সকাল দুপুর ঝুমবৃষ্টি পড়েছে। মেঘলা বিকেল এখন ক্লান্ত পায়ে পার হতে চলেছে। সেই সাথে বৃষ্টি কিছুটা বিরাম নিয়েছে। তবে মেঘ বৃষ্টির আশংকা এখনো উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতিতে গাঢ় অন্ধকার ভাব বিরাজ করছে। ঠান্ডা বাতাস বোইছে। কালো মেঘগুলো ‘গুম গুম’ ডাকছে। হঠাৎ আলোয় ভরে উঠছে পৃথিবী। পরক্ষণেই অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সব। আলো আঁধারের এমনি পরিবেশে সুসমিতা দো’তলার বেলকনিতে একলা বসে আছে। দৃষ্টি তার মেঘলা আকাশে। সুসমিতার মনে পড়ে, ছেলেবেলায় মেঘের গর্জনে ভীষণ ভয় পেতো। দৌড়ে মায়ের শাড়ীর আঁচল জড়িয়ে ধরতো। মেঘের গর্জনে সুসমিতা এখন ভীত হয় না। বরং কান পেতে থাকে। শুনতে চায়, বাদলা দিনের না বলা কথা।
অনেক্ষণ যাবৎ গেটের সামনে একটি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরপর আড়চোখে এদিক ওদিক দেখছে। সুসমিতা যুবকটিকে সূক্ষ্ম ভাবে খেয়াল করলো। ছেলেটি কাজে অকাজে দাঁড়িয়ে নেই। সে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করছে। অপরিচিত লোক বাড়িতে ঢোকার অনুমতি নেই। ছেলেটি বিকল্প পথ অবলম্বনের চেষ্টা করছে।
ভেতর ঘর থেকে পরিচিত ডাক কানে এলো। ‘সুসমিতা, খেয়ে যা। বেলা ক’টা বাজে, সে খেয়াল রাখিস?’
সুসমিতা পরলো বিপদে। তার খেতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছা না হলেও তাকে এখন খেতে হবে। না খেলে জোর করা হবে। সুসমিতার প্রায়শই মনে হয়, ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। যদিও সে পালাতে পারে না। তাকে ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না আজ বহু দিন।
খাবার টেবিলটার পাশে নাহার বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। উৎসুক দৃষ্টিতে সুসমিতাকে দেখছেন। তার ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে। নাহার বেগম কিছু বলতে চান।
‘কিছু বলবে মা?’
‘আমি কী বলতে চাই, তা তুই জানিস। সেই কথাটা আজ বলে দে। আমাদের শান্তি দে।’
‘মা তুমি যদি আবারও সে কথা জানতে চাও, তবে আমি এখন খাবার ছেড়ে চলে যাবো।’ নাহার বেগম শক্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন। সুসমিতা খাবার শেষ না করেই উঠে পরলো। এমন কিছুই হয়নি ভাবে ঘড়ির দিকে তাকালো। বিকেল ৫:৪৭ মিনিট। কিছু না ভেবেই সে ছাদে রওনা হলো।
পশ্চিম আকাশের মেঘলা ভাব এখন আরো গাঢ় হয়েছে। শীত শীত বাতাস বোইছে। বাতাসে এক ধরনের আচ্ছন্নতার সৃষ্টি করছে। অজানায় হারিয়ে নিতে চাইছে। সুসমিতা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে তার চুল উড়ছে। সুসমিতার মনে আজ আনন্দ। যদিও এমনি ঘনঘোর আনন্দে তার প্রহর কাটে না। তার অষ্ট প্রহর কাটে নিরানন্দে, বন্দি জীবন যাপনে। এতে তার দুঃখ নেই। প্রতিটি মানুষ নিজের অভ্যাসে অভ্যস্ত। অভ্যাসের পরিবর্তনে মানুষ দুঃখ পায়, কষ্ট বোধ করে। সুসমিতা সেই সকল মানুষ থেকে ভিন্ন। এই কারণে মেঘদেবতা তাকে ডেকে বলেছিলো, ‘তোমার উপর মেঘের গোপন ইচ্ছা পূরণ হবে।’
সুসমিতা হেসে বলেছিলো, ‘কেন?’
