স্বামীর সাথে মাগরিবের নামাজ শেষে চা খেয়ে মোসলিমা খাতুন ডাইনিং টেবিলে প্যাড রেখে একখানা চিঠি লিখতে বসলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে উঠে বেডরুমে ঢুকলেন।
কিছু না বলে নিজের পাশ থেকে স্ত্রী’র নীরবে উঠে যাওয়াতে সায়েম মহম্মদ স্ত্রী’র কাছে গিয়ে বললেন, আমার পাশ থেকে কিছু না বলে চলে এসে বুকের নিচে বালিশ দিয়ে লুকিয়ে কী লিখছো?
: তোমাকে আগে থেকে দেখাবো না বলেই তো এখানে চলে এলাম!
সায়েম মহম্মদ স্ত্রী’র এমন কথা শুনে তার গায়ের ওপর পা তুলে জড়িয়ে শুয়ে বললেন, তাহলে তো লিখতেই দেয়া যাবে না। তুমি এমনভাবে লিখছো, যেন কোনো কলেজ পড়ুয়া মেয়ে তার নিষিদ্ধ প্রেমিককে লিখছে!

:আর তাই বুঝি তুমি এই বুড়ো বয়সে স্বামীগিরি ফলাতে এলে?
:কাকে চিঠি লিখছো?
:তোমাকে না দেখিয়ে পোস্ট করবো না। এখন সরো তো! লিখতে দাও!
:ভুলে যেও না তোমাকে এ বয়সেও তন্বি-তরুণী রাখতে আমারই ভূমিকা!
:সবই তোমার ভূমিকা। বিধাতা পুরুষ আমাকে তো আর নিজের করে রূপগুণ কিচ্ছুটি দেননি!
:শোনো, প্রতিদিন সকালে আমি তোমার আগে ঘুম থেকে উঠি। একথা তুমি অস্বীকার করতে পারবে?
:দরকার কি অস্বীকার করার?
:তাই তো প্রতিদিন নিজের জন্য উষ্ণ জলে মধুসহ একগ্লাস লেবুর শরবত বানাতে গিয়ে আমি দুই গ্লাস বানিয়ে ফেলি। আর তুমি ঘুমে থাকতে তা তোমাকে বিছানায় নিয়ে খাওয়াই। না হলে আজো তোমার লাবণ্য সেই প্রথম দিনের মতো থাকতেই পারতো না! যখন আমি ঢাকায় থাকি না, তখনো কোনো কোনোদিন ভুলে দুই গ্লাস বানিয়ে ফেলি!
:তুমি যখন বলছো আমার লাবণ্য প্রথম দিনের মতো আছে। আর এ নিয়ে আমি তর্ক করবো, অত বোকা আমি নই! কারণ তুমি তো জানোই আমি কার ছেলের বউ!
:সে আর বলতে! তবু বলছিলাম, কাউকে প্রথম পরিচয়ের শুরুতে না বলে দিলে সে ভাবতেই পারবে না এই তরুণী বঁধুটি দু’জন ডাক্তার ছেলেমেয়ের মা!
:তাতে আমার কোনো ভূমিকা নেই। সেটা প্রকৃতিগত। মানে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া।
:কিছুটা আমার লেবু মধু যোগে গরম জলেরও গুণ…

মোসলিমা খাতুনকে আজ তার কলেজে অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ দেয়া হলো। তার জীবনের সেরা এই দিনটিতে আজ সবচেয়ে যার কথা তার মনে পড়ছে, তিনি তার শাশুড়ি। শাশুড়ির পরিবর্তে এমন খবরটি প্রথমই অন্য কাউকে বলবেন, এটা তিনি ভাবতেই পারেন না! শাশুড়িকে আজো মোসলিমা চাচী ডাকেন। নিজের মা এখনো জীবিত থাকলেও তিনি মা’কেও সে চাচীর বিকল্প ভাবতে পারছেন না! তাই প্রথম চিঠি লিখে তাকেই খবরটা দিচ্ছেন মোসলিমা।

ঘোর অমাবশ্যার সেইরাতে পথের আলোর জন্য যদি তিনি পাটখড়ি জ্বালিয়ে সেদিনের লিমাদের বাড়ি না যেতেন, কি হতো লিমার ভাগ্যে। হতে পারে কোনো বড় চাকরিজীবীর সাথেই তার বিয়ে হতো। কিন্তু তিনি কি আজকের মোসলিমা হয়ে উঠতে পারতেন! অসম্ভব। কিছুতেই নয়।
তবু তার মনে হয়, বড় ডিগ্রি, বড় চাকরি অর্জন করলেও গতানুগতিকতার বাইরে তিনি কিছু করতে পেরেছেন বলে তিনি মনে করেন না। তবে তিনি চেষ্টা করেছেন, ছাত্রছাত্রীদের মনপ্রাণ ঢেলে শিক্ষা দিতে। ক্লাসের পড়ার বাইরেও সারা পৃথিবীর উৎকৃষ্ট উদাহরণগুলো তাদের সামনে টেনে এনেছেন। তার নিজের বিষয় বাংলা সাহিত্য ছাড়াও নতুন সব তথ্য নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করেছেন। তিনি নিজে যা শিখেছিলেন, তা শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নয়, তা বিলানোর জন্যও। আর বিলাতে বিলাতে অর্জিত বিষয়টি ভিন্নরূপে তার নিজের হয়ে উঠেছে। তার বাড়ির দুয়ারও তার ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত। এ জন্য তিনি সবার কাছে স্বতন্ত্র একজন।

তবু তিনি ভাবেন, যেন একটি সাধারণ আটপৌরে মানুষকে তিনি অতিক্রম করতে পারেননি। সততায়-আদর্শে। মানবিকতায়। মনের জোরে। এত শক্তি-সাহস তিনি কী করে পেতেন! লিমা মোসলিমা হয়ে উঠতে উঠতে যতবার সে এই মানুষটির সাথে মনে মনে আলাপ জমায়, ততবারই তার মন গেয়ে ওঠে, …তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও সুগন্ধ,/ তেমনি করে আমার হৃদয় ভিক্ষুরে/ কেন দ্বারে তোমার নিত্যপ্রসাদ পাওয়াও না ॥’
আসলে জন্মের পর থেকেই তো তাকে একটু একটু করে দেখা। কই, ওভাবে তো আর কারো ছবি মনে ভাসে না! তার সমস্ত প্রহরগুলো কেন সেই চাচী এসে জুড়ে থাকেন। তিনি শাশুড়ি হওয়ার পরও লিমা তাকে মা অথবা আম্মা ডাকতে পারেননি। ওই ‘চাচী’ সম্বোধনেই তার প্রাণ মধুতে জড়িয়েছিলো। তাই তার ঘরে বউ হয়ে গেলেও নতুন সম্বোধনে তা পাল্টাতে হয়নি!

