সান্টুর এখন সুদিন। অনেক ব্যবসা তার । তার ওপর দলের জেলা কমিটির পদে সমাসীন। আংগুল ফুলে কলাগাছ হতে তার বেশিদিন লাগবে না। হাজার মানুষকে গিললেও তাকে খারাপ বলবে না সমাজ। মমিন তার অফিসের সামান্য একজন কর্মচারী। একই ক্লাশে পড়েছে। রাত জেগে পড়ে করে কি করতে পেরেছে মমিন। টাকার অভাবে বেশিদূর গড়াতে পারেনি। চাকুরীর জন্য ইন্টারভিঊ দিয়ে দিয়ে হতাশ হয়েছে। এখন ও লাইনে পা ফেলতে শঙ্কা হয়। বিনা চিকিৎসায় বাবা মারা গেছে। বাবার জন্য কান্না ছাড়া কিছুই করতে পারেনি সে। তার সংসারের অবস্থা খুব খারাপ। কী করতে পারবে মমিন? চায়ের দোকানের ম্যাছিয়ার হওয়া তো সাজে না। রাখালের সাথে গরু চড়ানো। মাঠের কাজ অথবা লেবারী করাও বেমানান। একদিন সান্টুর সাথে দেখা হলে সে বললো,
‘কেমন আছিস সান্টু?’
‘ভালো আছি। তুই কেমন?’
‘আমার কথা ছাড়ো। বসে আছি। চাকুরী পাচ্ছিনা।’
‘চাকরী করবি?’
‘চাকরী করবোনা মানে?’
‘তাহলে চলো আমার সাথে।’
‘কি কাজ করতে হবে?’
‘আমার পেছনে থাকবি। মাস গেলে বেতন পাবি।’

মমিন কাজ করা শুরু করে। সান্টু জেলা কমিটির দপ্তর সম্পাদক। রুম ভাড়া নিয়ে পারসোনাল অফিস খুলেছে। অফিসের জাঁকজমক দেখলে মন ভরে যায়। কর্মকর্তা থেকে শুরু করে দলের লীডাররা আনাগোনা করে তার কাছে। ব্যবসা বাণিজ্য পার্টির কাজ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড সে অফিসে বসে পরিচালনা করে। মমিনের কাজ সান্টুর ফরমায়েস করা। আরো দু’জন লোক আছে সান্টুর। তারা মমিনকে সহযোগিতা করে। পার্টিতে অবস্থান মজবুত করার মানসে নিখুঁতভাবে কাজ করে সান্টু। সামনের নির্বাচনে তার টার্গেট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদ দখল করা। সে লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপে পথ হাঁটছে সান্টু। দিনের কাজ শেষ করে ঘনিষ্ঠ কর্মীদের নিয়ে সে গোপন বৈঠক করে। সে বৈঠকের উদ্দেশ্য নেতাদের কর্মকান্ড নিজস্ব দৃষ্টিকোন থেকে সমালোচনা করা। তাদের ত্রুটি স্পষ্ট করে তোলাও এ বৈঠকের মুল কাজ। অন্যের দোষ বের করতে সান্টুর জুড়ি নেই। গদগদ ভক্তির আড়ালে তার সুপ্ত কপটতা বিশ^াস করা যায়না।

দশটায় অফিসে বসে সান্টু। মমিনকে নয়টার আগে অফিস খুলতে হয়। বাড়িতে নাস্তা করে আসলেও চা সে অফিসে খায়। দু’পিচ দামী বিস্কুট খেয়ে সে চা মুখে দেয়। আগে পান খেতো না। এখন জর্দা মেশানো পানের রসে বেনসনের ধোঁয়া আস্বাদন করে। মমিনকে অফিস ঘষেমেজে ঝকঝকে করে রাখতে হয়। তার সাথের দু’জন সময়মত অফিসে আসেনা। সান্টু যদি দেখে তার অফিস নোংরা হয়ে আছে। তখন কি হবে। তাহলে কি সান্টু তাকে মাইনে দেবে। বন্ধু হলেও বুক কাঁপে মমিনের। সে এখন মনিব। মনিবের অবাধ্য সে হতে পারেনা। টেবিলের জিনিষপত্র সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে মমিন। চা গরম করে সামনে এগিয়ে দেয়। গর্বিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় সান্টু। গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,
‘ওরা আসেনি?’
‘কার কথা বলছো?’
‘বুঝতে পারছিস না? কম বুঝলে চলবে?’
‘একদম বুঝতে পারিনি। খুলে বলো।’
‘তোর সাথের ওরা কোথায়?’
‘তোমাকে বলবো ভাবছি। ওরা দেরীতে আসে।’
‘দেরীতে আসে?’
‘আমি বললে গায়ে লাগায় না।’
‘ঠিক আছে। আমাকে ফাঁকি দেয়া সহজ নয়।’

সান্টুর কাজ উপার্জনের পথ সুগম করা। তার কাছে খবর আছে বর্ডারে চোরাচালান হচ্ছে। ভারত থেকে দেদারছে গরু কাপড়চোপড় মোটর সাইকেল আর মসলা আসছে। মাল পাচারে সুযোগ দিয়ে হাবিলদাররা প্রচুর টাকা কামাচ্ছে। দূর্নীতি চলছে হাসপাতাল, মৎস্য এবং ইঞ্জিনিয়ার অফিসে। সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে সবখানে চলছে লুটপাট। সবাই সরকারী অর্থ মেরে খাচ্ছে। সে কি বসে বসে আংগুল চুষবে। সব জায়গা থেকে বখরা পাওয়ার উপায় বের করতে হবে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছাড়া চোরা রস বের করে আনা যাবেনা। কেউ সহজে টাকা দিয়ে দেবে এমনটা নয়। পুলিশকেও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়। আবার পুলিশকে সবকাজে ভাগ দিলে পোষাবে না। একটা আন্ডারগ্রাউন্ড চৌকস দল তৈরী করতে হবে তাকে। সবকিছু দেখভাল করা তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। সবকটা উপজেলা সমানতালে নিয়ন্ত্রণ করা বেশ টাফ হবে। এসব রিক্সি কাজ খুব সাবধানে করতে হয়। দেয়ালেরও কান আছে। জানাজানি হলে আগামীতে পার্টির নির্বাহী পদে স্থান নাও থাকতে পারে। পার্টির প্রভাবে ওপরে ওঠে যাচ্ছে সবাই। সে কেন পারবে না। অনুগত লোকদের কাজে লাগাতে পারলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এমন কায়দায় সবকিছু ষ্টিয়ারিং করতে হবে যাতে কেউ টের না পায়। কার নির্দেশে কি হচ্ছে ঘুনাক্ষরেও জানবেনা কেউ।
চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েস করে চা খায় সান্টু। মাথায় দারুণ প্লান আছে তার। রোড-হাইওয়ের টেন্ডারে সিডিউল জমা দিতে হবে। অন্য কেউ যাতে সিডিউল কিনতে না পারে তার ব্যবস্থাও করতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারকে কথা মানাতে সবকিছু করতে হবে শক্ত হাতে। গভীর রাতে গোপন সলা পরামর্শ হয়েছে। নিজেরাই সব সিডিউল কিনে বক্সে ড্রপ করবে তারা। কাজ হাতিয়ে তারপর কথা। পছন্দের লোকদের দিয়ে প্রচুর টাকা কামাই করবে। কানাই মগ্না পল্টু সজল আর দুর্জয়কে অফিসের চারপাশে মোতায়েন করেছে সান্টু। মজহার কুতুবকে নিয়ে ঢুকবে অফিসে। প্রয়োজনে ইঞ্জিনিয়ারকে আটক করে রাখবে। এসপি সাবের সাথে সম্পর্ক হয়েছে তার। ওনার কথাবার্তা পছন্দ হয়েছে সান্টুর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভদ্রলোককে সোচ্চার দেখা গেছে। এসব লোককে দিয়ে কাজ হয়। সান্টুও তার অপিনিয়ন বলে দিয়েছে। সরকারের স্লোগান দূর্ণীতিমুক্ত দেশ। বর্তমান প্রজন্মের কাজ সরকারের হাতকে শক্তিশালী করা। এসপি সাহেব তাকে আশ্বাস দিয়েছে। সব শুভ পদক্ষেপে তাকে সহযোগিতা করতে চেয়েছে।

