-গাছেরা কত দিন বাঁচে জানো? জানো না, তাই তো?
-শোন, কিছু গাছ অল্প বয়সে মারা যায়। আবার কিছু গাছ সহজে মরে না। একশ, দুশ পাঁচশ এমন কি এক হাজার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। বেশি বয়স হলেও গাছের রঙ ফ্যাকাশে হয় না।
একজন মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়, তখন তার গায়ের চামড়া খসখসে হয়। কুঁচকে যায়। দেখতে তারুণ্যের সেই লাবণ্য আর থাকে না, কথায় কাজে দ্রুততা থাকে না। মানুষ অবশ্যি খুব কষ্টে পড়ে যায়। গায়ে জোর কমে যায়, হাঁটা চলা করতে পারে না। চোখে ছানি পড়ে, ভালো মত দেখতে পায় না, ভুল বাল কথা বলে, আগের শব্দ পরে বলে, পরের শব্দ আগে, অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে। সম্পূর্ণভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নিজেকে খুব অসহায় ফিল্ করে। ব্যতিক্রমও অবশ্যি দেখা যায়। কিন্তু গাছদের বেলায় তা হয় না।
আমাদের গ্রামে অনেক বড়, বিস্তৃত, একটা গাছ আছে। গাছটির নাম আমি জানি না। কখনো জানতে ইচ্ছেও আমার হয়নি। আমার দাদা-দাদীরা, বাবা-মা’রা ওই গাছটাকে বড়গাছ বলে। বড়গাছ কোন গাছের নাম হতে পারে, আমি কখনো শুনিনি। নাম নিয়ে আমার তেমন কৌতুহল না থাকলেও গাছটির বয়স নিয়ে আমার অনেক কৌতুহল ছিল এবং আছে। গত বছর দাদা মারা যাওয়ার আগে দাদাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছি। দাদা তোমাদের এই বড়গাছটির জন্ম কখন?
-দাদা বলল! এই প্রশ্নটা আমি আমার বাবাকেও করেছিলাম।
-তিনি আমাকে বলেন, ওনার বাবাও গাছটাকে এমন অবস্থায় দেখেছেন? সঠিক বয়স কেউ বলতে পারে না, গ্রামের দোকানে গাছটাকে পাঁচ’শ বছর আগের বলে উল্লেখ করে একটি সাইন বোর্ড দেয়। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন এতদিন পরও গাছ এতো সবুজ থাকে কেমন করে?
নিহাদ এতোক্ষণ নিরবের কথাগুলো শুনছিল।
-বললো, আচ্ছা আমি যদি বড় গাছটার মত বাঁচতে পারতাম?
-দূর বোকা, কেউ গাছের মতো বাঁচে নাকি! তবে আগের দিনের মানুষ অনেক দিন বাঁচতো। এখন মানুষ বেশি দিন বাঁচে না?
-কেন বাঁচে না?
কেন তুই জানিস না! এখন খাদ্যদ্রব্যগুলোতে ভেজাল থাকে। ফরমালিন দেয়, কার্বাইড দেয়, ফলে, মাছ-মাংস সহ শাকস্বজিতে, আরো কত রং মিশিয়ে ফাস্টফুড তৈরি করা হয়। এসব মানুষকে বাধ্য হয়ে খেতে হচ্ছে! ফলে দ্রুত মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রানাত হয়! কিডনি, লিভার, হার্ট দ্রুত কার্যকারিতা হারাচ্ছে। সৃষ্টি হয় বিভিন্ন রোগ, তাই মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। কিন্তু আগের দিনে “দাদার মুখে শুনেছি, মানুষের গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, গ্রামে গ্রামে সবুজ সবজি ফসল হতো, এ থেকে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য খেয়ে মানুষ অনেক দিন বাঁচত। তবে এখন আরো বেশি ফলস উৎপাদিত হয় কিন্তু……….?
-নিহাদ বললো, থাক! মানুষ কী বাঁচত ঐ বড় গাছটার মত!
-আরে না?
-তাহলে বড় গাছটা এতোদিন, এতোদিন বাঁচল কী করে?
