ভাই-বোনদের মধ্যে সবার ছোট হওয়া সত্ত্বেও যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, ঠিক ততটাই অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়েছে রিমা। আশার চেয়ে কম প্রাপ্তিতে দিনের পর দিন অভিমান জমা হতে হতে নিজেকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে নিতে লাগলো। সবাই নিজস্ব চাহিদা মেটাবার তাড়নায় রিমার দিকে নজরই দিল না। কীভাবে সে বড় হচ্ছে, কী তার প্রয়োজন এসবের দিকে খেয়াল রাখার সময়ই ছিল না কারও। এমনকি যেটুকু আন্তরিকতা যে বয়সে পাওয়া দরকার তাও সে পাচ্ছিল না। এমনভাবেই চলতে চলতে সে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এইচএসসি পাশ করে ফেললো। এতদিনে রিমার বাবা-মায়ের খেয়াল হলো মেয়ে বড় হয়ে গেছে। তাকে বিয়ে দিতে হবে। রিমার বড় ভাইয়েরা সবাই পড়াশুনা শেষ করে চাকরি-বউ-সংসার এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকার দরুণ পরিবারের অন্যদের সাথে মেলামেশার সুযোগ থেকে প্রায় বঞ্চিত। ভাই-বোনদের সাথে যে আত্মার একটা টান সবসময় কাজ করে এবং সে সুবাদেই পরস্পর পরস্পরের দিকে বিপদে আপদে ছুটে আসে তা রিমা নিজের ফ্যামিলিতে দেখতে পাচ্ছিল না। সবাই শুধু নিজেকে নিয়ে আছে। বাড়ির সবার ছোট বোনের প্রতি যে একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তা যেন এড়িয়ে যেতে পারলেই সবাই বাঁচে।

রিমার বাবা বছর দুয়েক আগেই চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। ছোট চাকরি হওয়ার জন্য এককালীন যে টাকা পেয়েছেন তা ছেলেদের ভাগ করে দিয়েছেন। রিমা নামে যে তার একটা মেয়ে আছে তার ভবিষ্যত-পড়াশুনা-বিয়ে এসব মাথায়ই আসেনি। রিমা সব নিরবে দেখে গেছে। মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু বলেনি। রিমার বড় বোন তার খোঁজ রাখে। তাই কোনোকিছুর চাহিদা যখন বেশি মাত্রায় হয়ে যায় তখন সে তার বোনকে বলে। এছাড়া কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেসও করে না। সে নিজেও কিছু বলে না। ঐ বোনের বাসা থেকেই রিমা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে। তাই তার বাবা-মা আর অন্য ভাই-বোনেরা রিমার উপস্থিতি অনুপস্থিতি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ভাবীদের অবস্থাটা এমন যে তাদের যে একটা ননদ আছে, পড়াশুনা করছে বিয়ে হয়নি একথা মনে মনেও কখনো চিন্তায় আসেনি। এ নিয়ে রিমার কোনো ক্ষোভ নেই। এসবে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবে রিমার প্রচ- ইচ্ছা সে পড়াশুনা চালিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে বিয়ে করার চিন্তাই সে করতে পারছে না। তবুও সবাই তাকে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চাচ্ছে।

একদিন রিমার বড় ভাই বাড়িতে আসলে তার বাবা বড় ভাইয়ের সাথে রিমার বিয়ে নিয়ে কথা বলছিল। রিমার বাবা তার ভাইকে বললো-
“দেখ, শাকিল, রিমার দিকে তো আমরা কোন নজরই দেইনি। কিন্তু ওতো বড় হয়ে গেলো। এখন তোরা সবাই মিলে ওর বিয়েটা দিয়ে দিলে আমি একটু চিন্তামুক্ত হই।”
“দেখো বাবা, তুমি তো জানোই আমি সবসময় খুব ব্যস্ত থাকি। আমি ওসব বিয়ে-শাদীর দায়-দায়িত্ব নিতে পারব না। আর এলাকায় কিংবা আশেপাশে কোনো ছেলে-টেলে পেলে এই কয়েকজন মুরুব্বী ডেকে বিয়ে দিয়ে দিও। আমি এসব ফালতু ব্যাপারে আসতে পারব না।”

এ কথা বলে রিমার ভাই চলে গেলো। যাওয়ার আগে তাকে ডাক দিয়ে একটু বলেও গেল না। রিমা আড়াল থেকে সব কথা শুনে যতটা না কষ্ট পেলো তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেলো তার ভাইয়ের ব্যবহারে। রিমা নিজেকে তার পরিবারের বোঝা ভাবতে শুরু করলো। সে ভাবতে লাগলো নিজের বাবা-ভাইরা তাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না আর অন্য একটা পরিবারে তো সে একটা উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই হবে না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল নিজেকে কোনোভাবেই আর অবহেলিত হতে দেওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক পড়াশুনাটা চালিয়ে যাবে এবং সমাজে নিজের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেবে। তা না হলে সারাজীবন অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। রিমার মনে হলো-এর চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।

ঠিক তারপর দিনই রিমা তার মেজো বোনের বাসায় চলে আসলো। বোনকে অনেক রিকোয়েস্টের পর সেখানে থেকে পড়াশুনা করার সুযোগ মিললো। রিমা ঢাকার একটা সরকারি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হলো। রিমার বোন একটা ছোটখাটো সরকারি চাকরি করায় বাসায় কাজের লোক রেখেছিল স্কুল পড়ুয়া দুই ছেলেকে দেখাশোনা করার জন্য। আর তার স্বামী ব্যবসার কাজে সবসময় ব্যস্ততার মধ্যেই থাকেন। রিমা এ বাসায় আসার পর তার বোন কাজের লোককে বিদায় করে দিয়েছে। ফলস্বরূপ দুই ভাগ্নেকে দেখাশোনার দায়িত্বসহ বাসার অধিকাংশ কাজগুলো তাকেই করতে হয়। এদিকে রিমার থাকা খাওয়ার দায়িত্ব নিলেও অন্য কোনো খরচ দিতে পারবে না বলে তার বোন জানিয়ে দিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই রিমাকে একটা টিউশনি নিতে হয়েছে। বাসার সব কাজ সামলিয়ে, কলেজের ক্লাস শেষে টিউশনিটা করে সে তার পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বোনের স্বামীর খারাপ চাহনিকে অগ্রাহ্য করে তাকে টিকে থাকতে হচ্ছে। মান-সম্মানের ভয়ে বোনকে কিছু জানাতেও পারছে না। আর জানালেও তার বোন কার দিকে সাপোর্ট করবে সেটাও বলা মুশকিল। তাই যতটুকু গা বাঁচিয়ে চলা যায় তারই চেষ্টা করে যাচ্ছে।

দুলাভাইকে নিয়ে রিমার ভয়টা দিন দিন বেড়েই চলছে। তাই বন্ধু-বান্ধবীদের বলে কয়ে আরও দুইটা টিউশনি ঠিক করলো। রিমা মনে মনে স্থির করলো মাস খানেক পর টিউশনির টাকাটা পেলেই সে বোনের বাসা থেকে চলে যাবে। বিশ দিন ধরে রিমার দেরি করে বাড়ি ফেরার কারণ জিজ্ঞেস করলো তার বোন। এতে তার ঘরের কাজের সমস্যা হচ্ছে তাই। রিমা ব্যবহারিক ক্লাসের কথা বলে কাটিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তার বোনের সন্দেহ হয় যে, ব্যবহারিক ক্লাস তো প্রতিদিন হওয়ার কথা নয়। তাই সে নানাভাবে জেরা করতে থাকে। একসময় বলেই ফেললো-
“দেখ রিমা, তুই আমার বোন কারণে তোকে আমার বাসায় থাকতে আর খেতে দিচ্ছি। আমার মনে হয় এখানে তোর কোন সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু কিছুদিন যাবত তোর বেশি সময় বাইরে থাকাটা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। আর তোর যদি নষ্টামী করার ইচ্ছে থাকে তবে তা আমার বাসায় থেকে করতে পারবি না। আরও তো ভাই-বোন আছে। কেউ তোর দায়িত্ব নিচ্ছে না বলেই আমি বাধ্য হয়ে তোকে রেখেছি। ভালোভাবে থাকলে থাক, নয়তো কোনো কলঙ্ক মাথায় নিতে পারব না।”

সহোদর বোনের মুখ থেকে এমন কথা শুনে রিমা আর সহ্য করতে পারলো না। তার মানে এ বাড়িতে তার কোনো নিরাপত্তা নেই। যেকোনো সময় দুর্নাম মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। তাই মান-সম্মান থাকতে থাকতে যত দ্রুত সম্ভব সে পরদিন সকালেই এ বাড়ি থেকে চলে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে? টিউশনি করে কিছু টাকা জমিয়েছিল তাই নিয়ে কলেজের কাছাকাছি একটা মহিলা হোস্টেলে সিট ভাড়া করলো। মাসের বাকি চারদিন এক বান্ধবীর বাসায় কাটিয়ে দিলো।

সকালে তার বোন তাকে বাসায় না দেখে ভাবলো কোথাও প্রয়োজনে গেছে। তাই আর মাথা ঘামালো না। রাতেও যখন ফিরলো না তখন যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। হয়তো করো সাথে চলে গেছে- এই ভেবে যেন আপদ বিদায় হয়েছে, তাই আর কোন খোঁজ করেনি কোথাও।

শুরু হলো রিমার একা একা পথ চলা। হোস্টেল-কলেজ-টিউশনি-পড়াশুনা এ নিয়েই দিন কেটে যাচ্ছে। এরমধ্যে বাড়ি থেকে কেউ কোনো খোঁজ করেনি। রিমার সব সয়ে গেছে। সে বুঝে গেছে তাকে স্ট্রাগল করেই বাঁচতে হবে। যাই হোক, তার তিনটা টিউশনির মধ্যে একটা টিউশনি তারই এক ক্লাসমেট বান্ধবীর ক্লাস ফাইভে পড়া ছোট ভাই। সেই সুবাদে বাসার সবার সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু রিমার জীবনের বাধার অন্ত নেই।

তার জীবনে ভালো সময় খুব বেশিদিন সয় না। হ্যাপির অল্প শিক্ষিত বড় ভাই সাজু ১৫ বছর পর কুয়েত থকে দেশে ফিরেছে। ফিরেই রিমার দিকে নজর পড়েছে। কারণ তার দেশে আসার উদ্দেশ্যই বিয়ে। আর হ্যাপির কাছ থেকে রিমার সম্বন্ধে সব শুনে রিমার অসহায়ত্বের সুযোগে নিজেকে রিমার থেকে খুব বেশি যোগ্য ভাবতে শুরু করলো। আর ভাবতে লাগলো তার মতো ছেলে রিমার মতো মেয়েকে চাইলেই বিয়ে করতে পারে। রিমা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় এবং মেধাবী। এ ব্যাপারগুলো হ্যাপির চল্লিশোর্ধ বড় ভাইয়ের টাকার গরমের কাছে খুবই ফেলনা মনে হলো। রিমাকে সরাসরি কিছু না বললেও একদিন ছুটির দিনে রিমার হোস্টেলে এসে তার খোঁজ করলো। রিমা বরাবরই ছেলেদের থেকে সাবধান থেকেছে। তার কোনো ছেলেবন্ধু নেই বললেই চলে। নিজের পরিবার থেকে বারবার আঘাত পেতে পেতে মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস প্রায় হারিয়েই গেছে। তাই গার্ডের কাছ থেকে একজন লোক তার সাথে দেখা করতে এসেছে শুনে বেশ আশ্চর্যই হলো। রিমার জানামতে তার সাথে দেখা করতে আসার কেউ তো নেই। তবে কে আসলো এই ভাবতে ভাবতে গেস্ট রুমে হ্যাপির ভাইকে দেখে খুব অবাক হলো, সাথে প্রচ- বিরক্তিবোধও জড়ো হলো মনে। রিমাকে দেখেই সাজু খুব খোশ মেজাজে বললো-
“এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। হ্যাপির কাছে শুনলাম তুমি এখানেই থাকো। তাই দেখা করতে এলাম আর কি। বাইরে বেড়াতে গেলে চলো যাই। মটর সাইকেল রাখা আছে। আমি অপেক্ষা করতাছি, তুমি রেডি হইয়া আসো।”

