করোনা কাল চলছে গৃহবন্দী সমস্ত বিশ্ব, লক ডাউন নামক প্রহেলিকায়। ব্রিটেনের আকাশ পানে তাকিয়ে ডুবে যাই গাঢ় নীলে। এই দুঃসময়ে ও যে কত নীল থাকে আকাশে। কদিন ধরে আকাশ নির্মেঘ। প্রকৃতি যেন সজীবতা ফিরে পেয়েছে। পাখিদের কিচিরমিচির সেই শৈশব ফিরিয়ে এনেছে। ঘাসের রং আরো সবুজ যেন। আপেল আঙ্গুর গাছে ফুল এসেছে। প্লাম আরো বর্ণে ডুবে আছে। করোনা মড়কের আগ্রাসনে এট্যোমসফেয়ার বদলে গেছে। মানুষ জাতি ঘরে ফেরায়, প্রকৃতি কিংবা প্রাণী জগতে এক স্বস্তির নিঃশাস। সামুদ্রিক প্রাণী ফিরে এসেছে তীরে। কমে গেছে কার্বন নিঃসরণ। শব্দ দূষণ নেই কোথাও। অসহ্য হর্ন বাজেনা এখন। ধরিত্রী আমাদের জীবনের খোরাক জুগায়। আর আমরা নির্বিচারে উজাড় করছি বন। মার্তৃক্রোড় চুত্য হয়েছে পশুরা কিন্তু আমরা নারী ভেবে নিয়ে ধরণীকে উপেক্ষা করে গেছি ভেবেছি সর্বংসহা। অত্যাচার নির্যাতন কিছু বাকি রাখিনি। আগুনের জঠর বড় সহ্য আবার তেজ তার। তাইতো প্রতিশোধের মড়ক করোনা নামে ফিরে এসেছে। মহাকালের আবর্তে মানুষ হত্যার নারকীয়তার উল্লাস যখন, পারমাণবিক বোমার আঘাতে মানুষ মারার কুট কৌশলে লিপ্ত অমানুষগুলো ঠিক তখনি অসহিংসু পৃথিবীর অমোঘ আবর্তে ছড়িয়েছে বোমা নামের অভিশপ্ত জীবাণু করোনা। অসহায় মানবকুলের ঠাঁই নেই মুক্তাঞ্চল বাতাস বিষাক্ত কমে গেছে কার্বন নিঃসরণ। বহুকাল পর সমুদ্রে নেচে উঠেছে ডলপিন।

প্রথম প্রকৃতি থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষ তার বুদ্ধি বল অর্জন করে সমাজ গঠন করে। আধিপত্য বিস্তার করে। আজ এই আধিপত্য বিস্তারে প্রকৃতিকেই মানুষ কোণঠাসা করে চলছে। ২১০০সাল নাগাদ সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা ১’১মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতিসংঘের রেড অ্যালার্ট।

জাতিসংঘের একটি বিজ্ঞানী প্যানেল হুঁশিয়ার করেছে- মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগর -পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোই বেশি দায়ী। পরিবেশ দূষণের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ হলো- বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, কৃষিক্ষেত্রে দূষণের প্রভাব, মাটি দূষণ, পানি দূষণ, ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য, বৃক্ষের ভূমিকা।

বাস ট্রাক রেল গাড়ি, লঞ্চ-স্টিমারে হাইড্রোলিক হর্ন এর শব্দ, বিমানের বিকট শব্দ শিল্প-কারখানার শব্দ, ইট পাথর ভাঙ্গার শব্দ মাইকের শব্দ হাট বাজার যানজট জনসভা মানুষের কোলাহলের শব্দ, সমুদ্রের গর্জন, শব্দ দূষণের কারণে হ্নদরোগ মাথাব্যথা অনিদ্রা মানসিক বিপর্যয়, স্নায়ুবিক বৈকল্য অনেক ধরনের সমস্যা দেখা যায়।

মাটি দূষণ উপকূলীয় অঞ্চলে যেমন ঝড় ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস বন্যা ইত্যাদির কারণে অবকাঠামোগুলো ধ্বংস হয়ে কৃষি জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে মাটি দূষিত হচ্ছে। অধিক লবণাক্ততার জন্য মিঠা পানি সংকটের কারণে ফসলের জমিতে সেচ কার্যক্রম সম্ভব হচ্ছে না।

