গোলাম মোহাম্মদ (১৯৫৯-২০০২) বিংশ শতকের অষ্টম দশক বা আশির দশকের অন্যতম মেধাবী কবি। কবিতা গান আর চিত্র কলায় তিনি তার মেধার অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন। কাব্য প্রতিভার গুণে তিনি তার কালকে অতিক্রম করে এখনও সমান বহমান। অত্যন্ত আধুনিক মননের কবি ছিলেন তিনি। প্রকৃতি, বিজ্ঞান, আর্দশ চিন্তাও মৃত্যু ভাবনা তার কাব্যেরপ্রধান বিষয়। মাত্র ৪১ বছরের জীবনে তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
১. অদৃশ্যের চিল : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭। প্রকাশক ঃ সুবচন প্রকাশনী,
২. ফিরে চলা এক নদী ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮। প্রকাশক বাংলা সাহিত্য পরিষদ,
৩. হিজল বনের পাখি : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯। প্রকাশক ঃ স্বচ্ছন্দ প্রকাশনা সংস্থা,
৪. ঘাসফুল বেদনা। ফেব্রুয়ারি ২০০০ স্বচ্ছন্দ প্রকাশনা সংস্থা,
৫. হে সুদূর হে নৈকট। ফেব্রুয়ারি ২০০২ স্বচ্ছন্দ প্রকাশন।

শিশুতোষ গ্রন্থ দু’টি যথা :
১. ছড়ায় ছড়ায় সুরের মিনার মে ২০০১। প্রকাশক : বাংলা সাহিত্য পরিষদ,
২. নানুর বাড়ি। আগস্ট ২০০২। প্রকাশক : স্বচ্ছন্দ প্রকাশন।

আশির দশক ব্যাপি তিনি লিখেছেন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। লিটল ম্যাগে তার কবিতা ছাপা হয়েছে। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছে পরের দশকে অর্থ্যাৎ নব্বইয়ে।সুবচনের সাহসীকতা ও ভালোবাসায় গোলাম মোহাম্মদ অদৃশ্যের চিলের ডানায় ভর করে কাব্য জগতে দৃশ্যমান হলেন। তার ৭টি গ্রন্থের মধ্যে ৪টির প্রকাশক স্বচ্ছন্দ প্রকাশক। স্বচ্ছন্দ এর প্রকাশক কবি জাকির ইবনে সোলায়মান গোলাম মোহাম্মদকে ভীষণ ভক্তি করতো। তার প্রতি ছিল অফুরন্ত ভালোবাসা। আজ সেই প্রকাশক কবি জাকির ইবনে সোলায়মান ও একবুক ব্যথা আর অনুরাগ নিয়ে গোলাম মোহাম্মদ এর মতো অল্পকালেই না ফেরার দেশে চলে গেছে। একজন কবি বাঁচিয়ে রাখে তাঁর গ্রন্থ। গোলাম মোহাম্মদ ভালো লিখতো কিন্তু তার গ্রন্থ প্রকাশের বিলম্ব দেখে আমরা খানিকটা চিন্তিত ছিলাম। মৃত্যুর মাত্র ৫ বছরের পূর্ব থেকে তার ৭টি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। তার মধ্যে অবশ্য হে সুদূর, হে নৈকট্য ও নানুর বাড়ি, তার মৃত্যুর পরপরই প্রকাশিত হয়। গোলাম মোহাম্মদ লোকান্তরিত হলেও তিনি বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন তাঁর কবিতা ও গানের কিছু অমর পঙ্ক্তির জন্য।
যেমন:
১. সেই সংগ্রামী মানুষের সারিতে
আমাকে ও রাখিও রহমান, যারা কোরানের আহবানে
নির্ভীক নির্ভয়ে সব করে দান (তাঁর গানের কলি)

২. হলদে ডানার সেই পাখিটা
এখন ডালে ডাকে না
মনের কোণে রঙিন ছবি
এখন সে আর আঁকে না।

৩. হিজল বনে পালিয়ে গেছে পাখি
যতই তারে করুন কেঁদে ডাকি
দেয় না সাড়া নীরব গহীন বন
বাতাসে তার ব্যথার গুঞ্জরণ।
এসব তার গানের জনপ্রিয় কিছু পঙ্ক্তি। কবি গোলাম মোহাম্মদ ভবিষৎ দ্রষ্টা যেনো বর্তমান বিশ্বের নিপীড়িত জনপদ তার লেখার জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়।
যেমন: শুকুন উড়ছে মাথার উপরে বন্ধুরা সাবধান
চায় নিশাচর হোক চিরতার
আলোকের অবসান।
রাত্রি যতই বাড়ে কাছে আসে ততদিন
বেদনার পরে সুখ সুবাসিত রঙিন
গ্রীষ্মের পর বর্ষা এবং
সবুজের উত্থান।
গৃষ্ঠিনী ভাবছে ঘরে ঘরে হোক লাশ
জনপদ হোক উজাড় বাড়ুক দীর্ঘশ্বাস।
কবির এ চারটি পঙ্ক্তির মতো আরও অসাধারণ পঙক্তি রয়েছে অনেক কবিতায়। অত্যন্ত আধুনিক চিত্র কল্প ও চিন্তার প্রোটন ফুটে ওঠে তার কবিতায়। তিনি অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করলেও তার হৃদয় ও চিন্তার সমন্বয়ে শব্দের যে বুনন তা মহা সম্রাটের মতো। বৃষ্টি ভেজা বৃক্ষেরা স্বপ্নরত শ্লীম রমণীদের মতো এমন বোধ ও আধুনিক চিত্রকল্প আমাদের কবিতায় খুব একটা বেশি নেই। চিরতার উষ্ণ কাপে মুখ রেখে অনাগত সঙ্গীতের সুরকে ছেয়ে দেখার দুর্দান্ত সাহস, অসাধারণ নৈপূন্য ও নতুনত্ব দেখিয়েছেন কবি গোলাম মোহাম্মদ। গোলাম মোহাম্মদের কাব্যের চিত্রকল্প ও আধুনিক উপস্থাপনা তার কবি শেরপাকে অনেক উর্দ্ধে তুলে ধরেছে। তার চিত্রকল্প গুলো অত্যন্ত শক্তিশালী, অত্যন্ত আধুনিক। এজন্য তিনি অসাধারণ কবিত্বের অধিকারী জীবনানন্দ দাশ গোত্রীয় একজন বড় কবি। আমার এ উচ্চারণ নির্মোহ কাব্য বিচার থেকে তার কাব্যের ওপর আরও অনেক গবেষণা হওয়া দরকার। তার দেশাত্ববোধক ও আর্দশবোধক কবিতার কিছু পঙ্ক্তির ফররুখের মতো আর্দশবাদী কবিদের সম গোত্রীয়। এই কবির আরও কিছু চমকপ্রদ চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি:
১. মধ্য মাঘে এখন বটের পাতায় আনচান বসন্ত
চটকার গম্বুজ ভরে বসন্তের অপেক্ষা
ডালিয়ার সুন্দরকে তছনছ করে দেয় ফাল্গুন
(বিস্তৃত বসন্ত / অদৃশ্যের চিল)