শহরের সবখানে সান্টুর সমাদর। জিএস তাকে ডান হাত মনে করে। কেন্দ্রের অনেক নেতার সাথে তার যোগাযোগ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে পার্টির নমিনেশন দেয়া হতে পারে। তখন তো নির্বাচনী এলাকার সর্বময় ক্ষমতার মালিক হবেন তিনি। পার্টি নমিনেশন দিলেও নির্বাচনের ব্যয় তাকেই বহন করতে হবে। সংসদ নির্বাচন সহজ কথা নয়। কাড়ি কাড়ি টাকা আর জনশক্তি দরকার। ব্যয় না করলে জনশক্তি হাওয়ায় উড়ে আসেনা। এতদিনের অভিজ্ঞতায় সে বুঝতে পেরেছে টাকা ছাড়া কর্মীরা কদম ফেলতে রাজি নয়। বনের পশুকে যেমন পোষ মানাতে হয় সঙ্গ আর খোরাকি দিয়ে। তেমনই গাইড আর সাহচর্য দিয়ে পার্টির কর্মী তৈরী করতে হয়। সংসদ নির্বাচন আসার আগে তাকে আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। কেন্দ্রকে মোটা অংকের ডোনেশনে তুষ্টি করতে না পারলে নমিনেশন ভাগ্যে জুটবে না। ত্যাগী বলে যে কথাটা মুখে মুখে উড়ে বেড়ায় সেটা আসলে সস্তা স্লোগান ছাড়া কিছু নয়। দুহাত খুলে ব্যয় করতে পারলে সবার মন পাওয়া যায় খুব সহজে। কামাই করতে না পারলে কি করে ব্যয় করা যায়। এমন কোন মনিষীর সন্ধান সান্টু পায়নি যাকে অর্থ আর তোয়াজে খুশি করা যায়না। একটা জিনিষ তার সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। যে কোন উপায়ে তাকে অর্থ কামাই করতে হবে। অন্যদের সাথে তার তফাৎ হলো তারা অর্থকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু সে অর্থকে ক্ষমতা লাভের উপায় মনে করে। হীনচেতাদের মতো সে অর্থকে সফলতা মনে করতে রাজি নয়।

সকালে অফিসে সমাগম থাকলেও দুপুরে কমে যায়। একদম ফাঁকা হয়ে যায় অফিস। এ সময় সান্টুর কাজ থাকেনা। তাই এ সময় সে বিজনেসের ফাইল ঘাটাঘাটি করে। মমিনকে খাবার আনতে পাঠায়। অফিস থেকে বাসা পাঁচ কিলো হবেনা। ইচ্ছে করলে সে বাসায় খেয়ে আসতে পারে। কিন্তু সান্টু বাসায় যায়না। সোমার প্রেম ওকে টানে না। অফিসে বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে। দুপুরে সঙ্গ দেয়ার জন্য মিথিলা আসে। ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজিয়ে যায় মিথিলা। মমিন ফজলা জবদুলকে হাতিবিলে পাঠায় সান্টু। অফিসের বাইরে তালা ঝুলানো থাকে। নির্জন জায়গায় অফিস। সহজে কেউ পা বাড়ায় না। জীবনে সুখী নয় সান্টু। প্রথম বয়সে ভালবাসার মধুর কাহিনী ছিলো। বাবার হস্তক্ষেপে সেটা নষ্ট হয়ে যায়। গরীব হলেও সুরমার দেহে রুপের গৌরব ছিলো। বাসনা পুরণে পিছিয়ে থাকেনি সুরমা। অনেক আদরে ভরে দিয়েছে। সুরমার সম্পদ ছিলোনা। কিন্তু অতল গভীর মন ছিলো । সুরমাকে কথা দিয়েছিলো সান্টু। সারাজীবন কাছে ধরে রাখবে। অনেক যত্ন আর প্রেমে সুখী করবে তাকে। কিন্তু সান্টুর মনে সুরমার প্রতি সত্যিকার মায়া ছিলোনা। প্রেমের অভিনয় করে তার দেহের সুষমা লুফে নিয়েছে সে। তাকে শুনিয়েছে বানোয়াট গালগল্প। একবুক হতাশা আর অন্তহীন কান্নার সাগরে সুরমাকে নিক্ষেপ করেছে সান্টু। অনেক অর্থ নিয়ে সোমাকে বিয়ে করেছে সে। সামাজিক মর্যাদা ঠিক রাখতে সুরমার কুসুমিত প্রেম পদদলিত করেছে সে। তার পায়ে পড়ে কতো কেঁদেছে সুরমা।
‘দোহাই তোমার। আমাকে অথৈ সাগরে ভাসাবে না।’
‘তোমাকে সাগরে ভাসালাম বলছো?
‘নয়তো কি? এতোদিন ভালোবেসে এখন ছুঁড়ে ফেলছো।’
‘আমিও তো সাগরে ভাসলাম।’
‘টাকা দেখে ভুলে গেলে। চোখের জল দেখলে না।’
‘বাবা রাজি না হলে কি করবো? বাবার কথা ফেলতে পারলাম না।’
‘এতোটা নির্মম হতে পারলে? কী নিয়ে বাঁচবো আমি।’

