প্রতিদিন খানিক রোদের হাসি শেষে এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে
এলোমেলো হাঁটতে থাকে এই রাজধানী।
কিছু মেঘ প্রতিদিনই ঢেকে রাখে বিকেল থেকে রাতের আকাশ,
ঘর্মক্লান্ত পথ হাঁটে ব্যথাতুর পায়ে, কখনো ছুটে চলে,
মাথার উপরে তখন বিরাট একটা আকাশ গলে,
কানে কানে ফিসফিস করে বাতাসেরা কথা বলে,
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে এই শহর,
কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় করতোয়া নদীরও,
নিরব দর্শক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে
চেয়ে থাকে বেদনাহত একটা চড়ুই পাখি।

খানিক রোদ, এক আকাশ মেঘ আর এক পশলা বৃষ্টিই তো জীবন।

জানি – অবশেষে বৃষ্টির কাছেই মানতে হয় পরাজয়,
তবুও এক টুকরো রোদের জন্য এত ছুটে চলা, এত কথা বলা,
এত এত সব আয়োজন!

হোক, তবুও ভাল, বেঁচে থাক কবিতার মতই আলো আশা,
বেঁচে থাক শিল্পী বাবুইয়ের গান,
বেঁচে থাক মায়াময় এই পৃথিবীর জন্য এত্ত টান! [ টান ]

“খানিক রোদ, এক আকাশ মেঘ আর এক পশলা বৃষ্টিই তো জীবন”- এভাবেই কবি এ কে আজাদ তার কবিতার ভাষায় জীবনের কথা বলেন, সমাজের কথা বলেন, মনের কথা বলেন; ভাবের মায়াজালে আটকে রাখেন পাঠকের মন। জীবনের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ এবং রঙিন ও সাদাকালো বাস্তবতাই তার কবিতার উপজীব্য। নিজস্ব ঢংএর শব্দ ও ছন্দের বহুমুখী নিরীক্ষা প্রবণতায়, উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহারে এবং চিত্রকল্পের সফলায়তন বিনির্মাণে জীবনঘনিষ্ঠ আবেগ অনুভূতির সাথে সমাজ-বাস্তবতার প্রকাশই যেন কবি এ কে আজাদের কাব্যগ্রন্থ ‘বিমর্ষ ল্যাম্পপোষ্ট’। কাব্যগ্রন্থের নামটাই যেন বলে দেয়- এ এক বিমর্ষতার গল্প, আধুনিক সভ্যতার আড়ালে পীড়নের যাঁতাকলে পিষ্ট মানব মনের এ এক করুণ আর্তনাদ, নগর জীবনের পরতে পরতে মিশে থাকা এ এক হতাশার নান্দিপাঠ, প্রেম বিরহে মিশে থাকা মানব হৃদয়ের এ এক ব্যথিত উচ্চারণ।

কবি এ কে আজাদ একজন সমাজ ও সময় সচেতন কবি, মায়াবী গীতিকার এবং দক্ষ প্রাবন্ধিক। সেই সাথে তিনি একজন সুসংগঠকও বটে। চলমান সমাজ ও দেশ-জাতিকে তিনি অবলোকন করেছেন নিবিরভাবে। তার ‘বিমর্ষ ল্যাম্পপোষ্ট’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে তিনি প্রকাশ করেছেন বহমান জীবনের আবেগ অনুভূতি ও আধুনিক সমাজের এক নির্মোহ কঠিন বাস্তবতা। ঘুমিয়ে পড়া সমাজের নানা অসঙ্গতি, সামাজিক অবক্ষয়, নিষ্পেষিত মানুষের করুণ আর্তনাদ এবং নাগরিক জীবনের নানারকম হতাশার বর্ণমালায় সাজানো তার এই কব্যগ্রন্থ।

জীবন একটা নকশী কাঁথা হরেক নকশা আঁকা,
সুখের সাদায় রঙিন দুঃখ, সেলাই আঁকা-বাঁকা। [অণু কবিতা-২]

