কুড়িগ্রামের দাদামোড়ে মুনমুন হোটেলে ঝড়ুদার সাথে দেখা। ঝড়ুদা ওখানে কারিগরের কাজ করে। ক্লাশে সে ভালো ছাত্র ছিল। আমার এক ক্লাশ উপরে সে পড়ত। বাবা মারা গেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে সে শহরে চলে আসে। তখন থেকে মুনমুন হোটেলে সে কাজ করে । স্কুলে থাকা অবস্থায় তার সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা খুব দুঃখ পেয়েছি। একদিন হোটেলে অনেক আলাপের পর ঝড়ুদা একসময় বললো-
‘তা তুই আছিস কোথায় এখন?’
‘কেন, গাগলায়। গাগলা স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রে।’
‘তাহলে তো একদিন সহজে কালিগঞ্জ যেতে পারিস।’
‘কালিগঞ্জ যেয়ে কি হবে?’
‘কেন তোর অনুপার কথা মনে নেই? কালিগঞ্জে তো ওর বিয়ে হয়েছে।’
‘সত্যি! কি নাম ওর স্বামীর?’
‘আফজাল হোসেন। বাবার নাম আবদুল খালেক মাস্টার।’
‘আচ্ছা, তাহলে যাব একদিন।’
সে কবেকার কথা। এতদিনে অনুপাকে বোধ হয় চিনতে পারব না। ঝড়ুদার কথায় হারানো দিনগুলো মনের পটে জীবন্ত হয়ে উঠল। তার গোলগাল স্ফটিক স্বচ্ছ মুখখানা সমস্ত গৌরব এবং উজ্জ্বলতা নিয়ে ফুটে উঠল। তখন নদী ভাংগনের কারণে আমরা রেল বাজার গ্রাম ছেড়ে সাবানন্দে চলে এসেছি। সাবানন্দ শ্যামল লতায় ঢাকা একখানা সুন্দর গ্রাম। এর পূর্বদিকে ব্রক্ষ্মপুত্রের একটি শাখা নদী সারাটি বছর তরল শরীর নিয়ে বয়ে যায়। নদীটা বড় শান্ত। খুব একটা ভাংগেনা। সেই নদী থেকে সামান্য দূরে গাছগাছালীর ভেতরে অনুপাদের বাড়ি। নতুন জায়গায় এসে নতুন পরিবেশের দোলা লাগল আমার মনে। কোথা থেকে একটা সুরের পাখি অলক্ষ্যে ঢেলে দিল মনের ভেতর গানের সুধামঞ্জুরী। সে সুরের ছোঁয়ায় আমার মন শিমুল তুলোর মত বাতাসে উড়ে বেড়াতে লাগল। নতুন বান্ধব জুটে গেল অনেক। আমার প্রিয়বন্ধু নুরুর ছোট বোন অনুপা আমার মনোলোকে নীরব ঝড়ের মাতম তুলল। একদিন নুরুর সাথে মার্বেল খেলছি। তখনো অনুপার সাথে আমার জানাশোনা হয়নি। সে এসে মার্বেল খেলা ভেংগে দিল। আমি বললাম-
‘একি করছ। খেলা ভাংগছ কেন?’
