হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি আইসিইউ থেকে ডাক্তার বের হবার। সকাল থেকে বাবাকে একবার দেখার জন্য ভেতরটা ছটফট করলেও ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করে আইসিইউতে প্রবেশ করার সাধ্য হয়ে উঠলো না।

খানিক বাদে ডাক্তার সাহেব বের হয়ে দ্রুত পায়ে চলে গেলেন। তার ধূসর মুখটা দেখে ভেতরটা ধড়ফড়িয়ে উঠলো। একজন নার্স আমার দিকে এগিয়ে এলেন। হাসপাতালে আসার পর থেকে এই নার্সের সঙ্গেই সবথেকে বেশি কথা হয়েছে, কেননা বাবার দেখাশোনার দায়িত্বে তিনি ছিলেন। হাসিমুখের নার্সের মুখটাতে এমন মলিনতার ছাপ এঁটেছে যে আমার হৃৎস্পন্দনের মাত্রা ক্রমশ কমতে শুরু করলো।

ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবার অবস্থা এখন কেমন?’

তিনি খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে উত্তর দিলেন, ‘তোমাকে এখন শক্ত থাকতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশ নেওয়ার ব্যবস্থা করো।’

বুকের মধ্যে মনে হলো কেউ যেন কলিজাটা হেঁচকা টানে ছিড়ে ফেললো। আমি আচমকা ব্যথাটা সইতে না পেরে ধড়াস করে ফ্লোরে বসে পড়লাম। নার্স আমাকে তাড়াতাড়ি করে ধরে চেয়ারে বসালেন। একজনকে ডেকে এক গ্লাস পানির ব্যবস্থা করে আমার হাতে গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। এক নিঃশ্বাসে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলাম। টানা দুই মাস খরতাপের রৌদ্র শেষে এক পশলা বৃষ্টিকে মাটি যেমন শুষে নিয়েও কর্দমাক্ত হতে পারে না, তেমনি এই এক গ্লাস পানিতে আমার গলাটা একটুও ভিজলো না।

গতকাল রাত থেকে দাঁড়িয়ে বসে সময় কাটছে হাসপাতালের বারান্দায়। মা আর ছোট ভাই বোন দু’টোর চেহারা চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ওদিকের একটা কক্ষেই ঘুমিয়ে আছেন তারা। মা সারা রাত জেগে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, ফজরের নামাজ শেষে অনেক কষ্টে চোখ বুজলেন। এখন ডাকা উচিৎ তাদের। কিন্তু ডেকে তুলে কিভাবে বলবো আমাদের মাথার উপরের ছায়াটা আর নাই!

চুপচাপ মায়ের পাশে গিয়ে বসি। মাথায় হাত রাখতেই মা উঠে বসলেন। চোখ জোড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘুমের অপূর্ণতা। ছোট বোনটাকে ছোট ভাইটা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে।

‘তোকে বললাম একটু ঘুমা, কাল রাত থেকে এক নাগাড়ে ছোটাছুটি করে যাচ্ছিস।’

মায়ের কথায় চোখ ভিজে এলো। তাড়াতাড়ি চোখের পানি লুকিয়ে নিয়ে ছোট ভাই আর বোনটাকে ডেকে তুললাম।

আমার এমন আচারণ দেখে মা খানিকটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘সব ঠিক আছে তো তৃষ্ণা?’

আমি মাথা নিচু করে রইলে মা আবার প্রশ্ন করলো, ‘তোর বাবার অবস্থা এখন কেমন? ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে?’

অনেক কষ্টে চোখের জল সংবরণ করলাম। ছোট বোনটা বললো, ‘আপু, বাবার সঙ্গে কি এখন দেখা করা যাবে?’

বোনের এমন কথা শুনে ছোট ভাইটা আবদারের সুরে বলে উঠলো, ‘আমি বাবার কাছে যাব।’

নিজেকে শক্ত রাখা এই মুহুর্তে হিমালয় জয়ের থেকেও কঠিন। গলাটা ভারী হয়ে এলো, নিঃশ্বাস যেন আঁটকে আসছে।
সবার মুখের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম, ‘মা প্রস্তুত হও, আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।’

কথাটা শেষ করেই হনহন করে কক্ষ থেকে বের হয়ে এলাম। দ্রুত পায়ে খানিক দূর এগিয়ে গিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লাম। হৃদয় ভাঙ্গা কান্নার শব্দে আশেপাশের লোকের চোখে কান্না জমে গেল।

এম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছি। মায়ের মুখটা শুষ্ক। চোখেও জল নেই। অতি শোকে পাথর হয়ে যাওয়ার জলজ্যান্ত উদাহরণ এখন আমার মা।

ভাই বোন দু’টির চোখের পানি আমাকে প্রতিনিয়ত আগত এক অসহায় জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা এই মুহুর্তে শব্দ ভান্ডারে নেই৷