তার ওই চাচী ডাকের ভেতরেই এত দরদ ছিলো যে, মা অথবা আম্মা ডেকে তখনকার লিমাকে সম্পর্কটি ভরাট করতে হয়নি।
লিমার পুরো নাম মোসলিমা খাতুন। কিন্তু সবাই মোসলিমাকে ছোট করে ডাকতো লিমা। লিমাদের বাড়ি থেকে মাত্র দু’বাড়ি পরে ছিলো আলী শেখের বাড়ি। মোসলিমার দাদা অন্য গ্রাম থেকে এসে ওখানে সস্তায় পাঁচ একর জমি কিনে পুকুর বাগানসহ চারপাশে পরিখা কেটে বিশাল বাড়ি করেছিলেন। কাছাকাছি কিনেছিলেন অনেক ফসলি জমি। বন্দরে আছে তাদের পূর্ব পুরুষের আড়ৎ। এই গ্রামে বসতি গড়া তার দাদার যৌবনে। তার বাবা-চাচাদের তখন শিশু বয়স।

মোসলিমা জন্মেই দেখেছেন আলী শেখের পাঁচ ছেলেমেয়ে ও তাদের সবার জীবন যাপন। মোসলিমার চোখের সামনে এখনো ভাসে বয়স্ক হলেও শক্ত-সমর্থ আলী শেখ লাঙ্গল কাঁধে চার ছেলেকে বকতে বকতে জমিতে নিচ্ছে, কেন তারা জমিতে যেতে এত দেরি করে। প্রতিদিন কেন তাড়িয়ে নিতে হয়। এভাবে প্রতিদিন খেটেখুটেই তাদের পেটের ভাত জোটাতে হতো।
একে একে ওদের ছেলেমেয়ের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। তার ওপর আলী শেখের একমাত্র মেয়ে রাজিয়া ফুপুও তার দুই বছরের ছেলে হারুনকে নিয়ে বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে এসে ওঠে। হারুনরা বড় হতে হতে আলী শেখের রথ পড়ে আসে। তার কথা আর কোনো ছেলে আগের মতো মান্য করে না।
একদিন আলী শেখ স্ত্রী’কে বললো, তুমার ছাওয়াল মাইয়েরে কও, স-ব জুদা অইয়ে যাক। কামাই-কাজে কারুর মন নেই। আর সব বিষয়ে এট্টুহানি জাগার ভেতর এত্ত খেয়োখেয়ি ভালো নাগে না! তারা মনে হরে, তাগে বাপের গাঁঠিতি টাহা জম্মায়। তাই দিয়ে বাপ পুরো গুষ্ঠিরে চালায়ে নেবে।

জুদা হওয়ার কথা যখন উঠেছে, তার প্রতিধ্বনি ছেলেদের কানে পৌঁছুতেই সবাই এককথায় রাজি। সবার তখন ভাবখানা, ভিন্ন হয়ে যেতে পারলে যেন প্রতিদিন বাবার অধীনে থেকে বাধ্যতমূলক কাজে যেতে হবে না। প্রতিদিন এমনি এমনি খাওয়া জুটে যাবে।
আলী শেখ মানুষটা মানুষ হিসাবে খারাপ ছিলো না। বাপ হিসাবেও নিরপেক্ষ। তাই তিনি তার ছোট বড় ঘর দু’খানায় যার যার প্রয়োজনানুসারে ভেতরে হোগলার বেড়া দিয়ে ভাগ করে দিলেন। বড় ছেলের বউ অবশ্য এ বাড়িতে আসার বছর দুয়েকের ভেতর নিজের উদ্যোগে নিজেদের জন্য আলাদা একখানা ঘর তুলেছিলেন।

অন্যসব ভাগাভাগিতে এক-আধটু কম পড়লো যার, ভাগে সে নিম রাজি হলেও বাপের সামনে উচ্চবাচ্য করতে সাহস পেলো না। তারপর আলী শেখ তার নিজের পাঁচ বিঘা জমি মৌখিকভাবে পাঁচ ছেলেমেয়ের ভেতর বন্টন করে দিলেন। শর্ত হলো চার ছেলে তাদের মা-বাবা দু’জনকে একসপ্তাহ করে খাওয়াবে।

বোন রাজিয়াকে ভাইদের সমান একবিঘা জমি দিলে আলী শেখের চার ছেলের চার বউয়ের ভেতর তিন বউই তাদের যার যার স্বামীকে মন্ত্র শোনাতে লাগলো, ‘ভাই যা পায়, বুন পায় অর্ধেক। তোমরা চার ভাই মিলে আব্বারে কও!’
আলী শেখের বড় ছেলে আফজাল শেখ বাদে আর তিন ছেলে তা তাদের বাপকে যেই বলতে গলা বাড়িয়েছে, আলী শেখ ঘরের বারান্দার চালের সাথে গুঁজে রাখা গরু পিটানো পাচুনখানা টেনে বার করতেই তিন ছেলে ঘরে ঢুকে যার যার বউকে কিলঘুষি মারতে মারতে বলতে লাগলো, আমার বাপের সম্পত্তি আমার বাপ তার মাইয়েরে কতটুক দেবে না দেবে, তোগে কাছে জাইনে দেবে নাকি? তোরা বাপের বাড়িরত্তে কে কতটুক আনছিস?’

