অনন্য গদ্যশিল্পী মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর দুটোগ্রন্থ ‘নূরনবী’ ও ‘মানব’-মুকুট’ (১৯২২) বাঙলা সাহিত্যের অমূল্য সীরাতগ্রন্থ। দুটিই বহুল প্রশংসিতও বটে৷ ‘মানব মুকুট’ হযরত মোহাম্মদ সা..-এর জীবনীভিত্তিক এ গ্রন্থটি বিভিন্ন পত্রিকায় বিশেষ প্রশংসিত হয়’- ‘সহচর’ (পৌষ ১৩২৯) এবং ‘সওগাত’ (অগ্রহায়ণ ১৩৩৩) পত্রিকায় প্রকাশিত সমালোচনার এ গ্রন্থের বিশেষ প্রশংসা করা হয়৷ ‘সহচর’-এর মতে, লেখকের এই ‘মূল্যবান অবদানে বঙ্গ সাহিত্য বাস্তবিকই গৌরবান্বিত’ হয়েছে এবং ‘সওগাত”- এর মতে সমালোচক মনে করেন, ‘ প্রত্যেক বাঙালী মুসলমানের গৃহে এই গ্র’ন্থখানা ‘ গৃহপঞ্জিকার ন্যায় বিরাজ করিবে’৷

‘বুলবুল’ পত্রিকার কলস্রোতায় এয়াকুব আলী চৌধুরী আরও জানান যে, প্রথমে ‘মানব-মুকুট’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়৷ কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্র (অর্থাৎ হিন্দু শিক্ষক ও ছাত্র) উভয়ের সমবেত প্রতিবাদে সেই একবারের পরই বইখানি পরিত্যক্ত হয়’৷

বাংলা সাহিত্যে রসুল চরিত রচনার ধারা মধ্যযুগ থেকেই শুরু হয়েছে৷ মধ্যযুগে সৈয়দ সুলতান ‘নবীবংশ’ নামে সুবৃহৎ একটি কাব্য রচনা করেন I এর প্রথম খণ্ড ‘নবীবংশ’I এতে হজরত আদম থেকে শুরু করে সকল নবির পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছেI আর দ্বিতীয় খণ্ডের নাম ‘রসুলচরিত’৷ এতে রসুলাল্লা বা হযরত মোহাম্মদ সা.এর জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে I

ঊনবিংশ শতাব্দীতে গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী হলেও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য বিশেষভাবে পবিত্র কোরআন শরিফসহ হযরত মোহাম্মদ সা.এর জীবনী অধ্যয়ন করেনI কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ ছাড়াও তিনি হযরত মোহাম্মদ সা.-এর জীবনচরিত রচনা করেনI মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবনচরিত প্রথম খণ্ড ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয়I ১৮৮৭ সালেই দ্বিতীয় খণ্ড এবং শেষ খণ্ড প্রকাশিত হয় I

রামপ্রাণ ণ্ডপ্তও ১৯০8 সালে হযরত মোহাম্মদ সা.এর জীবনী রচনা করেন৷ এ গ্রন্থের নাম ‘হযরত মোহাম্মদ’I এর দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল I

১৯২৫ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ হযরত মোহাম্মদ সা.-এর সুবৃহৎ জীবনী প্রকাশ করেন৷ ৭৭৫ পৃষ্ঠার এই জীবনী গ্রন্থের নাম ছিল ‘মোস্তফা চরিত, উ’পক্রম ও ইতিহাস ভাগ’I পরবর্তীকালে তিনি ১৯৩২ সালে ‘মোস্তফা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য’ রচনা করে বিভিন্ন ধর্ম-প্রচারকের সঙ্গে একটি তুলনামূলক সমালোচনা লিপিবদ্ধ করেনI পরবর্তীকালে বাংলা গদ্যেই খান বাহাদুর আহসানউল্পাহ্ ‘হযরত মোহাম্মদ’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন (১৯৩১)I কবি গোলাম মোস্তফা সুললিত গদ্যে হযরত ‘রসুলাল্লার জীবনী রচনা করেনI এর নামকরণ হয় ‘বিশ্বনবী’I ৪৭১ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটি ১৯৪ ২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়I এ গ্রন্থ প্রকাশের এক বৎসর আগে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ‘মরুভাস্কর’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করেন I

