বাংলা কথাসাহিত্য ধারায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬-১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) এর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রখ্যাত এই বাঙালি সাহিত্যিক হলেন বাংলা সাহিত্যে অমর কথাশিল্পী। তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি পাঠকের কাছে অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হন। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে বাংলা উপন্যাস তুমুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর জনপ্রিয়তম উপন্যাসিক হয়ে ওঠেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সমকালিন সময়ে ব্রাহ্মণ শাসিত এবং জমিদার শাসিত বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ কেমন ছিলেন তার নিখুঁত বর্ণনা আমরা তাঁর লেখায় খুঁজে পাই। সমাজের সাধারণ মানুষই তাঁর রচনার নায়ক-নায়িকা। তাঁর জীবন অনুসন্ধানী দৃষ্টি আমাদের আকর্ষণ করে। গল্পের কাহিনি পাঠককে একাগ্র করে তোলে। নারী চরিত্র নির্মাণে তিনি যে নির্মাণ শৈলির পরিচয় দিয়েছেন তা স্মরণীয়। প্রেমের বিশ্লেষণ, আচার-আচরণের বর্ণনা তাঁর রচনায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব।

শরৎচন্দ্রের সমস্ত উপন্যাস ও ছোট গল্পগুলিকে প্রধানত পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তত্ত্বমূলক- এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করলেও তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসের কেন্দ্রভূমিতে বিরাজমান রয়েছে বাঙালির সমাজ সম্পর্কে এক বিরাট জিজ্ঞাসা এবং বাঙালির মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ জীবনের রূপায়ণ। সমাজের বাস্তব অবস্থা, নরনারীর জীবনভঙ্গিমা ও জীবনবোধকে নিয়ন্ত্রিত করে তাদের মানসলোকে যে সূক্ষè জটিল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে-শরৎসাহিত্যে আমরা তারই সার্থক রূপায়ণ দেখতে পাই। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের দুঃখ-বেদনার এতবড় কাব্যকার ইতোপূর্বে দেখিনি আমরা। মূঢ়তায় আচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থার নিষ্ঠুর শাসনে লাঞ্চিত নরনারীর অশ্রুসিক্ত জীবনকথা অবলম্বন করে মানবদরদী শরৎচন্দ্র গদ্যবাহিত যে কতগুলি উৎকৃষ্ট ট্রাজেটি রচনা করেছেন তাতে বাংলা সমাজের বহুচিত্রিত এক আলেখ্য উম্মোচিত হয়েছে আমাদের সামনে। মূলত তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যের যে মানবতাবাদের মূলসূর তারই রূপায়ণ ঘটিয়েছেন তাঁর গল্প-উপন্যাসে। ওয়াল্ট হুইটম্যানের মতো তিনিও পতিতাকে মানব মহিমার আদর্শোজ্জ্বল দাবিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়’-বাইবেলের এ পবিত্র বাণীই শরৎ সাহিত্যে আদর্শ হয়ে উঠেছে। আরও বলা যায় রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’, ‘নষ্টনীড়’ প্রভৃতি রচনা যে সমাজ সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে শরৎচন্দ্রের হাতে তারই বিকাশ ঘটেছে। মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস সৃষ্টির যে বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের হাতে পরিদৃষ্ট হয়, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মধ্যেই তারই অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির সার্থক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্টিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাসের পথরেখা ছেড়ে যখন তিনি বর্তমানের সমস্যা জর্জরিত জীবনের সমতলে এসে দাঁড়ালেন, বলতে গেলে তখন থেকেই শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ল। অবশ্য প্রত্যক্ষ জগত থেকে আহৃত উপাদানই যে কেবল উপন্যাসে তাঁর জনপ্রিয়তা এনেছে তা নয়, প্রেমের বিচিত্র রহস্য উদঘাটনেও তিনি যথেষ্ট পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন।