চার ভাইয়ের মাথাপিছু সেই একেক বিঘা জমিতে আর একেক পরিবারে কী হয়। তার ভেতর নতুন ছেলেমেয়ে জন্মানো তো ঠেকে নাই। আগে থেকেই আলী শেখের ছেলেরা অন্যের জমিতে কাজ করতো। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসাও করতো। তা ছাড়া যে কোনো কাজেই তার চার ছেলে বাপের মতো পটু ছিলো। ফিরোজার স্বামী পুলিশ বিভাগে সেপাইয়ের চাকরি করতো। রোড এক্সিডেন্টে তার স্বামী মারা গেলে রাজিয়াকে সরকার থেকে যে টাকা দেয়া হয়েছিলো, রাজিয়া তাই যক্ষের ধনের মতো নেড়েচেড়ে খেতো। সেই টাকার থেকেই কিছুটা দিয়ে আলী শেখ তাকে ছোট হলেও একখানা মজবুত টিনের ঘর করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোর ছেলে যেন না ভাবে পরের বাড়ি আছি। তারে বুঝতি দিতি অবে, ঘরডা তার বাপের টাকার। আর ঘরের জমিডা তার মার। এ জমিতে তার মামাতো ভাইবুনির মতো তারও সুমান হক! এইটা ভাবতি না শিখালি সে পরমুখা স্বভাবের অইয়ে বড় অবে, আমি তা চাই না!
রাজিয়ার জন্য নতুন টিন কিনে ঘর বানানো হলে দেখা গেলো সে ঘরখানা বাড়ির অন্য ঘরগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে। তার ওপর আলী শেখের বড় ছেলের বউ রাবিয়া সুলতানা তাকে নিজে ব্লাউজ-পেটিকোটসহ বাচ্চাদের পোশাক বানানো শিখিয়ে দিয়েছেন। একটি শেলাই মেশিনও তিনি নিজের টাকায় ননদকে কিনে দিয়েছিলেন। তারপর বাচ্চাদের ফ্রক-শার্ট-প্যান্টের ছবি বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে দিতে থাকলেন। কিছু ডিজাইন নিজে হাতে এঁকে দিতেন, একদিন তার চারপাশে গোল হয়ে কাজ দেখা কৌতূহলী মেয়ে-বউদের বললেন, কাউকে মাছ না দিয়ে তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দিতে হয়, বুঝলে তোমরা? এই যে আমি রাজিয়াকে এগুলো শেখাচ্ছি, তোমরা দেখো, রাজিয়া এই কাজগুলো এত ভালো পারবে, যে আশপাশের সবাইকে তার কাছে আসতে হবে এগুলো তৈরি করতে!

কিন্তু মুশকিল হলো, হাঁড়ি-কোলা, ঘরের রুম ভাগাভাগির আগে ছেলেরা যেভাবে মা-বাবার দায় স্বীকার করে নিয়েছিলো, পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো, তাদের দু’জনের পাত পর্যন্ত ছেলেদের ভাত পৌঁছাতে গড়িমসি হয়। যে যার মতো বাড়ি ঢোকে। খেয়ে-না খেয়ে, কম খেয়ে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে গলগল-কলকল করে আবার বেরিয়ে যায়। আলী শেখ আর তার স্ত্রী’র তখন পেটের ক্ষুধা ছড়িয়ে যায় শরীর থেকে মনে। তাদের জোয়ানকালের কথা তাদের মনে পড়ে যায়। ছেলেমেয়েরা তাদের ছোটবেলা বাড়ি ঢুকে প্রথমেই মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরতো। কোথায় কী ঘটলো সব এসে মা-বাবার কাছে ঊর্ধ্বশ্বাসে বলতো। স্বামী-স্ত্রী দুজনের কারো তখন সময় ছিলো না শিশুসন্তানদের মুখে পাড়ার অগোছালো খবর শোনার। কিন্তু তারা তাদের হাতের কাজ করতে করতে ভান করতো, যেন সবই শুনছে! কিন্তু এখন তাদেরকে শোনানোর জন্যও ছেলেদের আর কোনো কথা নেই। মেয়েও ঠেকায় পড়েছে বলে বাপের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এটাও আলী শেখ ও তার স্ত্রী ভালোই বোঝে।

আলী শেখ এখন প্রায়ই আক্ষেপ করে বলে ওঠে, যার যার ছ্ওায়াল মায়েরে ভাত খাওয়ায়ে হাঁড়ি উপুড় কইরে রাহে। আর কয়, আইজ রান্দা অইনাই! ভরা হাঁড়ি আর খালি হাঁড়ির শব্দ শুনতি শুনতি এহনো যদি না বুজি, কার গরে কী রান্দা অয়… পাবি, তোরা এর পতিদান পাবি… তয় আমি দ্যাখফো না এই আর কি! সিডাই বালো। সুন্তানের দুর্দিন আর কিডা দেখতি চায়! তোগে সুদিন আসুক বরং তাই য্যান আমরা দেইহে মরি!

প্রতিদিন শ^শুর-শাশুড়ির একই ধরনের শাপ-শাপান্ত শুনতে শুনতে ভিন্ন হওয়ার মাস ছয়েক পর একদিন, আলী শেখের বড় ছেলে আফজাল শেখের স্ত্রী রাবিয়া সুলতানা তার ঘর থেকে নেমে মধ্যউঠোনে দাঁড়িয়ে শ্বশুরের উদ্দেশে বলে উঠলেন, ‘আব্বা, আপনি ক্যান আপনার জমি পাঁচ বিঘা সবাইকে আগের থেকে দিয়ে দিলেন? আর এখন ক্যান আপনার অন্যের ঘরের ভাতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়? আপনাদের দুইজনকে আমি আগেও বলছি, আপনারা প্রতিদিন তিনবেলাই আমার ঘরে খান।
আলী শেখ বলে ওঠে, রক্তে যে টান পড়ে বড় বউ! তো এহন কি জমি ফিরাইয়া নেবো? তুমি কী কও? জমি লেইহে তো আর কেউরে দেইনাই!
বাড়ির বড় ছেলে আফজাল শেখ। আফজাল শেখ খুব নিরীহ টাইপের একটা মানুষ না হলেও তার মুখে মানায় না এমন কথা সে কারো প্রতি উচ্চারণ করে না। আর তা হয়েছে যাকে নিয়ে সে সংসার করছে তার প্রভাবে। তাই বাড়ির কোনো নাকাল অবস্থায়ই তার কোনো উচ্চবাচ্য থাকে না। কিন্তু তার স্ত্রী’র কথা ঠাসঠাস। তিনি সেই উঠোনে দাঁড়িয়েই বলে উঠলেন, এই আমি বললাম, এই আজকের থেকে আপনাদের দুইজনের দায়িত্ব আমার। আর কোনো ঘরের ভাতের অপেক্ষা আপনারা করতে পারবেন না!
আলী শেখ বলে উঠলো, কী কও বড় বউ? তোমার ছাওয়াল মাইয়ে ডাঙ্গর অইয়ে ওঠছে। বড় দুইজন স্কুলির বড় ক্লাসে ওঠছে। তুমাগেই কত খরচ? আফজালের দোকান তো ওইটুক এট্টা!