রাগে রিমার শরীর কাঁপছিল। প্রথমত সে এসেই তাকে তুমি সম্বোধন করেছে। দ্বিতীয়ত বেড়াতে যাবার অফার করেছে এমনভাবে যেন তার সাথে বহুদিনের সম্পর্ক। তার এই অশোভন আচরণ রিমাকে যতটা না রাগান্বিত করলো তার চেয়ে বেশি অপমানিত হলো সে। তারপরও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ভদ্রতা বজায় রেখে বললো-
“সাজু ভাই আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু নোট আনতে হবে। আজ বরং আপনি যান। আরেকদিন হ্যাপিসহ আমরা সবাই বেড়াতে যাব।”

সাজু তখন বেয়াদবের মতো রিমার হাত ধরে টান দিয়ে বললো-
“ঠিক আছে চল তুমি যেখানে যাবা, সেখানে তোমাকে নামিয়ে দেই। আর কয়েকদিন পর তো আমার সাথেই ঘুরতে হবে। এখন আর আপত্তি করো নাতো।”

রিমা এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খুব কঠিনভাবে বললো-
আপানি যা ভাবছেন তা কখনই সম্ভব নয়। আমি মরে গেলেও না। আপনার ভাইকে পড়াই বলে ভাববেন না যে, আমি খুব সস্তা হয়ে গেছি। যে কেউ এসে যা তা বললেই সাড়া দিব। এখান থেকে চলে যান। আর কখনো এখানে আসার চেষ্টাও করবেন না।”

এরপর রিমা আর কখনও হ্যাপিদের বাসায় যায়নি। হ্যাপি কয়েকবার এর কারণ জিজ্ঞেস করলেও রিমা কিছুই বলেনি।

ঈদের ছুটি চলে আসলো। হোস্টেল ছেড়ে সবাই এক এক করে বাড়ি চলে যাচ্ছে। রিমা কোথায় যাবে? কেউ তো তার কোনো খবরই রাখে না। প্রচ- অভিমানের ক্ষোভে সে হোস্টেলই থেকে গেলো। তার বাবা-মা ভাবলো কোন বোনের বাসায়। আর ভাই-বোনরা যার যার মতো ঈদ কাটালো। কেউ রিমার কথা কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনই বোধ করেনি। রিমার ছোটবেলার বান্ধবী তার বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, হয়তো কোনো বোনের বাসায় আছে।

রিমা তার নিজের মতো করে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ঈদের দিনটা উপভোগ করলো। কিছু জমানো টাকা ছিল। তাই দিয়ে অনেকগুলো চিপসের প্যাকেট কিনে সে সারাদিন ঢাকা শহর হেঁটে বেড়ালো আর সামনে যতগুলো পথশিশু পড়েছে প্রত্যেককে একটা করে চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দিলো। এইসব শিশুরা তা পেয়ে যে আনন্দ পেলো তা দেখে রিমার সব কষ্ট যেন দূর হয়ে গেলো।

দুই দিন পর হোস্টেল ভরে গেলো। তার হাতে এখন দুইটা টিউশনি। একটার টাকা দিয়ে সে হোস্টেলের সিট ভাড়া আর খাবার বিল দেয়। অন্যটা দিয়ে ঢাকা শহরে কোনোভাবে তার অতি প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এভাবে আর চলছে না। তাই পত্রিকার পাতা খুঁজে পার্টটাইম একটা চাকরির বিজ্ঞাপন পড়লো। ঢাকার নামকরা একটা শপিং কমপ্লেক্সে সেলস গার্ল। বিকাল ৪ টা হতে রাত ৮ টা পর্যন্ত। বেতন দশ হাজার টাকা। সপ্তাহে ৫ দিন। রিমা ভাবলো টিউশনি দুটো হাতে রেখে চাকরি পেলে ভালোই হবে। কিন্তু বিপত্তি বাধলো অন্য জায়গায়। পরীক্ষা পাশের মূল সনদ লাগবে। সেগুলো রিমা বাড়িতে রেখে এসেছে তাই সে ভাবলো সনদগুলো নিয়ে আসলে তার চলার পথ আরও সহজ হয়।

পরদিনই রিমা বাড়ি গেলো। আইএ পাশ করে সে বাড়ি ছেড়েছিল। এখন অনার্স ৩য় বর্ষে পড়ছে। রিমার মা একমাত্র মানুষ যে রিমার কথা মনে করেছে এবং তার ব্যাপারে অন্য ভাই-বোনদেরকে সহযোগিতার কথা বলেছে। মায়ের কথা তার অনেকবার মনে পড়েছে কিন্তু অন্যদের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভে আর মার কাছে আসা হয়ে ওঠেনি। বাড়িতে গিয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলো। তারপর রাতে ঘুমানোর আগে সে তার মায়ের কাছে সব বললো আর তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা করতে বারণ করলো। পরদিন সকালে কাগজপত্র নিয়ে রিমা হোস্টেলে ফিরে আসলো।

যে চাকরিটার জন্য রিমা সার্টিফিকেট আনতে বাড়ি গিয়েছিল সেই চাকরিটা তার হয়ে গেলো। পড়াশুনার সুবিধার্থে সে একটা টিউশনি ছেড়ে দিলো। দেশের একটা নামিদামি ব্র্যান্ডের কাপড়ের দোকানে কাজ করতে তার ভালোই লাগছিল। নিজেকে স্মার্টলি উপস্থাপন করার ফলে ক্রেতার সংখ্যাও আগের চেয়ে বাড়তে থাকলো। দোকান মালিকও বেশ খুশি হলো। এভাবে কাজ করতে করতে তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। মাঝে কয়েকবার তার মায়ের সাথে কথা হয়েছে।

অনার্সে রিমা তার কলেজ থেকে ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হলো। মাস্টার্স ভর্তি হলো ইডেন কলেজে। এর মধ্যে চাকরির বেতন বাড়ায় সে তার টিউশনি ছেড়ে দিলো। চাকরির সময়টা বাদে বাকি সময় দ্বিগুণ উৎসাহে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলো। যে হোস্টেলে এতদিন থেকেছে সেখান থেকে ইডেন কলেজের হোস্টেলে উঠেছে।

একদিন দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম একটি ছেলে রিমার কাপড়ের দোকানে এসে রিমাকে বললো- “কি ব্যাপার আপনাকে ইডেন কলেজের গেইটে প্রায়ই দেখি। আবার এখানেও। বুঝতে পারলাম না।”
রিমা একটু মুচকি হেসে বললো- “না বুঝার কি আছে। পড়াশুনা, চাকরি দুটোই চালিয়ে যাচ্ছি।”
“বেশ ভালো তো। কোন সাবজেক্টে আর কিসে পড়ছেন।”
“ফিজিক্সে মাস্টার্সে পড়ছি।”
“হুমম! খুব কঠিন আর প্র্যাকটিক্যাল সাবজেক্ট।”
“তা বলতে পারেন।”
“নামটা বললে খুব ভালো লাগতো।”
“রিমা।”
“ঠিক আছে। তবে যাই। দেখা হবে।”

এই বলে ছেলেটা চলে গেলো। রিমা ভেবেছিল কিছু কিনতে এসছে তাই এত কথা বলা। কিন্তু পরে তার মনে হলো যেন তার সাথে দেখা করার জন্যই- এসেছে। যাই হোক, রিমা এ নিয়ে বেশি না ভেবে নিজের কাজে মন দিলো।

তাড়াহুড়া করে রিকশা ভাড়া দিতে গিয়ে রিমার ন্যাশনাল আইডি কার্ডটা হারিয়ে গিয়েছিল। তো এই কার্ড উঠানোর জন্য একদিন সে ইসলামী ফাউন্ডেশন ভবনের ৭ম তলা যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ হয় সেখানে গেলো। গিয়ে দেখে ঐ ছেলেটি, যে তার দোকানে এসেছিল মাস দুয়েক আগে। ছেলেটি সেখানকার সহকারী পরিচালক। রিমাকে দেখে সে একটু উচ্ছ্বসিত হয়েই বললো- “আপনি এখানে? কি করতে পারি আপনার জন্য বলুন?”

রিমা তার সমস্যার কথা বললো। রিমা সেখানে অফিসারদের নামের তালিকা দেখে জানলো ছেলেটির নাম তৌফিক আহমেদ।

তৌফিক সাথে সাথে কম্পিউটারে রিমার ডাটা দেখে টেকনিক্যাল এক্সপার্টকে বললো ইমিডিয়েট রিমার আইডি কার্ড করে দিতে। প্রায় ১ ঘণ্টা পর রিমা তার কার্ড নিয়ে সেখান থেকে বেরুলো। আসার সময় মোবাইল নম্বরটাও দিয়ে আসলো তৌফিককে।

মাসখানেক পর তৌফিকের নাম্বারটা রিমার মোবাইলে ভেসে উঠলো। রিমা ফোন রিসিভ করতেই তৌফিক বলে উঠলো- “একটা ধন্যবাদ অন্তত আশা করেছিলাম আপনার কাছ থেকে।”

রিমা বললো- “হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আমার একটু ভুলই হয়ে গেছে। তবে আপনি আবার কি ভাবেন এই মনে করে আর ফোন দেয়া হয়ে ওঠেনি।”
“এখানে আবার ভাবাভাবির কি আছে, বুঝলাম না।”
“অনেক কিছুই আছে। একটা ছেলে একটা মেয়েকে ফোন দিলে কেউ কিছুই ভাবে না। আর যদি মেয়েটা আগে ফোন দেয় তবে ছেলেটার মধ্যে মেয়েটা সম্বন্ধে অনেক নেগেটিভ ধারণা তৈরি হয়।”
“আমার সম্বন্ধে আপনার এমন ধারণা কীভাবে তৈরি হলো?”
“আপনার সম্মন্ধে তো তৈরি হয়নি। আমি বলেছি-ছেলেদের ব্যাপারে। আর আপনি তো মেয়ে নন, তাই না?”
“ও বুঝতে পেরেছি, ছেলেদের প্রতি আপনার অনেক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।”
“ভুল বললেন। আমার কারো ব্যাপারে কোনো ক্ষোভ নাই। শুধু একটু বুঝে শুনে চলি, এই আর কি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। বেশ ভালো লাগলো-আপনার সাথে কথা বলে।” এই বলে তৌফিক ফোন রেখে দিলো। রিমার ভালো কিংবা মন্দলাগা কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না।

নিজের পরিবার থেকে নিজের ব্যাপারে কোনো সাড়া না পাওয়াতে রিমার মানুষের প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাস কোনোটাই নেই। সে শুধু জানে তাকে চলতে হবে সামনের দিকে। কোনো রকম ফালতু সেন্টিমেন্টকে পাত্তা দিলে চলবে না।

কয়েকদিন পর আবার তৌফিকের ফোন- “আজ আপনাকে বেগুনী রঙের ড্রেসে বেশ ভালো লাগছে।”

রিমা তার ড্রেসের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়েই বললো-
“আপনি কি আমাকে ফলো করেন নাকি?”
“ফলো করার সময় থাকলে তো করব। আমি অফিসে আসি সকাল ৯টায়। বাসা থেকে বেরোই সকাল ৭টায়। সারাদিন কাজ করে বাসায় ফিরি রাত আট টায়। তবে কখন ফলো করবো। তবে আপনি গত একমাস কি কি রঙের ড্রেস পড়েছেন তা বলে দিতে পারবো।”
“আচ্ছা এক মাসেরটা না বলে আপনি গত তিন দিনেরটা বলেন তো?”
“সাদা, আসমানী, খয়েরি।”

রিমা একটু অবাক হয়েই বললো- “সত্যি করে বলুন তো আপনার বাসা কোথায়?”
“আপনার কলেজের ঠিক বিপরীতে। আপনাকে আমি অনেক দিন থেকে চিনি, দেখছি। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আমার দেখামতে আপনি একমাত্র মেয়ে যে সুস্থ ব্রেন দিয়ে নিজেকে সঠিকভাবে চালাচ্ছেন। আপনি যদি অনুমতি দেন নির্ভয়ে ক’টা কথা বলতে চাই।”
“ঠিক আছে বলুন।”
“আমি আপনার সাথে সরাসরি কিছু কথা বলতে চাই যদি দয়া করে আমার সাথে দেখা করেন।”
“কি ধরণের কথা।”
“আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি- দেখা হলে বলবো।”

রিমা একটু নির্লিপ্তভাবেই বললো- “ঠিক আছে কাল তো ছুটির দিন। টিএসসি-তে আসেন। শুনি, আপনার কি কথা।”
“Thank you very much. কাল দেখা হবে।”

পরদিন তৌফিক টিএসসি-তে সময়মতো পৌঁছানোর প্রায় দুই ঘণ্টা পর রিমা আসলো। রিমার ধারণা ছিল এক দেড় ঘণ্টা না গেলেই হয়তো তৌফিক অধৈর্য্য হয়ে চলে যাবে। কিন্তু দেড় ঘণ্টা পর তৌফিক মেসেজ দিলো যে আপনার মতো একজন মানুষ যদি কথা দিয়ে কথা না রাখে তবে আমার আর কিছুই বলার নেই।

রিমা মেসেজ পড়ার পর কথা রাখার দায়বদ্ধতা থেকে সেখানে গেলো। গিয়েই তৌফিককে বললো- “যা বলার স্পষ্ট বলবেন। হেয়ালী আমার পছন্দ নয়।”

তৌফিকও রিমার দিকে একেবারে স্পষ্টভাবে তাকিয়ে বললো- “রিমা, আমিও তাই চাই। দেখুন, আপনাকে আমার খুবই ভালো লেগেছে। বলতে পারেন ভালোবাসি। তাই আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। ভেবেছিলাম প্রস্তাবটা আপনার পরিবারেই পাঠাবো। কিন্তু আমি শুধু আপনাকে দেখেছি, আপনার সম্বন্ধে আর কিছুই জানি না। তাই আপনার ফ্যামিলিতে জানানোর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সবকিছুই আপনার সম্মতিতে হবে। তাই আপনি যদি বিষয়টা সিরিয়াসলি ভেবে দেখতেন তবে আমার জন্য খুবই ভালো হতো।”

রিমা তৌফিকের কাছ থেকে হঠাৎ করে এ ধরণের এক্সপ্রেশন আশা করেনি। তারপরও বললো-
“ঠিক আছে, আমি বিষয়টা ভেবে দেখব। তবে আমার মাস্টার্স পরীক্ষার আর মাত্র তিন মাস বাকি আছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে আপনি আমাকে আর ফোন দিবেন না। আমি এ সময়টাতে সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত থাকতে চাই।”

এই বলে সে হোস্টেলে ফিরে আসলো। কোনোরকম বাড়তি চিন্তা মাথায় না নিয়ে রিমা চাকরি এবং পড়াশুনা দুটোই চালিয়ে যেতে লাগলো। তৌফিক আর ফোন দেয়নি। এর মধ্যে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। প্রায় পাঁচ মাস পর তৌফিকের ফোন আসলো।
“রিমা আমার কথা কি আপনার মনে আছে?”
“হ্যাঁ মনে আছে।”
“আপনার সাথে কি দেখা করতে পারি? যদি কোনো আপত্তি না থাকে।”
“কবে দেখা করতে চান?”
“আজই বিকেলে। আজতো ছুটির দিন।”
“আচ্ছা চলে আসবো।”

বিকেলে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে দুজনে বসলো। তৌফিক বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো-
“আমার প্রস্তাবটা ভেবে দেখেছেন কি?”
“ভেবেছি। তবে আপনি ফ্যামিলির কথা যা বলছিলেন, আসলে আমার অন্য ভাই-বোনদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। এক্ষেত্রে আপনাকে আমি ফ্যামিলি বিষয়ক কোন সম্মান দিতে পারব না। এজন্যই আমি নিজেকে এ সব ফরমালিটিজ থেকে দূরে রেখেছি।”
“ঠিক আছে। আমি তো আপনাকে আমার পাশে চাই। আর বিয়ের পর আমি সস্ত্রীক বিদেশে চলে যাবো। একটা স্কলারশীপের অ্যাপলাই করেছি। সেটা সম্ভবত হয়ে যাবে। আপনি যদি ফ্যামিলি বাদ দিয়ে সব করতে চান তাতেও আমার আপত্তি নেই।”