-সেটা জানা নাই! তবে বিজ্ঞানীরা তো কতো কিছু আবিষ্কার করে! নিশ্চয়ই তারা জানতে পারবে।
-দূর বোকা, এখন বিজ্ঞানী পাবো কোথায়?
-সেটাও অবশ্যি ঠিক! তবে বইয়ে পড়েছি আমাদের বাংলাদেশের এক মহান বিজ্ঞানী ছিল স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। তিনি নাকি রেডিও আবিষ্কারে প্রধান ভূমিকা রাখেন। সেই জগদীশচন্দ্র বসু নাকি গাছের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার অনুভূতি বুঝতেন?
-বুঝতেন মানে?
-মানে গাছেরা দুঃখ পেলে কাঁদে, সুখে হাসে, এই সব আর কি?
-ইস্ আজ যদি জগদিশ চন্দ্র বসু থাকত্! তবে ওনার কাছে গিয়ে জানতে পারতাম, এই বড় গাছটি এতোদিন বাঁচল কেমন করে?
-জানিস! নিহাদ!
-কি?
-মা বলেছে, মা যেদিন আমাদের বাড়িতে আসে, আমার জন্মেরও অনেক আগে! তখন একদিন নাকি উত্তর পাড়ার এক লোক রহিম মিয়া রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি হঠাৎ দেখতে পান গাছটির চার পাশে আগুন জ্বলছে এবং গাছের ডালে কারা জানি বিভিন্ন খেলা করছে। এটা দেখে, ওনি বেহুশ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। হঠাৎ পাশে বাড়ির তমিজউদ্দিন দেখতে পেলে লোকজন জড় করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। হুঁশ হলে, তিনি সবাইকে এসব কথা বলেন। এরপর থেকে রহিম মিয়া, তমিজউদ্দিনও কেমন হয়ে যায়। ঠিক এরপর দিন তমিজউদ্দিন দেখতে যাই, আসলে কি আছে ঐ গাছে।
তমিজউদ্দিন বলে, ঠিক দুপুর বেলা! সূর্যটা মাথার ওপর। রোদের ডানায় যেন ঝাপটা দিচ্ছে বাতাসের সাথে, গাছের পাতাগুলো চিক্ চিক্ করছে। গাছের পাশে যেতে তমিজউদ্দিনের গাঁ ছম ছম করতে লাগল। তমিজ উদ্দিন ভয়ে বলছে, গাছে কেউ আছেন? হঠাৎ একটা শব্দ তমিজউদ্দিনের কানে আসে,
-আমি! আমি!
-আমি কে?
তমিজ উদ্দিন গ্রামে থাকলেও তার বড় ছেলে অনেক পড়ালেখা করে বলে, ভূত সম্পর্কে বলছে, জানে। তিনি এতোটা ভুত-টুতে বিশ্বাস করেন না। ঠিকদুপুর, গাছে ভূত টুত নেই তো!
তমিজউদ্দিন কাঁপা কাঁপা গলায় আবার বলেন, কে? কে কথা বলছেন?
-জি আমি! আপনার পাশেই আছি। অদৃশ্য হয়ে আছি বলে আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না।
তমিজউদ্দিন ভাবে জ্বিন-টিন না তো! ঠিক দুপুরে জোহরের সময় জিনের আনাগোনা দেখা যায়। জিনদের তো কেউ দেখতে পায় না। এরা অদৃশ্য থাকে।
-তমিজউদ্দিন আবার বলে, আপনি কে?
-আমি! আমি!
-আমিটা কে? সাহস করে বলেই ফেলে, জ্বিন নাকি ভূত?