বড় বউ বললেন, আপনি তাইলে আপনার ছেলের দোকানের টাকাই হিসাব করছেন? আপনার বউমার রোজগারটা দেখেন নাই? যাক, সে সব আপনার ভাবতে হবে না। চারটে ভাতের জন্য মা-বাপ হয়ে আপনারা বিলাইয়ের মতো অপেক্ষা করেন। ইজ্জতহীনভাবে আপনারা কবরে গেলে আমার ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে লাভটা কি? তাদের অস্তিমজ্জার ভেতর বসবাস করবে পূর্বপুরুষের আত্মমর্যাদাহীন এক ছবি। তারা মানুষের চোখের দিকে কখনো সোজা দৃষ্টিতে তাকাতে পারবে না! আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে কয়েক পুরুষ লাগে। কথাটা আমার দাদাকে বলতে শুনেছি।
আলী শেখ তার বড় ছেলের বউয়ের কথায় হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেয়। বলে, মারে আমি কী পুণ্য করছিলাম, যে ভালমন্দ কিছু না বুঝেই তুমারে আমি ঘরে আনছিলাম…
রাবিয়া সুলতানার মেট্রিক পরীক্ষার কয়েক মাস আগে তার বাবা মারা যান। রাবিয়া সুলতানার আর পরীক্ষা দেয়া হয় না। কিশোরী রাবিয়ার জন্য পাত্র খোঁজা শুরু হলে, আলী শেখ অনেকটা দয়া করেই রাবিয়াকে বউ করে আনেন। রাবিয়ার বাবা প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার ছিলেন। তারও তেমন কোনো জমিজমা ছিলো না। রাবিয়াকে কোনো যৌতুক দিতে পারেনি বলে, আলী শেখকে তার বাড়ির মানুষেরা বলতো, ‘শ্যাখ, তুমি ছাওয়াল বিয়ে দিয়ে ঠইকে গেছো!’ আলী শেখ সোজা-সাপটা বুদ্ধির মানুষ। বউ যে কিছুটা লেখাপড়া জানা, এটাও যে একটা বলার বিষয়, তা বলেও আলী শেখ কারো কথার পাল্টা জবাব দিতে পারেনি। বরং তার মনে হয়েছে, লেখাপড়া সে আর কি! এখন তো ঘরে ঘরেই ছাওয়াল-মাইয়েরা স্কুলে যায়। তার নিজের ছেলেমেয়েরাও তো কোনোটাই একেবারে মূর্খ না। বাড়ির কাছে প্রাইমারি স্কুলের সব কয় ক্লাসই তো সবাই পড়ছে। এখন তার নাতিপুতিরা সবাই দল বেঁধে সেই তার বাপ-চাচাদের স্কুলে যায়। তবে হাইস্কুল বেশ দূরে। পাশের গ্রাম পাইককান্দিতে। বড় ছেলের ছেলে দুটো সেখানে যায় পড়তে।

রাবিয়া সুলতানা জোর দিয়ে বলার পর সেদিন থেকে সত্যিই আলী শেখ আর তার স্ত্রী অন্যকোনো ছেলের ঘর থেকে ভাত আসার অপেক্ষা করেন না। মোসলিমার তখনকার শিশু চোখের সামনেই পরিবর্তনটা ঘটতে থাকে। পরবর্তী সময় যতই লিমা ওই বাড়িতে গেছেন, আলী শেখ আর তার স্ত্রী’র কথাতে আর কোনো আহাজারি শুনতে পাননি। মুখের রুক্ষ-সূক্ষ্ম হাভাতে ভাবটাও তাদের ক্রমে মিলিয়ে যেতে থাকে। রাবিয়া চাচী তার ছেলেমেয়ে তিনটিকে শিখিয়েছিলেন প্রতিদিন স্কুলে যেতে দাদা-দাদীকে বলে যাবে। তাদেরকে রেখে কোনো কিছু খাবে না। সম্মান করে কথা বলবে।
মোসলিমা স্বয়ং রাবিয়া চাচীকেই দেখতেন, যে কোনো কাজে তিনি তার শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে পরামর্শ করছেন। প্রতিবেলা, রান্না করতে গেলে শাশুড়িকে বলেন, ‘আম্মা এইবেলা চাল কতগুলো দেবো?’ শাশুড়ি জানতে চাইতো, আগের ভাত কতগুনো আছে? তারপর সে যা বলতো, তা-ই যে চাচী রান্না করতেন, তা নয়। কিশোরী মোসলিমা একদিন রান্নারত রাবিয়া সুলতানার পাশে পাটি বিছিয়ে আরো ক’জনের সাথে অংক করতে করতে জানতে চাইলেন, আচ্ছা চাচী, দাদী যা বলে, আপনি তো তা রান্না করেন না। আপনি তো আপনার মতো করেন! তাহলে কেন জিজ্ঞেস করতে যান দাদীর কাছে?

মোসলিমার মা’র সাথে রাবেয়া চাচীর খুব ভাব ছিলো। রাবিয়া সুলতানা মোসলিমাদের বাড়িতে বেশি যেতেন না। আর সেটা হতো তিনি সময় পেতেন না। তবে মোসলিমার মা নিজেই সম্পর্কে পাড়াতো জা এই রাবিয়া সুলতানার জন্য এটা ওটা নিয়ে আসতেন। মোসলিমাদের চার ভাইবোনকেই রাবিয়া সুলতানা তার ছেলেমেয়েসহ অন্যদের সাথে পড়াতেন। কারণ স্কুলে রাবিয়া সুলতানার ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খুব সুনাম ছিলো। কড়া শাসনে রেখে পড়াতেন তাদের মা। তাই রাবিয়া সুলতানার ছেলেমেয়ে তারেক, সায়েম, সৌমি একসময় মোসলিমাদের ভাইবোনের মতোই ছিলো।
সেদিন মোসলিমার প্রশ্নের উত্তরে রাবিয়া সুলতানা বলেছিলেন, যে মানুষ পাঁচ পাঁচটা ছেলেমেয়ে মানুষ করেছে। এতবড় সংসারটা একা সামলেছে, সেই মানুষটার এখন করার মতো কিছু নেই। অথর্ব। তাই তার বেঁচে থাকাটা যেন তার কাছে অসহনীয় না হয়ে ওঠে! তাই এটা ওটা জিজ্ঞেস করে বোঝাই এখনো তার বেঁচে থাকার দাম আছে।

