কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্রী লোপা। যেমন সুন্দরী তেমন মেধাবী। এছাড়া কলেজের সবগুলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার দীপ্ত উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। নাচ, গান, বিতর্ক সব দিক দিয়ে এগিয়ে থাকাটাই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য। বন্ধু-বান্ধবীর অভাব নেই। কলেজের শিক্ষকরাও তাকে এক নামে চিনে এবং স্নেহ করে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেয়েটির চোখে চিন্তায় অনেক স্বপ্ন খেলা করে। এর মধ্যে একটি স্বপ্ন হলো-একজন নামিদামি উপস্থাপিকা হওয়া। পাশাপাশি টিভিতে একজন সফল সংবাদ পাঠিকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। এজন্যই মনে কোনো জড়তা না রেখে নিজস্ব পরিম-লের মধ্যে যেসব স্টেজ আছে, সেখানে নিজেকে মেলে ধরে সবার প্রশংসা কুড়িয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সে দিন দিন নিপুণ হয়ে উঠছে। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস সম্পন্ন মেয়েটি স্বপ্ন-পূরণের নেশায় যেন বদ্ধপরিকর।

কিন্তু সবার স্বপ্নই যে পূরণ হবে, এ ব্যাপারে পৃথিবীরতো কারও কাছে দায়বদ্ধতা নেই। লোপার এলাকার খুব মেধাবী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা বারেক সম্প্রতি বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছে। প্রায়ই সে লোপার প্রশংসা শুনতো বিভিন্ন জনের কাছে। একদিন এলাকারই এক স্টেজ ফাংশনে লোপাকে দেখে বারেক মুগ্ধ হয়ে যায়। তাই আর দেরি না করে সে লোপার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। লোপার পরিবারতো এমন সোনার ছেলে পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। তারা লোপার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু লোপা বেঁকে বসে। প্রথমত পড়াশুনা করা অবস্থায় সে বিয়ের চিন্তাই করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত বারেককে লোপার একেবারেই পছন্দ হয়নি। উচ্চতায় লোপার চেয়ে এক হাত খাটো তো হবেই, তার ওপর আবার গায়ের রং কুচকুচে কালো, মাথায় একটা মস্তবড় টাক। এই ছেলে যে কোন সাহসে লোপাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালো তা লোপার মাথাতেই আসছে না। লোপা যদি কখনো কোনো ছেলেকে নিয়ে ভেবেছে, তার চোখের সামনে একটা সুদর্শন, স্মার্ট ছেলে ভেসে উঠেছে, যে লোপাকে তার নিজের মতো করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা যোগাবে। পায়ে পা মিলিয়ে দুজন একসাথে চলবে। সে হবে গতানুগতিক ধারার বাইরের একজন মানুষ। সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে দেশ বিদেশে নিজেকে ছড়িয়ে দিবে। অন্যদিকে বারেক খুব গোড়া এবং রক্ষণশীল পরিবারের সংকীর্ণ মনমানসিকতাসম্পন্ন একজন মানুষ। বইয়ের বাইরে যে অবাধ সংস্কৃতিময় একটা জীবন আছে তা তার বোধেই আসে না। মনস্তাত্বিক উন্নয়নের জন্য প্রকৃতির বুকে এলিয়ে দিয়ে যে নিজেকে জানতে হয়, অন্যকে বুঝতে শিখতে হয়, তা তার অজানা। সে শুধু জানে ভালো রেজাল্ট করতে। তারপর, ভালো চাকরির সুবাদে বাড়ি, গাড়ি, সুন্দরী স্ত্রী নিয়ে সাধারণ নিয়মে দিন কাটানো। অন্যে কি চাইলো কিংবা অন্যের মন বোঝার মতো মানসিক বোধই তার নেই। এত কিছু ভাবার পর লোপার মতো একটা যুগোপযোগী মেয়ে কিছুতেই বারেকের মতো ছেলেকে মেনে নিতে চাইলো না।

এদিকে লোপার পরিবার মোটামুটি সচ্ছল। ভাই-বোন সবাই বিয়ে-শাদী করে যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। এখন সবাই চাচ্ছে লোপার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে মুক্ত হতে। তাই এরকম উঁচুদরের ছেলেকে তারা কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলো না। তাই সবাই তাকে বোঝাতে লাগলো-“এই ছেলে একদিন ডিসি, সচিব হবে। তুই চাকর-বাকর, শান-সৈকত নিয়ে রানীর মতো থাকবি। কত সম্মান, তাছাড়া আমরাও সবাইকে বলতে পারবো। সমাজে মান-সম্মান বাড়বে। আরে ছেলে মানুষ দেখতে যাই হোক, নামেই বড়। আমরা চাই তুই সুখী হ। কিন্তু এসব কথা লোপার ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারলো না। লোপার এক কথা তার চাওয়া মতে, বারেকের কোনো কোয়ালিটিই নেই। তাই তাকে নিয়ে সে কোনোদিনও সুখী হতে পারবে না।

যাই হোক, এতকিছুর পরও পরিবারের চাপের মুখে, বাবা-মায়ের দিকে চেয়ে লোপার মতের বিরুদ্ধে এক রকম জোর করেই লোপার সাথে বারেকের বিয়ে হয়ে গেলো। লোপার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেলো। সে এতটাই দুঃখ পেলো যে সে একেবারে স্তব্ধ, নীরব হয়ে গেলো। যে উচ্ছলতা আর প্রাণ-চাঞ্চল্য তার মধ্যে সদা বিরাজমান ছিল তা হঠাৎ করেই থেমে গেলো। এ যেন অন্য লোপা। বাবার বাড়ি থেকে কেউ আসলে, তাদের সাথে আর আগের মতো প্রাণবন্তভাবে আন্তরিকতার সাথে মিশতে পারে না। বিয়ের পর মাসখানেক কলেজে গিয়েছিল। পরে ইচ্ছে করেই পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়। তার আরোপিত স্বামীরও তাই ইচ্ছে ছিল। বারেক সাহেবের কথা হচ্ছে বিয়ের আগে সে কলেজের বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতো ঠিক আছে, তবে বিয়ের পর অবশ্যই তাকে পুরোপুরি সংসারীমনা হতে হবে। আর যেহেতু স্ত্রীকে দিয়ে চাকরি করাবে না, তাই অত পড়াশুনারও দরকার নেই। লোপা তার স্বামীর সব কথাই মেনে নিচ্ছে। কোনো প্রতিবাদই করছে না। এটা তার স্বামীর জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। বারেক সাহেব মনে মনে লোপার ব্যাপারে বেশ তৃপ্ত হলেন।

এদিকে লোপার ভেতরটা যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এটা তার স্বামীধনের বোঝা বড়ই দুঃসাধ্য। পানির মাছ ডাঙায় আনলে যা হয় লোপার অবস্থাও অনেকটা তাই। সে না পাচ্ছে মানসিক প্রশান্তি, না পাচ্ছে দৈহিক তৃপ্তি। নেগেটিভ হরমোনের প্রভাব দিন দিন তাকে আরো আচ্ছন্ন করে তুলছে। এতে করে তার মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা বাসা বাঁধছে।

বিয়ের পর লোপা তার স্বামীর সাথে কোথাও বেড়াতে যায়নি। বগুড়া পোস্টিং হওয়ার কারণে সেই যে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছে চার মাসের মধ্যে আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। ঈদের ছটিতে দুজন বাসে করে একসাথে পাশাপাশি সিটে বসে বাড়ি যাচ্ছিল। হঠাৎ লোপা লক্ষ্য করলো তার সিটের আশেপাশের যাত্রীরা একবার তার দিকে, একবার তার স্বামীর দিকে তাকাচ্ছে। লোপার বুঝার আর বাকি রইল না যে ওদেরকে খুব বেমানান লাগছে। লোকজন এ নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলো। একজন বলেই ফেলল-“মেয়েরা যে এত লোভী হয়, তা আজ নিজের চোখে দেখলাম।” এ কথা শুনে লোপার এত কষ্ট হচ্ছিল যে, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল আর সবাইকে বলতে ইচ্ছে করছিল যে, “সবাই বিশ্বাস করো আমি এমন জীবন চাইনি। আমি খুব দুঃখী! খুব দুঃখী একটা মেয়ে!” বারেক সাহেবের এসবে কিছু যায় আসে না। সে শুধু জানে সে একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা। তার ক্ষমতা আছে বলেই তার এত সুন্দরী স্ত্রী আছে। এতে অনেকের হিংসা লাগতেই পারে। এটা সে নিজের কৃতিত্ব হিসেবে নিলো।

তারা কুমিল্লা এসে পৌঁছলো। লোপা দ্রুত বাস থেকে নেমে একটা রিকসা নিয়ে একাই তার শ্বশুরের বাসায় চলে গেলো। প্রচ- অভিমানের বশে সে তার বাবার বাসায় গেল না। ঈদের পুরো ছুটিটা ঘরে বসেই কাটালো। ইচ্ছে করেই শপিং এ গেলো না। শ্বশুরবাড়ির লোকদের সাথে খুবই শীতল আচরণ করলো। বারেক সাহেবের সাথে লোপা বিয়ের পরও ফ্রি হতে পারেনি। অনেকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও সে তাকে আপনি আপনি সম্বোধন করে। কুমিল্লা আসার পর লোপা তার সাথে কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা বারবার নিমন্ত্রণ করলেও কারো বাড়ি যায়নি। ঈদের ছুটি শেষ হলে তারা বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। এবারও যাওয়ার সময় লোপা ইচ্ছে করেই স্বামীর পাশের সিটে না বসে অন্য সিটে বসলো। বারেক সাহেব এর কারণ জিজ্ঞেস করলে লোপা একদম চুপচাপ রইল। বগুড়ার বাসায় আসার পর লোপার স্বামী তাকে চার্জ করে কললো-“তুমি আমার সাথে এরকম আচরণ না করলেও পারতে। আফটার অল, আমি তোমার স্বামী।” লোপা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না-একটু শীতল গলায়ই বললোÑ“আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে কতটা মানতে পেরেছি সেটাও আপনার ভাবা উচিত। আপনার ইচ্ছে হয়েছে আমাকে বিয়ে করেছেন, আমিও আমার ইচ্ছায় চলব। বিয়ের আগে আপনি নিশ্চয়ই জানতেন বিয়েতে আমার মত নেই। সেটা আপনি কেয়ার করেননি, আপনার পজিশনের জোরে। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমার কাছে এসবের কোনো মূল্য নাই। আমি একটা সহজ-সরল স্বতঃস্ফুর্ত জীবন চেয়েছি, সেটা আপনার জন্য হলো না। বরং আমি দিন দিন সামাজিকতার বাইরে চলে যাচ্ছি। এতে আপনি আমাকে দোষারোপ করতে পারেন না।

লোপার স্বামী এবার একটু নরম হলো। কিন্তু নিজের বাহাদুরি বজায় রাখার জন্য বললো-“আমি তো তোমাকে জোর করে বিয়ে করিনি। বিয়ের সময় তোমাদের বাড়ির লোকজন সবাইকে তো অনেক খুশিই দেখলাম।”

একথা শুনে লোপা বেশ খানিকক্ষণ হাসলো। তার হাসিতে ছিল অনেক ক্ষোভ আর দুঃখ যেটা বেশ উপহাসের মতো শোনালো। তারপর বললো-“আমাকেও কি মহাখুশি মনে হয়েছিল। বিয়ের আগেই আমি আপনাকে ফোনে বলেছিলাম আমার ইচ্ছার কথা। আর এখন এসব কথা শোনাচ্ছেন। আপনার বোঝা উচিত ছিল কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করা ঠিক না। এখন আমার আচরণ আপনার সহ্য করা উচিত।”

লোপার স্বামী এরপর আর বাড়াবাড়ি করলো না। সে লোপার ইচ্ছেনুযায়ী চলতে লাগলো। সে ভাবলো সময়মতো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু লোপার মাঝে যে না পাওয়ার যন্ত্রণা তৈরি হয়েছে, সেটা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। বাস্তবতার সাথে শরীর, মন কোনোটারই খাপ খাওয়াতে পারছে না।

একদিন লোপার স্বামী তাকে অফিসার্স ক্লাবের পার্টিতে যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করলো। সবাই তার স্ত্রীকে দেখতে চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত লোপা সেখানে গেলো। সমস্ত পার্টি যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠলো লোপার উপস্থিতিতে। সবাই তাকে বেশ ভালোভাবে গ্রহণ করলো। পার্টিতে সে ইচ্ছে করেই একটা গান গাইলো। সবাই খুব প্রশংসা করায় অহঙ্কারে বারেক সাহেবের পা মাটিতে পড়ে না। এই প্রথম লোপাকে সবার সাথে হাসতে দেখে তার মনে হলো লোপা বোধ হয় ঠিক হয়ে গেছে। রাতে বাসায় ফিরে লোপাকে কাছে টানতে চাইলো। কিন্তু লোপা তাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখান করলো। এভাবে দিনকে দিন তার মধ্যে প্রচ- ক্ষোভের হরমোন নিঃসৃত হতে থাকে। নিজের স্বামীকে অসহ্য লাগতে শুরু করে। বারবার একটা কথাই মনে হতে থাকে তা হলো বারেক সাহেব তার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। তাই তাকে সে ক্ষমা করতে পারছে না। মাঝে মাঝে তাকে দেখলে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। তার সামনে বেশিক্ষণ থাকলে মেজাজ খারাপ করে বিভিন্ন জিনিস ছুঁড়ে মারে আর সামনে থেকে চলে যেতে বলে। ফলে দুজনের রুম আলাদা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে চিৎকার করে ওঠে আর বলতে থাকে “আমি তো এমন চাইনি। আমার কেন এমন হলো।”

লোপার স্বামী অনেক ভেবেচিন্তে তাকে মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলো। কারণ সে দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই নেওয়া গেল না। তাই ডাক্তারই বাসায় আসলো। তাকে দেখে বুঝলো-সে যা হতে চেয়েছিল তা হতে না পেরে তার মধ্যে এক ধরণের হতাশার জন্ম নেয় এবং অবচেতন মনে সারাক্ষণ তাই নিয়ে ভাবতে থাকে। যখন সে তার এই ভাবনার সাথে বাস্তবের মিল খুঁজে পায় না তখনি তার পাগলামি বেড়ে যায় এবং মনে হয় তার স্বামীই এর জন্য দায়ী। তাই প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে সে তার স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে। এই বলে ডাক্তার তাকে কিছু ইনজেকশন আর ঘুমের ঔষধ প্রেসক্রাইব করে। কিন্তু তার স্বামী তাকে ঔষধ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়। এভাবে চলতে চলতে এক সময় শোনা যায় গ্যাসের চুলায় আগুন ধরিয়ে লোপা তার মন ও শরীরের সমস্ত ব্যথা ও যন্ত্রণা একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে।