আষাঢ় মাস। তাই বৃষ্টি যে যখন তখন ঝরবে এটা বলাই বাহুল্য। প্রকৃতি তার নিজ নিয়মেই চলে। কারও তোয়াক্কা সে করে না। তেমনি জ্বরও কোনকিছুর তোয়াক্কা করে না। যেমনটা আনিসের ক্ষেত্রেও করছে না। তবে ব্যতিক্রম এই যে আনিসের জ্বর আলাদা টাইপের। যখন তখন আসলেও আসাটা খুব ভালো হয় না। সাথে নিয়ে আসে একরাশ বিরক্তি আর মাথা ব্যথা! ছোটবেলা থেকেই জ্বর আসার আগে কাথা কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতো আনিস। ওর মা ছেলের কাণ্ড দেখে হাসতেন। মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান খাওয়া লাল ঠোঁটে চুকচুক করে বলতেন,
‘‘আহারে, আমার বাবাটা জ্বরে কাবু হয়ে গিয়েছে দেখছি!’’
আনিস কান্না করতে পারে না। নাক ফুলিয়ে শুয়ে থাকে। তাই দেখে ওর মা আনিসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। সেসময় আনিসের মনে হতো,তার মা সব থেকে ভালো। কিন্তু ধারণাটা ভুল তা সে ধরতেও পারেনি। পান খেয়ে ঠোট লাল করা, মিষ্টি চেহারার স্নেহময়ী নারীটি যে এভাবে চলে যাবেন সে ভাবতে পারেনি। আনিসের বাবার বন্ধুর সাথে চলে গিয়েছিলেন তিনি। তবে এসেছিলেন আবার। আনিসকে নিয়ে যেতে। সেদিন শক্ত করে বাবার হাত চেপে ধরে রেখেছিল আনিস। অতটুকু একটা ছেলে। কি বুঝেছিল কে জানে! মা চলে গিয়েছিল। একটা কথাই মাত্র আনিসের কথা মনে আছে। সেই কণ্ঠ সেই সুর।
‘‘আনিসের দিকে খেয়াল রেখো। ’’
তেমনিভাবে আজও শুয়ে আছে সে। পার্থক্য শুধু, বাইরে চনচনে রোদ। আর এই গরমে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। জ্বরেরধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে জানে, আনিস। চোখ বুঝে ভাবছে অনেক কথা। বাবার বুড়িয়ে যাওয়া। প্রাণচঞ্চল মানুষটার বদলিয়ে যাওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। চেনা মানুষটি হঠাৎ করে অচেনা হয়ে গেলেন। কথা বলতে গেলে হু হ্যাঁ ছাড়া কোনো জবাব আসে না।
বেশ ঠাণ্ডা লাগে আনিসের। কাথাটা আর একটু টেনে নেয়। ঘোড় লাগা শুরু হয়। মাথার দুদিকের রগে টান পরে। এমন সময় মনে হয় কেউ ঢুকে ওর ঘরে। দরজা খোলাই ছিল। মিষ্টি চেহারা। আনিসের মনে হয় ওর মা। সেই হাসি মুখ। হাত বাড়াতে গিয়ে জ্ঞান হারায় সে। ঘুমের ঘোরে শুনতে পায় রুমে কারও পদচারণা। চুড়ির টুংটাং আওয়াজ। পানির ছলছল শব্দ। আনিসের মাও চুড়ি পড়ত। চিকন কাচের চুরি। চুড়ির টুংটাং আওয়াজ বেশ লাগতো আনিসের। তাই সময়ের বেশিরভাগ মায়ের কাছেই থাকতো। আনিস আবছায়া আলোয় দেখে একটি মিষ্টি মুখ। পরক্ষনেই আবার হারিয়ে যায়। বাবার চেহারাটাও সামান্য ভেসে উঠে। সেটাও ক্ষণিকমাত্র। সব অন্ধকার হয়ে যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার!