বাবার লাশ দাফন করা হলো। বিশাল এক ঋণের বোঝা মাথায় চাপলে হার্ট অ্যাটাক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আল্লাহ এ পর্যন্ত হায়াত রেখেছেন বলেই চেষ্টা করেও আর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় নি। বাবার ঋণের দায়ভার আমিই নিলাম। বিনিময়ে বাবাকে সবাই ক্ষমা করার অনুরোধ জানালাম। যদিও প্রথমে তারা আমার উপরে অতটা ভরষা করতে পারেন নি, কেননা আমার জায়গায় একটা ছেলে হলে বিষয়টা স্বাভাবিক লাগতো।

বাবার সমস্ত ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আমাদের শেষ অবলম্বন বলতে এই একতল বাড়িটাই শুধু রয়ে গেল। মায়ের সকল গহনাদিও বিক্রি করতে হয়েছে। মায়ের মনে এই জন্য একটুও ব্যথা লাগেনি। তার সকল ব্যথা কেবল বাবার চলে যাওয়ার জন্যই।

আত্মীয় স্বজন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সেদিনই যেদিন জানতে পেরেছে বাবা একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। আমাদের বাসায় সবারই যাতায়াতের পরিমাণ কমতে শুরু করলো। একসময় কেবল আপন বলতে নিজেরাই রয়ে গেলাম৷ চারিদিক থেকে টাকা পরিশোধের চাপ আসতে লাগলে বাবার মধ্যেরাতে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়। পাশে দাঁড়ানোর মত একটা মানুষকেও খুঁজে পাওয়া গেল না।

কষ্ট’টা গাঢ় হলো যেদিন থেকে অয়নের দূরে সরে যাওয়াটা টের পেতে লাগলাম। বাবা মারা গেল, একটা বার অয়ন সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যও সামনে এলো না। ফোনে দুই মিনিট কথা বলে সেই যে রেখে দিল তারপর থেকেই বুঝতে পারলাম এ ভাঙ্গন ইচ্ছেকৃত। তবুও ঘটনা সম্বন্ধে পরিষ্কার হওয়ার জন্য অয়নকে একবারের জন্য ডাকলাম।

অয়ন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানালো, ‘তৃষ্ণা, এখন আর আমার পরিবার তোমাকে কোনোভাবেই মেনে নিবে না। আর আমার পক্ষে আমার পরিবারকে অমূল্যায়ণ করা অসম্ভব। আমাদের উচিৎ আর যোগাযোগ না রাখা। তোমার জন্য শুভ কামনা রইলো।’

কাঁটার মত বিঁধল কথাগুলো। এতদিন আমি নই, আমার পরিবারের সামাজিক মর্যাদাটাই তাহলে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বুঝতে অসুবিধা হলো না। খুব কষ্ট হতে লাগলো এটা ভেবে যে, এতদিন একটা ছোটলোক’কে এতটা ভালোবেসে এসেছিলাম। নিজেকে সামলে সেদিন হাসি মুখে বিদায় নিলেও বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল। সেই অনুভূতিটা ঠিক বোঝানোর মত নয়।

এদিকে মা ভীষণ ভেঙ্গে পড়লেন আগত অন্ধকারের কথা ভেবে। ছোট ভাইবোন দু’টোর দিকে তাকানো যায় না। অভাবটা যেন ওদের মস্তিষ্ককেও ছেয়ে ফেলেছে।

আজকাল স্নাতক পাশ ছাড়া কোনো চাকুরীতে আবেদন’ই করা যায় না। আর করা গেলেও তা হবার নিশ্চয়তা শূন্যের কোটায়। আমার স্নাতক পাশ হতে এখনও দু’বছর বাকি৷ মাথায় পরিবারের ভার। মায়ের মুখের দিকেও আর তাকানো যায় না। সান্ত্বনা দিয়ে দু’একটা কথা বলার মত কথাও নেই আমার কাছে। ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ কমাতে সমস্ত প্রাইভেট টিচার বাদ দিয়ে নিজেই পড়ানো শুরু করলাম।

হন্য হয়ে টিউশন খুঁজতে খুঁজতে দিন কাটতে লাগলো। বর্তমান যুগটাতে বেকারের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে পড়তে চাই’র সংখ্যা থেকে পড়াতে চাই’র সংখ্যা বেশি৷ অনেক কষ্টে দু’টো টিউশনির ব্যবস্থা হলো। এই বাজারে আট হাজার টাকায় চারজনের সংসার চলা খুব কষ্টের। মাসের ত্রিশ দিন খাবারের তালিকায় ডালের পাশাপাশি আলুভর্তা নাহয় আলুভাজি কখনওবা ডাল আলু মিক্স থাকে। ছোট ভাইটা খানিকক্ষণ কান্নাকাটি করে খিদে সামলাতে ঠিকই খেয়ে নেয়। বোনটা প্রশ্ন করে না কোনো, চুপচাপ খেয়ে ওঠে। বোঝার মত বুদ্ধি আছে ওর।

রোজ যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘এভাবে আর কতদিন?’

আমি হাসিমুখে উত্তর দেই, ‘ধৈর্য ধরো। শীঘ্রই সুদিন আসবে বলেই এত মেঘের ঘনঘটা।’

অয়নের খোঁজ খবর আর রাখি নি। যেদিন সম্পর্কটার ইতি টেনেছি, সেদিনই চোখের জল মুছে সব কষ্ট ডুবিয়ে দিয়েছি ব্যস্ততায়। সামনের অন্ধকার তাড়াতে গিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে উঠলাম যে মনে করার আর সময় কই!

ভার্সিটির এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায়’ই একটা কোচিং সেন্টারে পড়ানোর সুযোগ মিললো। খবরটা আমার জন্য একজন বেকারের চাকুরি পাওয়ার মত আনন্দ নিয়ে আসলো।

টিউশনির পাশাপাশি কোচিং-এ ক্লাস, মাস গেলে বেশ ভালো একটা টাকার পরিমাণ হাতে আসে। ডাল, আলুর সঙ্গে মাঝে মধ্যে মাছ, গোশতও খাওয়া জোটে। কিন্তু স্থায়ী ভালো থাকার জন্য আমার স্থায়ী কিছু করা চাই।

বুদ্ধি দিয়ে সহযোগিতা করলো এক বান্ধবী। আনাইলের এই যুগে অনলাইন ভিত্তিক কিছু একটা করা যেতে পারে। চেষ্টা প্রখর হলে সফল হওয়ার নিশ্চয়তা আছে৷ ওর বুদ্ধিটা মস্তিষ্কে আঁটকে রইলো। অনেক ভেবে বার করলাম, অন্যসব ব্যাবসা করার মত এত পুঁজি আমার নেই। কিছু করতে হলে রান্না নিয়েই করতে হবে। মা’কে পাশে পাওয়া যাবে।

বোঝার পর থেকে মাকে রান্নায় টুকিটাকি সাহায্য করতাম। শখের বসে মাঝেমধ্যে এটা ওটা রান্না করেও ফেলতাম। বাবা খাবার টেবিলে সেদিন প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিতেন। মা ভীষণ ভালো রান্না জানতেন বলেই আমিও রান্নায় বেশ পারদর্শী হয়ে উঠলাম।

অয়নের জন্য প্রায় দিন’ই বক্স ভর্তি ওর পছন্দের সব খাবার রেঁধে নিয়ে যেতাম। ও তৃপ্তি সহকারে খেত আর প্রশংসায় ভাসিয়ে দিত আমায়। আমি খুশিতে গদগদ হয়ে উঠতাম।

অনলাইনের এই ব্যাবসার কথাটা মাকে বললে মা আশংকাযুক্ত চোখে তাকিয়ে বললো, ‘আমরা পারবো তো?’

আমি ভরষার হাসি হেসে বললাম, ‘এখন অব্দি কোথাও হেরে যেতে দেন নি তো উপরওয়ালা।’

মা আনন্দের অশ্রু চোখে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ, তুই’ই পারবি।’

আশেপাশের লোকজন সুযোগ পেলেই তাদের গল্পের আসরে আমাকে টেনে নিয়ে আসেন।
তাদের বুলি হলো, ‘বাপ মরে যাওয়ার পর মেয়েটা একদম নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে তো থাকেই না৷ রাত করে বাড়ি ফেরে। মা’টাও শাসন বারণ করে না৷ এসব করেই তো সংসার চালায়।’

কানে তুলি না তাদের কথা। নিজ থেকেই যেমন কথা রটিয়ে যাচ্ছে, একদিন সবাই তেমন নিজ থেকেই বুঝবেন আর লজ্জায় মুখটাকে আড়াল করে রাখতে চাইবেন। সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষাতে আছি।

ছোট ভাইটাকে পড়ানোর দায়িত্ব বোনটাকে দিয়েছি। ভার্সিটির ক্লাস, টিউশন আর কোচিং বাদে বাকি অবসর সময়টুকু রান্নার কাজে ঢেলে দিলাম।

অনলাইনের আমার পেজ’টার নাম দিয়েছি মায়ের পছন্দে ‘বাঙ্গালির ভোজ’। আমার বিশ্বাস একবার কেউ মুখে তুললে সে আবার খুঁজবেই।

প্রথমে তেমন একটা সাড়া না পেয়ে খুব মন খারাপ হয়ে এলো। পরে ফ্রী ডেলিভারি, মূল্য ছাড়, কম দামে বেশি খাবার এসব অফার দিতেই আস্তে আস্তে সাড়া পেতে লাগলাম।
ডেলিভারিতে একা কুলিয়ে উঠতে পারছি না বলে একজনকে সহযোগী হিসেবে যোগদান করালাম। রান্নার দিকটা মা বেশি সামলাম। বাকিটা আমার দায়িত্বে। দিন দিন ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। রুটিন মাফিক এই জীবনে অবসর বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। এখন শুধু সামনে এগিয়ে চলা, পিছন ফিরে তাকানোর একদম সময় নেই।

কয়েক মাসে বেশ পরিচিত হয়ে উঠলো আমার ‘বাঙ্গালির ভোজ’। ডেলিভারি বয় হিসেবে আরও দুইজনকে জোগাড় করলাম। আমাদের সঙ্গে রান্নায় ছোট বোনটাও টুকিটাকি সাহায্য করে। সবমিলিয়ে বেশ চলতে লাগলো, সুনাম ছড়াতে লাগলো পুরো শহরে। যখন কেউ প্রশংসা করে, তখন আমার আনন্দে চোখ জোড়া ভিজে আসে। ভেজা চোখ জুড়ে স্বপ্নেরা জেগে ওঠে। আমি সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার পথে হেঁটে চলছি দিনের পর দিন।

কেটে গেল কয়েকটা বছর। ছোট ভাইটা বড় হয়েছে। বুঝতে শিখেছে। ছোট বোনটা নিজেকে আমার মত একজন সফল স্বাবলম্বী ব্যক্তি হিসেবে দেখার চেষ্টায় এগিয়ে চলছে। ‘বাঙ্গালির ভোজ’ নামে এখন শহরে আমার তিনটে রেস্তোরাঁ। একতল বাড়িটা এখন চার তলে পরিনত হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করেছি, টিউশন কোচিং বাদ দিয়েছি। চাকুরির চেষ্টা করি নি কখনও। একজন সফল ব্যাবসায়ি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার যে স্বপ্ন চিন্তায় লালন করেছি, সে স্বপ্ন আজ সত্যি হয়েছে বলেই আমার মতো ভেঙ্গে পড়া পরিবারের কিছুটা সাহায্যে আসতে পারি। সফল নারী হিসেবে ‘অপরাজিতা’ হিসেবে সম্মান পেয়েছি বহু জায়গায়। তবুও স্বপ্ন দেখা থেমে নেই।

হার মেনে না নেওয়া, শূণ্য থেকে শিখরে আসা, সফল হওয়া নারীদের নিয়ে টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আমি তেমনই একটা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে টেলিভিশন কেন্দ্রে উপস্থিত হলাম। এরকম জায়গায় এর আগে কখনও উপস্থিত হই নি বলে বেশ স্নায়ুচাপ অনুভব হচ্ছে। একটু বসা দরকার সাথে এক গ্লাস পানিও। ঠিক এমন সময় এক ভদ্রলোকের স্বর কানে এলো। বুঝতেই পারলাম না কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

‘ম্যাম, অপরাজিতা শো শুরু হতে এখনও ত্রিশ মিনিট বাকি। আপনাকে দয়া করে অপেক্ষা করতে হবে। আপনি আমার সঙ্গে আসুন, আমি আপনাকে বসার জায়গায় নিয়ে যাব।’

কন্ঠস্বরটা বেশ পরিচিত। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি মুখটাও পরিচিত। বিড়বিড় করে বললাম, ‘অয়ন।’

অয়নের চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে বোঝাই গেল এতক্ষণ আমাকে ঠিক সেও চিনতে পারে নি।
অয়ন কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় আমি বললাম, ‘চলুন।’

শো শেষ হলো টেলিভিশন কেন্দ্র থেকে আমি বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই অয়ন পিছু ডাকলো। থেমে দাঁড়াই।

‘তৃষ্ণা, তোমায় কিছু বলার ছিল।’
‘বলো।’
‘আমি খুব দুঃখিত। তৃষ্ণা আমি …………… ‘
অয়নকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমার জরুরী কাজ আছে অয়ন। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। আমি আসি।’

বলেই দ্রুত পা চালালাম। আজ আমার হাতে কোনোই কাজ নেই। তবে অয়নকে দেওয়ার মত সময় আমার কাছে নেই। আমার পাশে আজ একজন সফল মানুষ আছেন। যিনি শূণ্য থেকে নিজেকে আজ শিখরে তুলে এনেছেন৷ যিনি আমার অর্জনটার থেকেও আমার ভেতরটাকে বেশি ভালোবাসেন। তার অনুপ্রেরণায়’ই আমি সফলতার এই প্রান্তে থেমে থাকতে চাইনা, আরও উপরে উঠার স্বপ্ন দেখার সাহস পাই। সে আমাকে সম্মান দিয়ে ডাক পাড়ে ‘অপরাজিতা’।