শুধু নামের আগেই ‘শেখ’ পদবী রয়েছে তা নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে জেলও খেটেছেন ১১ মাস। কারাবরণের কারণটিও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহান ভাষাদিবসের পবিত্র স্মৃতির সাথেও জড়িত। স্বাধীনতা উত্তরকালের অর্ধশতাধিক লেখকের শিক্ষাগুরুও তিনি। অধিকাংশ শিস্য পদক-পুরস্কার-প্রণোদনায় ভাসছেন। কিন্তু প্রচার ও তদ্বিরবিমুখতার কারণে নিজের ভান্ডার ছিলো শুন্য। নিভৃতচারী সেই লেখক-সম্পাদক-কার্টুনিস্ট শেখ তোফাজ্জল হোসেন। অসুখের মুখে বিনা চিকিৎসায় অভিমানে চলে গেলেন পরপারে।

ভাষামাসে স্মৃতির মিনার হলেন লেখক-সংগঠক শেখ তোফাজ্জল। জন্ম ১৯৫০-এর ২৬ মার্চ, আসামের জোরাহাটে। ২০২০-এর ০২ ফেব্রুয়ারি চিরবিদায় নিলেন ঢাকায়। একাধারে শিশুসাহিত্যিক, কার্টুনিস্ট, সম্পাদক, সংগঠক, বিপ্লবী ছিলেন। বেতারে সংবাদ পাঠ করেছেন প্রায় ২৫ বছর। সমাজ সচেতনমূলক কার্টুন এঁকেছেন সাড়ে চার হাজার। ছড়া-কবিতা-সংকলন মিলে প্রকাশনা প্রায় ২০টি। একজন নিরাহংকারী, পরোপকারী মানুষ হিসেবেও ছিলেন সুবিদিত।

সত্তর দশকের উপান্তে ঢাকায় গড়েছিলেন ‘অনুশীলন সঙ্ঘ’। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে একই নামে সংগঠন ছিলো। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সেটি ছিলো নিবেদিতপ্রাণ। শেখ তোফা’র সংগঠনটিও বিশেষভাবে স্মৃতিপ্রদ। তরুণদের সাহিত্যচর্চার প্রাথমিক পাঠশালাসম। সাপ্তাহিক সাহিত্য পাঠের আসর বসতো ঢাকায়। কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৪-এর ৯ জুন থেকে। একনাগাড়ে বা বিরতি দিয়ে চলেছিলে ১৯৮৩ পর্যন্ত। বায়তুল মোকাররম সংলগ্ন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দু’তলায়। পঠিত লেখার ওপর গঠনমূলক আলোচনা-পর্যালোচনা চলতো। এর কিছু প্রামাণ্য স্মারক পরবর্তীতে দেখেছিলাম। বন্ধুলেখক আমীরুল ইসলাম, আহমদ মাযহারের সংগ্রহ থেকে। উপস্থিতি, স্বাক্ষর আর আসরের ধারা বিবরণ। লেখক গড়ার কৌশল-কর্মের কিছুটা তাতে প্রতিভাত। অামীরুল, মাযহার ছাড়াও ধারা বিবরণের লেখক অনেকে। আবু হাসান শাহরিয়ার, লুৎফর রহমান রিটন, শরীফ মাহবুব। কিংবা গোলাম মওলা শাহজাদা বা হাসান হাফিজ, নাসির আহমেদ। ছিলেন সৈয়দ আল ফারুক, সৈয়দ নাজাত হোসেন, রুবী। কখনও আহমদউল্লাহ, আনোয়ারুল কবীর বুলু, ফারুক হোসেন।

আশির দশকে নিয়মিত সাহিত্যসভা করে ‘চাঁদেরহাট’। অতঃপর নানাবিধ সংগঠনের বহুমাত্রিক আয়োজন। তবে ‘অনুশীলন সঙ্ঘে’র উদ্দীপনাটি বিশেষভাবে মহীরুহ। কারণ বারুদ মাখানো ক্লান্তির পর তরুণদের সাহিত্যমোদী করা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাহিত্য-প্রজন্ম প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগটি সুমহান।

