“মহাজন সাব বাড়িত আছেন নি?”
“না, তিনি তো বাড়িত নাই”
“ও, আইচ্ছা আইলে কইয়েন জামাল আইছিলো”
“আইচ্ছা”

মিনিট বিশেক পরে…
“মহাজন বাড়িত নি?”
“না, তিনি সকালে বের হইছে আর আসে নাই”
“আইচ্ছা আইলে কইয়েন উত্তরপাড়ার মার্জিয়া আইছিলো”
“আইচ্ছা’

মিনিট দশেক পরে আরো দুইজন। তার কিছুক্ষণ পরে আরেকজন। এভাবেই কেউ না কেউ আমজাদ মহাজনের বাড়িতে আসতেই থাকে আর বউ মেয়েরা এভাবে উত্তর দিতে থাকে। বর্ষা এলে যখন নদী, খাল-বিল পানিতে টইটম্বুর হয় তখন নদীর উপকূলের মানুষগুলো মহাজনের শরণাপন্ন হয়। অনেকের বাড়িঘর ডুবে যায়, কর্ম থাকে না। আর এই সুযোগে সাহায্যের নামে মহাজন উচ্চ সুদে টাকা ধার দিয়ে মানুষগুলোকে আরো ঝামেলায় ফেলে। কারণ কেউ সুদ চালাতে পারে আবার কেউ না পেরে নিজের ভিটেমাটি ছাড়তে হয়। যারা সুদে টাকা নেয় না তাদের মধ্যে গফুর মিয়া একজন। শত কষ্টেও সে সুদে টাকা নেয় না। এবার তো মহাজন নিজেই বলেছিলো, “গফুর তোর টাকা লাগলে বল। অন্যদের চাইতে তুই কম সুদ দিস।” কিন্তু গফুর একরোখা, সে কখনোই সুদে টাকা নিবে না। বর্ষার এই দুর্দিনে সুদ নেয় বলে তার প্রতি ঘৃণাও বটে।

বৃষ্টির পানিতে গ্রামের রাস্তাঘাটের নাজেহাল অবস্থা। এবারের বর্ষায় অনেকের বাড়ি ডুবে গেছে। অতিবৃষ্টিতে অনেকের ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে। গফুরের ঘরে পানি উঠলেও ডুবে যায়নি। হাটু সমান পানি। তবে গফুর বসে খাওয়ার মানুষ না। প্রত্যেক বর্ষায় কৃষি কাজ না থাকলেও মাছ ধরেই সংসার চালায়। ভোরে নামায পরে মোল্লা সাহেবের নৌকা আর জাল নিয়ে বের হয়। যা পায় তার অর্ধেক মোল্লা সাহেবকে দিয়ে বাকি অর্ধেক বিক্রি করে খেয়ে পড়ে চলে গফুর। তার উপর এবছর নতুন অতিথি। ৫ বছরের সাধনার পর তার মেয়ে হয়েছে আজকে ৭-৮ মাস হলো।

পরেরদিন সকালে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়। গফুর মাছ নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে যায়। অজপাড়াগাঁয়ের মাটির রাস্তা সামান্য বৃষ্টিতেই এতো কাদা হয়, গফুর লুঙ্গি হাটুর উপরে উঠালেও যেনো পা উঠাতে পারে না। বাজারে দেখা মহাজনের। গফুরকে উপহাস করে বলে, “তোর অবস্থার উন্নতি হইবো নারে গফুর। কইলাম টেকা নিতে নিলিনা। উলটা দেমাগ দেখাইলি”
“মহাজন সাব, মরলেও যেন আল্লাহ আপনের কাছে না নেওয়ায়, যারা সুদে টেকা দেয় তারা মানুষ না।”
এই কথা শুনে মহাজন আরো ক্ষেপে যায়। রাগে ফুলে উঠে।গফুর মাছ বিক্রি কতে চাল, ডাল আর মেয়ের জন্য একটা ঝুনঝুনি খেলনা নিয়ে যায়।

