পয়লা বৈশাখ! দুই বাংলার প্রাণের উৎসব। নতুন বছরকে সাদরে, আনন্দে-অনুষ্ঠানে বরণ করে নেওয়ার শুভদিন। দেশীয় সংস্কৃতির লালন, দেশীয় ভাবধারায় পরিবারের সকলে একত্রিত হয়ে কিছুটা মূল্যবান সময় একসাথে কাটানো। বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সকলে এক প্রাণ, এক মন হয়ে আনন্দ স্রোতে ভেসে যাওয়া।

কৃষিপ্রধান দুই বাংলা তথা ভারতবর্ষের মানুষের নববর্ষ বা নতুন বছর পালন যে ঋতুভিত্তিক হবে সেটাই স্বাভাবিক। বছর শেষের সঙ্গে সঙ্গে যা কিছু জীর্ণ, পুরনো সব দূরীভূত হবে। ঋণ শোধ হবে। নতুন ফসলে ভরে উঠবে গোলা। আবার সব হিসাব শুরু হবে নতুনভাবে। এই স্বপ্নটুকু ঘিরেই মানুষের দিনাতিপাত। তাই কৃষি প্রধান বাঙালির নববর্ষ পালনের আনন্দটুকুও নতুন ফসল উৎপাদনকে ঘিরেই। পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটুক, ঋণ মুক্ত হোক গৃহকর্তা। প্রার্থনায় প্রার্থনায়, নামাজে-সিজদায়, মঙ্গলকামনায় শুরু হোক শুভ দিন। নতুন বছরে অন্নের সঙ্গে থাকুক কিছু অতি প্রিয় ব্যঞ্জন আর মিষ্টান্ন! শিশুরা সেজে উঠুক নতুন পরিধানে, এইতো এতোটুকু চাওয়া দেশের মানুষের! তারই নাম বর্ষ উদযাপন। ঠিক তেমনভাবেই সব হিসাব, ধার-দেনা বুঝে নিয়ে আবার নতুনভাবে শুরু করতেই হালখাতার অনুষ্ঠানও নববর্ষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে বাঙালির সমাজে।

আমাদের সেই ছোটোবেলার দিনগুলোতে নববর্ষকে ঘিরে নতুন জামাকাপড়, খাওয়া-দাওয়া বা হালখাতার মিষ্টির প্যাকেটের সঙ্গে আরেকটি বিশেষ আকর্ষণের বস্তু ছিল হালখাতার নিমন্ত্রণের রঙিন চিঠিগুলো! সেই রঙিন চিঠি যেন নববর্ষের দূত হয়ে আমাদের হাতে হাতে ঘুরতো। আর পয়লা বৈশাখের আগমনের বার্তা ছড়িয়ে পড়তো আকাশে, বাতাসে। চৈত্রের দাহ তুচ্ছ করে আমরা সেই চরকি নিয়ে ছুটে চলতাম হাওয়ার উল্টোদিকে। চরকি ঘুরতো আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে! পয়লা বৈশাখ পালন শেষ হয়ে গেলেও ওই চরকিগুলোর মধ্যে দিয়ে অনেক দিন পর্যন্ত বজায় থাকত নতুন বছরের বার্তাটুকু। আমাদের সেই তরঙ্গহীন গ্রাম্য জীবনে পয়লা বৈশাখের গুরুত্ব যে কতখানি ছিল আজকের শিশুরা তা অনুধাবন করতে পারবে না। আজকের ভার্চুয়াল পৃথিবীতে ওই পরিত্যক্ত রঙিন চিঠির গুরুত্বইবা কতটুকু! তাই বর্তমানে পয়লা বৈশাখ, হালখাতা, ওই রঙিন চিঠি থাকলেও চরকির ঘূর্ণন নেই! নববর্ষ পালনও তেমনি ভাবে হাজারো রোশনাই এর আড়ালে কিছুটা ম্লান হয়েছে বটে। তবে কৃষি ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার কারণেই হয়তো বা আজও অব্যাহত আছে।

খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর যে নিয়ম চালু করছিলেন তার সূত্র ধরেই নববর্ষ পালন আজও অব্যাহত রয়ে গেছে। সম্রাট আকবর কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ভিত্তির মূলে দেশের মানুষের ঋতুনির্ভরশীলতাকে উপলব্ধি করেছিলেন যুক্তির ভিত্তিতে। তাই হিজরী সনের পরবর্তে বাংলাসনকেই মান্যতা দিয়েছিলেন সহজ স্বাভাবিক নিয়মে। নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন, চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা মিটিয়ে দেওয়ার। পরের দিন পয়লা বৈশাখ, বছরের প্রথম দিন। সম্রাটও খুশি হয়ে মিষ্টান্ন বিতরণ এবং অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতেন। সময়ের সাথে সাথে সেই পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সমগ্র বাঙালি বাঁধা পড়েছে একসূত্রে। চৈত্রমেলা, বৈশাখীমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শুভেচ্ছা জ্ঞাপন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এক প্রাণ হয়ে বাঙালির হৃদয়ে সেই একটাই গান ধ্বনিত হয়, “এসো হে বৈশাখ”…

“পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন,
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।”…
পয়লা বৈশাখের এই শুভসূচনায় তাই মানুষকেই দ্বায়িত্ব নিয়ে সারিয়ে তুলতে হবে এই পৃথিবীকে। তাই হয়তো এই বছরটাও আমাদের পয়লা বৈশাখ পালন করতে হবে সেই সাবধানতা অবলম্বন করেই। তবে কেবল বাহ্যিক শারীরিক রোগ নিরাময় নয়, এই পৃথিবীর রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বাসা বেধেছে যে জটিল মানসিক রোগ, যে ব্যাধি পৃথিবীকে ক্রমশ নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের পথে; নিরাময় করতে হবে সেই মানসিক রোগকেও। তারজন্য চাই শুভবুদ্ধির উন্মেষ! নববর্ষের শুভ সূচনার প্রারম্ভে, পয়লা বৈশাখের মঞ্চ আসুকনা সেই বার্তা বহন করে! আসুন আমরা মানুষকে ভালোবেসে, মানবিকতার পথে হেঁটে, সম্প্রীতির বাঁধনে বাঁধা পড়ি। কারণ কবি জীবনানন্দ বলেছেন, “এই পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।”