শেখ তোফাজ্জল হোসেনও বহুমাত্রিক প্রতিভা ছিলেন। পারিবারিকভাবে কৈশোরেই সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত হন। কবিতার ছন্দ অক্ষরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত-স্বরবৃত্ত বিষয়ে ছিলেন দক্ষ। কবি জসীমউদ্দীনের তত্বাবধানে ‘সাধনা সঙ্ঘে’ যোগ দেন। কবি বেনজীর আহমদের শাহজাহানপুরস্থ সাহিত্য আসরেও ছিলেন। ভাষা আন্দোলন-খ্যাত ‘তমুদ্দিন মজলিসে’র পরবর্তীকালের সংগঠক হন। নিজে কবিতা ও শিশুসাহিত্যের চর্চা করেছেন। গদ্য, পদ্য দুটোতেই নিবেদিত ছিলেন। তবে অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন অন্য খাতে। সম্পাদনা আর কার্টুন আঁকার সময়খেকো শিল্পে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে’র দুটি কাগজেই পর্যায়ক্রমে সম্পাদক হন। শিশু-কিশোরদের প্রকাশনা ‘সবুজপাতা’। আবার সব পাঠকের কাগজ মাসিক ‘অগ্রপথিক’। এছাড়া প্রকাশনা বিভাগের পান্ডুলিপি সম্পাদনা। প্রুফ সংশোধনের কাজেও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন।

শেখ তোফাজ্জলের মেধা ছিলো আরেকটি শিল্পে নিবেদিত। সেটি দৈনিক পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের কার্টুন-কর্মে। একাধিক দৈনিকে নিয়ম করে কার্টুনচিত্র এঁকেছেন। ভীষণ মনোযোগ-প্রধান কাজ সেটি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে ধ্যানমগ্ন হতে হয়। প্রচুর পড়তে হয়, ধারণ করতে হয়। অতঃপর বিষয়টিকে ব্যাঙ্গাত্মক রূপ দিতে হয়। বাংলাদেশে কার্টুনিস্ট হিসেবে সমধিক-খ্যাত র’নবী। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, শিক্ষক অধ্যাপক রফিকুন্নবী। ওনার আগে নাম কিনেছিলেন ‘শেখ তোফা’। অর্থাৎ সদ্যপ্রয়াত শেখ তোফাজ্জল হোসেন। তারুণ্যে ষাটের দশক থেকে আঁকতেন দৈনিক আজাদে। পরবর্তীতে দৈনিক জনতা’য়, আমাদের সময়ে। অসংখ্য গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও রেখাচিত্র করেছেন। প্রণিধানযোগ্য কাজ করেছেন রফিকুল হক (দাদুভাই)-এর ছড়াগ্রন্থে।

১৯৬৮ সালে প্রকাশ করেন একুশের সংকলন ‘আবর্তন’। তাতে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে কার্টুন আঁকেন। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সুবিধা বৈষম্য ছিলো বিষয়। একটি গাভী আঁকেন যে ঘাস খাচ্ছে পূর্ব-পাকিস্তানে। অর্থাৎ অবহেলিত অধুনা বাংলাদেশে। আর বালতিতে দুধ দোহন করছে পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থাৎ পালিত গাভীটির মুনাফা ভোগ করছে পশ্চিমারা। উল্লেখ্য, ১৯৬৮-তে জে. আইয়ুব খানের ‘উন্নয়ন দশক’ চলছিলো। কার্টুনটি পাকিস্তানের শাসকপক্ষকে ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন শেখ তোফাজ্জল। কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন টানা ১১ মাস। একই জেলে আটক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও। ১৯৬৯-এর ফেব্রুয়ারিতে গণ অভ্যুত্থানবর্ষে উভয়ে মুক্তি পান। ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের ইতিহাসটি অতঃপর ঘটে।