সুরমার কথা এখনও মনে পড়ে সান্টুর। ধুসর মেঘের মতো সে স্মৃতির ঢেউ তুলে যায়। সুরমা থাকলে হয়তঃ মনটা পোড়া মাঠের মতো খাঁ খাঁ হেেতানা। কতো সুন্দর কথা বলতো সুরমা। গরীব হলে কি হবে। দেহে ছিলো ষোড়শী চাঁদের রুপের জৌলুস। সুরমার মাদকতা সে কারও কাছে আশা করতে পারেনা। সোমা তাকে প্রেম দিতে জানেনা। প্রেমের অভিনয়ও জানেনা। প্রাণহীন জড়পিন্ড ছাড়া সোমা তার কাছে কিছু নয়। তার সাথে সে রাত্রি যাপন করে নিরাবেগ পাথরের মতো। সুরমার সাথে সোমার বিস্তর ব্যবধান। সান্টু বুঝেছে প্রেমের সাথে অর্থের কোন মিল নেই। সুরমাকে বঞ্চিত করা ঠিক হয়নি। সুরমার ঘরে সকালের সূর্য নাজানি কতোটা কষ্ট ঢেলে দেয় । মিথিলাকে দিয়ে সুরমাকে ভুলতে চায় সে। মিথিলা সাড়া দিয়েছে সান্টুর আহ্বানে। ওকে চাকুরি দিতে চেয়েছে সে। ওর লেখাপড়ার খরচ দেয় সান্টু। মিথিলাকে বিয়ে করবে জাঁকজমকের সাথে। সবাইকে আমন্ত্রণ করবে সান্টু। সান্টুর কথায় বিগলিত হয় মিথিলা। নির্জন সান্নিধ্যে ভরপুর করে ওর মন। ক’দিন পরেই সান্টুর বউ হচ্ছে মিথিলা। সমস্যা কি। মিথিলা নিজকে একটুও আগলায় না। হৃদয়ের মুকুরে সান্টুর ছবি মুদ্রিত করে রাখে সে। ওর কথা ফিরিয়ে দিতে পারেনা। মিথিলা সান্টুর মন যুগিয়ে চলতে থাকে। তার দেহমনে একটি মানুষেরই রাজত্ব চলে। মিথিলার স্বপ্নের রাজপুত্র উদীয়মান তরুণ নেতা মোস্তাক আহমেদ সান্টু।

অবসরে মমিনকে কাছে ডাকে সান্টু। চা খেয়ে গল্প করে। ফেলে আসা দিনে চলে যায়। সে কথা শুনে খুশিতে বুদ হয় মমিন। এতো অর্থবিত্তের মালিক। বাল্য স্মৃতিকে ভুলে যায়নি। ভীষণ খুশি হয় মমিন। ওর তো ব্যর্থ জীবন। ভালো করে পড়তে পারেনি। পারেনি চাকুরি যোগাড় করতে। অনেক শান্তি পায় সে সান্টুর সাথে কথা বলে। ভাগ্যিস সান্টুর মতো বন্ধু পেয়েছে। যার পরিচয়ে মুখ উচিয়ে বেড়ায়। সবখানে বসার চেয়ার পায়। সান্টু তার পরিচয়। সান্টু তার গর্ব। দশহাজার টাকা মাইনে পায় সে প্রতি মাসে। বছরে দুটো বোনাস। বিপদে আপদে সহযোগিতা। অনেক সুখে রেখেছে। গল্প করতে করতে সান্টু বলে,
‘মমিন। আমার কথায় মাইন্ড করিস ?’
‘মাইন্ড করবো কেন? মাইন্ড করার কি হলো?’
‘সকলের সামনে তুই তোক্কা করি।’
‘বন্ধরাু তো তুই তোক্কাই করে।’
‘আমার কথায় মাইন্ড করিস না। মানুষ চালাতে কতো কথা বলতে হয়। গায়ে মাখবি না।’
‘সেটা বলতে হবেনা। আপন মনে করিস বুঝতে পারি।’
‘মেয়েটা কেমন রে?’
‘কোন মেয়েটা?’
‘মিথিলাকে কেমন লাগে তোর ?’
‘ভালোই তো। কোথায় বাড়ি ওর?’
‘বাড়ি কাছেই। আগে বল কেমন লাগে?’
‘খারাপ না। ভাবীর চেয়ে সুন্দর।’
‘ওর বাড়িতে যেতে হবে তোকে মাঝে মাঝে।’
‘আমার যাওয়ার কি দরকার পড়লো?’
‘ওর খোঁজখবর তোর মাধ্যমে করবো। আমি গেলে লোকে নানারকম বলবে।’
‘কেন জড়িয়ে যাচ্ছিস খামাখা। ভাবী শুনলে কি বলবে?’
‘মেয়েটার জীবন গড়ে দিতে চাই। একটু হেলফ কর আমাকে।’