কাব্যেও আমরা লক্ষ করি, মোজাম্মেল হকও ‘হযরত মহাম্মদ’ নামে একটি জীবনী রচনা করেন (১৯০৩)I এটি অসম্পূর্ণ থাকায় প্রথম খণ্ড নামে প্রকাশিত হয় I কাব্যে নজরুল ইসলামও ‘মরুভাস্কর’ রচনা করেI এটি অসমাপ্ত ছিল (প্রকাশকাল, ১৯৫১) I

শিশুপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে রসুলাল্লার জীবনী রচনার কয়েকটি প্রয়াস লক্ষ করা যায়I আবদুল ওহাব সিদ্দিকী ‘আরবের দুলাল’ নামে একটি শিশুপাঠ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেন (১৩৫১) I খান বাহাদুর আহসানউল্পাহ্ প্রণীত শিশুপাঠ্য জীবনী গ্রন্থের নাম ‘পেয়ারা নবী”I সারা তয়ফুর মহিলাদের মধ্যে প্রথম রসুলাল্লার জীবনী রচনা করেনI ‘স্বর্গের জ্যোতি’ নামে শিশুপাঠ্য গ্রন্থটি ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হয় I

রসুলাল্লার এই মাহাত্ম্য সাধারণ মানুষ যেন উপলব্ধি করতে পারে যে জন্যই এ গ্রন্থের বহুল সংস্করণ ছাড়াও এয়াকুব আলী চৌধুরী রচনাবলির একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এর পর আরও অনেক সীরাত সাহিত্য রচিত হয়েছে। এর মাঝে সৈয়দ আলী আহসান এর ‘মহানবী’ একটি অসাধারণ সীরাত গ্রন্থ। শিশুদের জন্য কবি আল মাহমুদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. একটি অনন্য গ্রন্থ।

বাংলা সাহিত্য উল্লেখযোগ্য রসুলচরিত সম্পর্কে আলোচনা করলামI উল্লেখ্য, এ গ্রন্থগুলির অধিকাংশ জীবনচরিতI অথবা হযরত মোহাম্মদ সা.-এর জীবনের ধারাবাহিক বৃত্তান্তI মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী রচিত ‘মানব-মুকুট’ সে ধারায় বিশেষ ব্যতিক্রমI এ গ্রন্থের নামকরণেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছেI লেখক এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, তাঁর চরিত্রের অলৌকিক মাহাত্ম্য রক্ত-মাৎসের মানুষের বিভিন্ন গুণাবলিতে অভিষিক্ত হলেও তিনি মানবজাতির শিরোমণি বা মুকুট স্বরূপI এয়াকুব আলী চৌধুরীর রচনাবলীর সম্পাদক খান মুহম্মদ সালেক যথার্থই বলেছেন:
‘হযরত মোহাম্মদ আপনাকে আল্লাহর দাস ও মানুষরূপে ঘোষণা করিয়া মানুষের সমগ্র জীবন ব্যাপারে আপনাকে মিশ্রিত করিয়া মানুষের মনের মধ্যে এই মহাসত্য দৃঢ় রূপে আঁকিয়া দিয়াছেন যে, মানবতা মহাপুরুষ মানুষ হইতে উচ্চ নহেন, মানব-সত্তার সীমার বইিরে নহেন, তিনিও মানুষ-মানুষেরই তিনি মহত্তম পরিণাম I