শৈশব পেরোতে পেরোতে মোসলিমা তার এই চাচীর কাছে আরো কত কত প্রশ্ন যে রেখেছেন। তার প্রতিটি উত্তরে মোসলিমা চমকিত হয়েছেন। মোসলিমা একদিন বললেন, আপনি তো আপনার শ্বশুর-শাশুড়িকে এমনিই খাওয়ান। তার ওপর, তারা প্রতিদিন ডেকে ডেকে রাজিয়া ফুপুকে তরকারি দিয়ে দেয়!
চাচী বলেছিলেন, নিজের সন্তানের সামনে কেউ কিছু খেতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর বড় হলে, তোমাদের যখন এমন দিন আসবে, তখন মিলিয়ে নিও।

মোসলিমা যখন উঁচু ক্লাসে উঠে গেলেন, তখন সে আর রাবিয়া চাচীর কাছে পড়তে যেতেন না। তাকে স্কুলের এক মাস্টার এসে পড়াতেন। কিন্তু তারেক, সায়েম, সৌমি ওদের মায়ের সহযোগিতা নিয়ে নিজেরাই লেখাপড়া করতো। তবু মোসলিমাদের থেকে ওদের রেজাল্ট ভালো হতো। চাচী অবশ্য তার বিয়ের পর থেকে বাড়ির প্রায় সব ছেলেমেয়েসহ আশেপাশের স্কুলপড়–য়া সবাইকে লেখাপড়া করাতেন। একসময় নাইন-টেনের ছাত্র-ছাত্রীরাও তার কাছে পড়তে আসতে শুরু করলো। কারণ চর্চার ভেতর থাকতে থাকতে নাইন-টেনের বিদ্যাও তার আয়ত্ব হয়েছিলো। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তার নিজের ছোট ভাইবোনদের পড়াতে পড়াতে তার নাকি এই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো, সবাইকে ডেকে ডেকে পড়ানো। তাই চাচীর শ^শুরের নিজের প্রায় ত্রিশটি পরিবার বসবাস করা অত বড় বাড়ি ছাড়াও আশপাশের সব বাড়ির স্কুল পড়ুয়া কেউ-ই বাকি থাকতো না চাচীর কাছে পড়া শিখতে আসতে।
তিনি প্রায় দিনভর বারান্দায় পাটি বিছিয়ে পড়াতে পড়াতে একদলকে ছুটি দিয়ে আরেক দল নিয়ে বসতেন। ওর ভেতরই চলতো তার সব সাংসারিক কাজ থেকে শিল্পিত ভূমিকাও। কারো রুমালে ফুল আঁকা, সুতার রঙ মিলিয়ে দেয়া। কারো একটা ব্লাউজ বা বাচ্চার জামা কেটে দেয়া। কারো একখানা চিঠি লিখে দেয়া। কারো মেয়ে দেখতে আসবে, তাকে সাজিয়ে বরপক্ষের সামনে নিয়ে যাওয়া। কোরমা-পোলাওটা নিজের চুলোয় রান্না করে দেয়া।

স্কুলে যে কেউ পিছিয়ে গেলে তাদের মায়েরা কান ধরে ধরে রাবিয়া সুলতানার কাছে হাজির করতো। আর সেইসব ছাত্রছাত্রীদের তিনি সারাজীবনের জন্য তরিয়ে দিতেন। এভাবে তার নাম স্কুলের স্যাররাও জানতেন। স্কুলে কেউ খারাপ করলে, শিক্ষরা গার্জিয়ান ডেকে তাকে রাবিয়া সুলতানার কাছে পাঠাতে বলতেন।
রাবিয়া সুলতানার বড় ছেলে তারেক যখন খুলনা থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করলো, তখনই একটা নামকরা মিলে তার চাকরি হয়ে গেলো এবং অল্পদিনের ভেতরে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে তারেককে একটা উঁচু পদ দেয়া হলো। তারেকের এই গৌরব খুব উচ্চকিত হয়ে গ্রামে রটতে লাগলো। যতটা না তা তার মা-বাবা বলে, তার চেয়ে তার দাদা আলী শেখই বলে বেড়ান। এখন আলী শেখ আর বারান্দার বিছানায় দিনরাত এককরে জড়সড় হয়ে বসে থাকেন না। পান ফুরিয়ে গেলে স্ত্রী’র সাথে গালিগালাজ করে ন্যুব্জ স্ত্রী’কে এঘরে-ওঘরে পান আনতে পাঠান না। আলী শেখ এখন তার বংশের তৃতীয় প্রজন্মের প্রথমজনের প্রথম দেয়া কাশ্মিরী অফহোয়াইট শালখানা মজবুত করে গায়ে জড়িয়ে বড় রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে গিয়ে বসে থাকেন আর পৌত্রের গল্প করেন।

আর ওই চায়ের দোকান থেকেই আলী শেখের সমবয়সী মোসলিমার দাদা খন্দকার জমিরউদ্দিন আলী শেখের বাড়ির সব নতুন খবর তার বাড়িতে নেয়া শুরু করলেন। মোসলিমা তখন একবছর আগে মেট্রিক পাশ করেছেন। কলেজে পড়বে এমন স্বপ্ন তাকে কেউ দেখায়নি। কারণ আরেক গ্রামের স্কুলে গিয়ে মেয়েমানুষ মেট্রিক পাশ করেছে, সেটাই অনেক বড় বিষয়! বরং লেখাপড়া কম হলেও অবস্থাপন্ন, পরিবারের নাম আছে এমন পাত্রকেই প্রাধান্য দিয়ে তার জন্য খোঁজা হচ্ছিলো। কারণ তাদের পরিবারের বংশ পরম্পরায় ধারণা, চাকরি যত বড়ই হোক, বেতন আর কত হবে! বরং জমি-জিরাত আছে, ছেলে ব্যবসা বোঝে এমন পাত্র কম বিদ্যান হলেও ভালো।