সান্টুর দেয়া দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে মমিন। ওর পাঠানো গিফ্ট সঠিকভাবে পৌঁছে দেয় মিথিলার কাছে। ঘরে বউ থাকার পরও মিথিলাকে ভালোবাসে সান্টু। বড়লোকদের এটা বাতিক। জীবনকে উপভোগ করতে করে এসব। বন্ধুর কথা ফেলতে পারেনা সে। শহর থেকে একটু দূরে মিথিলার বাড়ি। ওর দুই ভাই গার্মেন্টসে কাজ করে। বুড়ো বাবামা আর মিথিলা থাকে বাড়িতে। এদিকে এখনও বিদ্যুত আসেনি। সন্ধ্যায় ভুতুড়ে আঁধার নামে। প্রায়ই আসতে হয় মমিনকে। চা না খাইয়ে মিথিলা ওকে ছাড়তে চায়না। মিথিলার মাবাবা খুবই সহজ মানুষ। ওর সাথে অনেক গল্প করে। সান্টু সম্পর্কে নানা কথা জানতে চায়। মনের মাধুরী ঢেলে বন্ধুর বিষয়ে সাফাই করে মমিন। কতো বড় নেতা সে। দিনরাত তার পেছনে ঘুর ঘুর করে লোকজন। কাউকে সে কটু কথা বলেনা। সবার কাজ হাসিমুখে করে দেয়। ওকে অফিসে চাকুরী দিয়েছে। মিথিলা যদি ওর পেছনে লেগে থাকে সব হবে। আগে পড়া শেষ হোক। সান্টুকে বলবে সে। কোন কষ্ট থাকবেনা। একটা চাকুরী হলে উন্নতি করতে দেরী লাগবে না। ওর মনটা খুব নরম। অন্যের দুঃখ সহ্য করতে পারে না। বিয়ে করেও সুখী হতে পারেনি সান্টু। ওর পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে দেয়নি বাবা। সে জন্য মনে দারুণ ক্ষোভ। আমার ধারণা মিথিলাকে ও বিয়ে করবে। না হলে মনে এতো টান জন্মেছে কেন। আমার কাছে সব সময় ওর গুনের কথা পাড়ে।

মমিনের কথা শুনে মিথিলার জনক জননী আশায় বুক বাঁধে। আল্লা যদি গরীবের দিকে মুখ তুলে চায়। অমন গুনধর বরের সাথে মিথিলার জোড়া যেন বিধির কলমে লেখা হয়। রাতদিন এই কামনা করে তারা। মমিনের মন চায় সান্টুর কথা বলে মিথিলার সংস্পর্শে থাকতে। আনত চোখের সুশ্রী মানবীকে নয়নের সাধ মিটিয়ে দেখতে ক্ষুধাতুর মন সায় দেয়। কোন কোনদিন রাতের খাবার সে ওদের বাড়িতে খায়। ঘরছাড়া বাউলের ক্রন্দনে আঁধার জড়িয়ে সে বাড়ি ফেরে । অমন সরলা মেয়ের সাহচর্যে তার মন ব্যাকুল হয়। মিথিলাকে ভালবেসে ফেলে সে। তার মন নিষ্পাপ প্রজাপতির মতো মিথিলার শুভ্র অবয়বে প্রেমের শিশির ঢেলে দেয়।