সামাজিক, আত্মজীবনীমূলক, রাজনৈতিক, বিতর্কমূলক ইত্যাদি শ্রেণিভিত্তিক উপন্যাস রচনা করে তিনি অপ্রতিদ্বন্দী জনপ্রিয়তার শীর্ষ অবস্থান করেছেন। সামাজিক উপন্যাসগুলির মধ্যে বড়দিদি (১৯১৩), বিরাজ বৌ (১৯১৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), চন্দ্রনাথ (১৯১৬), দেবদাস (১৯১৭), দত্ত (১৯১৮), বামুনের মেয়ে (১৯২০), দেনাপাওনা (১৯২৩), নববিধান (১৯২৩), বিপ্রদাস (১৯৩৫) উল্লেখযোগ্য। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসগুলির মধ্যে শ্রীকান্ত ১ম পর্ব (১৯১৭), শ্রীকান্ত ২য় পর্ব (১৯১৮), শ্রীকান্ত ৩য় পর্ব (১৯২৭), শ্রীকান্ত ১ম পর্ব (১৯৩৩)। বিতর্কমূলক উপন্যাসের মধ্যে চরিত্রহীন (১৯১৭), গৃহদাহ (১৯২০), শেষপ্রশ্ন (১৯৩১)।

পথের দাবী (১৯২৬) তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাস। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলির মধ্যে প্রেম, সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা, গ্রামীণ জীবনের সমস্যাবলি, পারিবারিক জীবন, সর্বোপরি ব্রাহ্মণ শাসিত এবং জমিদার শাসিত সাধারণ মানুষের জীবন-যাত্রা মনো-দৈহিক চিত্রের নিখুঁত বর্ণনা আমরা দেখতে পাই। তাঁর ‘চন্দ্রনাথ’ উপন্যাসে জমিদার পুত্র চন্দ্রনাথের প্রেম ও বিধবা সমস্যা প্রাধান্য পেয়েছে। ‘পল্লী সমাজে’ গ্রামীণ সমস্যা ও প্রেম প্রাধান্য পেয়েছে। ‘দেনাপাওনায়’ জমিদারের শোষণ-অত্যাচার ও পারিবারিক জীবনের চিত্র দেখা যায়। ‘চরিত্রহীনে’ প্রচলিত সমাজের প্রতি তীব্র শ্লেষ ও বিদ্বেষ ফুটে ওঠেছে। ‘দেবদাসে’ প্রেম-বিরহ, বিবাহ, প্রতিতা অনুরক্তির মতো বিষয়গুলি উঠে এসেছে। ‘পথের দাবীতে’ ঔপন্যাসিকের রাজনৈতিক দাবি ও ইচ্ছার বিষয়টি পরিস্কার হয়েছে। ‘শেষ প্রশ্নে’ রাজনৈতিক সমস্যা ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বড় করে দেখানো হয়েছে। এছাড়াও প্রেম, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, ধর্ম সংস্কার প্রভৃতির উপর লেখক প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রেমাঙ্কুর আতর্থি শরৎচন্দ্রের ‘দেনাপাওনাকে’ চলচ্চিত্রে রূপদান করেছেন। প্রেমথেশ বড়ৃয়া পরিচালিত তাঁর ‘দেবদাস’ উপন্যাসটি ১৯৩৫ সালে বাংলা ও হিন্দিতে চলচ্চিত্রাকারে মুক্তিলাভ করে। এছাড়া তাঁর শ্রীকান্ত ও পরিণীতা উপন্যাস নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর ‘শুভদা’ উপন্যাস (১৯৩৯) প্রকাশিত হয়।

কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর লেখা ছোটগল্পগুলিতেও। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প ‘মন্দির পরিণীতা (১৯১৪), বিন্দুর ছেলে (১৯১৪), মেজদিদি (১৯১৫), বৈকূন্ঠের উইল (১৯১৬), অরক্ষণীয়া (১৯১৬), নিস্কৃতি (১৯১৭), কাশীনাথ (১৯১৭), স্বামী (১৯১৮), ছবি (১৯২০), হরিলক্ষী (১৯২৬), অনুরাধা (১৯৩৪), সতী (১৯৩৪), পরেশ (১৯৩৪), মহেশ (১৯২৩) প্রভৃতি। শরৎচন্দ্রের গল্পগুলির মধ্যেও প্রেম, সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা, গ্রামীণ জীবনের সমস্যাবলি, পারিবারিক জীবন, সর্বোপরি ব্রাহ্মণ শাসিত এবং জমিদার শাসিত সাধারণ মানুষের জীবন-যাত্রা মনো-দৈহিক চিত্রের নিখুঁত বর্ণনা আমরা দেখতে পাই।

প্রবন্ধ সাহিত্যেও শরৎচন্দ্র সমান পারদর্শিতার সাক্ষর রেখেছেন। নারীর মূল্য (১৯২৩), তরুণের বিদ্রোহ (১৯২৯), স্বদেশ ও সাহিত্য (১৯৩২) প্রভৃতি প্রবন্ধগুলিতে তিনি সমকালিন সমাজের সামাজিক অবক্ষয়, সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা, মানুষের বিভিন্ন স্থূল বিশ্বাস, ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছনতা চিত্র তুলে ধরেছেন। এছাড়া শরৎচন্দ্র বেশ কিছু অনুবাদও করেছেন। ‘অনিলা দেবি’ ছদ্মনামে তিনি লেখালেখি করেছেন। নারীর মূল্য তাঁর এ ছদ্মনামে লেখা।

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বতম জ্যোতিস্ক হলেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যিনি তাঁর সীমিত কালখন্ড ও ভূমিখন্ডকে স্বচ্ছন্দে অতিক্রম করে এক যুগোত্তীর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন বাঙালি পাঠক সমাজে। তাঁর কালজয়ী খ্যাতি দেশের সীমাকে পরিলঙ্খন করে বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করে বিদেশী পাঠকদের মনকেও জয় করেছে।
সমগ্র উপমহাদেশে তিন চন্দ্রই কথাসাহিত্যের রজাত্ব করেন। বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র (১৮৭৬-১৯৩৮), হিন্দি সাহিত্যে প্রেমচন্দ্র (১৮৮০-১৯৩৬) ও উর্দু সাহিত্যে কৃষণচন্দ্রর (১৯১৩-১৯৭৮)। তিনজনই সমান জনপ্রিয়। ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় এবং রাজ্যভাষায় তাদের সাহিত্য অনূদিত হয়েছে। তাঁদের সাহিত্যমানও উঁচুদরের।
বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে শরৎচন্দ্র এমন একটি নতুন পথ ধরে অগ্রসর হয়েছেন যা বাংলা কথাসাহিত্যের পরিধিকে প্রসারিত করে দিয়ে তার মধ্যে এনেছে এক অদৃষ্টপূর্ব বৈচিত্র্য। সংবেদনশীল হৃদয়, ব্যাপক জীবনজিজ্ঞাসা, প্রখর পর্যবেক্ষণশক্তি, সংস্কারমুক্ত স্বাধীন মনোভূঙ্গি প্রভৃতি গুণে শরৎ সাহিত্য লাভ করেছে এক অনন্যসাধারণ বিশিষ্টতা যা পরবর্তীকালের বাংলা সাহেত্যের গতি-প্রকৃতিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

জনপ্রিয়তা বা পাঠকপ্রিয়তা প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসটিকে পৃথিবীব্যাপী সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিক্রি হয়েছে এই বইটি। শেক্সপিয়রের ‘রোমিও ও জুলিয়েট, ম্যাকবেথ, হেমলেট’ এর তুলনা মেলা ভার। জেন অস্টিন এর ‘সেন্স এন্ড সেন্সেবিলিটি’, দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম এন্ড পানিশম্যান্ট’, চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’, গার্বিয়েল গর্সিয়া মার্কজের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউট’, এর মতো শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ উপন্যাসটি দুনিয়া কাঁপানো জনপ্রিয় সাহিত্যের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা অবশ্যই সমীচিন হবে। তাঁর দেবদাস বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তার এক বিরল উদাহরণ। ভালোবাসা ও বেদনার আবেগের দিক থেকে এমন গল্প বিরল। যদিও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা’, তারাশঙ্করের ‘কবি’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’র মতো আরো অনেক উপন্যাস সমকালিন বা তার উত্তরকালেও তেমনিই জনপ্রিয়। এরপরও রবীন্দ্রযুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের জনপ্রিয়তা সে যুগের মতো এ যুগেও এমনভাবে বহমান যে, ভারতীয় প্রায় সব ভাষায় সেগুলি অনূদিত, এমনকি চলচ্চিত্র ও মঞ্চনাটকেও রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর রচনায় বাঙালির নিত্যদিনের সুখদুঃময় জীবনযাত্রা, বাংলার পল্লীসমাজ ও সর্বোপরি বাংলার নারীচরিত্র অপরূপ মাধুর্যে ফুটে ওঠেছে। সমাজের অন্যায়-অবিচার ও দুর্বলতা তিনি তীক্ষè ও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। ভাষার আবেগ সঞ্চারে এবং বাংলা গদ্যের ক্রম বিকাশে শরৎচন্দ্রের অবদান নজিরবিহীন। সামাজিক সংস্কার ও নীতিবোধের প্রশ্নকেই তিনি তাঁর উপন্যাসের উপজীব্য রূপে তুলে ধরেছেন। বাংলা সাহিত্যের তুমুল জনপ্রিয়তম এ কথাসাহিত্যিক ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মা ভুবনমোহনী দেবী। কৈশোর ও যৌবনের অধিকাংশ সময় শরৎচন্দ্র কাটিয়েছেন মাতুলালয়ে। শরৎচন্দ্রের পাঁচ বছর বয়সে তাঁর বাবা তাঁকে দেবানন্দপুরে প্যারী পন্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করেন। দু-তিন বছর শিক্ষালাভের পর তাঁর মামা তাঁকে ভাগলপুর শহরে দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয়ে ছাত্রবৃত্তিতে ভর্তি করেন। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্র ভাগলপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে মতিলালের ডিহিরির চাকরি চলে গেলে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে দেবানন্দপুরে ফিরে গেলে শরৎচন্দ্র জেলা স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এ সময় তিনি হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে স্কুলের ফি দিতে না পারায় ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে এই বিদ্যালয়ও ত্যাগ করতে হয়। এ সময় তিনি ‘কাশীনাথ’ ও ‘ব্রহ্মদৈত’ নামে দুটি গল্প লেখেন। তিনি তেজনারায়ন জুবিলি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রাস পাশ করে এফ এ ক্লাসে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।

রেঙ্গুনে (১৯০৩-১৯০৬) বর্তমানে মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে থাকাকালিন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতী পত্রিকায় তাঁর উপন্যাস ‘বড়দিদি’ প্রকাশিত হয়। এটি বেশ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। অবশ্যই ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে রেঙ্গুন যাওয়ার দু-একদিন আগে তিনি কলকাতার বৌবাজরে তাঁর গিরিন মামার সাথে দেখা করতে যান। সেখানে গিরিন মামার অনুরোধে গল্প লিখে কুন্তলীন প্রতিযোগিতায় পাঠিয়েছিলেন। মন্দির নামের গল্পটিতে তিনি তাঁর নিজের নাম না দিয়ে দিয়েছিলেন গিরিন মামার আরেক ভাই সুরেন মামার নাম। দেড়শ গল্পের মধ্যে ‘মন্দির’ সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়েছিল। রেঙ্গুনে শরৎচন্দ্র শহরের উপকন্ঠে বোটাটং-পোজনডং অঞ্চলে থাকার সময় মিস্ত্রীদের সাথে অবাধে মেলামেশা করতেন। সেখানে তিনি শান্তি দেবীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের একটি পুত্র সন্তানও হয়েছিল। কিন্তু পুত্রের এক বছর বয়সের সময় প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে শান্তি দেবী ও শিশু পুত্র উভয়েরই মৃত্যু হয়। পরে তিনি রেঙ্গুনেই হিরন্ময়ী দেবীকে বিবাহ করেন। হিরন্ময়ী দেবী নিঃসন্তান ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সাথেই তিনি সুখে শান্তিতে কাটিয়েছেন।

শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে চাকরি করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা, গান-বাজনা এবং সাহিত্য চর্চাও করতেন। মিস্ত্রী-পল্লীতে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর কাঠের বাড়ির নিচতলায় আগুন লাগে। আগুনে তাঁর কয়েকটি বইয়ের পান্ডুলিপি ও লাইব্রেরীসমেত বাসাটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সে বছর অক্টোবর মাসে তিনি এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। তখন তাঁর পরিচয় হয় যমুনা সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালের সাথে। তাঁর অনুরোধে রেঙ্গুনে গিয়ে তিনি তাঁর ‘রামের সুমতি’ গল্পটি পাঠিয়ে দেন। গল্পটি ১৩১৯ সালের ফাল্গুন ও চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত হলে শরৎচন্দ্র এক গল্প লিখেই একজন মহা শক্তিশালী লেখক হিসেবে সাহিত্যিক ও পাঠক মঙ্গলে পরিচিত হন। ইতোপূর্বে ১৩১৪ সালে ভারতী পত্রিকায় শরৎচন্দ্রের ‘বড়দিদি’ প্রকাশিত হয়েছিল। সে গল্প পড়ে রবীন্দ্রনাথও তাঁকে প্রতিভাবান লেখক বলে বুঝেছিলেন। ‘রামের সুমতি’ প্রকাশিত হলে কতৃপক্ষের অনুরোধে তিনি ভারতবর্ষ এবং সাহিত্য প্রভৃতি প্রত্রিকায় লিখতে থাকেন। তখন ভারতবর্ষ পত্রিকার মালিক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স তাঁর বইও প্রকাশ করতে শুরু করেন। অবশ্য যমুনা-সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথই প্রথম তাঁর ‘বড়দিনি’ উপন্যাসটি প্রকাশ করেছিলেন।

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে শরৎচন্দ্র হঠাৎ দূরারোগ্য পা-ফোলা রোগে আক্রান্ত হন। তখন তিনি রেঙ্গুনের চাকরি ছেড়ে স্বস্ত্রীক দেশে চলে আসেন। হাওড়ায় থাকাকালিন শরৎচন্দ্র তাঁর বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাই ঐ সময়টাকে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের স্বর্ণযুগ বলা হয়। হাওড়ায় থাকাকালিনই শরৎচন্দ্রের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম-সাক্ষাত পরিচয় হয়। পরিচয় হয়েছিল জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বাড়িতেই বিচিত্রার আসরে। পরে বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি শান্তিনিকেতন ও জোড়াসাঁকোয় কবির কাছে গিয়েছেন। ঘনিষ্টতা বেড়েছিল। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্রকে ডি. লিট. উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। এর আগে কলকতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পদক উপহার দিয়েছিলেন। এসব ছাড়াও দেশবাসি তাঁকে ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ আখ্যায় বিভূষিত করেছিলেন। পাঠক নন্দিত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যকৃত ও পাকস্থলিতে ক্যান্সারের পীড়ায় ভোগছিলেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারির ১২ তারিখ তাঁর পেটে অপারেশন করা হয়েছিল। অপারেশনের মাত্র ৪ দিন পর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি অমর এ কথ্যাশিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।