একদিন মোসলিমা খাতুনের বাবা মোসলিমার জন্য একটা পাত্র নিয়ে আলোচনা করছিলেন। দাদা বললেন, আমরা এই এলাকার ভেতর গণ্যমান্য। একশো বিঘা জমি আমার এখনো আছে। তোমাদের আমি উচ্চশিক্ষিত না করলেও লেখাপড়া তো শিখিয়েছি! ওই বিদ্যাতেও তোমরা চাকরি বাকরি করতে পারতে। কিন্তু আমি তা দেই নাই। কারণ যার যতো টাকা, সম্মানও তার তত, আমি এই মতে বিশ্বাসী মানুষ। এই যে আমাদের আশেপাশে যারা আছে তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে আমাদের আনুগত্য স্বীকার করে আছে। সেহেতু জামাইটা যেন আলী শেখের পৌত্র থেকে যোগ্য হয়। সে ক্ষেত্রে শহরে যে বউমার ভাইয়েরা থাকে, তাদের বলো ভাগ্নির জন্য পাত্র খুঁজতে।

দাদা এবং বাবার কথায় কী ছিলো, মুসলিমার মনে একটা দিক নির্দেশনা চিহ্নিত হয়ে গেলো। মুহূর্তে তার ভাবনার সবটুকু তারেক ছেয়ে ফেললো।
তার মনে হতে লাগলো হাত বাড়ালেই সে তারেককে পেতে পারে। যদি শুধু বাবা আর দাদা রাজি থাকেন! মোসলিমার মনে হতো, একটু ইঙ্গিত পেলে আলী শেখের পুরো বংশ এসে হামলে পড়বে ওদের দাওয়ায়। কিন্তু মোসলিমার দাদা খন্দকার জমিরউদ্দিনই একদিন এক খবর নিয়ে এলেন এবং ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনি নিয়ে সারধরে পাটিতে খেতে বসে খেতে খেতে সে খবর পরিবেশন করেন, আজ চায়ের দোকানে আলী শেখ বললো, তার নাতি তারেককে নাকি মিলের মালিক বিদেশে পাঠাবে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য। সাথে মালিকের মেয়েকেও পাঠাবে। তয় দু’জনকে বিয়ে দিয়ে। তার মানে মেয়েও তারেকের মতো ইঞ্জিনিয়ার।
কেউ টের পেলো না মোসলিমা সেদিন তার সামনের খাবার রেখে উঠে পড়েছিলেন। সেই থেকে তার খাবার মুখে তুলতে গেলে অরুচি হয়। যে তারেক একসময় তাকে সমঝে কথা বলতো, সে এখন তার থেকে এতদূরে! মা-বাবাকে বলার সাহস নেই। কিন্তু সেই কবে থেকে তিনি ভেবে রেখেছিলেন, তারেক এলে তাদের বাড়ি নিশ্চয় আসবে। তখন তিনি নিজেই তাকে বলবেন, ‘আমি তোমার সাথে ঘর বাঁধতে চাই!’ কিন্তু সে আসেনি। অবশ্য প্রতিবার গ্রামে এলেই যে তারেক মোসলিমাদের বাড়িতে আসতো তেমনও নয়। কারণ একটা সময়ের পর যে কোনো বাড়িতে নিজের বয়সী কোনো ছেলে থাকলে আরেকটা ছেলে সে বাড়িতে অনায়াসে যেতে পারে। মুসলিমার ভাই তিনটি তার থেকে ছোট।

সেই যে ছোটবেলা অনেকে মিলে ইট বিছিয়ে, গামছা টাঙিয়ে ঘর বানিয়ে তাদের খেলা হতো। সবাই মিলে মোসলিমাকে বউ বানাতে চাইতো কারণ মোসলিমা ছিলেন সবার থেকে সুন্দর মেয়ে শিশু এবং একমাত্র তারই পুঁতির মালা, ছোট ছোট রঙিন চুড়ি, ইমিটেশনের দুল আর জরিপাড় ছোট শাড়ি ছিলো। একদিন তাকে তারেকের বউ সাজতে দেখে মোসলিমার দাদী কার কাছে খবর পেয়ে, এসে ছোঁ মেরে তুলে টানতে টানতে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো। সেদিন দাদীর চোটপাটে সেই থেকে তারেকদের বাড়িতে গিয়ে তার ওসব খেলা বন্ধ।
কদিন ধরে আলী শেখের বাড়ির আরেক বিষয় নিয়ে জনেজনে কথা হচ্ছে। আলী শেখের দ্বিতীয় ছেলে আফসারের বিধবা মেয়ে রমিজার জন্য ভালো একটা পাত্র পাওয়া গেছে। পাত্রের বয়স একটু বেশি। তবে বিরাট ব্যবসা আছে। ঢাকায় উচ্চবিত্তের এলাকায় বাড়ি আছে। পাত্রের আগের বউ তাকে ছেড়ে অন্যলোকের সাথে একেবারে বিদেশে চলে গেছে।
লোকটির ছেলেমেয়ে দুটিও বেশ বড়। তারা তাদের মতো থাকে। রমিজাকে ছাকু ঘটক গোপালগঞ্জ শহরে নিয়ে সে লোককে দেখিয়েছে।
রমিজাকে লোকটি পছন্দও করেছে। কিন্তু তিনি গ্রামে এই হতদরিদ্র পরিবারের ভেতরে এসে বিয়ে করতে রাজি নন এবং তিনি রমিজার ছেলেকে মাঝে মাঝে কিছু টাকা পাঠালেও রমিজা তার ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে রাখতে পারবে না। এই শর্তে রাজি থাকলে তিনি শাড়ি-গহনাসহ যাবতীয় সবকিছু রমিজাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন, সেসব পরে রমিজা গোপালগঞ্জ শহরে যাবে। সেখানেই কাজী অফিসে বিয়ে হবে। সেখান থেকে তিনি তার গাড়িতে করে রমিজাকে ঢাকাতে নিয়ে যাবেন।

