ঝরে যাওয়া বৃষ্টিরও কিছু গল্প থাকে, থাকে তীব্র হাহাকারে জমা কিছু কান্নার দাগ। ঝরাপাতার কান্না শুনেছ তো? শোনোনি? কান পেতো শীতের হাওয়ার বুকে চুপিসারে। শুনতে পাবে মর্মরে বাজে কী করুণ বেদনার বাঁশি! বাজে কী বিষাদ সুর তুলে বিরহী নূপুর! শীতের হাওয়ায় সে ছড়িয়ে দিয়ে যায় করুণ বাঁশির সুর, বাজিয়ে দিয়ে যায় বিরহের বিষাদনিক্কন। সেই যে কোনো এক বসন্তলগ্নে প্রেম হয়েছিল তার, ভোরের উজ্জ্বল আলোকবিন্দুর সাথে, দিনের পালতোলা সোনালি রোদ্দুরের সাথে, সে প্রেমে ক্রমশ সবুজ হয়ে উঠেছিল সদ্য অঙ্কুরিত কচি পাতা, গাঢ়, নিটোল হয়ে উঠেছিল তার ডাগর, নবীন চোখ। বৃক্ষের গভীরে সে পৌঁছে দিয়েছিল নিজের বুকের ভেতর জমে ওঠা প্রেমের অমৃত, পাঠিয়ে দিয়েছিল হৃৎপিণ্ডে ফুটে ওঠা প্রেমপারিজাতের অমূল্য সুবাস। বৃক্ষ তা শুষে নিয়েছিল, আশ্লেষে, আনন্দে। তরতর বেড়ে উঠেছিল সে-ও, সবুজ পাতা আর রোদ্দুরের তীব্রতর প্রেমে, কামার্ত সঙ্গমে, দিনে দিনে মহীরুহ হয়ে উঠেছিল বৃক্ষ, হয়ে উঠেছিল সুশীতল ছায়া… কিন্তু! ক্রমশ লাবণ্য হারালো রোদ্দুর, হয়ে উঠল চণ্ড! কোমল প্রেম ভুলে পাতাকে সে পুড়িয়ে দিল নিদারুণ উত্তাপে, দুর্মর প্রচণ্ডতায়। আচমকা প্রেমিক রোদ্দুরের বৈরি সে রূপে হতবিহ্বল পাতা মিইয়ে গেল শোকে, বিবর্ণ, ম্লান হলো তার সবুজ, কোমল মুখ। যন্ত্রণাভারে নুয়ে পড়ল মাটির দিকে, কষ্টভারে ঝরে গেল বৃক্ষ হতে, ধীরে। ফিসফিসিয়ে মাটির কানে কানে বলল তার অব্যক্ত প্রেমগাথা, দেখাল তার হৃৎপিণ্ডে গেঁথে দেয়া রোদ্দুরের প্রেমবহ্নি! হাওয়া কান পেতে শুনলো সে করুণ গল্প, দেখল পুড়ে যাওয়া হৃদয়ের ক্ষত। অতঃপর বুকের তানপুরায় তুলে নিলো ঝরে যাওয়া পাতার হাহাকার, বাজিয়ে নিলো পাতার হৃদপিণ্ডে গাঁথা করুণ কান্নার সুর। শীতের হাওয়ায় ঝরে যাওয়া পাতার হাহাকার বাজে সেই থেকে, বাজে রোদ্দুরের সাথে পাতার প্রেমের বিষাদগাথা… কান পেতো শীতের হাওয়ায়, শুনতে পাবে হাওয়ার বুকে বাজতে থাকা ঝরাপাতার করুণ ভায়োলিন… ঝরে যাওয়া বৃষ্টিরও গল্প আছে এমন, ঝরাপাতার মতো তারও হৃৎপিণ্ডে জমে আছে মেঘের সাথে তুমুল প্রেমের কথকতা, অতঃপর সে প্রেম হারিয়ে যাওয়ার তীব্রতর ব্যথার দাগ… আর তুমি? তুমিও কি পড়োনি জীবনের প্রেমে? জীবন তীব্র আলিঙ্গনে আঁকড়ে ধরেছে তোমায়, প্রেমে, আনন্দে, বেদনায়, বিষণ্ণতায়… অতঃপর সময় নামক রোদ্দুরের ছোঁয়ায় বেড়ে উঠছ, জলে, যৌবনে, হাওয়ায়, জীবনের জলজ জলসায়… অবশেষে, জেনে রেখো, রোদ্দুরের মতো সময়ও চণ্ড হবে হঠাৎ একদিন, শুষে নেবে সমস্ত সবুজ, কেড়ে নেবে যা কিছু কুসুম-কোমল। ঝরাপাতার মতোই বিবর্ণ, ম্লান হবে তোমার তুমি, ঝরে যাবে কোনো এক বিষণ্ন বেলায়। নির্লিপ্ত সময় বয়ে যাবে অন্তহীন, পাতার প্রেমভোলা রোদ্দুরের মতোই। রোদ্দুর যেমন পুরাতন প্রেম ভুলে নতুন পাতার প্রেমে বুঁদ হয় আবার নির্লজ্জ বাসন্তী আয়োজনে, সময়ও তেমন সীমাহীন বিশ্বাসঘাতকতায় মগ্ন হবে আবার অন্য তোমার প্রেমে। জমে উঠবে আবার জীবনের নবতর জলসাঘর, ভরে উঠবে বাগানের চিরচেনা কোণ, নতুন কোনো স্বপ্নের কুঁড়ি-স্পর্শে, হেসে উঠবে অচেনা তোমার জীবনের মোহন যাদুর ছোঁয়ায়। গল্পটুকু শুধু থেকে যাবে হাওয়ার বুকে, বেদনার করুণ সুর হয়ে, বিষণ্নতার মৃদু ফিসফিস হয়ে। শীতের হাওয়ার হৃৎপিণ্ডে বেজে উঠবে ব্যথার ভায়োলিন, মৃদু শিৎকারে। সতর্ক কান পেতো, চোখ রেখো শীতল হাওয়ার চোখে, শুনতে পাবে সেই অন্যতুমির প্রেমের গল্প, ব্যথার হাহাকার, কোনো এক পাতাঝরার দিনে…

২.
যাপিত জীবনের ঘামে, ক্লেদে, ক্লান্তিতে, জীর্ণ, অবসাদগ্রস্ত মন যখন পরিত্রাণ চায়, হাঁপিয়ে উঠে যখন চায় একটু মুক্ত বাতাস, আলো ঝলমল একটুকরো অপার্থিব আকাশ, তখন সে হাত বাড়ায় তোমার দিকে। কাঙালের মতো তখন সে চায় তোমার উষ্ণ, উদার প্রেম। আমার কাছে তুমি তো ব্যক্তি নও কোনো! তোমার তুমি আমার কাছে সত্য আর সুন্দরের এক অনন্য রূপ। ঈশ্বর। আমার সব কষ্টে, যন্ত্রণায়, বেদনার সব অনুসঙ্গে চাই তোমার নীরব উপস্থিতি। চাই আমার সকল দহনে তুমি পাশে থাক, সশশীরে না হলেও মনে মনে অন্তত, হাওয়ার কানে কানে তবু বলো, আছি, তোমার সাথে আছি! তাতে নিভবে আমার সকল দহন, কমবে আমার যাপিত জীবনে চাপা যন্ত্রণার অসহ্য ভার, মুহূর্তেই। কিন্তু তুমি! আমাকে বিপর্যস্ত করো আরও! যন্ত্রণাভারে নুয়ে পড়া আমার মনকে তুলে দাও দহন-চিতায়! তাতে আরও বেশি পুড়ে যায় আমার চৈত্রদগ্ধ মন, দাউ দাউ জ্বলে ওঠে আরও বেশি আগুনরঙা কৃষ্ণচূড়া। তুমি তাতে আনন্দ পাও ভীষণ! আমার যন্ত্রণার তাপে তুমি হেসে ওঠ খলখল! হৃৎপিণ্ডে ফুটে ওঠা কৃষ্ণচূড়ার রক্তরঙে তুমি স্নান কর অহর্নিশ, আমার চোখ থেকে মুছে যায় সত্য আর সুন্দরের মোহন মূর্তি। ভেসে ওঠে নরক, জেগে ওঠে শয়তানের প্রতিচ্ছবি। ভেসে ওঠ তুমি! তখন দ্বিধা এসে সামনে দাঁড়ায়। প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় দারুণ ত্বরায়। তুমি কি তবে একই সাথে ঈশ্বর আর শয়তান? খল আর বল? তুমি কি তাহলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ? একই সাথে মুখ ও মুখোশ? দ্বিধার টানে থমকে যায় আমার অমৃতপিয়াসী মন। যে তুমি মুক্ত বাতাস ছিলে আমার, যে তোমার পরশে মুক্তির অপার আনন্দ ছুঁয়ে গেছে আমার খর মনের ধূলো, সে তুমি মুহূর্তেই হয়ে ওঠ বিষাক্ত কার্বন! বিষিয়ে ওঠা মনে তুমি বিছিয়ে দাও মৃত্যুর ছাইরং, ছড়িয়ে দাও বেদনার বিষণ্ন কালি। যে তুমি ছিলে আমার একটুকরো খোলা আকাশ, যার আলোয় হেসে উঠত আমার থুবড়ে পড়া মন, স্বপ্ন আঁকত আমার ডানাভাঙা কল্পনার পাখি আবার রঙিন পেখম মেলার, সে মুক্ত আকাশ পলকেই ঢেকে যায় ছলনার দমবন্ধ শিষায়, প্রতারণার দূষিত অন্ধকার গিলে ফেলে সেই প্রিয়, অতি প্রিয় আকাশটুকু আমার। যাপিত জীপনের ভাপে, তাপে, ক্লেদে, ঘামে, থুবড়ে পড়া মন আরও বেশি যন্ত্রণায় নীল হয় আমার, আরও বেশি ক্লেদাক্ত, বিষাক্ত হয় তার নরম, কোমল ভিটে। আমার কাছে সত্য আর সুন্দরের রূপ পাল্টে যায়। পাল্টে যায় ঈশ্বরের মুখ। পাল্টে যাও তোমার তুমি। জেগে ওঠে এক খল ঈশ্বর, জেগে ওঠ অন্য তুমি। যেখানে প্রেম নেই, প্রতারণা আছে, মোহ নেই, আছে নিরাসক্তির এক অসহ্য, অসুর অনুভূতি। আমি খাবি খাই বারবার। হাত বাড়াই তোমার ঈশ্বর রূপে, তুমিও হাত বাড়াও প্রেমে, প্রতিজ্ঞায়, প্রতিবেশে, পরক্ষণেই জেগে ওঠ, খল তুমি, রুদ্র তুমি! সরিয়ে নাও হাত অপ্রেমে, প্রতিজ্ঞা ভূলে অকরুণ সরে যাও দূরে। তবু আমি দীর্ঘশ্বাস টানি মুক্ত একটু বাতাস প্রত্যাশায়, চোখ মেলি খোলা একটুকরো আকাশের খোঁজে, একবার, বারবার, প্রতিবার…

৩.
আজন্ম দেখতে থাকা এই প্রকৃতি, পথঘাট, প্রতি ধূলিকণা, চেনা, খুব চেনা। এখানে মিশে আছে দেখা-অদেখা পূর্বপুরুষের পায়ের চিহ্ন, বাতাসে ভাসছে তাদের গায়ের গন্ধ, নিঃশ্বাসের অণু-পরমাণু। কেউ নেই তারা আজ। তবু, এই পথে মিশে আছে গা ছমছমে অনুভূতির রেশ। একদিন এই পথ ধরে হেঁটেছিল যে জন, এই প্রকৃতি তার নীরব সাক্ষী হয়ে জেগে আছে, এই পথ আপন বুকে লুকিয়ে রেখেছে তার পায়ের চিহ্ন, গোপনে, নিভৃতে। এই হাওয়া ফিসফিসিয়ে জানিয়ে যাচ্ছে একদিন এখানে কেউ ছিল, নিংড়ে নিয়েছিল জীবনের সবটুকু রূপ, রস, গন্ধ। শুষে নিয়েছিল জীবনের পেয়ালা থেকে দুঃখ-সুখের, প্রেম-অপ্রেমের সবটুকু নির্যাস। আজ কেউ নেই। মিশে গেছে জীবনের উল্টোপিঠে, হারিয়ে গেছে অন্ধকারের অতলে। এই প্রকৃতি তবু নিভৃতে ধরে রেখেছে অতীতের সেই প্রেমগাথা, হারানো জীবনের সুর। সুরটুকু শোনা যায় কান পাতলে, প্রকৃতির বুকে। কানে কানে বলে সে, ছিল, একদিন এই জনপদ মুখর ছিল অন্যকোনো গানে, বুঁদ ছিল অন্য কোনো সুরে। আজ আমার সুরে মোহাবিষ্ট এ সময়। একদিন এ সুরও হারাবে অনন্তের মোহে। বহুকাল পরে কেউ একজন চমকে উঠবে হারানো সে সুরের হঠাৎ পরশে, স্মরণ করবে তার হারিয়ে যাওয়া অগ্রজের সুর, এমনি করেই। তারও বুকের ভেতর বেজে উঠবে হয়তো এমন বেদনার বাঁশি, বিরহের বিধুর সানাই…