গভীর রাত, আমি তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম। একটা বিকট পায়ের শব্দ বাড়ীর সামনের সমস্ত শুকনা পাতা মাড়িয়ে মনে হলো ধেয়ে আসছে দরজার দিকে। চারদিকে তখন ছন্নছাড়া অন্ধকার। শনশন বাতাসে ভেসে আসছে ভয়ঙ্কর কিছু অদ্ভুত আওয়াজ। দরজার কাছে আসতেই টের পেলাম ঘরের সদর দরজা খুলে গেলো । পুরোটা ঘর জুড়ে গা ছমছম করা একটা ভূতুড়ে পরিবেশ। নিজেকে দেখতে পারছিলাম না, শুধু মনে হলো সামনে প্রকাণ্ড এক ছায়ামূর্তি যা আমার দিকেই ধেয়ে আসছে। দৌড়ে বের হয়ে গেলাম ঘর থেকে। দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করছিলাম, কিন্তু কোন শব্দ বের হচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো কেউ একজন গলা চেপে ধরেছে।। আমি এপাশ- ওপাশ করছিলাম।। গলা শুকিয়ে আসছিলো।
তখন মনে হলো মাথায় কে যেনো হাত রেখে আমাকে ডাকছে, এই কি হলো তোমার! সকাল হয়েছে উঠো… একী সর্বনাশ! তোমার তো দেখছি গা পুড়ে যাচ্ছে। এজন্যই আজ ঘুমের ঘোরে বার বার কেমন যেনো করছিলে।। দাঁড়াও, আমি তোমার জন্য কফি বানিয়ে আনছি। আজ স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে নাও। ডাক্তার দেখাতে হবে।
ছোট শহরে বেড়ে উঠেছি আমি আর অন্ত একই পাড়ায়। খুব ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা। স্কুলে যাবার সময় পথে মেয়েদের আর ছেলেদের গ্রুপ যদিও আলাদা ছিলো তবুও দুজনের নজর থাকতো একে অন্যের দিকে। কিসের যেনো একটা মনের টান ছিলো দুজনের। একবার ছোটবেলায় আমাকে স্কুল শেষে পাওয়া যাচ্ছিলো না,কোন একটা গাড়ির ধাক্কা লাগায় কেউ একজন আমাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়,তখন দু দিন তো অন্ত-র অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। সেও প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। এভাবেই দুজনে খুব কাছ থেকে বড় হয়েছি আমরা। দেখতে দেখতে ৭ বছরের সংসার জীবন চলে গেলো । তিল তিল করে মনের মাধুরি মিশিয়ে সাজিয়েছিলাম দুজনে মিলে। আমি স্কুল শিক্ষিকার চাকুরি পেয়ে গেলাম আর অন্ত উত্তরায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে বড় কর্মকর্তা। বিয়ের এতোটা বছর প্রেম আর ভালোবাসায় যেনো পরিপূর্ণ এক প্রশান্ত মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম, দুঃখ বেদনা আর হাসি কান্নার এক যুগলবন্দী জীবন। অনাগত অতিথির অপেক্ষায় দিন যায়, রাত আসে! একদিন ফুটফুটে চাঁদের আলোয় ভরে উঠবে সহসা এই প্রেমকানন, এই ভেবে ভেবে ঘুঙুরের মতো গড়াচ্ছিলো আমাদের দুজনার সময়!
