জামাল এখন একটা অটো গ্যারেজে কাজ করে।দুপুর থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত তার ডিউটি।মূলত তার কাজ হলো কে কে অটো নিয়ে আসলো সেই হিসাব নেওয়া আর অটো ড্রাইভার দের অটো গুলো চার্জে দেওয়া।চার্জ আর রাতে রাখা বাবদ ড্রাইভাররা টাকা দেয় গ্যারেজের মালিককে।গ্যারেজে প্রায় ৫৫ টার মতো অটো আসে।কোনো কোনো দিন রাত ১ টা কি ২ টাও বেজে যায়।

আবার রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত আরেকজন ডিউটি দেয়।ছেলেটা জামালের ছোট।জামাল তাকে স্নেহই করে বটে।আজ অটো প্রায় তাড়াতাড়িই চলে এসেছে। হালকা বৃষ্টি ছিলো সন্ধ্যার পর থেকে।চল্লিশ টার বেশি অটো চলে এসেছে।

জামাল গ্যারেজে বসে চিন্তা করছে তার ৫ মাস আগের জীবনের কথা।বন্ধুদের সাথে কত অসৎ উপার্জন করেছিলো।জামালের আছে বলতে তার মা।দুইজনের খেয়ে পড়ে বাচঁতে অত টাকার লাগবেনা বলে জামাল কোনো কাজ করতো না। বন্ধুদের সাথে যত অপকর্ম করা যায় করতো।মোড়ের রাস্তা টা থেকে রাতের বেলায় তাদের একজন রিক্সায় উঠে রিক্সা নিয়ে আসতো,আর বাকি চারজন ব্রিজের নিচে অপেক্ষা করতো কখন রিক্সা টা আসবে আর অমনি হাত মুখ বেঁধে রিক্সা নিয়ে চলে যেতো তাদের এই গ্রুপ টা।একেক দিন একেক জায়গায় টার্গেট তাদের।কোনো দিন একটা কোনো দিন দুইটা।প্রতিদিন গড়ে দুই এক হাজার টাকা থাকে তার।তার মা জিজ্ঞেস করতো সে কি কাজ করে কিন্তু জামাল বলতো না।সে বলতো,”মা,কি কাম করি তা তোমার জানা লাগবে কে কউ তো?”
“ওমা, তুই কি কাম করস তা জানতে হইবোনা?”
“না মা,জানতে লাগবোনা।তোমার যা লাগে তা তো পাও ই নাকি?”
সংসারে যা লাগে জামালকে বললে আসলেই জামাল ঠিক মত এনে দেয় তাই জামালের কাজ জানার প্রতি তার মায়ের আগ্রহ নেই।

একদিন সন্ধ্যায় প্রতিবারের মতো অইদিনও রিক্সা হাতানোর ধান্দায় রিক্সা নিয়ে মাঠের কোণায় আসে।রীতিমতো মারধর শুরু করবে এমন সময় জামালের মা মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো আর তখনই এই ঘটনা চোখে পড়ে।সাথে সাথে মারামারি থামাতে গিয়ে দেখে জামাল তাদের সাথে।জামালের মা জামালকে থাপ্পড় দিয়ে রিক্সাওলা কে যেতে বলে।সাথে সাথেই তার গ্রুপের একজন বলে উঠে ধুর আজকের ধান্দা টাই গচ্ছা গেলো।এ শুনে জামালের মা চোখ লাল করে জামাল কে বলে, “আজকে বাড়িতে আয়”।
গ্রুপের বাকিদের সাথে ঝামেলা বাধে জামালের।

মায়ের ভয়ে অনেক রাতে বাড়িতে ফিরে,কিন্তু তার মা তখনো সজাগ।খুব বাকবিতন্ডা হয় মা ছেলের মধ্যে। এক পর্যায়ে জামালের মা বলে,”বাবারে,তোর এই অসৎ উপার্জনের পয়সা দিয়া আমারে মাছ মাংস খাওনোর দরকার নাই।তুই হালাল রুজি কইরা আমারে ডাইল ভাত খাওয়া আমি এতেই খুশি হমু বাপ”
“মা, আজকাইল কেউ কাউরে কাম দিতে চায় না,আর হের লাইগাই চ্যাংরা বয়সের পোলাপান এই রাস্তায় নামে।”
“তাই বইলা কাম না খুইজা এই রাস্তায় বাপ?”
“হ,মা।কাম না পাইয়াই বেকার রা চুরি,ডাকাতি,ছিনতাই করে”
“তবুও বাপ তুই কাম খোঁজ, কম টেকা হোক তবুও ভালো”