-আমি জ্বিনও না, ভূতও না! আমি মানে আমি।
দূর থেকে তমিজউদ্দিনের ভাই ইয়াজউদ্দিন দেখে তার ভাই গাছের সঙ্গে কথা বলছে! বাতাসের সঙ্গে কথা বলছে। এর কোন মানে হয় না। ভাই পাগল-টাগল হয়ে গেলে না তো। দ্রুত বাড়িতে গিয়ে সবাইকে খবর দেয়।
ইয়াজউদ্দিনের কথায় সবাই কানাঘুষা করছে। ৬৫-৬৬ বছরে বয়সের একজন মানুষ কিভাবে দিন দুপুরে গাছের সঙ্গে, বাতাসের সঙ্গে কথা বলে? সবাই দলে দলে দেখতে আসে তমিজউদ্দিনকে। ইয়াজউদ্দিন, তমিজউদ্দিনকে দেখতে না পেয়ে ভয় পাই। এই দিন দুপুরে তার ভাই অদৃশ্য হল কীভাবে? তবু লোকজন সহ কাছে এলে, দেখে, তমিজউদ্দিন গাছের নিচে পড়ে আছে। মুখে ফেনা এসে যায়। সবাই তমিজউদ্দিনকে দ্রুত বাড়ি নিয়ে আসে। ডাক্তার আসে, ডাক্তার বলে, ভয়ে এমনটি হয়ে যায়? পানি দিলে, পানির ছিটকা দিলে ঠিক হয়ে যাবে।
তমিজউদ্দিনের মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না, ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে একদিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু মুখেও দিচ্ছে না। আশেপাশের গ্রাম সহ অনেক মানুষ দেখতে আসে। কেউ বলে ভূতে ধরেছে। কেউবা বলে জ্বিনে। দু’দিন পর তমিজ উদ্দিনের মুখ দিয়ে কথা ফোটে।
গ্রামের গণ্য মান্য সব মানুষকে বলে, সে গাছের মধ্যে অদৃশ্য যে আমার সাথে কথা বলছে, সে বলল, এদের খাদ্য হলো, সূর্য ও চাঁদের আলো, ওগুলো তাদের বায়বীয় খাবার, আর এই গ্রাছের পাতা তাদের প্রধান খাদ্য। গাছের পাতা খেলেও কখনো কেউ গাছের পাতা কমেছে বলে চোখে পড়ে না, বরং পাতা বাড়ছে। চাঁদের আলো সহজে হজম হলেও সূর্যের আলো সহজে হজম হয় না, বয়স হলে খেতে পারে। তবে তারা অন্য কোন আলো খায় না, আলো খায় বলে, তাদের কেউ দেখতে পায় না। তমিজ উদ্দিন বয়স্ক ও মান্যগণ্য ব্যক্তি হওয়ায় সবাই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং কথাগুলো বিশ্বাস করে সবাই ধরে নেয় জ্বীন বা অদৃশ্য পীর আউলিয়া এরকম কোন কিছু হবে, সেই থেকে সবাই নাকি ঐ গাছকে অনেক ভয় পায়। আর গাছটিও সবুজ সতেজ।
উত্তর পাড়ার রহিম মিয়া দেখছে যে, গাছের চারপাশে আগুন জ্বলছে এবং গাছে কেউ ওঠছে নামছে, খেলা করছে। তখন থেকে সবার মুখে মুখে রটে যায়। গাছটার অনেক ক্ষমতা। সে থেকে গাছটি বটগাছ হলেও সবাই বড়গাছ বলে ডাকে।
-নিহাদ রীতিমত চমকে ওঠে, তাই নাকি।
-নিরব হ্যাঁ, জানিস নিহাদ, মার মুখে শুনে আমি চিন্তা করতে পারছি না।
-তারপর কি হল?
অবাক কা-! প্রায় এক বছর পর উত্তর পাড়ার রহিম মিয়া মারা গেল। তার ঠিক ছ’মাস পর মারা গেল তমিজউদ্দিন। এখনো গাছটা সেই আগের মতোই আছে।
-মজার কথা হলো কী?
-কি, নিরব!
বর্তমান এ সম্পর্কে সবাই জানলো, অনেক টিভি চ্যানেলে এর সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রচার হল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হল। অথচ বিজ্ঞানের এতো উৎকর্ষতা ও উন্নতি, দেশের বিদেশের অনেক বিজ্ঞানী এলো, গেলো, দেখলো, গবেষণা করলো, বিভিন্ন তথ্য দিল। সবাই বলে বড় গাছটার আনুমানিক বয়সহবে দু’শ বছর, তিন’শ বছর কিংবা তারও অধিক। বড় গাছটার সঠিক বয়স, আগুন জ্বালা এবং গাছে কে ছিল, কোথা থেকে এল, তমিজ উদ্দিন যে আমি’র সাথে কথা বলেছিল সে রহস্য এখনো অজানাই থেকে গেলো।