২. আয়নিক বন্ধনে সোডিয়াম – ক্লোরিন যেমন- খাদ্য লবণ হয়ে যায়
পরমাণুর সূক্ষ্ম হাতে হাত রাখে হ্যা-না আয়ন।
(বিশিষ্ট রসায়ন/ঐ)
একজন কবি বেঁচে থাকেন তাঁর কাব্য প্রতিভার কারণে। কাব্য প্রতিভার বৈশিষ্ট্য নির্মিত হয় নতুন চিত্রকল্প, আধুনিক শব্দের কারুকাজে আর কাব্য রচনার নতনত্ব ও নিজস্বরীতির ওপর। উপরোক্ত চিত্রকল্প গুলো সাক্ষ্য দেবে কবি গোলাম মোহাম্মদ একজন আধুনিক কবি, চিত্রকল্পময় অমর এক কবি প্রতিভা। এ কবির জন্য বলতে ইচ্ছে করে-
কবিরা কি মরে?
না মরে না, কবিরা কখনো মরে নাই
মরে না মরে না,
কবিরা নবির ছায়া,
রাজার অধিক দূর্দান্ত সম্রাট যেন এক
ছুঁয়েছে আকাশ যার মস্তকের অবিনাশি কেশগুচ্ছ,
পাগড়ীর উষ্ণিশ কোন সাহাবি কিংবা নবীর
না কবিরা মরে না, মরে নি কোন কবি কোন কালে,
তাকে যতই আগুনে পোড়ানো হোক চড়কবৃক্ষে ঘৃতঢেলে,
তিনি দীপ্তিমান ইব্রাহিম কোন
তার কেশাগ্রে শান্তির পায়রারা চুমো খায়।
ফাঁসি দেবে?
বৃক্ষের ডালে ঝুলিয়ে পায়ে হাতে
পেরেক পিটিয়ে দারিদ্রের নিষ্ঠুর অম্লাগ্নি জ্বেলে,
না তাকে মারতে পারবে না,
সে কখনো মৃত্যুর কাছে মাথা নোয়ায় নি,
সে চির বিদ্রোহী
সে মরে নি।
তার নিউরোণে রক্তের লাল পান্নারা দানা বেঁধেছিল
কেউ বোঝে নি রক্ত গোলাপ,
সে যতই চলে যাক
শিউলি শরতে ঘোর প্রভাতের শীসে,
সে প্রত্যেক প্রত্যুষে হৃদয়ে জেগে ওঠে
সে এখন হাঁটছে মগবাজারের
রেলক্রসিং পার হয়ে প্রীতি প্রকাশনে
কিংবা সেই আমল জোসনার শিল্পকোণে,
কিংবা কোন শিখরে মিনারে
সপ্ত আকাশের নক্ষত্রে নক্ষত্রে
মানুষের অন্তরের গৃহকোণে,
দুর্বিনীত কলমের ঠোঁটস্পর্শে
সাদা কাগজের বিমল শয্যায়।
সে এখন বসবাস করে অনন্তের রেললাইন ধরে
উজ্জ্বল রেস্তোরায়,
মখমল বিছানো সবুজ জলসায়
নূর মসজিদের প্রার্থনায়
সে এখন শহরের সমস্ত
সাহিত্য আসরের উজ্জ্বল উপস্থাপক,
মৃদু হেসে চাঁদ ছিঁড়ে দিচ্ছেন ঠোঁটের বোঁটা থেকে;
তার বুক পকেটে কবিতা,
প্যান্টের পকেটে শার্টের বোতামে
হাতে ডানায় পাখায়
সমস্ত শরীরে মেখে আছে স্বর্ণালি কবিতা,
তার কাঁচা পাকা দাড়ি
চোখের মিম্বরে লটকে ছিল
চিংড়ি মাছের ঝাঁকের মতো
অজস্র রূপালি কবিতা,
আনকোরা কাগজের শরীরে যেন বা নিজেই
উজ্জ্বলন্ত কবিতার পতাকা।
তাকে তো এখনো হাঁটতে দেখি
সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে
বিনায়াবনত কোন এক বিশ্বাসী নাবিক কবি
শহরের অজস্র সড়কে।