আমি মানে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক রাত্রি ঘুটঘুটে অন্ধকার!
………………… ……… ……… ……… ……… ………
আমি মানে যৌতুক না দিতে পারায় নির্যাতিতা মেয়ের গরীব বাবার
সহস্র দীর্ঘ নিশ্বাস!
………………… ……… ……… ……… ……… ………
আমি মানে চাঁদার দাবীতে রাস্তায় আটকে রাখা পণ্যবাহী ট্রাক,
আমি মানে চিড়িয়া খানায় আটকে পড়ার ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া
ভাষা ও দন্ত-নখরহীন বাঘ!
………………… ……… ……… ……… ……… ………
আমি মানে চোখের জলে চুপসে পড়ে থাকা অকেজো দেশলাইয়ের কাঠি; [আমার পরিচয়]

হতাশার পাশাপাশি বর্তমান সমাজের নানান বিচ্যুতি, সামাজিক নিষ্পেষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কবি জ্বালিয়ছেন দ্রোহের আগুন। চুপ করে বসে থেকে অপরাধ মেনে চলা সমাজকে জাগ্রত করার জন্য একজন শব্দসৈনিক এর মতই দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন কাঁধে। অপরদিকে স্বাধীনতার অর্জন, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক আচরণ ও বৈষম্যসহ সমাজের নানান অসংগতির প্রতি করেছেন অর্থবহ ইঙ্গিত। কেবল হতাশার চোরাবালিতেই ঘুরপাক খায়নি কবির কলম, ফেটে পড়েছে প্রতিবাদেও। উত্তরণের পথের দিকে কবি জানিয়েছেন আহবান। তাই তো তিনি লিখেছেন-

কিছু শব্দ আমাকে ধার দে না বোন,
আমি তোর মতন একটি কবিতা লিখব আজ!
যে কবিতা আওয়াজ তুলবে অন্ধকারের বিরুদ্ধে, আলোর আওয়াজ,
যে কবিতা পুড়ে যাওয়া চাঁদের কপালে এঁকে দেবে দ্বিধাহীন কথার লাল টিপ,
যে কবিতা বিবর্ণ অন্ধকারের দেয়ালে লিখে দেবে আলোর দেয়াল লিখন।
………………… ……… ……… ……… ……… ………
আমি একটা কবিতা লিখব আজ,
আমার হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা ভাষার কবিতা,
আমার কলমের নিবে বাবার মুক্তিযুদ্ধের স্টেনগানের গুলির মতন
ক্যাটক্যাট শব্দে বের হওয়া ভয়হীন একটা মুক্তির কবিতা।

আমি একটা কবিতা লিখব আজ,
সূর্যের মতন একটা সত্যের কবিতা,
দিবসের মতন চকচকে ঝকঝকে একটা সুন্দর কবিতা। [কবি পূর্ণার কাছে চিঠি]

এই কাব্যগ্রন্থে বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া সমাজের নানান অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরেছেন কবি। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়- নুসরাত নামের এক মাদরাসা ছাত্রীর কথা, যাকে ক্ষমতাধর কিছু লোকের মারপ্যাঁচে জীবন দিতে হলো। খবরে প্রকাশ- তারই একজন চরিত্রহীন শিক্ষকের হুকুমেই নাকি প্রকাশ্য দিবালোকে জীবন্ত নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা, যেটা এই আধুনিক সমাজে জাহিলিয়াত যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। সে ঘটনাটি তুলে এনেছেন কবি তার “নুসরাত একটা ফুল হতে চেয়েছিল” কবিতায়:

পাপড়ি মেলার আগেই খুবলে খুবলে খেয়ে ফেলল গোলাপের কুঁড়িটাকে।
শূন্যই পড়ে থাকলো বুক চাপড়ানো সকাল,
নোনা জলের এক বিশাল সাগর এবং অগ্নিদগ্ধ একটা ইতিহাস,
আর কেরোসিনের তীব্র গন্ধে ভারী হয়ে রইলো তাবৎ পৃথিবীর আকাশ বাতাস!

কেননা আমরা কেউ বাবা হলেও হতে পারতাম, তা না হয়ে পশু হয়েছি।
কেউ অভিভাবক হলেও হতে পারতাম, তা না হয়ে আমরা নরখাদক হয়েছি,
কেউ জনগনের কল্যাণে কাজ করলেও করতে পারতাম, তা না করে আমরা পকেটমার হয়েছি,
কেউ মানব হলেও হতে পারতাম, তা না হয়ে আমরা দানব হয়েছি। [নুসরাত একটা ফুল হতে চেয়েছিল]

বর্তমান সময়ে আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মূলধারার পেছনে পেছনে ছায়ার মত চলছে এক ধরনের বালখিল্যতা। মিথ্যা কবি-লেখকের কালো থাবায় নষ্ট হচ্ছে আমাদের প্রকৃত সাহিত্য-সংস্কৃতি। মৌলিক মেধার স্ফুরণ না ঘটিয়ে বন্ধু বান্ধবের নিকট থেকে কবিতা লিখে নিয়ে নকলবাজ কবি হচ্ছে কেউ কেউ। দিন দিন বিলীন হচ্ছে নিজস্ব দেশীয় শব্দ ও সংস্কৃতি। এর কবিতার এক শব্দ, ওর কবিতার এক শব্দ নিয়ে গোঁজামিল দিয়ে ধার করা শব্দে কেউ কেউ দু’একটা কবিতা লিখে নিজকে মহান ভাবছে। না আছে শব্দের গাঁথুনী, না আছে ভাবের সামঞ্জস্য। সেই আলোকে কবি লিখেছেন ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা:

কবিতার শহর আজ ভরে গেছে কামুকের ঘামে,
লুকানো পিরিতি কিছু শৈল্পিক শব্দের খামে।
নির্জনে হজম করেছে কিছু হরফের দানা,

কোন্ কেরামতি দেখিয়েছে পীর? – নাই কোন কবির জানা।

কবিতার খাতায় গোপনে জমেছে নারদের আনাগোনা,

কবিতার শহরে আজ হাঙরের হানা,
হরফের হেরফের তাই মানা।
কাব্যের গাছে আজ জমেছে বানরের নাচ। [কবিতার শহরে হাঙরের হানা]
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নানান বেদনা-বিধুর ঘটনাও শৈল্পিকরূপে স্থান পেয়েছে কবির কবিতায়। ২০১৯ সালে ঢাকার বনানীতে এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০০জন লোক মারা যায়। সে দূর্ঘটনা ব্যথিত করেছে কবিকেও। হতভাগ্য সেই সব লোকদেরকে উৎসর্গ করে কবি লিখেছেন-

আগুনের হল্কা বুকে নিয়ে আর কত কাঁদবে এই দুঃখী জননী!
আর কত ধোঁয়ার কাছে হার মানবে আকাশের মেঘপুঞ্জ!
বুকের জানালা দিয়ে ছিটকে পড়ে আর কত মানবতা
রক্তের সাগরে দেবে আত্মাহুতি। [আহা দুখী জননী]

মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ জুড়ে আছে ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমবিরহ। আশা হতাশার মাঝে নিরবে ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের আর্তনাদ যেন ভাষা লাভ করেছে কবি আজাদের ‘বিমর্ষ ল্যাম্পপোষ্ট’ কাব্যগ্রন্থটিতে। মানব-মনের নিগূঢ় সংবিৎজারনের এক চমৎকার বাণিচিত্র অবলীলায় অংকন করেছেন কবি তার স্বকীয় বৈশিষ্টপূর্ণ ভাষায়। নিচের কয়েকটি উদাহরণই কবির সে বিশেষত্বের পরিচায়ক:

আমার একটা উনুন আছে;
সেই উনুনে
বিনয় মজুমদারের দেয়া
অগ্নি সূতার বুনোন আছে।

মাঝে মাঝেই সেই উনুনে জ্বলতে হয়,
চুপটি করে গরম জলে গলতে হয়,
অগ্নি-জ্বলা উনুন কোলে বসতে হয়,
ক’দিন পরে ফাগুন এলো –

নামতা পড়ে সে অঙ্কও কষতে হয়!

আমার একটা উনুন আছে,
জ্বলছে আগুন জ্বলে,
পুড়ে পুড়ে হচ্ছি না ছাই,
যাচ্ছি কেবল গলে। [আমার একটা উনুন আছে]

নিঃসীম আঁধারে পুড়ে যায় চাঁদ, গলে পড়ে জ্যোৎস্না শিশিরের মতন,

নিশ্বাসের আগুনে পুড়ে যায় রাত্রির বালিশ।

জানি- একদিন শরৎ পুড়ে যাবে, পুড়ে যাবে ফাগুনের রোদ,
উড়ে যাবে গানের কোকিল। [কেবলই চেয়ে থাকা]

আহা! পেন্সিলে আঁকা ভুল জ্যামিতিক চিহ্নের মতন
যদি রাবার দিয়ে মুছে দেয়া যেত স¤পর্কের ভুলগুলো,
হয়তো চাওয়া পাওয়ার মাঝে থাকতো না এমন সুমেরু-কুমেরু দূরত্ব!
[যাক, উড়ে যাক চাতক পাখিটা]

বিষুব রেখা বরাবর দাঁড়িয়েছে তোমার আর আমার স¤পর্কের সূর্যটা।
‘ভালবাসা’র প্রতিটি অক্ষর আজ ঝলসে গেছে বিষম তাপদাহে।
এক আকাশ বিশ্বাসকে রাতের পৈথানে রেখে

গোলাপী ঠোঁটের হলুদ পাখিটা উড়ে গেলে ফিরে আসে এমন নির্মম দিন!

আহারে! এই জীবন প্রবল ঝড়ে ভেঙে যাওয়া অবশিষ্ট বৃক্ষ একটা!
[পড়ে থাক স্মৃতির বেওয়ারিশ লাশ]

পা ভাঙা বিড়ালের মত
বয়ে নিয়ে জীবনের ক্ষত
ছাই ঢিবির ’পরে,
শুয়ে থাকা, কাতরানো শুধু
দুই চোখে আজ মরুভূমি ধুধু
মন-মরা ঘরে। [উন্মাদ ঘুড়ির নাটাই ছেড়ে]

কী আর রেখে যাবি এক টুকরো স্মৃতির ছিন্নভিন্ন পালক ছাড়া?
তা-ই রেখে যা। ঐটুকু স্মৃতির গলায় দড়ি লাগিয়ে বানিয়ে নেব
পোষ-মানা প্রভূ-ভক্ত এক বিলেতি কুকুর। [স্বাধীন আবাসভূমি]

আমরা তো ভাই পাখ-পাখালী,আমরা পশু নই,
মানুষ নামের মুখোশ ছেড়ে এসো পাখি হই। [নীল কবুতর]

অজস্র জলরাশি হলে জীবন, ঢেউয়ের সাথে কথা হয় ঢেউয়ের,
স্রোতের সাথে কথা হয় নদীর।
আর হলুদ পাখির ঠোঁটে লেগে থাকে অনুরাগের রং। [গলে যাওয়া দিন, মনে থাকা স্মৃতি]

তোমার মুখ ও মুখোশের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে বুঝতেই
কেটে গেল এতটা সময়!
অবশেষে গোলাপী ঠোঁট খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম-
কাগজের গোলাপী রঙে মোড়া আছে মাটির ময়না পাখির ঠোঁট। [বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মন]

পরিশেষে বলা যায় যে- এক স্বাতন্ত্র ঢংএর কাব্যদ্যোতনায় এবং উপমা-উৎপ্রক্ষোর সংমিশ্রনে আধুনকি নাগরিক জীবনের এক চমৎকার চিত্রকল্প অংকন করেছেন কবি এ কে আজাদ তার ‘বিমর্ষ ল্যাম্পপোস্ট’ কাব্যগ্রন্থে। কোথাও আধুনিক কাব্যকলার অবলম্বনে, আবার কোথাও প্রথাগত ছন্দ-ঝঙ্কারে মানব সমাজের কঠিন বাস্তবতা এবং আধুনিক সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নগর জীবনের ব্যথা-বেদনার কথা সফলভাবে সাজিয়েছেন কবি এ কে আজাদ তার কবিতার পয়ারে। কাব্যগ্রন্থটি পাঠকের মন জয় করতে সক্ষম হবে বলে আশা করছি।

‘বমর্ষ ল্যাম্পপোস্ট’ প্রকাশ করেছে নিউজ কর্ণার পাবলিশিং এর পক্ষে কালীপদ সেন টিপু (০১৭১১-৪৮৬৮৭১) এবং বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন প্রতিথযশা প্রচ্ছদ শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ। প্রকাশ কাল – বৈশাখ ১৪২৬, এপ্রিল ২০১৯। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাহিত্য সাময়িক-পত্র ‘নোঙর’ এর প্রকাশক আমীরুল ইসলামের উদ্দেশ্যে। ৯৬ পৃষ্ঠার এই বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৫০/- টাকা।