সৈয়দ কওসর জামালের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘স্বগতোক্তিপ্রায়’ (২০২১) কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতা পাঠকের কাছে এক ভিন্ন স্বাদের কাব্যদর্শন তা বলাই যায়। কবিতা মাত্রই কিছুটা স্বগোতক্তি একথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এই স্বগোতক্তির মধ্যে নাটকীয়তা নেই। ভাষায় আলংকারিক প্রয়োগ নেই। যা আছে তা আত্মক্ষরণের নিবিড় সংশ্লেষ। একান্ত ব্যক্তিগত অনুচ্ছায়ার গদ্যলিপি। স্মৃতিরোমন্থন,আত্মবিশ্লেষণ,দার্শনিক চেতনা, মৃত্যুভাবনা সব মিলিয়েই কবির জীবনবোধের চাবি খুঁজে পাই। এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে এস টি কোলরিজের সেই বিখ্যাত কথাটি:

“And in Life’s noisiest hour, There whispers still the ceaseless Love of Thee, The heart’s Self-solace and soliloquy. You mould my Hopes, you fashion me within.”
(Samuel Taylor Coleridge)

অর্থাৎ জীবনের সবচেয়ে কোলাহলময় সময়ে, এখনও ফিসফিস করে তোমার প্রতি অবিরাম ভালবাসা, হৃদয়ের আত্ম-সান্ত্বনা এবং স্বগতোক্তি। তুমি আমার আশাকগুলোকে ছাঁচে ফেলেছ। তুমি আমাকে আমার ভেতর ফ্যাশন করেছ।

এ কথা কি পরোক্ষে আমাদের আলোচ্য কবিও বলেননি?
“পুরোনো সব উজ্জ্বলতা গোধূলির রঙ মেখে বিষাদে অধোমুখী
এইসব দেখে ভাষাচ্যুত আমি কাব্যে পুনর্নির্মাণের কথা ভাবি
ভাবি নতুন শব্দ ও নতুন বাক্যগঠনের, যেখানে সমুদ্র সুঘ্রাণ,
একটি ভাঙা শব্দ বৃত্ত ভেঙে উঠে দাঁড়াবে তার স্বপ্নে
শতশত ভাঙা শব্দ জুড়ে যে বিচিত্র আলখাল্লা একটা বহুরৈখিক
প্রশ্ন হল, তুমি কি পুনরায় সাগ্রহে তাকাবে ফকিরের দিকে”

‘তুমি’ সর্বনামটিই তুমুল শক্তি নিয়ে এই স্বগোতক্তিতে জেগে উঠেছে। ‘তুমি’ প্রত্নসত্তারই অনুসারী প্রণয়মূর্তির সংজ্ঞা থেকে এসেছে। কখনো রমণী হিসেবে তার রমণরঙ্গের আভাস আছে। কখনো মান-অভিমানের দূরত্ব। রক্তমাংসের ঘ্রাণও উপস্থিত হয়েছে। কখনো তাকে এই সময়ের দর্পণে,আবার কখনো প্রাগৈতিহাসিক যুগের চৈতন্যে যাতায়াত করতে দেখি। প্রেম যে চিরকালীন প্রশ্রয়ে আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের প্রজ্ঞাময় বহিঃপ্রকাশ তা উপলব্ধি করতে পারি:

“তুমি বন্ধু আমার অথচ ঠিক শত্রুর মতো অন্তত দুই হাজার বছর
তুমি সেই গোপন পরিখা যার মধ্যে দিয়ে দুর্গে ঢুকেছিল শত্রুসেনা
অতি সাধারণ আমি, রাজত্ব বলতে শুধু এই আত্মমর্যাদাটুকু
তবু লক্ষ করি আমার চারপাশে তোমার সতর্ক প্রহরা,দশজোড়া চোখ
আকাশে চেয়ে থাকি, মেঘের মধ্যে হাঁটতে যাই, শব্দের অর্থ খুঁজি”

বারবার ফিরে আসে অবিশ্বাস, সন্দেহপরায়ণতা,প্রতিহিংসা, যন্ত্রণা, বিচ্ছেদ, কুটিলতা, হিংস্রতা, ক্রোধ ও ভ্রম প্রভৃতি শব্দগুলি। কবিও নিজের সত্তাকে আদিপ্রজ্ঞার সমান্তরালে খুঁজে পান। পতঙ্গ,পাখি,বৃক্ষ,সমুদ্র,মৃত্তিকা, পাথর, নদীর ,ঢেউ, আকাশ, মেঘ, নক্ষত্র, নীলিমায় সত্তার সঞ্চরণ অনুধাবন করেন। কিন্তু পরক্ষণেই মানবশরীরের স্থিতিতে আত্মপ্রকাশ করেন:

“জাদুকর নই বলে আঁকড়ে ধরেছি মুহূর্তমাত্রের এই জীবন
ইন্দ্রিয়ের প্রাচুর্য ও কুটিলতা ছাড়া বৃথা আমার এই স্বপ্নাঘাত
ভালোবেসেছি এই নক্ষত্রজীবন, এখন সেখানে ধোঁয়া,ছাই…”

