পৈষালি শীতের কাকডাকা ভোরে আজ আর জামিলার উঠতে ইচ্ছে করে না। রাতভর নেতানো কম্বলের জমাট ওমটুকু ধরে রাখতে গুটিসুটি মেরে পাশ ফিরে। বয়সী শরীরের বিষবেদনা কনকনে হিমঠান্ডায় উসকে ওঠে। এরমধ্যে বাসি এঁটোকাঁটা জড়ানো বাসনের গায়ে সাবান জলের ঠান্ডার কামড় বড়ই নিদারুন।

সকাল থেকে একমুহূর্তের অবসর নেই, দিনভর তাকে গনগনে আগুনের পাশেই থাকতে হয়। নদীর পাড় ঘেঁষে রেলস্টেশনের বারোযারী হোটেল। ট্রেনে কত মানুষ আসে, যায়! কেউ হোটেলে এসে বসে, খায়, বিশ্রাম নিয়ে চলে যায়, কেউ ষ্টেশনে নেমেই আপন গন্তব্যে ফিরে যায়।

জামিলার কাজ হোটেলের ভাত তরকারী রান্না করা আর সকালের এঁটো বাসনমাজা। কুটাবাছার জন্য পাশের বাড়ির হানুফা বেওয়া আসে। দিনভর জামিলার পাশেই থাকে, সন্ধ্যা পরে আর থাকে না। আপন ঠিকানায় ফিরে যায়। কেবল জামিলারই কোন ঠিকানা নেই। সকাল থেকে রাত, রাতের পর সকাল! ঋতুর পালাবদলের তোয়াক্কা ছাড়াই এটি এখন তার জীবনের সাথে জুড়ে গিয়েছে।

হোটেলমালিক দীদার মুন্সির বাড়িও পাশেই। দুই ছেলে, ছেলে বৌ, নাতী, নাতনী আর পরিবার নিয়ে তার সংসার। বড়ছেলে মাঝেমধ্যে হোটেলে আসে, ক্যাশে বসে, নজরদারী করে। বাপের অবর্তমানে মালিকানা বুঝে নেয়ার পাঠ আরকি। দীদার মুন্সির ভালোঘরের লক্ষীমন্ত একটা এতিম মেয়েমানুষের খুবই দরকার ছিলো্। রান্নার কাজতো আর যাকেতাকে দিয়ে হয়না। বছর বছর মানুষ বদলালে হোটেলের বদনাম, রান্নারও ক্ষতি। তার জহুরীর চোখ, বানের পানি নেমে যেতে না যেতে কত মানুষ এলো গেলো! কার কতক্ষতি হলো সে হিসাবে তার আগ্রহ ছিলোনা। তিনি খুঁজতেন সহায় সম্বলহীন দুখী মেয়েমানুষ। আপন অভিজ্ঞতায় মনে করতেন সর্বহারা দুখীরাই বিশ্বাসী হয়। জামিলার ক্ষতি একটু বেশী হওয়ায় তিনি তাকে নিয়ে দ্বিতীয়বার আর ভাবেননি। হোটেলের রান্নার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবে, এই অঙ্গীকারে তাকে আপন বাড়িতে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বারান্দার কোনে একটা ঘর জামিলা জন্য বরাদ্দ দেয়া নিয়ে স্ত্রী রাবেয়ার সাথে প্রায় যুদ্ধই বেধে গিয়েছিলো। একুশ, বাইশ বছরের মেয়েমানুষকে কেউকি আপন সংসারে ঠাঁই দেয়! দীদার মুন্সী স্ত্রীকে অনেক বুঝিয়েও সুবিধা করতে পারেনি। বৌয়ের সন্দেহ, নিত্যঝগড়ার প্যাঁচে দীদার মুন্সি হোটেলঘরেই জমিলার জায়গা করে দেন। রাত এগারোটার ট্রেন চলে গেলে জামিলার ছুটি, দীদার মুন্সিরও ঘরে ফেরা। স্টেশন চৌকিদার আজমল খাঁ জামিলাকে বুবুর চোখেই দেখতো। জামিলা দীদার মুন্সীকে চাচাই ডাকে। খুঁজে পাওয়া লতায়পাতায় চাচাশ্বশুর। তাইতো এই আশ্রয়টা জামিলা শতকষ্টেও হারাতে চায়না।আরও একটা আশায় জামিলা ষ্টেশনকেই আপন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। হাজার কাজের মাঝেও জামিলা রেলস্টেশনের মানুষের স্রোতে তার চেনামুখের তালাশ করে।

জfমিলা আলগোছে ঘুমের মাঝে হাতবাড়ায়। পাশের খালি জায়গায় হাত পরতেই তার বুকের মাঝে ছ্যাঁৎ করে ওঠে। আচমকা ঘুমের আবেশও ছুটে যায়। গত আটাশির বানের পর থেকেই তার পাশের জায়গাটা শূন্য। অপেক্ষার কানাগলির পথশেষ হয়, জামিলার বুকের মানিক ও ঘরের মানুষটার ফেরার পথ এইদীর্ঘ সময়েও খুঁজে পায়না।

গ্রামের তিনকানি জমির বসতভিটা, বাড়ির নামানে বকনা বাছুর নিয়ে দুধেল গরুর গোয়াল, লতানো শাকসবজির মাচাংএর পাশে হাঁস-মুরগী নিয়ে জামিলার সংসারে সুখ, আল্হাদ থৈথৈ করে। বছর না ঘুরতেই কোলজুড়ে আসে আসমানের চাঁদ, জামিলা সোহাগ করে নাম রাখে আদুরী। আদুরীর বাপ হেলালুর রহমান ডাকে ময়না। পায়ে পায়ে পথ বাড়ার মতোই বাড়ে ময়না।বাড়ে সংসারের আয় উন্নতি।

জামিলার কপালে এইসুখ বেশীদিন সইলো না। আটাশির বানের পানি দেখতে না দেখতে বাড়ির চারপাশে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলো। গ্রামের মানুষজন নৌকা, তালগাছের ডোঙা, কলার ভেলায়, যে যেমন পারলো আশেপাশে সরতে গেলো। হেলালুর রহমানও গ্রামের অন্যদের সাথে গরু, বাছুর মালসামান যতোটা পারে নিয়ে নদীপাড়ের রেলস্টেশনের উপর আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা করতে গেলো। প্রতিবেশীদের পরামর্শে জামিলা বাপের সাথে ময়নাকেও পাঠালো। বছর পাঁচেক মেয়েকে এই দুর্যোগ থেকে বাপের সাথে পাঠিয়ে নিজে যা পারে বাঁচার রসদ বাধতে থাকে। পলে পলে রাত গাঢ় হয়। জামিলা ঘরের মেঝেয় চৌকির উপরে টুল নিয়ে ঠাঁই বসে অপেক্ষা করে একটা সংবাদ পাওয়ার আশায়।

রাতের অন্ধকারে ঘরের মাঝে বানের জোয়ার যেনো আপন খেয়ালে খলবল করে বাড়তেই থাকে। বুকের উপর দিয়ে ঘোলাপানির ছলাৎ।