মেঘদেবতা এর উত্তর দেয় নি। নিঃশব্দ ছিলো।
‘মেঘের ইচ্ছা’ তো আর সহজ সাধ্য নয়। বড় তিতিক্ষার বিষয়। অসাধ্য সাধনের বিষয়। সুসমিতা সেই অসাধ্য সাধন করলো। ফল যা হবার হলোও তাই। পৃথিবীর মানুষ তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো। সমাজ থেকে করলো আলাদা। আলাদা হবার অবশ্যই একটি কারণ রয়েছে। তবে সেই কারণ সুসমিতার বাবা সেকান্দার শেখ বলতে চান না। লজ্জায় তার মাথা কাঁটা যায়।
এই মাত্র ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে বাতাসের বেগ ক্রমেই বেড়ে চললো। এক পর্যায়ে দরজা-জানালা উড়ে যায় অবস্থা। এরই মাঝে বৃষ্টির ফোটা বড় আকার ধারণ করলো। অতঃপর শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বর্ষণ। তুমুল বর্ষণ সুসমিতাকে পুরোপুরি ভিজিয়ে দিলো। দৌড়ে পালাবার সময় কোথায়।
এমনি সময় মাগরীবের আযান শোনা গেলো। একই সাথে রাস্তার ল্যাম্পোষ্ট গুলোতেও আলো জ্বলে উঠলো। অন্ধকারের বৃষ্টি গিয়ে ল্যাম্পোষ্টের হলদে আলোয় ঝমঝমিয়ে পরছে। কয়েকজন পথচারীকে রাস্তায় ছাতা মাথায় হেটে যেতে দেখা যাচ্ছে। দুষ্টু বাতাস তাদের ছাতা উড়িয়ে নিতে চাইছে। মানুষগুলো নড়বড়ে হাতে ছাতা ধরে হাটছে। আজ বৃষ্টি তাদের না ভিজিয়ে শান্ত হবে না। সেদিকে দৃষ্টি যেতে সেই যুবকটিকে আবারও দেখা গেলো। সে রাস্তার পাশে এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভরা বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে গিয়েছে। ছোট্ট নিঃশ্বাস নেমে গেল সুসমিতার বুক থেকে। দুর্বোধ্য কারণে মায়া লাগা শুরু হলো।
কালী সন্ধায় ছাদে একলা থাকা নিষেধ। নাহার বেগমের ধারণা, এই সময়টাতে জীন ভূতেরা নতুন বাসস্থানের খোঁজে থাকে। মানুষের শরীর হলো উন্নত বাসগৃহ। সুসমিতা জানে, জীন ভূত কোন কথা নয়। মায়ের কথার উল্টো পাতায় অন্য কথা লুকনো। সুসমিতা মাথা নিচু করে নিচে নেমে এলো।
শোবার ঘরটা এখনো অন্ধকার হয়ে আছে। আলো জ্বালানো হয় নি। সুসমিতা ঘরে গিয়ে সুইচ অন করলো। ঘর আলোয় ভরে উঠলো এবং একই সাথে অন্ধকারে ডুবে গেল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। ঘর অন্ধকার। এ ধরনের ঘটনায় বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সুসমিতাকে দেখে মনে হলো, সে বিরক্ত নয়। স্বাভাবিক ভাবে মোম খুঁজতে শুরু করলো।
ঘন অন্ধকারে কিছুই চোখে আসছে না। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে হাত রেখে সুসমিতা ওয়ারড্রপের কাছে পৌছলো। ওয়ারড্রপের ঠিক পাশেই ড্রেসিং টেবিল। ড্রেসিং টেবিলের নিচের ড্রয়ারে দুটো মোম রাখা আছে। সেদিকে যেতেই শক্ত কিছুর সাথে তার পা আঁটকে পরলো। ধাই সামলাতে না পেরে মেঝেতে আছড়ে পরলো সে। ঠিক এই সময়ে, পাশ থেকে কোন এক ‘অন্ধকার শরীর’ উঠে দাঁড়ালো। দরজা দিয়ে আসা হালকা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলো। অন্ধকার শরীর উঠে দাঁড়িয়ে সুসমিতার পেটে সজোড়ে লাথি মারলো এবং মানুষের কন্ঠে বললো, ‘এতো দিন কেন বেঁচে আছিস? তোর মৃত্যু আমাকে শান্তি দেয়। কেন এখনো বেঁচে আছিস?..’ কথাগুলো বলেই অন্ধকার শরীর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সুসমিতা মেঝেতে উবুর হয়ে পড়ে আছে। পেটের নিচটায় ভীষণ ব্যাথা শুরু হয়েছে। পৃথিবী অন্ধকার করা ব্যাথা। সুসমিতা দম চেপে আছে। ব্যাথা উপসমের অপেক্ষা করছে। অথচ সময় বাবার সাথে সাথে ব্যাথাটা বেড়েই চলেছে। সুসমিতা তার মাকে ডাক দিল। বুদ্ধিমতি মায়ের বুঝতে দেরি হলো না, মেয়ের প্রসব ব্যাথা উঠেছে।
সুসমিতাকে ধরে রান্না ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। খবর পেয়ে সেকান্দার সাহেব ছুটে এলেন। মেয়ে রান্না ঘরের মেঝেতে শুয়ে প্রসব যন্ত্রনায় ছটফট করছে।
সুসমিতার মা উদগ্রীব হয়ে বললেন, ‘এখন কি করবে?’
সুসমিতার বাবা থমথমে গলায় বললেন, ‘হারামজাদিকে হসপিটালে নিয়ে যাই’।
নাহার বেগম চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘না, ডাক্তার হসপিটাল করলে চলবে না।’
সেকান্দার শেখ কথা বললেন না। মাথা নিচু করে নিজের ঘরে চলে গেলেন। ঘরে যাবার সময় আঠারো হাত লম্বা দড়ি সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। চোখের আঁড়ালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি সাহিদা দেখে ফেলেছে। সাহিদা সেকান্দার সাহেবের বাসায় রান্নাবান্নার কাজ করে। সে দৌড়ে গিয়ে বন্ধ জানালার ফাঁকে চোখ রাখলো। সেকান্দার সাহেব সিলিং ফ্যানে দড়ি ঝোলাতে শুরু করেছেন। শীতল এক অনুভুতি নেমে গেল সাহিদার শিরদাঁড়া বেয়ে। সে আচ্ছন্নের মতো সেকান্দার সাহেবকে ডাকতে শুরু করলো, ‘চাচাজি, কি করেন? মইরা যাবেন তো! চাচাজি, দড়জা খুলেন। ও চাচাজি, দরজা খুলেন।..’
ততক্ষণে সেকান্দার সাহেব লক্ষ্য করলেন, তার পায়ের নিচের মোড়া নড়তে শুরু করেছে।
ওদিকে, ভীষণ ব্যাথায় সুসমিতা গোঙাতে শুরু করেছে। গোঙাতে গোঙাতে বলছে, ‘মা, মাগো, আর পারছি না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’
‘চুপ, চুপ কর মাগী! মস্তি করার সময় মনে ছিল না?’
সুসমিতা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, ‘মা, মাগো, এমন কথা বলো না। আমি আবারো বলছি, আমার সন্তানের বাবা নেই। কেন বিশ্বাস করছো না মা? তুমি দেখো, এই সন্তান একদিন পৃথিবী জয় করবে। পৃথিবী জয়ের জন্যই ও আমার পেটে এসেছে। ও যেদিন এসেছে, সেদিন রাতে আমি সপ্ন দেখেছি। একটি জোত্যির্ময় তারা’… সুসমিতা আর কথা বলতে পারছে না। তার কথা জড়িয়ে আসছে। যন্ত্রণায় ছটফট করেছে।
নাহার বেগম বসে আছেন। ও’ ঘর থেকে সাহিদার ডাকাডাকি কানে আসছে। সাহিদা এমন ভাবে ডাকছে কেন? আপাতত নাহার বেগমের সে কথা জানতে ইচ্ছে করছে না।