দুই.
কপালে ঠাণ্ডা কিছুর স্পর্শ পেয়ে কেঁপে ওঠে আনিস। গাল বেয়ে পড়া পানির ঠাণ্ডা পরশ পায়। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। আধবোজা চোখে দেখে গোল চেহারার ফর্শা মিষ্টি একখানি মুখ তাকিয়ে আছে। চেহারায় উদ্বিগ্নতার ছাপ। আনিস মেয়েটিকে দেখে চমকে যায়। ধড়ফড় করে উঠতে চায়। কিন্তু দুর্বল শরীরে উঠতে পারে না। মাথা টলে আবার পড়ে যায় বিছানায়। ইশারায় চুপ করে শুয়ে থাকতে বলে ওকে। আলতো করে চোখ বুজে সে। মেয়েটি উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়। উজ্জ্বল আলোয় ঘর হেসে উঠে। বিকেলের পরন্ত আলোয় কিছুটা সুস্থভাব বোধ করে আনিস। পেটে ক্ষিধে চাগিয়ে উঠে। কিন্তু উঠে গিয়ে রান্না করার সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়ে চুপচাপ পরে থাকে। একটু পর মেয়েটি বাটিতে করে হালকা গরম স্যুপ নিয়ে আসে।আনিস মাথা তুলে বলে,
‘‘এসবের কোনো দরকার ছিল না, আরশি।’’
‘‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি। শরীরের যে অবস্থা! আর তাছাড়া আমি তো অকৃতজ্ঞ না।’’
খোটা খেয়ে আনিস চুপ করে থাকে।আরশি ফুঁ দেয় গরম স্যুপে। বলতে থাকে,
‘‘আমার তো নিজেরি প্রাণ নিয়ে টানাটানি অবস্থা। বাবা ছিল বলে রক্ষে।’’

আনিস এবার ভয় পায়। চমকে উঠে বলে,
‘‘তোমা.র বা… বা!’’
‘‘হ্যাঁ, বাবা। তো কি হয়েছে? ’’
‘‘না কিছু না। কিন্তু তুমি বুঝলে কিভাবে?’’
আরশি বলে, ‘‘তা জানার দরকার কী? একটা খবর তো দিতে পারতেন? ভাগ্যিস সেসময় ছাদে উঠছিলাম। গোঙানোর শব্দ কানে এলো। ভিতরে ঢুকে দেখি, দু হাত বাড়িয়ে মা মা বলে ডাকছেন।’’
আনিস লজ্জা পায়। পাওয়ারি কথা। হাজার হলেও বয়সে ছোট না। মৃদু হেসে উঠে।
আরশি বলে, ‘‘আন্টিকে মনে হয় অনেক ভালোবাসেন তাই না?’’
জবাবে চোয়াল শক্ত হয় আনিসের। ‘‘না।’’
‘‘কেন!’’
আনিস কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। আরশি কথা বাড়ায় না। বলে, ‘‘আচ্ছা বাদ দিন। এখন শুয়ে পড়ুন। বাবা ডাক্তার চাচাকে ফোন করে দিয়েছে। আসলো বলে।’’
আনিস চুপ করে থাকে। বাটি ও পানির বালতি নিয়ে বেড়িয়ে যায় আরশি।

তিন.
আরশি, বাবার একমাত্র মেয়ে। মা ছোটবেলায় মারা গিয়েছে। কাছের বলতে এক বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। যারা আছে, থেকেও নেই বা অনেক দূরে থাকে। বছরে দু একবার সাক্ষাত হয় এই যা। আনিস যখন আরশিদের তিনতলায় এক রুম ভাড়া নেয়, আরশি তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মেধাবী। কাজেকর্মে সব দিক দিয়ে পটু। কেউ একটু টু শব্দও করতে পারে না ওর উপড়ে। তাই তো একা সব কিছু সামলাচ্ছে। আনিসের সাথে আরশির ভাব, পরিচয়টা ভালো। বলতে গেলে খুবই ভালো। যা আরশির পক্ষ থেকে বেশি। আনিস চুপচাপ স্বভাবের। ভার্সিটি থেকে এসেই ঘরে ঢুকে বসে থাকে। খাওয়া-দাওয়া কখনো বাইরে আবার কখনো নিজেই রেঁধে নেয়। শুধু মাত্র বিকেলবেলা চুপচাপ ছাদে উঠে বসে থাকা আর আকাশের দিকে তাকানো ছাড়া আর কিছু না। এই রোজকার রুটিন। আরশির কেন জানি খুব চুপচাপ মনে হয় আনিসকে। মনে হয় ছেলেটির মাঝে অনেক দুঃখ। বাঙ্গালি নারীদের সচরাচর যা হয় আর কি? আরশির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মনেমনে আনিসকে পছন্দ করে ফেলেছে। অন্যসব মেয়েদের মতো কিন্তু সে না। কিছু ন্যাকা কথা আহ্লাদী স্বভাব কোনকিছুই ওর ধাতে নেই। পর্যবেক্ষণ করে ভালোভাবে। এ ছাড়াও মাঝেমধ্যে আনিসের জন্যে রান্না করে দেয়। ঘর গুছানো, ঝাড় দেয়া প্রায় দিনই করে সে। আনিস মুখে কিছু না বললে ও বিরক্ত হয় । আরশি তাই দেখে মুখ টিপে হাসে। হঠাৎ করে একদিন আরশি আনিসকে নিজের পছন্দের কথা বলে বসে। আনিস কিছু বলে না।
কিছুক্ষণ পর বলে, ‘‘দেখো তুমি যেটা ভাবছ সেটা ভালোবাসা না। ভালোলাগা। ভালোলাগা আর ভালোবাসা এক না। তাই আমার পক্ষে এ সম্ভব না।’’
আরশি চুপ করে থাকে না। মনের সব রাগ ঝাড়ে আনিসের উপরে।
‘‘আপনি একটা পাষাণ মনের মানুষ। একটা মেয়ে তার সবকিছু দিয়ে আপনাকে চায়। আর আপনি বুঝেও বুঝেন না। আপনি একটা অকৃতজ্ঞ লোক।’’
আনিস না শোনার ভান করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেননা কিছুই বলার নেই তার। কিই বা বলবে?

চার.
পাতলা সুতির চাদর গায়ে দিয়ে ছাদে আসে আরশি। ছাদঘেঁষা আমগাছের উপরে চাঁদ। তাই দেখে ও। বর্ষার স্নিগ্ধ চাঁদ। গোল থালার মতো চাঁদটি জ্যোৎস্নায় চকচক করছে। মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টির পানিতে এইমাত্র ধুয়ে দেওয়া হয়েছে। পিছন থেকে আনিস বলে,
‘‘চাঁদ টা সুন্দর তাই না?’’
চমকে আরশি মাথা ঘোরায়। আনিসকে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে। বলে,
‘‘আরে! আপনি এই শরীর নিয়ে ছাদে এসেছেন কেন? ঠাণ্ডা লেগে আবার জ্বর বাধিয়ে বসবেন দেখছি?’’
আনিস স্মিত হাসে।

‘‘না, এটুকু ঠাণ্ডায় কারো জ্বর আসে না সত্যি, তবে অনেকের ঘুম হারামও হয়ে যায়।’’
লজ্জায় আরশি মুখ লুকায়। আনিস একটু এগিয়ে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘‘আসলে ছোট বেলায় মা সব করে দিতো। খাওয়া থেকে শুরু করে সব। কখনওই কিছু বুঝিনি মা ছাড়া। কিন্তু তিনি যে এমন কাজ করবেন আমি কখনো ভাবিনি।’’
দীর্ঘশ্বাস ছারে আনিস। আরশি মুখ তুলে ওর দিকে চায়। আনিস ওর দৃষ্টিসীমানা দূর অন্ধকারে নিক্ষেপ করে।
‘‘মা যে এভাবে চলে যাবেন আমি ভাবিনি। সেইসময় দেখেছি বাবার নিরবতা। একজন প্রাণচঞ্চল মানুষের বুড়িয়ে যাওয়া। দিনের পর দিন একই ভাবে চলাফেরা করা। এতো ভালোবাসার পরও যদি ভালোবাসায় কমতি থাকে তাহলে কি লাভ ভালোবেসে? সবাইকে ছেড়ে যদি একজন কে নিয়েই ভালোবাসা হয়, তাহলে সেই ভালোবাসায় লাভ কি বলো? শুধু এক বুক হতাশা আর দুঃখ ছাড়া।’’
আনিস আরশির হাত ধরে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘‘আসলেই আমি অকৃতজ্ঞ তাই না? কারও ভালোবাসার মুল্য নেই আমার কাছে। জানো বিশ্বাসই হচ্ছে সবকিছু। এই বিশ্বাসটুকুই কাউকে করতে ইচ্ছে করে না। বারবার ভেসে উঠে বাবার থমকে যাওয়া চেহারা। তাই আমি অকৃতজ্ঞ। হ্যাঁ, আসলেই আমি অকৃতজ্ঞ।’’

আরশি কিছু বলে না। দুজনের হাতের উপর ওর চোখের পানি টপটপ করে পড়ে। চাঁদের আলোয় মুক্তোর মতো জ্বলে সেগুলো। কারো দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, হাসি-খুশির প্রতিক চোখের জল। আকাশের তারা গুলো মিটমিট করে জ্বলে। ওরা দুজন দাঁড়িয়ে থাকে। একজনের দুঃখ অন্যজনের চেহারায় প্রতিফলিত হয়।