উঁচু ডালের ফল পাড়তে হলে লম্বা আকশি লাগে। তাই অত উঁচুশ্রেণির পাত্রের প্রকৃত খোঁজ-খবর নেয়া সম্ভব হয় না। তবে বিধবা রমিজার ছয় বছরের একটি ছেলে আছে আর তা জেনেও যে শিক্ষিত বিত্তবান লোকটি বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, এতেই পালের বয়স্কজন আলী শেখ বর্তে গেছে। রমিজার বয়স বাইশ। আর লোকটি যতই সুঠাম দেহের হোন, চুল কলপে কালো করুন, যার ছেলেমেয়ে দু’টি ইউনিভার্সিটি পাশ করে নিজেদের মতো থাকতে শিখে গেছে তার বয়স তো অন্তত পঞ্চাশ উত্তীর্ণ হবেই। তাহলে রমিজার থেকে সে কত বড় হয়, এই প্রশ্নটা আর কারো মনে না জাগলেও একজনের মাথায় ঠিকই জেগেছিলো। তিনি কঠোরভাবে মানা করলে তার স্বামী আফজাল শেখের ছোট ভাই আফসার শেখ আর আফসারের স্ত্রী মধ্য উঠানে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে তার উদ্দেশে বলেছিলো, নিজির ছাওয়াল তো দুই হাত ভরে টাকা পাঠাচ্ছে। তাই দিয়ে কাঁচাঘর ভাইঙ্গে পাকা ঘর বানানোর জন্য ইট-বালি কেনছো! আমরাও এট্টু ভালো থাহি, তা চাও না ক্যান? আমাগে তো আর ভালো থাকবার উপোয় নাই। মাইয়েডারে বিয়ে দিলাম, সে বিধবা অইয়ে এট্টা ছাওয়াল নিয়ে ফিরি আসলো। দুইডে টাকা দূরি থাক, গায়ে একভরি গয়না দিছিলাম, তাও জামাইর চিকিৎসা করাতি খুয়াইছে… বিয়ের পর নিজির চিষ্টায় মাইয়েডা আইএ পাশ করলো, এট্টা মানুষও তো নাই যে তারে এট্টা চাকরি দেয়। তা দিলিও তো এট্টা উপোয় অতো! এই যে রমিজার ছাওয়ালডা আছে, তবু তারা দাদা-দাদির কাছতে পাবে নানে ফেইসোডাও। নাই তো দেবে কোহানতে! ছোট মাইয়েডা মেট্টিক ফেল করলো, ওয়ারে দিই কি অবে? তারে বিদেয় হরতিও তো এতগুলোন টাকা নাগবে। তাই বা কিডা দেবে? এট্টা মানষির খাটনির উপর এত্তগুলা প্যাট। আমরা জানি, রমিজা এ বিয়ে বসপে না বুইলা বড় চাচীর পায়ের উপর পড়ছে। কিন্তুক চাচীর কি উচিত না অবুজ মাইয়েডারে বুজানো! তাই কই, আল্লারওয়াস্তে তোমরা আর কেউ এ বিয়েতে বাঁদা দিও না…’

আফসার শেখের স্ত্রী বড়ই বাজখাই। সে স্বামীর ওপর দিয়ে আরো এককাঠি। সে তার প্যাঁচাল অব্যাহতই রাখলো। বলতেই থাকলো, ছাকু ঘটক আমার বাপের বাড়ির কাছের মানুষ। সে মেলা জায়গা-জমিন কিনিছে এইরহম বড় বড় বিয়ের ঘটকালি কইরে।
বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখের দুইদিন আগেই ছাকু ঘটক এলো। ঘটকের তল্পিবাহক হয়ে আসা এক কিশোরের মাথায় বিশাল এক নতুন আধুনিক সুটকেস দেখে জোয়ারের মতো বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়েতে উঠোনসহ বাড়ির ক’খানা ঘরের সবগুলো বারান্দাও ভরে গেলো। মেয়ে রাজিয়ার ঘরের একরুমে আলী শেখ তার স্ত্রী’কে নিয়ে থাকে। সেই ঘরের বারান্দায় সুটকেস রেখে ঘটক বললো, আমার অন্যখানে কাজ আছে। আরেক জাগায় এমন আরেকটা পাত্রীর সুন্ধান পাইছি, তারে আরেক পাত্ররে দেহাতি অবে। আমি যাবো সেইহানে পাশের গ্রামে। আমার তাড়াতাড়ি যাতি অবে। কেউ তোমরা সুটকেসটা খোলো। জিনিসগুনো বুজে নেও।

আলী শেখের বাড়িতে ওরকম আধুনিক সুটকেসের জিনিস বুঝে নেয়ার যোগ্য সৌমি ও সায়েম, ভালো হিসাব বোঝা মানুষ। আর বাড়ির বড় বউ এগিয়ে এলে তো আর কাউকে লাগে না! আলী শেখ তার বড় ছেলের ছোট দুই ছেলেমেয়েকে একসাথে তাদের নাম ধরে ডাক দিলো।
নিজের ঘরে থেকে রাবিয়া সুলতানা শ্বশুরকে ধমক দিলেন। বললেন, আব্বা, সায়েমের ইউনিভার্সিটি খুলেছে। তাকে সকালে ঢাকা পাঠিয়েছি। সৌমি তার খালার সাথে খালার বাড়ি বেড়াতে গেছে। আর এর ভেতর আমরা কেউ থাকবো না! খবরদার বলে দিলাম, সৌমি-সায়েম কেন, ওদের বাবাও যদি এর ভেতর থাকে, তো আমার সাথে বাইরে বোঝাপড়া করে তাকে ঘরে ঢুকতে হবে।

আলী শেখ পারলে তার বড় ছেলের বউয়ের পায়ে ধরে। বলে, মা’রে, তুমার খাই। তুমার ফরি। তোমার পরিচয়ে সারাজীবনের পড়া মাথাডা এহন উঁচা কইরা চলি। কিন্তু ওগুলারে কই ফেলাই, যেগুলারে মানুষ করতে পারি নাই? ভাত দেয় নাই, তারপরেও তো তাগে চিন্তায় ঘোম আসে না।
অবশেষে সবকাজে আগবাড়িয়ে চলা আলী শেখের ছোট ছেলের বউ বড় ভূমিকা রাখতে এগিয়ে এলো। ঘটক তার হাতে চাবি দিলে, ছোট বউ সুটকেস খুলতেই ঠেসেভরা কাপড় চোপড় ঝুপঝুপ করে পড়তে লাগলো।
ভেতরে আরো কি আছে, যে ভুরভুর করে ঘ্রাণে মাটির সোঁদা গন্ধ ঢেকে যায়। মা-খালা-চাচী সহ সবার জন্য শাড়িই দিয়েছে খান বিশেক। তাও অনেক দামি। তার ওপর কনের জন্য আলাদা শাড়ি খানকয়েক। গহনার বাক্স খুলতেই মুরুব্বিরা সব আলী শেখের উদ্দেশ্যে একসাথে বলে উঠলো, শ্যাখ, কোনো শ্যাকরারে ডাইকে গয়নাগুলো দেহাইয়া নেও। এত বড় বড় গয়না। ওজনও যহন মেলা, এগুনো আসল সোনার কিনা…
মুরুব্বিদের কথা শুনে আধা বয়সী ঘটক এমন ধমক দিলো, যে অনেকেরই তাতে পা বেয়ে ভেতরের পানি বেয়ে পড়ার কথা!