সান্টুর প্রতারণা মিথিলা বোঝেনা। কলেজ ছুটি হতেই সান্টু ফোন করে। ফোন পেলে ক্লাশ ছেড়ে ছুটে আসে মিথিলা। সে জানে সান্টু গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে । মনের ভেতর ঝড়ের তোলপাড় নিয়ে মিথিলা সান্টুর অফিসে আসে। একান্ত নির্জনে অনেকটা সময় কাটায় সান্টুর সাথে। একমাত্র লক্ষ্য সান্টুর ওর নধর দেহ। বেগবতী নদীর মতো প্রেমের তরঙ্গে ওর মন ভিজিয়ে দেয় মিথিলা। মিথিলার বিশ^াস ও ঠকবে না। ওর স্খলনের ক্ষতি পুষিয়ে দেবে সে। সে যদি অর্থশালী পুরুষের হৃদয়ের রাণী হতে পারে তাহলে অসুবিধা কোথায়। এমন বেপরোয়া সম্পর্কের পরিণামে মিথিলা অন্তস্বত্তা হয়ে পড়ে। তার শরীর ভারী হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে তার ভেতরে পরিবর্তন হচ্ছে। খাবার খেলে বমি হয়। সারাক্ষণ গা গুলিয়ে থাকে। কাউকে এ কথা বলতে পারেনা সে। একদিন সান্টুকে সে বলে :
‘তোমাকে একটা কথা বলবো?’
‘একটা কেন হাজারটা বলো। তোমার কথায় মধু ঝরে।’
‘কেমন করে বলবো। বলতে যে লজ্জা করে।’
‘লজ্জার কি হলো? যা বলবে ঝটপট বলে ফেলো।’
‘আমার পেটে তোমার বাবু এসেছে।’
‘কি মাথা খারাপ করা কথা বলছো? সংকোচ হচ্ছেনা বলতে?’
‘কতোদিন না বলে থাকবো? এখন তো না বলে পারছিনা।’
‘মমিন প্রতিদিন যায় তাইনা?’
‘তুমি যেদিন পাঠাও সেদিন যায়।’
‘খাওয়া দাওয়া রাত কাটানো সবই চলে?’
‘কি বলছো। তোমার মুখে কিছুই আটকায় না। আমাকে বিয়ে করে নাও।’
‘দোষ করবে অন্যে। বিয়ে করবো আমি। এতোটা বোকা পেয়েছো ?’

দু’চোখে অন্ধকার নিয়ে মিথিলা বাড়ি আসে। ঘরের দরজা দিয়ে অশ্রুর ধারায় বুক ভেজায়। গলায় ফাঁসি দেয়ার সংকল্প করে। এ জীবন রেখে কি লাভ। ভালোবাসার এই পরিণাম। যার জন্য কলঙ্কের দাগ সে বাঁকা কথা বলে। কোথায় লুকাবে সে। কার কাছে বিচার চাবে। এমন স্বজন কে আছে যে পাশে দাঁড়াবে। বাবা মায়ের এমন ক্ষমতা নেই অসহায়া মেয়ের অধিকার আদায় করে দেবে। তার শরীরের ভেতর সান্টুর সন্তান বড় হচ্ছে। কতোদিন আড়াল করে রাখবে মিথিলা। কলেজে যেতে তার মন চায়না। এ অভিশপ্ত মুখ কেমন করে দেখাবে। ধুসর জগতে যেন তার বাস। তারপরও সে সান্টুর অফিসের পাশ দিয়ে ঘুরে যায়। ওর অফিসে তালা ঝুলানো। সান্টু এখন নতুন সাইডে বসে। মিথিলার শরীরে আশি মন লোহার ওজন। নবীন নেশাখোরের মতো ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ফেরে মিথিলা। সান্টু তাকে মৃত্তিকার তলে কবর দিতে পারে। বিশ^াস হয়না তার।

হাতিরবিলের সাইডে বেশ কামাই হবে সান্টুর। একোয়ার করা জায়গায় নির্মাণ হবে বিসিক শিল্পনগরী। ফাঙ ফুঙ করে কাজটা জমাতে পারলে হয়। শিল্পমন্ত্রীকে আনকমন গিফ্ট দিয়ে বিল সই করাতে পারবে সে। দাদামোড়ের অফিস তাকে বন্ধ রাখতে হলো। মিথ্যে বলার মেয়ে নয় মিথিলা। মেয়েটাও যেমন। কেলেংকারী কান্ড ঘটিয়ে বসলো। এসব মেয়েরা অভুক্ত মাছের মতো সহজে টোপ গিলে বসে। পুরুষ মানুষ তো থুকথুক করবেই। তাই বলে এতোটা! সুযোগ বুঝে পসারিণীর সেজে দেহের বসন খুলে দেয়। যেসব মেয়ে এ পথে হাঁটে তারা নিজের সেফটির বিষয় মাথায় রাখে। বিয়েসাদী কি গাছের গোটা পেড়ে দিলে হলো। একটা ঝামেলা হবে ধরে নিয়েছে সান্টু। সবদিক সামাল দিতে কিছু গচ্ছা যাবে। বিষয়টা নিয়ে খুব ভাবছে সে। অফিস জেনে গেলে ইমেজ ধরে রাখা সমস্যা হবে। যতো ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক জাল টেনে বেড়ায়। একটু ট্রেস পেলে পত্রিকার পাতা ঠেসে দেবে। মমিনকে ব্যবহার করা ছাড়া কোন পথ দেখছে না সে। মমিন তো বেশ যাওয়া আসা করেছে। ফজলা আর জবদুলকে দিয়ে কিছু গুঞ্জন ছড়িয়ে দিতে হবে। মিথিলার বাড়ি শহরতলির ভইসবাতানে। ওদিকে কমিউিনিটি ক্লিনিকে সান্টুর কাজ চলছে। ওখানে তার লোক রাখার দরকার পড়েনা। রাজমিস্ত্রি দিয়েই এসব কাজ মেকাপ দেয়া যায়। তাতেই ভালো লাভ আসে তার। মমিনকে মিথিলার সাথে গভীর করে মেশার সুযোগ দিতে হবে। লোকে যাকে দেখবে তার সম্পর্কে উড়ো কথা বিশ^াস করবে। ঠিকমতো কলকাটি নাড়তে পারলে অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে বাঘ শিকার করা যায়। মেয়েটাকে গড়ে নিয়ে বউ বানানো যেতো। সে সুযোগ না পেলে কি করবে সান্টু। মমিনের হাতে বেশি করে অর্থ ধরিয়ে দিলো সে। আর পুরনো দিনের গল্পে হাওয়া দিয়ে খুব কাছে টেনে নিলো।
‘কাজটা দেখিস দোস্ত। বাইরের কাজে খুব ব্যস্ত থাকবো। ওদিকে একদম যেতে পারবো না।’
‘সেটা বলতে হবেনা আমি দেখে নেবো।’
‘মিথিলার খোঁজ নিস। আমার সাথে কথা বলছে না। এতো করে মন পেলাম নারে মেয়েটার।’
‘আমি ওকে বুঝাবো। তুই ফোন করিস।’
‘ফোন। আমাকে বলে কিনা কালপ্রিট। বিশ্বাসঘাতক! ওর জন্য এতোকিছু করছি।’
‘মাথা খারাপ করিস না। মেয়েদের ঘিলু কম। অল্পতেই রেগে যায়। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।’

পার্টির স্থানীয় ছেলেদের কান খাড়া করে দেয় সান্টু। তারা যেন মমিনের গতিবিধির ওপর নজর রাখে। মিথিলার সাথে ওর কিসের সম্পর্ক তা যেন ওরা খুঁজে বের করে। কেন ওর বাড়িতে যাতায়ত করে মমিন। প্রেমের ফাঁদে ফেলে একটা গরীব মেয়ের জীবন ধ্বংস করবে ও। এসব লোকের কাজ হলো মিষ্টি কথায় পটিয়ে মেয়েদের ক্ষতি করা। উঠতি বয়সের কয়েকটা রঙবাজ ছেলের হাতে মালপানি গুঁজে দেয় সান্টু। রাতের বেলা মমিনকে পেলে তারা যেন আটকে দেয়। তারপর যা করার তাই হবে। নারীর মধু পান করার নেশা চিরতরে মিটিয়ে দিতে হবে। সারাদিন ক্লিনিকের কাজ দেখাশুনা করে সন্ধ্যায় মমিনের কাজ থাকেনা। একটা টিনের ছাপড়ায় সে রাত কাটায়। মিথিলাদের বাড়িতে রাতের খাবার সে খেয়ে আসে। এই অবসরে ওর কষ্টের কথা মন লাগিয়ে শোনে। মমিনকে নিজের গোপন কথাটি বলতে পারেনি মিথিলা। কাউকে বলেনি সে লজ্জার ঘৃন্য কথাটি। কেমন করে বলবে সে। এতোটা লজ্জাহীন সে কোনদিন হতে পারবে না। প্রয়োজন হলে গলায় দড়ি দিয়ে মারা যাবে। মমিনের ইচ্ছে সান্টু আর মিথিলার ভুল বুঝাবুঝি মিটিয়ে দেয়া। এজন্য সে মিথিলাকে অনেক সান্তনা দেয়। সান্টুর সাথে দাম্পত্য প্রণয়ের সুন্দর স্বপ্ন দেখায়। এসব কথা বলে মমিন দূরের এক মায়াময় রাজ্যে চলে যায়। স্বপ্নময় সে রাজ্যে মিথিলা তারই হৃদয়ের মানসী। সমস্ত অবিশ^াস থেকে বের হয়ে মিথিলা তার ভালোবাসার মধ্যমনি হয়ে ওঠে।