‘ঠিক করছি। এসব বাজে খেলা আমি খেলতে দেব না।’
‘বাজে খেলা বলছ কেন? আমরা তো মিলেমিশে খেলছি।’
‘এসব খেলায় পড়া নষ্ট হয়। হাত নোংরা হয়।’
‘পড়া নষ্ট হবে কেন? আমরা তো পড়ার সময় খেলিনা।’
‘না, আমি খেলতে দেবনা।’
অনুপার উপর রুষ্ট হয়ে নুরু ওকে জোরে একটা ধাক্কা দেয়। ধাক্কা লেগে ও মাটিতে পড়ে যায়। ওর সুন্দর দেহখানা ধূলিমলিন হয়। কিন্তু ও তাতে একটুও কাঁদল না। আমি ওকে মাটি থেকে তুলে গায়ের ধুলো মুছে দিলাম। মাথায় হাত দিয়ে আদর করলাম। ওর পুষ্পকোমল দেহ বল্লরীর পেলবতা আমার স্নায়ুতে মদিরতা ঢেলে দিল। কালোকাজল চোখ দুটি তুলে আমার দিকে সে নিবিড় করে তাকাল। আমাকে শাসনের সুরে বলল-
‘এই খারাপ খেলা তুমি কোনদিন খেলবে না।’
আমি অনুপার কথা অবজ্ঞা করতে পারিনি। সেদিন থেকে আমি আর মার্বেল খেলিনি। তখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। অনুপার বয়স বুঝি দশ কি বার। এর মধ্যে ওর চেহারায় একটি মাধূর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ছাপ ফুটে উঠেছে। যা নিকট থেকে অবলোকন না করলে বোঝা যায় না। বোঝা যায় না দৃষ্টির গভীরতা দিয়ে না দেখলে। নিজস্বতাকে না খুইয়ে বাহ্যদৃষ্টিতে অনুুপার কুসুমকোমল চেহারায় মিশে থাকা কাঠিন্যকে উপলব্ধি করা যায় না। আকাশের অগণিত তারায় আমি তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। তার দুটি নীরব চোখের সলজ্জ শাসন আমাকে সংযত করে। অন্য ছেলেমেয়ের মত আমি যাচ্ছেতাই ধরনের আচরণ করতে পারি না। আমি সব সময় আমার চেতনার মধ্যে ওর উপস্থিতি অনুভব করি।
অনুপা স্কুলে মাত্র চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। এরপর আর ওর স্কুলে যাওয়া হয়নি। আমাদের গ্রামে যে সকল অভিভাবক মেয়েদের স্কুলে যেতে দেয় তাদের পড়া এর বেশী হয়না। এর বেশী কেউ গড়াতে পারে না। এই চারটি ক্লাশ পড়েই অনুপা বোধ হয় বিদ্যালয়ের সবটুকু পাঠ শেষ করেছে। জগৎ সংসারের সবচেয়ে নিগূঢ় সত্যটি সে যেন উপলব্ধি করতে পেরেছে। ঝড়ুদা’র বাবা মারা যাওয়ায় সে যখন পড়া ছেড়ে দিল তখন অনুপার হাস্যোচ্ছল মুখখানা ম্লান হয়ে গেল। যে আলোর পথে তার চলা হয়নি সে পথে কেন চলতে পারবে না ঝড়ুদা। এটাই ছিল তার মনের আক্ষেপ। বিধাতার এই নির্দয় বিবেচনা সে মেনে নিতে পারেনি।
ঝড়ুদার কাছে অনুপার ঠিকানা পেয়ে আমি ভাবলাম অবশ্যই ওকে একদিন দেখতে যাব। নাগেশ্বরী তো যাই প্রতি সপ্তাহে। মোটর সাইকেলে কালিগঞ্জ যেতে আর কতক্ষণ লাগবে। এতদিন পর নাজানি ওর কত পরিবর্তন হয়েছে। মেয়েরা তো অল্প সময়ে বুড়িয়ে যায়। সেই সুশ্রী বালিকাটি। যার শুভ্রতা আমার মানসপটে কী ভাবগম্ভীরতার জন্মই না দিয়েছিল!
একদিন আমি ওদের বাড়ির পাশে নদীর ঘোনায় বড়শী দিয়ে মাছ ধরছিলাম। অনুপা এসে আমার পাশে বসল। তখন শেষ বিকেল। নদীর তীরে প্রবাহমান স্বচ্ছ পানিতে এবং পল্লবন্যুজ বৃক্ষশাখায় দিবসের শেষ আলো খেলা করছিল। আমার শরীরে তার কান্তিময় দেহের উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সে বলল-
‘আমিও মাছ ধরব তোমার সাথে।’
‘ধর, আপত্তি কি। তোমার বড়শী নিয়ে আস।’
‘আমার তো বড়শী নেই।’
‘তাহলে মাছ ধরবে কি দিয়ে?’
‘কেন? তোমার বড়শী আছে না?’
‘আমার তো মাত্র দুটো বড়শী।’
‘ওরই একটা আমাকে দাওনা। বারে আমার উপর রাগ করেছ নাকি?’
‘কিসের রাগ?’
‘ঐ যে মারবেল খেলতে মানা করেছি।’
‘ওতে তো আমারই ভাল হয়েছে। রাগ করব কেন?’
‘আর তো কোনদিন খেলতে দেখিনি। তাই ভেবেছি রাগ করেছ হয়তো। দাও না একটা বড়শী।’
সেদিন দু’জনে বিকেলের আলোছায়ায় মিশে মাছ ধরলাম। খুব মাছ ধরছিল বড়শীতে। আর মাছ ধরার খুশীতে সে উচ্ছল হয়ে উঠল। মনে হল আমরা যেন প্রকৃতির দুই সন্তান।
এমনই আনন্দ কৌতুক, লঘু বিরহ বিচ্ছেদে আমাদের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। দিনের কোন না কোন সময়ে ওর সাথে আমার দেখা হত। আলাপ হত। ওর প্রতি আমার হৃদয়ে অপরিসীম টান ছিল। কিন্তু কোন দাবী ছিল না। চাঁদের হাসির মত তার রূপের সুষমা বিনাবাধায় আমার মনের ছোট্ট ভুবনকে আলোকিত করে দিত।
সেই কথাগুলো অন্তরে জেগে উঠতেই এতদিন পরে কালিগঞ্জ যাবার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। এই তো কয়েক মাইল রাস্তা পার হলেই আমি আমার বাল্যের স্মৃতিকে উন্মোচন করতে পারি। এতদিনে কেমন জানি হয়েছে অনুপা। সেকি খুব অন্যরকম হয়ে গেছে। জীবনের দুঃখযন্ত্রণা সয়ে সয়ে একটি ছায়া মানুষে পরিণত হয়েছে? ঝড়ুদা বলেছে তার সাথে অনুপার দেখা হয়েছিল। তার সে আগের স্বাস্থ্য নেই। তাই বলে সে একেবারে ক্ষয়েও যায় নি। এখনও তার চেহারায় সেই অতুল লাবণ্যটি রয়ে গেছে। আমার মন বড় চঞ্চল হয়ে উঠল। যে নারী তার অনুপম রূপের সারল্যে আমার কৈশোরকে করেছে সমৃদ্ধ। যৌবনের দ্বারপ্রান্তে এনে দিয়েছে একটি চাঁদ চর্চিত রাত্রির নিবিড় সান্নিধ্য। তাকে তিরিশটি বছর কি করে ভুলে থাকলাম। তবুও আমি যাব তার কাছে আমার জীবনের হালচিত্রকে মেলাবার জন্য। এই তিরিশ বছরের সমস্ত ক্ষয়ের ছাপচিত্র আমি তার চেহারায় অবলোকন করব।
বর্ষার জলপতনের শব্দে ডোবার ধারে ডেকে ওঠা ব্যাঙের মত আমার হৃদয়ে বেজে উঠল বিগত বিরহ সংগীত। তাকে কি কখনো আমি ভুলে গেছি। মানুষ কি তার অতীতকে কোনদিন ভুলতে পারে। আমিও কি ভুলতে পেরেছি সে দিনগুলোর কথা, যখন কলেজে ভর্তি হবার জন্য আমাকে যেতে হল অনেক দূরে। এক অপরিচিত লজিং বাড়িতে। স্বজনবিহীন পরান্নবাসে আমি যে কি যন্ত্রণায় কালাতিপাত করেছি তা একমাত্র অন্তর্যামীই জানেন। সেখানে না ছিল আমার বন্ধুবান্ধব, না ছিল আমার পরিচিত কেউ। আমার চিরপরিচিত সাবানন্দ, স্রোতবতী নদীতীর এবং অনুপার শান্তস্নিগ্ধ হাস্যমুখর সংসর্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে আমি নামমাত্র এক মানুষ হয়ে বেঁচে থাকলাম। লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আমি বুকের উপর সান্তনার পাথর চাপা দিয়ে পড়ে থাকলাম। লজিং বাড়ি থেকে একদিন গ্রামে এসে শুনি অনুপার বিয়ে হয়ে গেছে। আমার মনে হল এক ধূসর রোদপোড়া বিবর্ণতায় আমার মায়াবতী গ্রামের মাঠ প্রান্তর ছেয়ে গেছে। যেখানে সে নেই, সেখানে আমার উপস্থিতি অর্থহীন। আমি এক অসহনীয় বিচ্ছেদের অন্তর্জ্বালায় পুড়তে থাকলাম। তারও কয়েকমাস পর লজিং বাড়ি থেকে একদিন এসে দেখলাম অনুপা এসেছে। চৈত্রের এক বিষণœ বিকেলে সে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমি তাকে দেখেও না দেখার ভান করলাম। সে ক্ষুব্ধ অভিমানী কন্ঠে আমাকে বলল-
‘কথা বলছ না কেন। দেখছনা কে এসেছে?’
‘দেখতে পাচ্ছি। সুখে আছ তো?’
‘আমার কথা ছাড়। তুমি কেমন আছ?’
‘সে কথা জানতে চেয়েছ কোনদিন। ভাব কেমন থাকতে পারি?’
আমার কথায় অনুপা কান্নায় ভেংগে পড়লো। দু’হাতে চোখ ঢেকে বলল-
‘এছাড়া আর আমার কি করবার ছিল। তোমার সাথে তো আমার মিল হবে না। কোনদিন না। কোনকালে না। তুমি এখনো পড়ছ। আর আমার পরের বাড়ি যাবার বয়স হয়েছে। তোমাকে বোঝাতে পারব না কি যন্ত্রণায় আমি পুড়ছি। অনেকক্ষণ কেঁদে কেঁদে অনুপা শান্ত হল।
আজ এতটা বছর পরে আবার তার মুখোমুখি হব। যে ছিল আমার একান্ত কাছের মানুষ তার সাথে দেখা হবে। জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে মানুষ তার অবস্থানে কখনো স্থির থাকতে পারে না। আমিও থাকিনি। অনুপাও নিশ্চয়ই আমার পথ চেয়ে বসে থাকে নি। লেখাপড়া করে এখন আমি চাকরি করছি। কত জায়গায় গিয়েছি চাকরি করতে। কত মানুষের সাথে হয়েছে পরিচয়। ধীরে ধীরে আমি তার কথা ভুলে গেছি। এতদিন পরে তার কি সেসব কথা মনে আছে। নিশ্চয়ই নেই।
আমি যখন নাগেশ্বরী ছেড়ে মাদাইখ্যালের কাছাকাছি পৌঁছলাম তখন আকাশে মেঘ জমল। কালিগঞ্জ পৌঁছতেই নামল বৃষ্টি। কার যেন অভিমানী অশ্রু ভিজিয়ে দিল পত্র পল্লব, ঘর দরজা, রাস্তাঘাট। কার্তিকের পরিচ্ছন্ন দিনটা মেঘের গুমোট আস্তরণে ঢেকে গেল। ঝড়–দা বলেছিল আফজাল হোসেন বললেই যে কেউ বাড়ির ঠিকানা বলে দেবে। কিন্তু আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। কালিগঞ্জ বাজারের আশপাশে কয়েকজন আফজালের সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু অনুুপা নামের কাউকে তারা বিয়ে করেনি। একজন বলল, গড়ের ওদিকে দুধকুমরের ধারে একজন আফজাল আছে। চলুন না দেখা যাক। আর একজন বলল মাদাইখ্যাল বাজারের পাশে আর এক আফজালের কথা। সেখানেও গেলাম। কিন্তু অনুপার স্বামী আফজালের কোন খোঁজ পেলাম না। তিরিশ বছর আগের এসব কথাতো অনেকের জানবার কথা নয়। আর আমিও এতবছর তাদের সাথে যোগাযোগ রাখিনি কেন। আর এখন হঠাৎ করে তাদের খুঁজে বের করার প্রয়োজনই বা কি।
অনুপার দেখা হল না। মেঘভার বৃষ্টি ক্লান্ত দিনের ব্যথাটুকু বুকের মধ্যে তোলপাড় তুলল। একজন লোক উৎসাহী হয়ে এক দোকানে আমাকে চা খাওয়াল। অনেক কৌতুহলী লোক জমলো আমার চার পাশে। যাত্রাপুর, সাবানন্দ এসব জায়গা এদের অনেকেই চেনে। এর মাঝে মাঝে গাড়ুহারা, সিতাইঝাড়, সাবানন্দের দিকে নানান কাজে যায়। কিন্তু সেদিকের অনুপা নামের কোন মেয়ের কালিগঞ্জে বিয়েশাদী হয়েছে কিনা তা কেউ বলতে পারে না। অগত্যা আমি ফিরে এলাম। মনের গহীনে একটি শুভ্র সুশ্রী প্রিয়মুখ কার্তিকের মেঘলা দিনের বৃষ্টির ধারায় অশ্রু মুছে নিল।