জলসুন্দর চোখ

এতকিছুর পর, স্বাধীনতার ঘাম জমে দাদ রিং সীমানায় দানা বেঁধে কাঁটা তার,
মাঝে বক্তব্যের খেলা
বক্তৃতা হয়ে বেজে চলছে আর বাজিয়ে চলছে।

আঘাত পেয়ে জলঘরে চোখের জল
ঢেউ তোলে; জোয়ারভাটায় ধুয়ে যায় মাটি কার !
কার মাটি, কার জন্য পড়ে থাকে ?

সহনশীলতার পরিচয় দিতে গিয়ে জলসুন্দর চোখ
বুকের মাটি টের পায়– অসুখ
জলের মতোই গড়ায় জল,
জলের দরেই মানুষ কিনে বেঁচে

দিনের বক উড়ে গেলে অসংখ্য হায়না
জুড়ে বসে পুনরায় শিকার করবে বলে।
…………………………………………..

স্বাধীনতার হাজতবাসের পর

আর হাঁটতে পারছি না আমরা
এই দেখো, পায়ের তলা
ঠিকানাবিহীন খরা মাঠ

বুকের দোয়াতে হেমন্ত সুর
শীত আসবে বলে সব রক্ত শিরা পথে
ভাটিয়ালী গায় ফাটলের কাছাকাছি
কাকড়ের হাতে ধারালো তুলি
অসুস্থ, মানচিত্র আঁকে সময় সময়

স্বাধীনতার হাজতবাসের পর
গণতান্ত্রিক হাঁটা রোগ !
কুয়াংচৌ থেকে দুরবিনে কার চোখ জানা নেই
তবে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের কথা বললেই
গলার কাছে চাইনিজ- চেকার !

একদিন এই হাঁটা পথেই জন্মাবে অমানুষখেকো গাছ।
…………………………………………..

একটি নদীর জন্য

একটি নদীর জন্য ঈশ্বর হতে পারে না মানুষ,
গা ভাসায় আর ভেসে যায় জলে।

আমার মুহুরী জানে-
কল্পচিত্রের মত আক্ষেপ ছোড়ে জীবন
মৃত্যুর আগে,
নিজের নদী চিনতে পারে না মানুষ,
আমিও পারিনি।

আক্ষেপের পর নদীটি ভাগ হয়।
একটি ধারা চোখ থেকে ঝরে যায়,
একটি ধারা আগামীর পথে মানুষ খুঁজে বেড়ায়।

ধারাটি এগিয়ে যায় বহুদূর বিস্তার ছড়িয়ে মনের দিকে
যেখানে ঈশ্বর ঈশ্বরের চেনা এবং পিপীলিকাধিকার

ধারাটি একদিন বড় হবে, নদী হবে;
একটি নদীর জন্য ঈশ্বর হতে পারে না মানুষ।
…………………………………………..

পজেটিভ

আমার চতুর্দিক ঘিরে করোনা বিলাপ
ঘরের অন্ধকারে মুখ ভারি কবুতর

বিলাসী মানুষের সুখের অসুখ
এঘর ওঘর হয়ে জানালা জুড়ে বসে,
বাইরে জীবন মানেই খেলনা
জানালায় বসে জানালায় দেখি
নিরন্ন মানুষও তা-ই
খোলা আকাশের…
বর্ষাভেজা গা, কালো মুখ, চেঁচিয়ে বলছে-
পাশের বাড়িতেও পজেটিভ !

পাশের বাড়িটিও…
…………………………………………..

গতি ও সূত্র

১.
এই যে মানুষ, চারপাশে
হেঁটে দৌড়ে এগিয়ে পিছিয়ে, প্রতিদিন

শরীর ভাঙছে
ভেতর পুড়ছে
বেরিয়ে আসছে গরম বাতাস

এখানে পোড়া দাগ ভিন্ন চোখের ছবি
যখন নজরে আসে অনেক দেরি হয়ে যায়।

২.
এক শরীর ভেঙে
কার জন্য, কী উপযুক্ত করে নেয় সময় ?

জানি না, মানুষ কার জন্য
কার কাছে ঋণ
না কি পাওনাদার হলেই বদলে যায় সব ?
একদিন শেষ দিন, চুপ হয়ে যেতে হয় !

কখনো সময়ের চোখাচোখি হলে
দৃষ্টির সিঁড়িতে পা রেখে ঢুকে যাবো কাল গহ্বরে।

৩.
আমি এক গাছ তলায়
চারপাশে নিউটনের ছায়া শরীর,
উপরে পাকা ফল

মাটিতে পড়তেই গড়িয়ে যায় নদীর মতো,
তারপর সব ধোঁয়া, আকাশের।

৪.
গ্রাম থেকে শহর
শহর থেকে গ্রাম
নজর রেখেছে চন্দ্রবিন্দু।

৫.
সময় বলছে, গা ঢাকা দিয়েছে মানুষ,
ভেতরে পাখিটি, প্রাণের জন্য তাল ঠোকে

আলো ফুটলেই যদি আকাশ খোলা
মন ভোলা পাখি ডানা মেলে উড়ে যাবে
দূরে যাবে, বহুদূরে…

চন্দ্রবিন্দু স্থির হবে মাথার উপর।
…………………………………………..