সেদিন আরও কিছুক্ষণ গল্প করে যার যার বাসায় চলে আসলো। রিমা হোস্টেলে ফিরে ভাবলো, তার ভাই-বোনরা হয়তো তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে কিন্তু বাবা-মা তো করেনি। আর তারা তো বৃদ্ধ হয়ে গেছে। তাই তাদেরকে নিয়েই সে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করতে চাইলো।

দুদিন পর তৌফিককে জানিয়ে রিমা বাড়ি গেলো। রিমা তার বাবা-মাকে সব জানানোর পর তারা বেশ খুশি হলো। একসময় তার বাবা বললো-
“দেখ মা, তোর উপর আমরা অনেক অবিচার করেছি। যে দায়িত্ব থেকে সবাই দূরে সরে ছিলাম, আজ তুই নিজেই সেটা করে দেখালি। যাই হোক আমি সবাইকে খবর দিচ্ছি। তুই ছেলেপক্ষকে আসতে বলো।”

বাবার কথা শুনে রিমার মনে কোনো আবেগ কাজ করলো না। ইচ্ছে করে যারা তার কোন খোঁজ নেয়নি, তাদের প্রতি তার যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সেটা কয়েকটা কথায় শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। যাই হোক রিমা তৌফিককে তাদের বাড়ি আসতে বললো।

পরদিনই তৌফিকের বাবা-মা এসে রিমাকে আংটি পরিয়ে পনের দিন পর বিয়ের দিন পাকা করে গেলো। রিমার বাবা তার সব ভাই বোনকে বিষয়টা জানিয়ে বাড়ি আসতে বললো। তৌফিক আর তার ফ্যামিলি সম্বন্ধে শুনে সবাই বাড়ি আসলো। যে বোনের দিকে তারা কোনোদিন ফিরেও তাকায়নি তার এত ভালো বিয়ে হচ্ছে শুনে সবাই রিমার দিকে ভিড়লো। মেজো বোন তো রিমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর সবাইকে বলতে লাগলো রিমা তার বাসায় থেকে ঢাকায় পড়াশুনা করেছে। রিমা সব নীরবে সহ্য করতে লাগলো কিন্তু কাউকে মুখ ফুটে কিছু বললো না।

বিয়ের দিন চলে আসলো। রিমার বাবাই বিয়ের সব জোগাড় করেছে। রিমার প্রতি দায়ভার থেকে মুক্ত হতে সব ভাই-বোনরা মিলে তার বাবাকে সহযোগিতা করছে। যাতে আশেপাশের লোকজন থেকে তৌফিকের পরিবারের সবাই ভাবে রিমাকে তার ভাই-বোনরা খুব ভালোবাসে।

যাই হোক বিয়ে শেষ হয়ে গেলো। বাবার বাড়ি থেকে বিদায় বেলায় সাধারণত মেয়েরা ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। কিন্তু রিমার চোখে এক বিন্দু জলও ছিল না। বরং যাবার বেলায় সে কাউকে কিছু বলে আসেনি। প্রচণ্ড- খুশিমনে সে তৌফিকের হাত ধরে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলো। যাওয়ার পর সে তার বাবার বাড়ির কারও সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। এমনকি ভাইবোনদের কিংবা বাবা ফোন দিলেও ফোন কেটে দিতো।

আসলে রিমা তার পরিবারকে ক্ষমা করতে পারছিলো না। তার প্রতি তারা যে অনাগ্রহ দেখিয়েছে এতে করে ক্ষোভ জমতে জমতে সেটা মনের মধ্যে একেবারে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে সে বের হতে পারেনি। মাসখানেক পর রিমার শ্বশুরবাড়ি থেকে রিমার বাবাকে ফোন দিয়ে তার শাশুড়ী জানালো, “রিমা তার স্বামীসহ দুই দিন আগে লন্ডনে চলে গেছে এবং সেখানেই স্থায়ী হবে।” এরপর রিমার সম্বন্ধে তারা আর কোনো খবর পায়নি।