মিথিলার সাথে কথা বলে একদিন রাত গভীর হয়ে যায়। এর মধ্যে একজন দু’জন করে অনেক লোক জড় হয় ওদের বাড়িতে। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন কে এই লোক। এতো রাতে যুবতী মেয়ের সাথে ওর কিসের আলাপ। অন্য গ্রামের লোক কোন প্রশ্রয়ে এতোটা করে যাচ্ছে? এ গ্রামের মা বোনের কি সম্মান নেই? এসব রঙবিলাস আর যে সহ্য করা যাচ্ছেনা। এর মধ্যে জনাদশেক ক্ষিপ্ত যোয়ান মমিনকে ঘর থেকে টেনে বের করে মারধর শুরু করে দিলো। মারধর হুগোহুড়ির এক পর্যায়ে সেখানে পৌঁছে গেলো পুলিশের গাড়ি। অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার দোষে মমিনকে থানায় নিয়ে গেলো পুলিশ । সারারাত ওর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হলো। ওর কোন কথা শুনলো না তারা। পরপর দু’দিন ওকে থানায় আটকে রাখলো পুলিশ। ক্ষুধা এবং মশার কামড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লো মমিন। একসময় ওসি সাহেব ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। তার নির্দেশে এক কনষ্টেবল মমিনের সামনে খাবার এনে দিলো। খাবার পেয়ে আকুল হয়ে খেতে লাগলো সে। এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করলো ওসি সাহেব।
‘কোথায় বাড়ি?’
‘শহরের পাশে। হরিকেশ গ্রামে।’
‘কার ছেলে?’
‘ছমির সেখের।’
‘রুপসী মেয়ে দেখলে মাথা ঠিক থাকেনা? তা বিয়েটা করে নাও।’
‘বিয়ে করবো মানে? ওতো আমার বোনের মতো।’
‘ছাড়ো ওসব পট্টি দেয়া কথা। ধরা পড়লে বোন, অন্য সময় প্রেমিকা।’
‘না সার। ও আমার বন্ধুর প্রেমিকা। আমার বন্ধু মোস্তাক সান্টু ওকে বিয়ে করবে।’
‘দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছো কেন?’
‘সত্যি কথা বলছি সার। আমার কোন দোষ নেই।’
‘আমার কথা মেনে নিলে তোমাকে চালান দেবো না।’
‘কি কথা স্যার?’
‘মেয়েটিকে বিয়ে করে নাও।’
‘তা আমি কোনদিন পারবো না। ওর গর্ভে সান্টুর সন্তান।’
‘বাজে কথা বলবে না। সান্টুর কথা বললে তুমি ছাড়া পাবে না। সারাজীবন জেলে পঁচতে হবে।’
‘জেলে পঁচবো তবু মিথিলাকে বিয়ে করবো না। ওকে বোন ডেকেছি।’
‘বোনের ইজ্জত মেরে ছারখার করছো। বিয়ে করতে দোষ। খা তাহলে জেলের ভাত।’

প্রতারণা, নারীধর্ষণ এবং অর্থ আত্মসাতের মামলায় জড়িয়ে মমিনকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করে সান্টু। জেলের অন্ধকারে চোখের জলে ভাসতে থাকে সে। কেউ তাকে দেখতেও আসেনা। বৃদ্ধ বাবা-মা জানেনা কি করলে মমিন মুক্তি পাবে। কিন্তু মিথিলা দারুণ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তার ভেতরের ক্রোধের বারুদ বিস্ফোরিত হয়ে লেলিহান অগ্নিশিখায় পরিণত হয়। তার জন্য একজন নিরীহ মানুষ কষ্ট পাবে এটা কখনই হতে পারেনা। কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে সে মিডিয়ার মুখোমুখি হয়। মুহুর্তে সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে সান্টুর অপকর্মের কথা। এক টুকরো সুপ্ত অগ্নিকণা অপ্রতিরোধ্য দাবানল হয়ে গ্রাম-গজ্ঞ শহর-বন্দর রাস্তা-ঘাট থানা-আদালত পুড়িয়ে সান্টুর অফিসের দিকে ছুটতে থাকে।