প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘প্রস্তাবনা”I এ অধ্যায়ে লেখক একটি মাত্র বাক্যে রসুলাল্লার চারিত্র্য তুলে ধরেছেন। অধ্যায়ের উন্মোচক বক্তব্যে তাই তিনি এক বাক্যে বলেছেন:
‘যে সমস্ত মহাপুরুষের আবির্ভাবে এই পাপ-পঙ্কিল পৃথিবী ধন্য হইয়াছে, যাঁহাদিগের প্রেমের অমৃত-সেচনে দুঃখ তপ্ত মানব-চিত্ত স্নিগ্ধ হইঁয়াছে, যাঁহারা মানব সমাজের যুগ-যুগান্তসুর কুক্ষিগত কালিমারাশির মধ্য হইতে সূর্য্যের ন্যায় উত্থিত হইয়া পাপের কুহ্ক ভাঙ্গিয়াছেন, ধর্ম্মের নবীন কিরণ জ্বালাইয়াছেন ও পতিত মানবকে সত্য ও প্রেমে সঞ্জীবিত করিয়া নবীন জীবন পথে টানিয়া লইয়া গিয়াছেন, ইসলাম ধর্মের প্ৰচারক হজরত মোহাম্মদ তাঁহাদের অন্যতম l

প্রস্তাবনা শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন :
কে সেই মহাপুরুষ যিনি মানবের চিরকালের আবাস-ভূমি গৃহাঙ্গনকে তুচ্ছ না করিয়া পবিত্র ও মধুর করিয়াছেন; মানুষের বিচিত্র সুখ-দু:খ ও আশা আকাঙ্ক্ষাময় মর-জীবন দ্বারা সার্থক ও সুন্দর করিয়া অনন্ত জীবনের সন্ধান দিয়াছেন; মানব সমাজকে পরিত্যাগ করিয়া নহে, পরন্তু মানুষের মধ্যে বাস করিয়া, মানুষের সঙ্গে বিচরণ করিয়া, বিশ্বমানবের জীবনধারার সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন যোগ রাখিয়া কে মানুষকে ভালবাসিয়াছেন, রক্ষা করিয়াছেন, ত্যাগের দুজ্জর্দয় সাধনা করিয়াছেনঃ

এ প্রশ্নের উত্তর তিনি পরবর্তী চরণে দিয়েছেন- ‘তিনিই মানুষের অতি আপন, প্রাণের ধন পরমাত্মীয়; মহা’পুরুষের গৌরব-মুকুট তাঁহারই প্রাপ্য”। অর্থাৎ তিনিই মানব-মুকুট ৷

শিশুদের জন্য তিনি ‘নূরনবী’ নামে রূ’পকথার আঙ্গিকে যে রচনা করেন তাহাতে বলেন:
‘সাত সমুদ্র তের নদীর পারে রাক্ষসের দেশে মেঘবরণ-ঢুল কুচবরণ-কন্যা আনিতে গিয়া রাজপুত্র কত বিপদে পড়িয়াছিল, তাহার কাহিনী শুনিতে শুনিতে তোমরা অবাক হইয়া থাক’ … ‘কিন্তু পাপের পাতালে শয়তানের হাত হইতে মানুষের উদ্ধারের জন্য আমাদের নূরনবী কত যে দু:খের সাগরে সাঁতার দিয়াছিলেন”… ‘সেই পুণ্যকথা এমন মধুর আর চমৎকার যে, যাদুর দেশের ঘুমন্ত রাজকন্যা আর সোনার কাঠি ও রূপার কাঠির কথা তার কাছে কিছুই নয়। ’ নূরনবী সে যুগে ‘মানুষের বাঁধা নিয়ম ও বদ্ধজ্ঞানের বাঁধ ভাঙ্গিয়া” যেভাবে বিশ্বকল্যাণের পথে ‘অগ্রসর’ হইয়াছিলেন, তাহা চিন্তা করিয়া তিনি একালের মুসলমানের জন্য এক অমৃতময় সুসংবাদ বহন করিয়া আনিয়াছেন৷ হযরতের সাধন-জীবনের ক্রম:বিকাশের দিকে তাকাইয়া তিনি সর্বকালের ও সর্বদেশের ‘মানুষের অধিকার’ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করিয়াছেন : ‘এই দুঃখ-ব্যথা ও ব্যর্থতাপূর্ণ জীবন লইয়া, শত শঙ্কা-সংকোচ-ভরা হৃদয় লইয়া রক্ত-মাংসের শরীরধারী মরণশীল দূর্বল মানুষ মহাজীবনের মহিমা-লোকে আরোহণ করিতে পারে; ঊর্ধ্ব-জীবনের অন্তহীন গতিতে তীহারই জন্মগত অধিকার আছে৷’প্রেরিতত্ব ক্লাস্তিহীন তপস্যার পরম পরিণতি; ইহা মানুষের অনায়ত্ত অথবা অতি-প্রাকৃতিক দৈবী ক্ষমতা নহে। তিনি বলিয়াছেন ‘মোহাম্মদ কেবল মানব-জীবনের মহিমা ছিলেন না; তিনি মানুষের নিত্য ও স্বাভাবিক জীবনের সুগভীর অভিব্যক্তি৷ তিনি যে শক্তি লাভ করিয়াছিলেন তাহা জন্মগত অধিকার নহে, উন্মাদিনী শক্তির আকস্মিক আবির্ভাবের পরিণাম নহে, তাহা স্বাভাবিক বিকাশ ও সাধনার ফল৷ … হযরত মোহাম্মদের জীবন-বিকাশের প্ৰতি অপরিসীম শ্রদ্ধায় দৃষ্টিপাত করিয়া তিনি এই সভা উপলব্ধি করেন যে, মনুষ্য-জীবনের বিকাশ-সম্ভাবনা সীমাহীন; সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্র কাহারও জন্য কোনোকালে সংকুচিত নয়৷ তাঁহার শত তারিফ এজন্য যে, মহাজীবনের এই আমৃত-বার্তা তিনি একালের ভীত সন্ত্রন্ত মুসলমানের কানে পরম আনন্দে পৌঁছইিয়া দিয়াছেন।’

এয়াকুব আলী চৌধুরীর ভাষা গীতাঝঙ্কারময়; তবে তিনি কবিতা চর্চা করেন নি। শেখ সাদীর‘ বোস্তা’ কাব্য হতে তিনি একটি কথিকা “প্রতিবাসী-প্রেম’ নামে পদ্যে পরিবেশন করেন (কোহিনুর, চৈত্র ১৩১৮)৷ তাঁর শিশুপাঠ্য গ্রন্থ ‘নূরনবী’তে মাঝে মাঝে ছড়া-ছন্দের ব্যবহার আছে৷ তিনি তাঁর ‘নূরনবী’গ্রন্থ সমাপ্ত করেছেন এভাবে :
আলোর নবী চলে গেছেন
আলোক মালার দেশে!
সেই দেশেতে যাবে যদি
নেচে হেসে হেসে
গুণের খনি পরশমণি
নবীর কথা ধর;
সোনা হবে, রাজা হবে,
রাজার চেয়ে বড় ৷

মহাপুরুষ মুহাম্মদ সা. এর পুণ্য র্জীবানাদর্শ অনুসরণ করলে মানুষ সকল ঐহিক ও পারত্রিক সমস্যার সমাধান করে ব্যক্তিত্বের চরমৎকর্ষ তথা অমরত্ব লাভ করতে পারে, এটাই এয়াকুব আলী চৌধুরীর লেখার মূল প্রতিপাদ্য৷ মানব মুকুট ও নূরনবী আজ হয়ে উঠুক আমাদের কিশোর তরুণ সবার একটি অনিবার্য পাঠ্য সীরাত গ্রন্থ। রবিউল আউওয়াল মাসে আজ এটাই প্রত্যাশা।

১.মানব মুকুট:
প্রকাশক: বাংলা একাডেমি
সম্পাদনায়: মোহাম্মাদ আব্দুল কাইউম
মূল্য: ১০০টাকা।
২. নূর নবী:
প্রকাশক: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
সম্পাদনায়: আহমাদ মাযহার
মূল্য:৪৫ টাকা।