গফুর বাহিরে মাচা বানিয়ে দিয়েছিলো।মাচার উপর মাটির চুলায় তার বউ রান্না করে। গফুর বলে, “বউ সাবধানে কাম করিস, মাইয়ারে কোলে নিয়া রান্ধিস। ঘরে কিন্তু সাপ খোপ আসে”।
“আফনে কি যে কন ময়নার বাপ। চৌকিতে রাইখা কাম করি, ডর কিয়ের?”
“তবুও বউ সাবধানের মাইর নাই। মাইয়ার কিছু হইলে থাকতে পারমু না”।

কয়েকদিন পরে গফুর মাছ নিয়ে বাজারে যায়। সকাল থেকে বৃষ্টি হওয়ায় বাজারে লোকজন কম। মাছ তেমন বিক্রি হয়নি। বেলা গড়াচ্ছে। গফুরের বউ রান্না বসাবে। মেয়ের হাতে ঝুনঝুনি দিয়ে বাহিরে সে রান্না করতে আসে। বর্ষায় প্রতিবছরই এমন হয়। বাহিরে মাচায় রান্না করতে হয়। খানিক পরেই মেয়ের কান্নার শব্দ শুনে ঘরে এসে দেখে ঝুনঝুনিটা পড়ে গেছে তাই কান্না করছিলো। মেয়ের হাতে ঝুনঝুনি দিয়ে আবার রান্নার জন্য বাহিরে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার কান্নার শব্দ শুনে কিন্তু ঘরে আসে না। ভাবে হয়তো আবার খেলনার জন্যই কাঁদছে। বেশ কিছুক্ষন পরে রান্নার কিছু একটা নিতে ঘরে এসে গফুরের বউয়ের চোখ কপালে উঠে। তার মেয়ে পানিতে পড়ে গেছে। এখনো মরে ভেসে উঠেনি। কিন্তু পরিস্থিতি খুব বাজে। তাকে কোলে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। বাহিরে বের হবে এমন সময় গফুর আসে বাসায়। এমন অবস্থা দেখে গফুরও পাগলের মত হয়ে যায় কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে ঘরে নিয়ে পেটের উপর চাপ দিয়ে পানি বের করে। এতে কিছুই হয় না। গঞ্জে হাসপাতালে যাওয়া দরকার কিন্তু নৌকা, টাকা কিছুই নেই।

দৌড়ে মোল্লা সাহেবের বাড়িতে গেলে তাকে পায় না। মোল্লা সাহেবের বউ তাকে নৌকা নিয়ে যেতে বলে। নৌকার ব্যবস্থা হলেও টাকার জন্য পাগলের মত ঘুরতে থাকে। গ্রামের রহিম চাচাকে নৌকায় করে গফুর তার বউ মেয়েকে পাঠায় গঞ্জের হাসপাতালে। আর নিজে গিয়ে হাজির হয় মহাজনের কাছে টাকা ধার চাইতে। এই সুযোগে মহাজন কড়া কথা আর অশ্রাব্য ভাষা শুনিয়ে দেয় গফুরকে। গফুর হাসপাতালে এসে দেখে পেটের পানি বের করেছে কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দরকার যার জন্য টাকা জমা দিতে হবে। গফুর আবার আসে মহাজনের কাছে। তার পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে। কিন্তু মহাজন দিবেনা, সে নারাজ। সে বলে, “তুই তো মইরা গেলেও আইবি না কইছিলি। তা মাইয়া খান মরলেই আসিস কিছু টেকা পইসা দিমুনে”।
গফুর অশ্রু চোখে হাসপাতালে এসে দেখে তার বউ পাথরের মত বসে আছে। রহিম চাচা জানায় ডাক্তার চিকিৎসা করেনি। মেয়ে মারা গেছে।
গফুর কথাটা শুনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কান্না আর আসছে না। গফুর এক পর্যায়ে বলে, “উঠরে বউ, আমাগো টেকা নাই, স্বপ্নও নাই। তারা সুদ খায় না, গরিবের রক্ত চুইষা খায়। পত্তেক বর্ষায় তাগোর পৌষ লাগে আর সর্বনাশ হইলে হয় আমাগো।”