আজও জ্বরের ঘোরে নাকি প্রলাপ বকছিলাম,”অন্ত ছেলে হলে সে হবে তোমার মতো সুন্দর, আমার না তোমার মতো একটা ছেলে চাই”, বলো না দেবে তো? অন্ত কোন জবাব না দিয়ে আমার মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢালছিলো আর ভাবছিলো…..মিতু-র কি হয়ে গেলো এভাবে প্রায়ই জ্বর আসছে কেনো? অন্ত ডা. হালিম চাচাকে ফোন করলে, কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার চাচা এলেন। আমাকে দেখলেন, কিছু ওষুধ দিলেন, আর বললেন, যেন পূর্ণ বিশ্রাম নিই।
এভাবেই ভালোবাসাময় আমাদের গুছানো সংসারে লতানো ডগার মতো তরতর করে সুখ ছেয়েছিলো। দুপুরে যদিও একসাথে খাওয়া মুশকিল তবে রাতের খাবার খুব আয়েশ করে গল্পগুজবের মাঝে সারা হতো। অন্ত-র খুব পছন্দ বিভিন্ন রঙের ফুলের গাছ , তাই সারা বারান্দা জুড়ে রঙবেরঙের ফুলের টব দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছি ঘরের আঙ্গিনা। যদিও সবুজ পাতাগুলো যখন খয়েরি রঙের হতো , আর তাতে ভুল করে যদি আঙ্গুল লেগে যেতো, তবে এক ধরনের এলারজি হতো আমার। তবুও অন্তকে খুশি করবার জন্য সাতরঙা ফুলের গাছ চাষ করতাম।
কিছুদিন থেকে অন্ত-র যে কি হয়েছে বুঝতে পারছি না। কথা খুব কম বলে, কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে। রাতে বাড়ী ফিরতে বেশ দেরি করছে। আমি টেবিলে খাবার সামনে নিয়ে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ি। জিজ্ঞেস করলেই বলে একটা ইম্পরট্যান্ট প্রোজেক্ট আছে তাই সময় দিতে হয়। সকালে তো আমার স্কুল থাকে, তাই কদিন থেকে আর অপেক্ষা করতে পারছি না। তাছাড়া শরীরটাও আজকাল কেমন যেনো বিগড়ে আছে, প্রায়ই জ্বর আসে,সারারাত জুড়ে উদ্ভট সব স্বপ্ন তাড়া করে। ছুটির দিনেও আজকাল অন্ত বিজি থাকে, কেমন যেনো একাকী লাগে। বাসায় ফিরতে বেশ দেরী করে। অথচ আগে কখনও এমন করতো না। ওকে এতোটাই ভালোবাসি যে, কিছুতেই তেমন করে কিছু বলতে পারছি না। বোবার মতো তাকিয়ে থাকি আজকাল নতুন অন্ত কে দেখে। খুঁজে ফিরি আমার চিরচেনা অন্তকে। একদিন আর সহ্য করতে না পেরে ওকে বলেছিলোম… “শোন আমার খুব একা লাগে, স্কুল থেকে ফিরে ভীষণ ভয় লাগে, চলোনা, আমরা একটা বাচ্চা এডোপ্ট করি”!
কিন্তু অন্ত আমার এমন আবদার খুব কায়দা করে উড়িয়ে দেয়। বলে “আমিতো আছি তোমার, আর কে লাগে”! আমি আর কোন কথা বলতে পারিনি, শুধু মনে মনে বলি, আজকাল তুমি কোথায় যে আছো, সে আমি টের পাই না গো।
সেদিন ছিলো ছুটির দিন, আরও দুদিন ছুটি নিয়ে আমি মায়ের কাছে যেতে চাইলাম, অন্য সময় হলে অন্ত যেতে দিতো না, বলতো, আমি একা হয়ে যাবো, যেও না। এবার বলল,
যাও কিছুদিন থেকে এসো, তোমার ভালো লাগবে। আমিও বেশ ব্যস্ত, কাজ গুছিয়ে নেই।
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, তবে তাই হোক। পরের দিন সকালে চলে গেলাম মায়ের কাছে মন খারাপ করা এক অভিমান নিয়ে। কিন্তু মন পড়ে রইলো সংসারে। অন্ত ঠিক সময়ে অফিস যাচ্ছে কি-না, ওর ঘুম ভেঙেছে কি-না! দুপুরের খাবার যদিও ফ্রিজে বানিয়ে এসেছি তবুও ওর খুব কষ্ট হবে কাজ থেকে এসে আবার গরম করে খাওয়াটা। বারান্দায় ফুলের টবগুলোতে কে পানি দেবে?
