কদিন আগেও এমন ব্যপার মনের মধ্যে উঁকিঝুকি দেয় নি। সোহাগ সবকিছুই একটু বেশী বোঝে। এই বেশী বোঝার যন্ত্রণা ওকে খুবলে খুবলে খায়। ইদানিং নিজের শরীর নিয়েও বেশ বিব্রত। নাকের ঠিক নিচে, চোয়ালের প্রান্তসীমায় এবং দেহের অবহেলিত জায়গায় তুমুল আগ্রহে কচি ডগমগে বাদলা ঘাসের মত রোম গজিয়ে উঠেছে। মিহিকণ্ঠ ভেঙে চুরে গলার স্বর কাকের মতো কর্কশ খসখসে বেরসিক হয়ে উঠেছে।
গলার শব্দ নিয়ন্ত্রন হীন হয়ে পড়ার কারণে কথা বলতেও লজ্জা উগরে উঠে। এই কিছুদিন আগেও লজ্জা বিষয়টা মনের মধ্যে ছিলই না। যে বিষয়টা আড়ে ছিল না সে বিষয়গুলো এখন তাড়া করছে। মা এই বিষয়গুলো কেন যে বোঝে না? এক কষ্ট ওকে হাঁফিয়ে তোলে! মার কেন যে এ জ্ঞানের কমতি?
তারতো এ বিষয়ে বোঝা উচিৎ। আমি এখন ছোট নই, সববিষয়ে আমি এখন একটু বেশী বুঝি; এ বেশি বোঝার জন্য আমি মোটেও গর্বিত নই বরং কম বুঝলেই আমি শান্তি পেতাম। আমি যখন কম বুঝতাম, নারী পুরুষের ভেদাভেদ তখন আমার কাছে ধরা দেয় নি। পৃথিবীর সবকিছুকেই তখন খেলার সাথী বলে মনে হতো। এমনকি, অগ্নিময় সূর্যকে পাবার জন্য কতইনা আতিপাতি করেছি। মোমবাতির আগুনকে ভালবেসে হাত দিয়ে ধরতে গিয়ে হাত পুঁড়ে কত কেলেঙ্কারি। আর মা ছিল আমার সবচাইতে প্রিয় খেলনা। সেই ছোট বয়সের কথাও আমার মনে আছে। মার স্তনে মুখ লাগিয়ে এক স্তন খেয়েছি, অন্য হাতে মার আরেক স্তন নিয়ে বেহেস্তি খেলায় মত্ত থেকেছি। মার বুকের মধ্যে মাথা গুজে কি সান্তির ঘুমে নিজেই গুম হয়ে যেতাম। মার বুক ছিল আমার জন্য সোনার সিন্দুক। বাবা ধমক দিলে মার বুকে মুখ ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করতাম যেন কেউ খুঁজে না পায়। বোকা কাকের চোখ বন্ধ করে সাবান লুকানোর মতো আমিও আমিও চোখ বন্ধ করে নিজেকে আড়াল করতাম এবং আড়াল করতে গিয়ে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তাম। অথচ আজ ঘুম নেই, দু দুটো ডরমিক্যাম খেয়েও চোখে একরত্তি ঘুম আসে না।
বোতলের চিপি খুলে দুগাল ভরে মিষ্টি সিরাপ পেটে চালান করে সোহাগ। জিনিসটার দাম হুড় হুড় করে বেড়ে যাচ্ছে। একশ টাকার মাল এখন দেড়শ টাকা। সরকারের উচিৎ জিনিসটার দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। মদ খাওয়ার লাইসেন্স দেয়া গেলে এটারও দেয়া উচিৎ। ব্যবসায়ীদেরও লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। দেশের দিকে নজর দেয়া উচিৎ যাতে দেশের টাকা দেশেই রাখা যায়। ইন্ডিয়াতো দেদারসে টাকা লুটছে।
তিন চুমুকে বোতল খালি করে। পকেটে রাখা কাগজের মোড়নো চিনির পোটলা খুলে এক মুঠো খেয়ে নেয়। ততক্ষণে সিরাপ রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আর ক্রমেই বুকের খুব মধ্য হতে একটা আবেগের নহর হুড়হুড় করে দক্ষিণা বাতাসে নৃত্য তোলে। বুকের সেতারায় ভয়াবহ সুখের সুর রিনরিন করে বেজে উঠে। ঠিক এমনই মারাত্মক সুরের মূর্ছনায় কখন যেন সোহাগ প্রস্রাব করে দিয়েছে। সম্ভবত কিডনি কাজ করছে না। আজকাল প্রায়ই ব্যাপারটা ঘটে; সিরাপ খেলেই কখন যেন প্যান্ট ভিজে যায়। কিডনিতে মাঝে মাঝেই তীব্র ব্যাথা অনুতূত হয়।
সোহাগের চোখের পাতাগুলো কয়েকটন ভারি হযে নুয়ে আসতে চায়। সেহাগ ঘুমকে তাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বাম হাতে পাছার ময়লা ঝেড়ে ক্লিনিকের দিকে এগোয়। পস্রাবে পাছা ভিজে গেছে, এরপরও নেমকহারামী করা যাবে না। মার আদেশ অমান্য করা বড় অন্যায়, বড় পাপ। মায়ের আদেশ শিরধার্য। ক্লিনিকের কর্ডফোন থেকে একটা ফোন করতে হবে। মা গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে ৫২৯৬৩২ নাম্বার, পাশে এনতাজ সাহেব, সম্বোধন মামা, মামাকে ফোন করতে হবে। খুব জরুরী…। যাবার পথে ছোট বড় বেশকটি ফোনের দোকান পেছনে রেখে ক্লিনিকের দিকে এগোয়। ক্লিনিকে কার্ডফোনের ব্যবস্থা আছে। সোহাগের পেট মোটা মানিব্যাগে একটা একশ টাকা দামের কার্ড আছে। এ কার্ডটা মা কিনে দিয়েছে। মা বুদ্ধিমতি, সাধারণ দোকান থেকে ফোন করলে প্রাইবেসি থাকে না, আবার খরছও বেশী হয়। অথচ ক্লিনিকের কার্ড ফোনের বুথে কাঁচের দরোজা বন্ধ করে শব্দদূষণমুক্ত পরিবেশে কথা বলা যায়।
সোহাগ কাঁপা হাতে ফোন সেটের কীবোর্ডে হাত রাখে, পর্যায়ক্রমে নাম্বার মেলানের পর একটা রিং হওয়ার সাথে সাথে ফোন রিসিভ করে মধ্যবয়ষ্ক মামা। মামার কথা বলার ধরণ হাঁসের মতো ফ্যাসফ্যাসে। মামা সরাসরি প্রশ্ন করে, তুমি কে? এই যে এই ‘তুমি’ শব্দটাও প্রবল আপত্তিকর ঠেকেছে। ‘তুমি’ শুনতে ভালো লাগে না।
সোহাগ রাগ চেপে গিয়ে বিনয়ের সাথে উত্তর দেয়, মামা, আমি সোহাগ। মা আপনাকে অবশ্যই এবং আজই দেখা করতে বলেছেন।
সোহাগের বলা কথা সে যেন নিজেই চিনতে পারে না। মনে হচ্ছে বহুদূর থেকে কথাগুলো অনিচ্ছা স্বত্বেয় বের হয়ে আসছে।
মামা দ্রুত সম্মতি জানায়, ঠিক আছে আমি সন্ধ্যার পরপরই আসছি। ও হাঁ তোমার আম্মুকে বলবে, রাতে রান্না বান্নার দরকার নেই। আমি কাচ্চি বিরানি নিয়ে আসবো। তুমি নিশ্চয়ই বিরানি পছন্দ কর? কি কর না?
সোহাগের অন্তর থেকে গালি বের হয়ে আসে, মাদার …! এ গালিগুলে সে ইদানিং শিখেছে। সোহাগ গালি না দিয়ে উত্তর দেয়, আমি কাচ্চি বিরানি পছন্দ করি না।
তাহলে তুমি কি পছন্দ করো?
কড়া চিনি, কড়া দুধ দিয়ে বড় কাপভর্তী চা।
মামা হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে ফ্যাকাশে হাসি দেয়, অবিকল মরদা হাঁস মার্কা হাসির মাঝেই খোদা হাফেজ শব্দটা উচ্চারণ করে।
সোহাগ খোদা হাফেজের কোন উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। প্রচণ্ড বিরক্তি ভরে রিসিভার রেখে রাস্তায় বের হয়। এখন সোজা ইন্তাজের দোকানে গিয়ে দশ টাকার এক পুইট্টা গাঁজা কিনতে হবে। জিনিসটা ভেতরে নিলে আলাদা জগৎ, আলাদা দুনিয়া তৈরী হয়। সেই দুনিয়ার আসমান খুব নিচে অবস্থান করে। ইচ্ছে করলেই সে আসমান ছোঁয়া যায়।
এরই মধ্যে সোহাগের গা ছুয়ে একটা রিকসা উল্টো দিকে ছুটে যায়। ধ্যানভাঙা পাগলের মতো সে ক্ষেপে উঠে, মুখ বিকৃত করে গালি দেয়, হারামির বাচ্চা! চোখে দেখস না? গায়ের উপর রিকসা উঠাও! সোহাগের বোধ হঠাৎ জাগ্রত হয়। এভাবে গালি দেয়া অন্যায় হয়েছে।
ইন্তাজের দোকান হয়ে বাসায় ফিরতে বেশ দেরী হয়ে গেল। কলিংবেল টিপতেই মা দরজা খোলে। সোহাগ বেলিফুলের চাপা গন্ধে আভিভূত হয়ে মার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। মা সুন্দর পরিপাটি করে সেজেছে। নতুন বউয়ের মতোই পবিত্র একটি আবহ মাকে ছেয়ে আছে।
সোহাগের টকটকে চোখ দেখে ওর মা অপ্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন করে, কিরে তোর শরীর খারাপ বাবা?
সোহাগ চাপা হাসির মতো একটা দুর্বল রেখা ঠোটে ফুটিয়ে তোলে। যার মানে হতে পারে- আমি ভাল। আমি ভাল আছি কি? অথবা, আমার নিজেরই জানা নাই আমি ভাল আছি কিনা। ছেলের এমন আচরণে মা দ্বিগুন অপ্রস্তুত হয়ে পূনরায় প্রশ্ন করে, তোর মামাকে ফোন করেছিলিতো? এখনোতো আসছে না। সোহাগ বুঝতে পারে, মা ওর জন্য অপেক্ষায় নেই। মা আসলে মামার অপেক্ষায় আছে। সোহাগ মাকে পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে। নিজের রুমে গিয়ে টেবিলে রাখা প্লাস্টিকের জগ থেকে তিন গ্লাস পানি পেটে চালান করে। কিন্তু এর পরও তৃষ্ণা থেকে গেলো। সরা বুক জুড়ে মরুভূমির বিপুল খরা। গাঁজা জিনিসটা খাবার পর তৃষ্ণা বিষয়ক ঝামেলা বার বার পেয়ে বসে।
সোহাগের অসময়ে অসময়ে বিছানায় ছড়িয়ে পড়ার অভ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই। শোবার আগে বইপত্রের টেবিলে করুণার দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ে। বইপত্রের উপর ধুলোর মিহি আস্তরন। কিছু বইয়ের সাথে দেয়ালের সংযোগ সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে মাকড়সা। ওরা কি নিখুঁত কারুময় জাল বুনেছে। সেই জালের মাঝখানে পেটের নিচে ডিম নিয়ে একটা মাকড়সা বসে আছে। সোহাগের ঠোঁটের কোণ ছুয়ে একগুচ্ছ অবসন্ন হাসি বেরিয়ে আসে। মা এখন আর পড়ার কথা বলে না। লেখাপড়া করে মানুষ কি হয়? এ প্রশ্নের জবাব ও খুঁজেই পায় না। লেখাপড়া ওর কাছে খুব ক্লান্তিকর, হাস্যকরও বটে। মা কত বড় ডিগ্রীধারী শিল্পী। চারুকলার কত বন্ধু মার। মা তুলিতে হাত রাখলেই শ্রেষ্ট ছবি হতে বাধ্য হয় রং। মা ইংরেজী কবিতাও লেখেন। শিক্ষিত মায়ের মূর্খ ছেলে এমন কি ক্ষতি হবে দেশের? দরজা খোলার শব্দে সোহাগ জানলায় তাকায়। মা দরজা খুলে দিচ্ছে। স্থুল হাসি আর অপ্রস্তুত চেহারা নিয়ে একটি লোক প্রবেশ করলো।
লোকটা সোহাগের মামা। মধ্যবয়স, মাথার চুল বাদামী রং করা। মাথার ঠিক মাঝে স্পষ্ট টাক। এক হাতে শপিং ব্যাগ, অন্য হাতে ফলভর্তী কার্টুন। সোহাগ দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত দশটার কাছাকাছি। আজ যাদুর মত সোহাগের চোখে রাজ্যের ঘুম দানা বেধে উঠেছে। শহরের সব ঘুম পঁইপঁই করে ছুটে এসে চোখের রাজ্যে দ্বিগুন বেগে আছড়ে পড়ছে। সোহাগের যখন ঘুম ভাঙলো, তখন রাতের ঘড়ি দুটোর কাঁটা ওভার করেছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় ঘুম ছুটে গেছে। সোহাগ মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। টেবিলে ঢেকে রাখা তরকারি, ভাত, ডাল, পিরিচে সুন্দর করে কেটে রাখা কয়েক ধরণের ফল। ফলগুলো মামা এনেছে। সোহাগ খাওয়া শেষে গাঁজার দ্বিতীয় স্টিকটা নিয়ে ছাদে উঠে। জিনিসটা ঘরে বসে খাওয়া সমীচীন নয়। বেশ দূর্গন্ধ। ঘরের আসবাবপত্রেও গন্ধটা আঠার মতো লেগে থাকে। তাছাড়া খোলা আকাশের নিচে বসে খাওয়ার মজাই আলাদা। দীর্ঘ টান দিয়ে আসমানে ছুটে চলা মেঘের দিকে তাকালেই বুকের মধ্যে হু হু করে কান্না আসে। কাঁদলে বুকের ব্যথা ক্রমশই কমতে থাকে।
সোহাগ খাটের নিচে রাখা চপ্পল জোড়া টেনে আনে। আবার কি মনে করে ঠেলে রাখে। খালি পায়ে চলাচলে বিশেষ সুবিধা। শব্দ দূষণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় মার ঘরের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি যায়। বিষয়টা যদিও দৃষ্টিকটু, অপরাধের মধ্যে পড়ে, তবু সব জেনেও এ অপরাধটা সোহাগ প্রায়ই করে। মা এখনো জেগে আছে। টিভি চ্যানেলে সিনামা দেখছে, সাউন্ড বেশ নিচু করে রাখা। জানালার ছোট ছিদ্রপথ বেয়ে টেলিভিশনের সবুজ আলোর ফোয়ারা গলিয়ে পড়ছে বারান্দায় রাখা টবের গাছ গাছালির সবুজ পত্রে। বারান্দার শেষ মাথায় একগুচ্ছ নাইট কুইন ফুটে আছে লজ্জানত মুখে। ফুল হতে যে গন্ধ ছড়াচ্ছে সেটা অবিকল গাঁজার গন্ধ।
অথচ যে বছর প্রথম গাছটায় ফুল ফুটেছিল, সে বছর বাবা বাড়িতে ছিলেন। নাইট কুইনের তীব্র সুগন্ধে প্রতিবেশীরা মধ্যরাতেই বাসায় ভীড় জমিয়ে তুলেছিল। সোহাগ নাইট কুইনের প্রতি কোন আগ্রহ বোধ করে না। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে দক্ষিন প্রান্তের কার্ণিশে হেলান দিয়ে সোহাগ আসমানের দিকে তাকায়। কি সুন্দর স্বপময় হয়ে আসমান এ মাঝরাতে সেজে আছে। কি সুন্দর নিখুঁত পরিপাটি, কোটি কোটি তারার মধ্যে কিছু তারা খুবই উজ্জ্বল, কিছু তারা আবার এতোটাই অনুজ্জ্বল যে তা প্রায় দৃষ্টিতেই আসে না। ঐ অনুজ্জ্বল নি¯প্রভ তারার মতই সোহাগ। ঠিক তখন একটি তারা ছিটকে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায়। সোহাগ ঐ ছিটকে পড়া তারার সাথে নিজেকে মিলিয়ে ফেলে। সোহাগ প্রতিবার স্টিকে টান দিচ্ছে। প্রতি টানের সাথে পাল্লা দিয়ে চোখ হতে তুমুল বৃষ্টিপাত হচ্ছে। পশ্চিমে হেলে পড়া মলিন চাঁদ সোহাগের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই ক্লান্ত চাঁদকে উড়ে যাওয়া মেঘ ঢেকে দিচ্ছে। মেঘ সরে যেতে চাঁদ আবার তার ক্লান্ত চেহারা নিয়ে প্রকাশিত হয়। আচ্ছা ঐ চাঁদটা এখন কত দূরে অবস্থান করছে?
মধ্যপ্রচ্যের আসমানে সম্ভবত অবস্থান করছে। আচ্ছা, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদিআরব এখান থেকে কত দূর? আচ্ছা, ঠিক এ সময়ে বাবা কি আমার মত চাঁদটা দেখছে?
বাব কি আমাকে মনে করছে? বাবা কি শুধু টাকার পিছনে …? এত টাকা দিয়ে কি হবে বাবা? বাবা, তোমার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে কতদিন অপেক্ষা করছি।
বাবার কথা মনে পড়তেই সোহাগের দুই নদী চোখের মধ্যে জোয়ার এসে সবকিছু ঝাপসা করে দেয়। সাজানো আসমান আর দেখা যাচ্ছে না। তেরো বছরের সোহাগ পাঁচ বছরের শিশু হয়ে উঠে।
বাবার শার্টের আস্তিন ধরে সোহাগ প্রশ্ন করে
বাবা তুমি কি কাজ কর?
বাকালায় কাজ করি।
বাকালা কি?
বাকালা হলো দোকান।
সুপার মার্কেট। বড়সড় মুদি দোকানও বলতে পারো।
তুমি দোকানে কি কাজ করো?
বড় কষ্টের কাজ করি, এই দেখ আমার হাতে কেমন কহর পড়েছে। তোমাকে যাতে এই কষ্টের কাজ করতে না হয় সে জন্য আমি কষ্ট করছি। তুমি লেখা পড়া শিখে বিদ্বান হবে। তুমি বিদ্বান হলে, বড় হলে আমি বড় শান্তি পাব।
কল্পনার সামনে দাঁড়ানো বাবা হেসে উঠে।
সোহাগের চেখে নদী উতরে ঝর্ণা বহে।
বাবাগো আমি বড়ো হতে চাই না। বিদ্বান হওয়া আমাকে দিয়ে হবে না। তোমার হাতে কহর ফেলে কোন লাভ হবে না বাবা। তুমি নেই বলে আমার অনেকগুলি মামা জুটেছে। মামাদের আগমন আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। বাবা তুমি চলে এসো।
হঠাৎ আসমান ফুঁড়ে বৃষ্টি শুরু হলো, তীরের বেগে বৃষ্টির ফোঁটা সোহাগের নগ্ন শরীরে গেঁথে যাচ্ছিল। সোহাগ হুড়মুড় করে নিচে নেমে আসে। মার ঘর হতে চাপা হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সোহাগ গোপন ছিদ্রপথে তাকানোর সাহস পায় না। অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে জানালায় কান রাখে। মা চাপা স্বরে ধমকে উঠে, আহা! ঐ ঘরে সোহাগ…
সোহাগ ওর ঘরের ভেজানো দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বিছানায় বিছিয়ে পড়ে।
ওর শরীর থেকে একে একে হাত খুলে যায়, পা আলাদা হয়। একশো কোটি ঘুমের বিষন্ন তীব্র তীর ওকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। ঘুমের মতোই একটা বিষয় তাকে নিস্তেজ করে দেয়। যখন তার ঘুম ভাঙ্গে তখন ধানমণ্ডি ঈদগাহ মসজিদ হতে ভোরের সুমিষ্ট আজান শোনা যাচ্ছে। তীব্র প্রস্রাবের বেগ তলপেট ভারি করে তুলেছে। কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয়ে তাড়াহুড়ো করে বাথরুমে প্রবেশ করে। একটা লুঙ্গি বাথরুমের ফ্লোরে পড়ে আছে, টয়লেটের কমোটে একটা প্যান্থার ভাসছে।
সোহাগ এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতে থাকে। চিন্তাগুলো ওকে হাঁফিয়ে তোলে। আচ্ছা চিন্তাগুলো ঘুরিয়ে দিলে কেমন হয়?
টয়লেটের কমোটে কোন প্যান্থার ভাসছে না। প্লাস্টিকের বোলের নিচে কোন কাপড় চোপড় লুকানো নেই। বাবা বাড়িতে আছেন। বাবার কথা মনে হতেই চিন্তাগুলো লাইনচ্যুত ট্রেনের বগির মত ছিটকে পড়ে।
বাবার প্রতি তীব্র অভিমান জমে উঠে। প্রচুর অর্থ আর প্রতিষ্ঠার পেছনে এভাবে দৌড়াবার জন্যই নাইট কুইন ফুটে সুগন্ধের বদলে গাঁজার গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাবা, তুমি একগাদা টাকা জমাতে পারবে। তারপর টাকার স্তুপে বসে কষ্টের গিটারে বিরহের ক্রন্দন করতে পারবে। ঠিক এ সময় কলিং বেল বাজে। সোহাগ দরোজার দিকে এগোয়। ও জানে বাইরে বুয়া অপেক্ষা করছে। বুয়া নাস্তা বানাবে, কাপড় ধুবে, বাথরুমে রাখা কাপড় চোপড় দেখে সুন্দর রসালো একটা গল্প বানাবে। কাজের ফাঁকে পাশের বাসার বুয়ার সাথে গল্প করবে। সোহাগ সেই গল্প শুনবে, বুঝবে কিন্তু কিছই বলবে না।
বুয়া একদিন পাশের বাড়ির বুয়ায় সাথে সোহাগের জন্ম বিষয়ক গল্গ করছিল। সোহাগ পুরো গল্প শোনার পরও কিছুই বলতে পারে নি। কারণ, ও নিজেই অবাক হচ্ছিল, ওর এত মামা কেন?
সোহাগ জানে, ওর মা আজ দুপুরের আগে ঘুম থেকে উঠবে না। বুয়া আজ ভিষন ব্যস্ত হবে গল্প বলার জন্য, ইতিমধ্যে কয়েকবার উঁকি দিয়েছে পাশের বাড়ির বুয়ার উদ্দেশ্যে। সোহাগ একশ পঞ্চাশ টাকা নিয়ে বি এন টি বস্তির দিকে পা বাড়ায়। ভীষন এক ব্যাস্ততা ওর চোখে মুখে।