উল্লেখযোগ্য কোন পদক-পদবী-স্বীকৃতি পাননি শেখ তোফাজ্জল। বাবা শেখ শমসের আলী জীবনে দু’বার সর্বশান্ত হয়েছিলেন। ১৯৪৭- এ দেশভাগের পর পরিবারকে আসাম থেকে স্থানান্তর করেন। ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দে শ্বশুরবাড়িতে। ১৯৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকালে আসামের ব্যবসা হারান। ফলে অনেকটা কপর্দকহীন ছিলো সম্ভ্রান্ত পরিবারটি। শেখ তোফাজ্জল লজিং, টিউশনির মাধ্যমে ঢাকায় স্নাতক হন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি সূত্রে করনিক থেকে উপপরিচালক হয়েছিলেন। স্ত্রী বিলকিস আখতার দেহত্যাগ করেন ২০১৯-এর ডিসেম্বরে। দু’মাসের ব্যবধানে শেখ তোফাজ্জলও পরকালবাসী হলেন। রেখে গেলেন চিকিৎসক ও সাংবাদিক দুই কন্যা।

শেখ তোফাজ্জল হোসেনের রেখে যাওয়া গ্রন্থ প্রায় ২০। জলে-শরীর, পরমপ্রিয়, স্মৃতিপত্র ইত্যাদি কবিতার। ছড়ার লাঠি, শৈশবের ট্রেন, বাছাই ছড়া-কবিতা ইত্যাদি সরল পদ্যের। একগুচ্ছ কার্টুন– সংগ্রহযোগ্য প্রকাশনা। সম্পাদনা গ্রন্থ প্রায় এক ডজন। সম্মাননা হিসেবে পেয়েছেন ‘মনিরউদ্দিন ইউসুফ সাহিত্য পদক’। এছাড়া ‘আনন ফাউন্ডেশন সম্মাননা’ ২০১৬-তে। না, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় কোন প্রণোদনা তিনি পাননি। ১৩ বছর অসুখে বিছানাবন্দি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এই অগ্রসৈনিক। সাভারের নিভৃত এক আবাসনে কেটেছে শেষ দিনগুলো। নিয়তি এই, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে পরলোকগমনে গেলেন ‘বঙ্গবন্ধুর জেলমেট’। মৃত্যুতারিখটি ০২-০২-২০২০, যা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। গ্রীক মাইথোলজী অনুযায়ী সংখ্যাটি ‘পেলুনড্রম’ ধারার। ৯০০ বছর পর সংখ্যাটির সাল হিসেবে প্রত্যাবর্তন। বিশেষত্ব হলো এটি ওল্টালে একই সংখ্যা দাঁড়ায়। ‘পেলুনড্রম’ শব্দ যেমন– কনক, সরস, বাবা, রমাকান্তকামার ইত্যাদি। মানুষ হিসেবে শেখ তোফাজ্জলও ছিলেন ‘পেলুনড্রম’ বৈশিষ্টের। ওপর করলে যা, চিৎ করলেও তা। ভীষণ সাদাসিধে ও সরল অংকে বিশ্বাসী।
স্বর্গবাসী হোক প্রিয়জনেষু– শেখ তোফাজ্জল হোসেনের বিদেহী আত্মা।

পরলোকগমন বিষয়ে কবি শেখ তোফাজ্জলের কবিতা অনেক। কবি রফিক আজাদের প্রয়াণে যা লিখেছেন তা হয়তো নিজেরই কথা-

শব্দবন্ধে বাঁধা পড়ে আছি
কে রয়েছে কাছাকাছি, কে রয়েছে দূরে
কে রয়েছে দূরবর্তী নিজস্ব পুকুরে ছিপ ফেলে-
-কিছুই বুঝি নে-
সোমত্ত বিকেল গেছে, রাত্রি বেড়ে
গহিন নদীর ঢেউয়ে কালোপানা ছবি,
কবিতার পংক্তিগুচ্ছে ডুবে আছে নিশুতি আকাশ-

এসবও হারিয়ে যাচ্ছে, যাবে
তবু কিংখাবে কিছু ফুল রাখাই তো জীবনের দায় ।

চারদিকে শব্দবন্ধ, অভিপ্রায় অনুযায়ী
মুখোশ চাতুরি ছল ভাসে,
নৈরাশ্য পেরোনো কিছু পথরেখা
শিলীভূত আদর্শ চাতাল এবং
কতিপয় মাতালের কবন্ধ শমন
প্রসন্ন বিলাপে ধৃত অগস্থ্য যাবার সিঁড়ি
ধৃতিমান সোপানের লোভ্য অনুপান
-আমরাতো আছি শব্দবন্ধে বাধা