আমি ছাড়া অন্ত-র একা লাগবে না তো? সারাক্ষণ এমন ভাবনা আমাকে ঘিরে রাখছে। উফফ! মায়ের বাসায় গিয়েও কেনো যেনো শান্তি পাচ্ছি না। কেনো যে, ওর জন্য মন পড়ে আছে। সবে শ্রাবণের শুরু, বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। অমন বৃষ্টিতে মন আরও ভিজে গেলো।
পরদিন ঘুম থেকে জেগেই মাথা খুব ঘুরছিলো, কেমন যেনো বমি বমি লাগছিলো। চারদিক অন্ধকার দেখাচ্ছিলো। অথচ সবে সকাল হলো। মা-কে ডাকবো নাকি? নাহ থাক্ মা হয়ত ফজরের নামাজ শেষে ঘুমাচ্ছেন। তড়িঘড়ি করে বাথরুমে ভেসিনে মুখ রাখতেই একদলা বমি এলো। খুব অস্বস্তি লাগছে। কি করবো ভেবে পেলাম না । খুব বুঝতে পেরেছিলাম নতুন মেহমান আসছে , আমাদের সংসারে। তাৎক্ষনিক মন খুশিতে ভরে উঠলো। এই আনন্দের সংবাদ ফোনেও দিতে ইচ্ছে হলো না অন্তকে। মা-কে বলবো? না থাক, আগে ওকে জানাবো। তবে ফোনে নয়, আমি নিজেই গিয়ে বলবো। এক অজানা আনন্দে আমার মুখ জ্বলজ্বল করছিলো। মাকে ঘুম থেকে না জাগিয়েই বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। মায়ের বাসা থেকে আমার বাসা খুব একটা দূরে নয় তবুও ট্রাফিক জ্যাম এ পড়ে কয়েক ঘন্টা লেগে গেলো। আজ বাসায় গিয়েই ফোন করে অন্ত-কে ডেকে পাঠাবো, নাকি সরাসরি ওর অফিসে যাবো! ও- খুব সারপ্রাইজড হবে। নাহ থাক বাসায় যাই, শরীরও কেমন ভালো লাগছে না। রাস্তা থেকে কি এক গুছা ফুলের তোড়া নিয়ে যাবো? কি জানি কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। বুকটা এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। তবুও কিসের যেনো একটা অস্বস্তি কাজ করছে।
কয়েকঘন্টা জল্পনা-কল্পনা ভাবনায় কাটিয়ে বাসায় সামনে আসতেই মা ফোন করে বললেন, কই রে তুই? নাস্তা বানিয়ে তোকে পাচ্ছি না! হাসতে হাসতে বললাম, মা আমি এখন আমার বাসার সামনে। তুমি নানী হবে মা! আমি বিষয়টা বুঝতে পেরেই চলে এলাম বাসায়। তোমার জামাইকে নিজ মুখে জানাবো বলে।। দোয়া করো মা।
এদিকে বাসার সামনে এলেই দারোয়ান চাচা বললেন, এ-কি মা তুমি এখন এলে, স্যার সবেমাত্র বাসা থেকে বের হলেন। আমি বললাম সমস্যা নেই চাচা, আমি তো ওকে না জানিয়ে হুট করে এলাম।
ঘরের চাবি, ভ্যানেটি ব্যাগ থেকে বের করে দরজা খুলতেই ঘরময় সিগারেটের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় খুব কাশি পেলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই ড্রইং রুমে এ্যাস্ট্রেতে দেখতে পেলাম , কিছু সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ পড়ে আছে, এখনও জ্বলছে খানিকটা। জানালা খুলে দিলাম। পায়ে পায়ে বেড রুমের দিকে পা বাড়াতেই অচেনা পারফিউমের গন্ধে আমার আবারও মাথা ঘুরে এলো। বসে পড়লাম চেয়ার ঘেসে। অন্তকে ফোন করলাম কয়েকবার। উত্তর নেই। ১০ মিনিট পর অন্ত কল ব্যাক করলো। ওকে কোথায় আছে জিজ্ঞেস করতেই, ওপাশ থেকে উত্তর এলো, আমি তো এখন ঢাকার বাহিরে, তুমি নিশ্চয় মায়ের সাথে বেশ ভালো সময় কাটাচ্ছো! নিজের খেয়ার রেখো কেমন! আমি নির্বাক হয়ে রইলাম! কি বা বলার আছে এখন! এতোদিনের সংসার, এতো দিনের ভালোবাসা তবে কি সবই মিছে ছিলো? ও কেনো এমন করলো আমার সাথে? কেন? কেন? গলাটা শুকিয়ে আসছিলো, মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা।
অন্ত-কে সুখবরটা আর দেয়া হলো না, যে খবরের জন্য দুজনই উদ্রিব ছিলাম আমরা। আহা! এ-কি হয়ে গেলো! মুখ চেপে দৌড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। চোখের জল ধরে রাখতে পারছি না। কেনো এমন হলো? কেনো অন্ত অমন মিথ্যে বলল? তখন অঝরধারায় বৃষ্টি নেমেছে। সারাটা আকাশ ভেঙে ঝরছে বারিধারা। আমি শুধুই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বৃষ্টি একসময় আপন নিয়মে থেমে গেলেও সারা ঘর কোনো এক অচেনা পারফিউম আর সিগারেটের দুর্গন্ধে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে রইল…