চরকবাই

আসলে চরক কোনও চড়ক নয়।
চরকিও না।

কেউ মনে করো, আমার গ্রাম
জাতের সংস্কৃতির শব্দতলা, চড়কগাছ, হয়তো
ইংরেজের গন্ধ শুঁকেছে বিদায় জানাতে।

ইতিহাসের বুকে কান পেতে শোনো
উনিশ এর এক জনজাতির শব্দের ঝনঝন,
জরিপ করে রেখেছে চরকবাই।

একবার পেছন ফিরে তাকালে–
হাট বসে,
বাজার হতে চেয়েছিল,
হয়নি, বরং বেড়েছে ক্ষুধা।

মাটির বাসন চিৎকার করে কেঁদেছিল একদিন
এখনও শব্দ হয় বাসন মাটির।
…………………………………………..

ত্রিভূজ

এমন ঢাল বেয়ে হেঁটে যেতেন বাবা
তারও আগে হেঁটেছেন কেউ অথবা অনেক
এখন আমি।
চূড়ায় পাহাড় স্টেশন
তারপর পথের কোন উপরিপথ নেই,
যেখানে উচ্চতা শেষ আকাশের বুক ফোঁড়ে বিন্দু
স্থির থাকে না শরীর।
বাবাকে গড়িয়ে পড়তে দেখে
আমিও পা রাখি পাহাড়ি পথে,
পায়ের পর পা উপরে উঠছি যতই
বাবা উল্টো দিকে…
সমতল থেকে চেয়ে থাকে মা
স্থির দৃষ্টি থেকে দু’টো নদী বেঁকে যায় দুদিকে,
এক নদী প্রসবের রক্ত মোছে আরেক নদী সিঁথি…
…………………………………………..

যাপন

সুতো ছিড়ে উড়ে গেছে ঘুড়ি
লাটাই হাতে চেয়ে আছি আকাশের দিকে
এখানে পাখি হয়ে যায় সব
ঘুড়ি মেঘ প্রাণ, ওড়ে,
উড়ে উড়েই মুছে সব রঙ

অবুঝ আমি, হারিয়েছি শৈশব
চাকা ঘুড়ি কুতকুত তা
আজকাল আকাশ দেখার সময় কই
বহুদিন মেঘের সাথেও হয় না কথা
ঘুড়ির মতো সুতো ছিড়বে বলে ছটফট করছে পাখি।
…………………………………………..

পোড়াসলতের ধোঁয়া

ছোটবেলায় এমনই জ্বলতে দেখেছি কেরোসিনের বাতি,
পোড়াসলতের একগাদা ধোঁয়ায় সন্ধ্যার দরজা খুলে গেলে
অন্ধকারের প্রথম প্রহর দেখেছি বাবার মুখে,
সব ধোঁয়া মা’র চোখের খাঁজেই কেমন ছবি হয়ে যাচ্ছিল !
সামান্যই আলো,
তারপর একেকটি দীর্ঘ রাত…

মধ্যরাতে বাতিটি নিভে গেলে
একটি ধোঁয়ার নদী, মিছিলে,
বাইরে শেয়ালডাকা মাঠ।
নির্ঘুম রাত ভয়াল নদীটি পেরিয়ে আসে,
আলোর কাছে খুঁজতে দেখেছি জীবনের লাশ।

সময় গড়িয়ে নতুন সময়,
দিনের পর দিন এসে বদলে যায় সব
বাতির আলোয় উজ্জ্বল হাসি, ধোঁয়াবিহীন
কেরোসিনের বাতিগুলো পুরনো ঘরে
অকেজো জিনিসের স্তুপে এদিক ওদিক

অনেকদিন পর আবার জংলি শেয়ালের ডাক শুনি
সন্ধ্যা হতে না হতেই, ধোঁয়াবিহীন বাতির চোখে ঘুম
অজানা ভয়
কাহিনীর মোড় ঘুরে যাচ্ছে নাটকীয়ভাবে…

অতঃপর ঘরের ভেতর উঁকি দেবে পুরনো বাতি,
মুখে ছবি আঁকবে পোড়াসলতের ধোঁয়া।
…………………………………………..

ভাতের জন্য

অসংখ্য কবিতা মরে নিরন্ন আমি
স্বাধীনতার পথে পথে
হাঁটি, একা
এদিকে ওদিকে
যেদিকে মিছিল

ভাতের জন্য ভারতের মুখ চেয়ে।