পানি দূষণ পানি নিষ্কাশনের নালা সাধারণত জলাশয় এর সাথে যুক্ত থাকার কারণে শহর হাটবাজার বাসা বাড়ির ময়লা আবর্জনা বিভিন্ন প্রাণীর মলমূত্র নদীতে পড়ে পানি দূষিত হচ্ছে। জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের বর্জ্য ও খনি হতে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ পানি দূষণের একটি অন্যতম প্রধান কারণ।

কৃষি ক্ষেত্রে দূষণের প্রভাব ফসলের উৎপাদন নির্ভর করে মাটি পানি বায়ু আদ্রতা তাপমাত্রা ও আলোর প্রখরতার উপর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সামগ্রিক কৃষি পরিবেশের উপর পড়ছে। এ কারণে আগাম বন্যায় বোরো ধান সহ অন্যান্য ফসল পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে।

নির্বিচারে বর্ণ ও জলজ প্রাণী শিকার বন্ধ করতে হবে। জৈব কৃষির উপর অধিক জোর দিতে হবে। জলাশয় সাগর নদী দূষণমুক্ত রাখতে হবে। শব্দ দূষণ রোধে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। নিয়মিত এয়ার মনিটরিং এর মাধ্যমে বায়ু দূষণের উপাদানগুলোর পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। কাঠের ফার্নিচার এর বিকল্প হিসাবে প্লাস্টিক লোহা ব্যবহৃত করতে হবে।

বৃক্ষের ভূমিকা- বৃক্ষরাজি বাতাস থেকে CO2 শোষণ এবং অক্সিজেন O2 ত্যাগের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। একটি বয়স্ক বৃক্ষ দশজন মানুষের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করে। বৃক্ষ শব্দদূষণ রোধে বিরাট ভূমিকা পালন করে। তাই পৃথিবীর স্বার্থে পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষকে অন্তত একটি বৃক্ষ চারা রোপন ও পরিচর্যা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
বৃক্ষ এবং বন কেটে আমরা উজার করছি।

আইপিসিসির কো- চেয়ারম্যান ড: ক্রিস্টোফার ফিল্ড হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে পড়তে শুরু করেছে।

এই সেদিন ও প্রকৃতি তার ম্যাজিক দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ যতই উন্নয়নের অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় তুচ্ছ করেছে প্রকৃতিকে কিন্তূ প্রকৃতি মানুষ কে বাচিয়ে রেখেছে অস্তিত্বের লড়াইয়ে। তথ্যমতে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের গতি ৭০ কিলোমিটার কমিয়েছে সুন্দরবন। এর জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও তিন থেকে চার ফুট কমিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঝড়টি ঘন্টায় ১৫৫থেকে ১৬৫ কিলোমিটার গতিবেগে আঘাত হানে। কিন্তু বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় আঘাত করে ঘন্টায় ১৫১ কিলোমিটার গতিবেগে তার আগেই সুন্দরবন এর শক্তি কমিয়ে দেয়।যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষতি হতে পারতো শুধু সুন্দরবনের কারণে রক্ষা পেয়েছে উপকূলের মানুষ ও সম্পদ। ১৯৭০ ঘূর্ণিঝড় কাভার করতে এসে বঙ্গোপসাগরের উপকূল বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের অংশকে “ভৌগলিক কফিন” আখ্যা দিয়েছিলেন সাংবাদিক জন পিলজার। পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় এত মানুষ বাস করে। শুধু বাংলাদেশের নয় সমস্ত পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ হল আমাদের সুন্দরবন। বুধবারের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের মধ্য দিয়ে তা আরেকবার প্রমাণ হলো। সুন্দরবন না থাকলে অবস্থা কি হত? অতীতেও সিডর-আইলার সময় সুন্দরবন সুরক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গাছপালা প্রকৃতির অংশ এবং মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। জীব-বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম।

পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে একক উদ্যোগ নয় সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণের এ ক্ষেত্রে কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সম্পদ সমূহের যথাযথ ব্যবহার , সুরক্ষা এবং পরিচালনা। বিশ্বজুড়ে অনেক পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে। অসুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করতেই মানুষের জন্ম। আসুন সবাই মিলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি।