মনের ভেতরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। বৃষ্টির পর রোদ্দুরে ভেজা গাছের পাতা যেভাবে ঝিকিয়ে ওঠে। আগে তো কতমঞ্চে কত কত বার বক্তৃতা করেছেন! অবনীশ বসুর মতো বিদ্যাসাগর বিষয়ক আলোচনা কেউ করতে পারে না। অনেকেই মুখ বুজে সেকথা মানেন। কিন্তু আজকের ভাললাগাটা যেন অন্যরকম। তিনি যেন সবথেকে আজ বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন। যদিও এজন্য বেশ অনেকটা বাড়তি স্টাডি করতে হয়েছে। নতুন রেফারেন্স বই আনিয়েছেন কলেজস্ট্রীট থেকে। আলোচনার বিষয় দেওয়া হয়েছিল দয়ারসাগর বিদ্যাসাগর। অনেকেই এবিষয়ে এন্তার আউড়ে যেতে পারেন। কিন্তু প্রধান আলোচক যেখানে অধ্যাপক অবনীশ বসু,তখন আলোচনার মুড ও রিসোর্স যা তা হলে তো হবে না!

নামকরা একটি লিটিল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন। টাউন হলের কোন চেয়ার খালি নেই। মঞ্চে মহকুমা শাসক সহ কলকাতার দু’ একজন নামকরা সাহিত্যিক। দর্শক শ্রোতার আসনে বিভিন্ন জেলার অনেক কবি গল্পকার প্রাবন্ধিক। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীও আছে। গমগম করছে সারা হল। দুপুরে মিলের ব্যবস্থা আছে। যদিও সভাশেষে পঙক্তিভোজ।

সংগঠকরা তাদের সূচীতে অধ্যাপক বসুর আলোচনা শেষে রেখেছেন।নইলে ভীড় পাতলা হবার আশঙ্কা থাকে। সাহিত্য বা রাজনীতির সভাতে জমায়েত বেশি না হলে ব্যাপারটা ক্যামন যেন মিয়ানো লাগে।
মহকুমা শাসক উদ্বোধনী ভাষণে প্রশস্তি ছড়িয়ে দিলেন-
-আমার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন আশাকরি,মহকুমার মানুষ বিদ্যাসাগর মহাশয়কে চিনেছি অধ্যাপক বোসের চোখ দিয়ে।এটা আমাদের গর্বিত করে।
কলকাতার সাহিত্যিকরাও কার্পণ্য করলেন না।
-বিদ্যাসাগর মহাশয় সম্পর্কে কোন কিছু জানতে হলে অবশ্যই অধ্যাপক বোসের শরণাপন্ন আমাদেরকে হতেই হবে। এক্ষেত্রে তাঁর বইগুলি অসামান্য দলিল।

যদিও এসব কথা অত্যুক্তি নয়। বিদ্যাসার মহাশয়কে নিয়ে তাঁর বেশ কয়েকটি বইয়ের দারুণ কাটতি! কলকাতার বিভিন্ন সভাঘরে তিনি সম্বর্ধিত হয়েছেন বেশ কয়েকবার।

একপ্রকার আবেগমথিত ঘোরের মধ্যেই অধ্যাপক তাঁর কথা শুরু করলেন। তাঁর মন্দ্রকণ্ঠ উপস্থাপনা শ্রোতাদের যে মুগ্ধ করবে তা বলাই বাহুল্য। মাঝে মাঝে জলোচ্ছ্বাসের মতো করতালিতে তাঁর চমক ভাঙছিল।

আজ অবনীশ বসু মুখ ভর্তি করে বলতে পেরেছেন। ভেতরে বেশ একটা আত্মসন্তুষ্টির হাওয়া বইছে।বিদ্যাসাগর মহাশয় যে কতখানি দয়ারসাগর তা নানা উদ্ধৃতি আখ্যান ইত্যাদিতে প্রমাণ করতে পেনেছেন। যেসব তথ্য তিনি আজ পরিবেশন করেছেন তা অনেকেরই নাজানা না- পড়া।
মঞ্চ ও সংগঠকরা যে বেজায় আপ্লুত তা করমর্দন আলিঙ্গন অভিবাদনের বহরে বোঝা গেছে।

নিজস্ব গাড়ি কোরে আজ তিনি অনুষ্ঠানে আসেন নি। কিছুটা আজকের সূচীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছক ভাঙার চেষ্টা। বাসে করেই এসেছেন।ফিরবেনও একইভাবে।

সাহিত্যগোষ্ঠীর নামছাপা সুদৃশ্য ব্যাগে শাল স্মারক ফুল ব্যাজ ঢাউস মিষ্টির প্যাকেট। সাদাখামে সামান্য সাম্মানিক।
অনুরাগীরা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বাইকে কোরে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।অধ্যাপক মহাশয় ঘোর আপত্তি কোরেন।
-একটু হেঁটেই স্ট্যান্ডে যেতে চাই।স্ট্যান্ডে বসে লোকজন দেখতে আমার দারুন লাগে। কত ধরনের মানুষ! তাদের নিরন্তর গতায়াতের তাগিদ।এখানেই তো সাহিত্যের রসদ লুকিয়ে থাকে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘিরে থাকা অনুরাগীবৃন্দ কথাগুলো গিলতে থাকে। সকলের চোখেমুখে বিস্ময়। অবনীশ বসু স্ট্যান্ডের দিকে একাই পা বাড়ালেন।

স্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ বসে আছেন।বাড়ি ফেরার বাস তখনো আসেনি।বাস অফিসে খোঁজ নিয়ে জানলেন আর মিনিট পাঁচ সাতেকের মধ্যেই বাস ঢুকবে।
হঠাৎ অধ্যাপক পাঞ্জাবিতে টান অনুভব করলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল বয়স্কা থুরথুরে এক ভিখিরি বুড়ি।
-দেনা বাবা দুটো টাকা।তোর ছেলেপুলে ভাল থাকবে। ভগমান ভাল করবে।
-ভিক্ষে চাইছো তো মুখে বলতেই পারো, তা বলে পাঞ্জাবীতে হাত! সাহস তো কম না!
-দেনা বাবা দুটো টাকা।
-টাকা তো গাছে ফলে।নাড়ালেই ঝনঝন। বেশ দিব্যি একটা পেশা!
-খেতে পাইনি বাবা। ছেলে বৌ দেখে না।বুড়ি মানুষ দে বাবা দে।
-ছেলেবৌ দেখেনি তো আমি কি করবো? সরো সরো বিরক্ত কোরো না।

এদিকে কন্ডাকটরেরর চিৎকারে অধ্যাপকের সম্বিত ফেরে। বাসের দিকে দৌড় লাগায়। পাদানিতে এক পা দিয়েই ঝটিতে বাসের মধ্যে উঠে পড়েন। সামনের ফাঁকা সিটে ধপাস করে বসেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
-যাক বাবা বাঁচা গ্যাছে। যত্তসব উটকো ঝামেলা।

জানলা দিয়ে বাইরে চোখ পাতলেন অধ্যাপক।
বুড়ি তখন অন্য একজনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মুখে আউড়ে যাচ্ছে একই কথা
-দেনা বাবা দুটো টাকা
অধ্যাপক সিটের নরম স্পঞ্জে শরীরটা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ফিরে গেলেন টাউন হলের করতালি মুখরিত মঞ্চে।
ওদিকে দূরে অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসলেন ঈশ্বর!