তার কিছুদিন পরে এলাকা ছেড়ে চলে যায় জামাল আর তার মা।অন্য শহরে এসে থাকছে ৫-৬ মাস হলো। আর গ্যারেজে চৌদ্দ হাজার টাকা বেতনে ভালোই চলে মা ছেলের সংসার।বৃষ্টি তে এই পুরোনো কথা গুলো মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে যায় জামাল।বৃষ্টি কমছেও না বাড়ছেও না।খুব বাজে লাগছে জামালের।প্রায় বায়ান্ন টা অটো চলে এসেছে আর তিন টা আসলেই চলে যাবে জামাল।এক অটো ড্রাইভার জামালকে জিজ্ঞেস করছে,”কি মিয়া,বিয়া শাদী করবা না নাকি?”
“হ ভাই,মালিক বেতন বাড়াইলে আর ঘরে কিছু জিনিস পত্র কিন্নাই বিয়াডা করার ইচ্ছা”জামাল লাজুক ভঙ্গিতে বলে।

সব ড্রাইভার এর সাথেই তার দহরম মহরম সম্পর্ক। খুব খাতির তার।এখন সে সৎ ভাবে জীবন উপভোগ করার আনন্দ টা উপলব্ধি করতে পারে।সব অটো চলে আসছে শুধু রশিদ ড্রাইভার আসেনি।সবাই যাওয়ার পরেও আরো ২০-২৫ মিনিট অপেক্ষা করেছে জামাল।আর পারছেনা।জামাল মনে মনে ভাবলো হয়তো বৃষ্টির জন্য আসেনি।কালকে দেখা করবে, কারন রশিদ ড্রাইভার কে সে ভালো করে চিনে।অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। গ্যারেজ থেকে বের হয়ে তালা মারবে ঠিক তখনই দেখে গ্যারেজের পাশে বসে কাঁদছে রশিদ। জামাল আঁতকে উঠে আর বলে “কি হইছে রশিদ ভাই?কান্দেন কেন?”
“আমার সব শ্যাষ জামাল ভাই সব শ্যাষ।”
“কি হইছে,খুইলা কন ভাই।লন গ্যারেজে গিয়া কথা কই”
জামাল আর রশিদ ভিতরে যায়।রশিদ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করতে থাকে।তার চোখের পানি বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার।রশিদ বলে উঠে,”ভাই কতক্ষণ মন খুইলা জোরে জোরে কানছি,এহন আর পারতাছিনা।”বলেই আবার হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে রশিদ।”আইচ্ছা কন দেহি মিয়া অইছে ডা কি?”
“ছিনতাইকারীরা আমার অটো ডা লইয়া গেছে ভাই”
“কিহ?,কি কন রশিদ ভাই?”
রশিদ কান্না করে বলে,”হ ভাই,আমার সব শ্যাষ ভাই,চাইর মাস আগে মাত্র অটো ডা কিস্তিতে কিনছি ভাই,আমার তিন বছরের এক পোলা আর সাত বছরের এক মাইয়া আছে।বউ পোলাপান লইয়া আমি কেমন চলমু আর কিস্তিই বা কেমনে চালামু জামাল ভাই।আমার মরন অইলেও ভালা অইতো ভাই।ভাই অগো ভালা হইবো না ভাই,অগো মায়া নাই,কোন মা জানি জন্ম দিছে অগোরে”

জামাল কথাগুলো শুনে কাদঁতে পারছিলো না, শুধু চোখের কোণে পানি জমে গেছে। একটা পরিবারের সম্বল যখন হারিয়ে যায় তখন এতোটাই নিঃস্ব হয়ে যায় মানুষ যে নিজের মরন কামনা করে। আবার পুরোনো কথা মনে পড়লো জামালের। সে যখন রিক্সা ছিনতাই করতো তখনো তো কারো না কারো সম্বল হাতিয়ে নিয়েছিলো, তারাও হয়তো এভাবে হাউমাউ করে কান্না করেছে আর এভাবেই জন্ম নিয়ে প্রশ্ন করেছে, এভাবেই অভিশাপ দিচ্ছে। এক দেড় লাখ টাকার অটোটা বড়জোর ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারবে চোরাই মার্কেটে, কিন্তু রশিদ? সে কিভাবে দিন চালাবে? তার কিস্তি সংসার খরচ, বউ ছেলেমেয়ে। আচ্ছা যাদের রিক্সা নিয়েছিলো তারাও তো এভাবেই সংসার চালাতো। জামালের খুব অনুতাপ হয়, প্রায়শ্চিত্ত করতে ইচ্ছে হলো, ইচ্ছে হলো প্রতিটা রিক্সাওলাকে বলতে যেনো তার জন্মকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, যেনো তাকে অভিশাপ না দেয়, যেনো হাউমাউ করে না কাঁদে। বৃষ্টি থামে না, রশিদের কান্না থামে না, জামালের ভাবনাও থামে না।