তখন কবিকে তো প্রেমের লাশ বলেই মনে হয়। যে উল্লাস নিয়ে তিনি জেগে ওঠেন, সেই উল্লাসের প্রত্যাবর্তনে ধোঁয়া ও ছাই হয়ে উড়তে থাকেন। ইন্দ্রিয়সর্বস্ব জীবনের পর্ব থেকেই মানবিক হাহাকারটি মুখ্য হয়ে ওঠে।

‘তুমি’ সম্মোধনের আড়ালে হৃদয় স্পন্দন যেমন আছে, তেমনি বিমর্ষতা, অভিমানও আছে। সম্পর্কের সাঁকো ভেঙে যাওয়ায় বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিতও আছে। তবু কবি যখন ‘উদ্বাস্তু জীবন’ কাটানোর কথা বলেন, দিগন্ত সেখানে কাঁটাতার হয়ে দাঁড়ায়।কবির নারীটিও ঐশ্বরিক ধারণায় প্রাচুর্যময়ী ব্যাপ্তির উত্তরণে পর্যবসিত হয়। কবি তখন গিরিশ হয়ে জটাজুট প্রলম্বিত করেন। ব্রহ্মমুহূর্তের আলোকসঞ্চার ঘটে। দিগন্তময় রামধনু, সূর্যোদয় পর্বতচূড়া, স্বরবর্ণের মতো অক্ষর-শব্দের ভেতর এসে প্রবেশ করে।

তাহলে কবিতা কি অমরতাকামী?
জীবন যদি অমর হয়, তবে কবিতাও অমর। মৃত্যুই কি জীবনের শেষ পরিণতি? কবি বলেন:
“এক শূন্য থেকে অন্য শূন্যে যাই”

যে ব্যক্তি-আমি’র ভেতর জীবন ট্রপিজের, তাঁবুর ছিল—সে জীবন দিগন্তরেখায় আকাশের মতো বিস্তৃত। ব্রহ্মময়। কবিতাজীবন তো এক খেলামাত্র। ভূমিকাহীন,শিরোনামহীন প্রাচীনগ্রন্থের জীবন। আত্মবিস্মরণের কালে পৌঁছানো। কখনো গ্রিকদেবতা প্রমিথিউসের মতো মনে হয়েছে। অনন্তকে ছুঁয়ে ফেলার এক অমসৃণ ভ্রমণ। মৃত্যু ও জীবনের মাঝখানে প্রশ্নদীর্ণ কবি এক বোধাতীত রহস্যলোকের ঠিকানা অনুসন্ধান করেছেন। পৌরাণিক প্রত্যয়গুলিতে প্রবেশ করেও বেরিয়ে এসেছেন। অবশেষে এই আশ্রয় রচনা:

“যত একা হই, ততই নিশ্চুপ চারপাশে জেগেছে অনুভূতিদেশ
জীবনের মধ্যে স্বপ্ন, স্বপ্নের মধ্যে সৌন্দর্য, আমার আশ্রয় চায়…”

স্বাভাবিকভাবেই কবির ভাষা কম, অনুভূতি বেশি, চেতনা আরও বিস্তৃত। সত্যঅন্বেষণের নীরবতা এবং একই সঙ্গে দহন ও উত্থান, মুক্তি ও বিস্তার। তাই বৃক্ষের মধ্যেও চেতনাপ্রবাহকে চালিত করেছেন। গাছের ভাবনায় জারিত হয়েছে জীবন যা আত্মগত অনুচ্চস্বরেই নামান্তর ‘গোপনরহস্যলিপি পাঠ’। যার মধ্যে আছে ‘পরাবাস্তবের মাংসজটিলতা’এবং ‘নির্জ্ঞানমনের ক্রিয়াশীলতা’। যার ফলে কবি পেয়েছেন এক স্বয়ংক্রিয়তাও। নদী ও বৃক্ষপ্রসঙ্গগুলি জীবনের সম্মোহনে বারবার ফিরে এসেছে। মহাকালের স্রোতকে অনুধাবন করেই আত্মস্বরের অনুজ্ঞায় তা ব্যঞ্জিত হয়েছে। জীবনবৃত্তের ঘোরে আবর্তিত হতে হতে মৃত্যুযাপনের ধারণাকেও এক দার্শনিক আলোকে দেখতে চেয়েছেন। যদিও সীমাহীন পার্থিবতাকে বিসর্জন দেননি। জীবন ও মহাশূন্যতার ভেতর তাঁর প্রমা আবর্তিত হয়েছে আত্মস্বরূপের দর্শনেই।

স্বগতোক্তিপ্রায় : সৈয়দ কওসর জামাল, কলমচি, ২৩/৪ রাজকৃষ্ণ চ্যাটার্জি রোড, কলকাতা: ৭০০০৪২, মূল্য :১২০ টাকা, প্রচ্ছদ : শান্তনু মিত্র।