“প্রাণ নেই,তবু জীবনেতে বেঁচে থাকা
মেলাবেন
তোমার সৃষ্টি,আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে
যত কিছু সুর,যা কিছু বেসুর বাজে
মেলাবেন”

মাতৃগর্ভ থেকে যে অমৃতময় যাত্রা সূচিত হয়েছিল,তা যে অশেষ,অফুরন্ত এবং আলোকময়,তখনই বোঝা যায় জীবনের লক্ষ্য বোঝা যায় এবং লক্ষ্য স্পর্শ করা যায়।
মানুষ জন্মগ্রহণের পর অসংখ্য প্রশ্ন এবং অনুচ্চারিত উত্তর নিয়েই এগিয়ে যেগে হয়।শেষ পর্যন্ত দেখা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র হয় ভুল করে প্রাপ্তি অথবা যা চাওয়া হয়েছিল,তার ঘরে পড়ে শূন্য।সমাজ, সংসার, জীবনসঙ্গী, কর্মক্ষেত্র,বিনোদন,অবসর এমন কি ঘরের পোষ্য পযর্ন্ত মনের মতো,চাহিদা মতো এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রাপ্তি ঘটে না!আবার যা যা পেলে,মনে হত জন্মযাত্রা সার্থক,তা কোনোদিন হাতের নাগালে আসে না!তাহলে হাতে পেনসিলের বদলে কী থাকল? হতাশা,ক্ষোভ, অতৃপ্তি এবং অহংকার।
এভাবে কী জীবন চলে? সেই ছোটবেলায় পড়া ভাবসম্প্রসারণ,”নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস” যেন সময়ের পরতে পরতে পাহাড় হয়ে উঠতে থাকে।শেষে সেই দমবন্ধ যাপনচিত্র মানুষকে তিলে তিলে মেরে ফেলে আর একটি নর্দমাকীটের মতো মৃত্যু তার একমাত্র দুর্ভল মানবজন্মকে নষ্ট করে।সেই প্রসাদীসুর মনে আছে তো–
‘এমন মানবজমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলত সোনা’
এখন প্রশ্ন, কে আমাদের মানবজমিন আবাদ করবে? ধর্ম, ঈশ্বর, গুরু, শিক্ষক, পিতামাতা অথবা কোনো মহাপুরুষের আলোকসঙ্গলাভ?
প্রত্যেক মানুষের জীবন কি সূর্যের মতো স্বচ্ছ অথবা বৃক্ষের পাতার মতো সরল বা নদীর জলের মতো পানীয়। মানুষ এক জীবনে শুধু সুষ্ঠুভাবে গ্রাসাচ্ছদনের ব্যবস্থা করতে করতে মারা যায়!তাদের কাছে গুরু বা মহাপুরুষ বা অললৌকিক আলো সহস্র জন্মেও পৌঁছায় না!
তারা তাহলে কী করবে?
তাদের সহজ-সরল তৃণসম চাহিদা,তার বিকেলের বাতাসের মতো একটুখানি অবসর, তার যে নৌকার নোঙরের মতো মাটি আঁকড়ে বাঁচা, তাদের কী হবে?
এককথায় আমাদের কী হবে?
আমরা তো তারাই যারা বিশ্বকবির ভাষায় সভ্যতার পিলসুজ। আমরা তো তারাই যারা তৃতীয় বিশ্বের এক জনগণমনদেশের বাস-ট্রেন-লঞ্চ বোঝাই কাজ করা পাবলিক।আমরা তো তারাই, যাদের সন্ত্রাসবাদীরা ধর্মের নামে, গণ আন্দোলনের নামে হত্যা করে চলে যায় ! আমরা তো তারাই,যারা রাজনৈতিক চার্লি চ্যাপলিনের গোঁফ, জুতো আর ছড়ি।
আমরা তাহলে কোথায় যাব?
আমরা এক মাত্র দুর্লভ জীবন কীভাবে সুন্দর করে,সাবলীল করে এবং সচেতন করে কাটাব?
আমাদের সময় হজরত মহম্মদ, যীশু, শ্রীরামকৃষ্ণ অথবা বিবেকানন্দ সশরীরে নেই,আমাদের সময় অলৌকিক আনন্দের কোনো সহজ পন্থা নেই, তাহলে আমাদের কী হবে?
একমাত্র উপায়, অক্ষর আলোর আয়না সন্ধান।
সেইরকম একটি গ্রন্থ।
তব করুন আঁখি।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
এমন গ্রন্থের কোনো আলোচনা করার বা সার্থকতা বোঝানোর ধৃষ্টতা আমার নেই।আমি কোনো সমালোচক নই বা এই লেখা কোনো পত্রিকার গ্রন্থালোচনার উজ্জ্বল পাতা হবে, এমন আশা করি না।
হয়তো এ লেখা স্বয়ং লেখকের চোখে কোনোদিন পড়বে না!
হয়তো এই লেখা অন্তরের বিশুদ্ধ আলোর মতো একবার জ্বলে ওঠে, আবার স্মার্ট সময়ে বুকে হারিয়ে যাবে!
কোনো ক্ষতি নেই। আফসোস নেই। শুধু আত্মসমর্পণ আর আত্মআনন্দ আছে। এমন একটি গ্রন্থ পাঠ করেছি।
আমি কোনো ধর্মগুরুর শিষত্ব গ্রহণ করিনি, কোনো ধর্ম প্রচার আমার ধাতে পোষায় না! আমি এমন একটি লেখার কথা বলতে চেয়েছি, যা পড়ে আমি পথ পেয়েছি, আপনারা পড়ে পথ পাবেন। কারণ আমাদের হাতে ধরে পথ দেখানোর কেউ নেই।
আমার বিশ্বাস সর্বদা, মূর্তির চেয়ে মানুষ বড়, আর মানুষের চেয়ে তাঁর জীবন।কারণ মানুষ একদিন মাটি ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু মানুষের জীবনধারার প্রভাব বা তাঁর কথা কোবোদিন মরবে না! আমার তো মনে হয়, সূর্য শুধু পুবদিকে ওঠে না, মানুষের মুখে ওঠে।
একজন মানুষকে যথার্থরূপে বদলতে দিতে আর পথ দেখাবো একজন মানুষই পারে।
মানুষ অমৃত আলো।
যদি জীবনের সার্থক উত্তর খুঁজতে হয়,তাহলে গুহায় নয়, সুউচ্চ মন্দির-মসজিদ-প্যাগোডায় নয়, ধর্মগ্রন্থে নয়, একমাত্র মানুষের জীবনে সন্ধান করতে হয়। এই গ্রন্থ একটি সমুদ্র ধারণ করে আছে, বিস্ময়কর এই এটি পানের যোগ্য এবং মনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবিশেষ উপযোগী। কয়েকটি বাণীসুলভ ঔষধ এই স্মার্টসময়ে প্রদান করি-
এক।আজকাল মনে হয়, সরল চোখ অর্জন করা পৃথিবীর কঠিনতম কাজ।
দুই।অত্যধিক নৈকট্য ও পরস্পরের প্রতি অতি মনোযোগের ফলে সম্পর্কের প্রার্থিত দূরত্ব রআিত হয় না, ফলে ছেলেমেয়েরা বেহাতি হয়ে যায়।
তিন। ভালোবাসা গভীর হলে তার সম্মোহনও যে কত গভীর হতে পারে, সেটাই মানুষ বুঝতে পারে না।
চার। সাম্রাজ্য বলতে শুধু সম্পদ আহরণ নয়, মানুষ অর্জন।
পাঁচ। স্ত্রী যতই সুন্দরী হোক বা স্বামী যতই আকর্ষণীয় হোক, বিয়ের কয়েক বছর পরেই দাম্পত্যজীবন একঘেয়ে হয়ে ওঠে, পরস্পরকে কিছু দেওয়ার নেই, যেন দুজন মানুষ দুজনের কাছে ফুরিয়ে যেতে থাকে, তার কারণ মননচর্চার অভাব।
ছয়। মনে রাখা দরকার,পরিবার বা সংসারের ভিত মজবুত না হলে রাষ্ট্র নড়বড়ে হয়ে যায়।
সাত। ভালোবাসা মানে যাকে ভালোবাসা যায়, তার ভালোতে বাস করা।
আট। নারূজাতিই সমাজের প্রকৃত ধারক ও বাহক, তারা ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকবে।
নয়। প্রকৃত ভালেবাসা থেকে মানুষ, অঘটন-ঘটন- পটীয়সী হয়ে উঠতে পারে। তবে আমরা যে ভালোবাসা সংসার ও বাস্তবজীবনে দেখতে পাই, তার মধ্যে আদিখ্যেতা ও দখলদারি মনোভাব বেশি থাকে।
এ কে কী বলেবেন? এ হল জীবন অমৃত।বরেণ্য কথাকার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর মননচর্চার ফসল আমাদের পথ দেখানোর জন্য সাজিয়ে দিয়েছেন। আপনাকে কোনো সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে না বা ঠাকুরের ভক্তও হতে হবে না। আপনি জীবনের আলোকিত পথ খুঁজছেন, মাটিতে, সংসারে, নিজের মধ্যে, তাই এই গ্রন্থটি দেখাবে।
পত্রভারতীর কর্ণধার এবং কিশোর ভারতী পত্রিকার সম্পাদক শ্রীত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং এই গ্রন্থটি পাঠের অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন একান্ত আলাপচারিতায় এবং কবিগুরু এই চরণটি শুনিয়েছিলেন-
জাগিবে একাকী
তব করুন আঁখি
তব অঞ্চল ছায়া
মোরে রহিবে ঢাকি।

গ্রন্থটি শিরোনাম প্রসঙ্গে এই গীতচরণটির কথা একেবারে মোহিত করে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ঠাকুরের সঙ্গে জড়ানো জীবন কেমন করে আলোর জীবন হয়ে উঠল, সেই আশ্চর্য জীবনপাঠ তুলে ধরেন। আমরা একদিন হয়তো ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সাধুকলমে তা পড়তে পাব। একবার স্বামী বিবেকানন্দ বাংলার গ্যারিক গিরিশ ঘোষকে বলেছিলেন, একটা জীবনী লিখুন তো জি সি, যাতে ঠাকুরের অলৌকিক কথা বাদ থাকবে। যাতে সংগ্রাম ও সাধনার কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে, একাত্ম হতে পারবে।
সে আশা পূর্ণ হয়নি বিবেকানন্দের।

সে আশার আলো দেখালেন, মানবজমিন কথাকার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। জয়তু।