রমিজার বিয়ের দিন বেলা বারোটা নাগাদ তারেক বাড়ি এসে হাজির। রাবিয়া বেগম সরগরম বাড়ির ভেতর তারেককে দেখে আঁতকে উঠলেন। বললেন, তুমি আজ বাড়িতে কেন?
তারেক বললো, দাদাভাই খবর পাঠিয়েছেন। রমিজার নাকি বিয়ে? খবর শুনে আমি কিছু টাকা দিতে চেয়েছিলাম না এসে। দাদাভাই, চিঠি লিখে জানালেন, তুমি পুরির বড়। যা হোক একটা কাজ হতে যাচ্ছে, তুমি না এলে আমার আত্মা শান্তি পাবে না!
এই বিয়েতে রাবিয়া সুলতানার অমত দেখে তার স্বামী আফজাল শেখ সেদিন নিজেই সকাল সকাল দোকান খোলার নাম করে কর্মচারি আসার আগেই পালিয়ে আছে। আর সেখানে রাবিয়া সুলতানার নিজের ছেলে কি না তার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে এসেছে খুলনা থেকে! মা’র কাছে আগে চিঠি লিখে কিছু জানতেও চাইলো না! তিনি ছেলেকে নিজের মুখোমুখি করে বললেন, যদি আমার এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া না চাস্, এখুনি চলে যা। এ বিয়ের নামে একটা প্রহসন। আমার সামনে এটা ঘটতে পারে না! এমনও হতে পারে মেয়েটাকে এইসব গহনাগাটি টোপ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ এই ঘটক একবার জেল খেটেছে। তারপর পুলিশকে টাকা ধরিয়ে নিজের এইসব মেয়ে ধরা কাজ বজায় রেখেছে। পাঁচভরি সোনা আর ওই জিনিসপত্রর যা দাম, তার থেকে বেশিই পাবে রমিজাকে বিক্রি করলে। এটা আমার কাছে একটা স্রেফ টোপই মনে হচ্ছে। এইসব কাজ যারা করে, তারা তো আর একা করে না। পিছনে লোক থাকে…

তারেক তার মাকে থামিয়ে বললো, এসব বিষয় আমিও তো কিছু জানি। নাকি? তবে তোমার চোখের সামনেই তো সব ঘটেছে। একদিনের ঘটনায় তো আর পালকি আসেনি! তুমি এসব কথা এদেরকে আগে বুঝিয়ে বলোনি কেন?

: আমি আমার মতো করে আমি বারণ করেছিলাম। আর রমিজাও রাজি নয়। কিন্তু রমিজার মা আর বাবা মধ্যউঠোনে দাঁড়িয়ে আমার সাথে ঝগড়া করেছে। তারা মনে করেছে, ভালো বিয়ে হচ্ছে দেখে আমি হিংসায় রমিজাকে মদদ দিয়ে বিয়েটা ভাঙছি।
: ‘তাই নাকি! তাহলে আমার থাকার প্রশ্নই আসে না’ বলে তারেক মাকে বললো, আসছি যখন চারটে খাবার দাও চলে যাই। শুধু শুধু দাদাভাই আমার সময় নষ্ট করলেন!
রাবিয়া সুলতানা ছেলেকে তাড়াতাড়ি বিদায় করবেন বলে পাতিলে যা ছিলো তাই ঢেলেপুছে খেতে দিতে লেগে গেলেন।

বাড়িতে বিয়ে হবে না। বিয়ে হবে গোপালগঞ্জ শহরে কাজী অফিসে। চন্দ্রদিঘলিয়া থেকে সাথে যাবে ঘটক আর রমিজার বাপ। তাই বাড়িতে বাড়তি মানুষের জন্য কোনো রান্নাবান্না খাওয়া দাওয়ার আয়োজন ছিলো না। রমিজার জন্য পালকি আসাতে কৌতূহলী মানুষে বাড়ি উপচে পড়ছে। এর ভেতর ঘটকের তাড়া, তাড়াতাড়ি রমিজাকে পালকিতে তুলে দিতে।
এদিকে ঘরের ভেতর থেকে তারেকের কণ্ঠ শুনে আলী শেখ দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলতে থাকে, বড় বউ তুমি আমার এমন পতিশোধ নিতি পারো এ আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই! আর খাবো না আমি তোমার ঘরের ভাত… তোমার ছাওয়াল তো আমার বংশের নাকি?

রমিজাকে যখন সাজিয়েগুজিয়ে পালকিতে তুলে দেয়া হলো, তার আর তার ছেলের কান্নায় যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। রাবিয়া সুলতানা ভেতর থেকে বাইরের মানুষের একত্রিত কণ্ঠের হায়হায় রবে রমিজার বেহুশ হওয়ার কথা শুনতে পেলেন। তিনি আচমকা দরজা খুলে বেরিয়ে এসে, ঘটকের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, পালকি ফিরিয়ে নাও। তারপর তার অন্য জা’দের উদ্দেশ্যে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ‘রমিজা যাবে না। ওর গায়ের থেকে শাড়ি গয়না সব খুলে সুটকেসে ভরে দাও!’

সবাই একসাথে আশ্চর্য হয়ে উঠলো। ছলোছলো চোখে কমবেশি সবার কান্না থেমে আপন-পর, ছোট-বড় সবার চোখে একটাই প্রশ্ন, তাহলে?
ঘটক জানে এ বাড়ির বড় বউয়ের একটা আলাদা সম্মান আছে। তার মুখের ওপর কথা বলার বিপদকে সে উপেক্ষা করতে পারলো না। তার ওপর তার বড় চাকরি পাওয়া ছেলে এসে ঢুকেছে বাড়িতে।
বাড়ি ভরা নীরব, উৎসুক মানুষের ভীড়ে রাবিয়া সুলতানা বললেন, রমিজাকে আমি আমার ছেলের বউ করে নিচ্ছি!
তোমরা যা কিছু এনেছো, সবসহ পালকি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। তারপর ছোট দেবর আদিল শেখকে বললেন, ছোট শেখ, বাড়ি ফাঁকা করো আর আপাতত মসজিদের ইমাম সাহেব কোথায় আছে, দেখো। তিনি এসে কলমাটা পড়িয়ে দিয়ে যাক!

বাড়ির মানুষ কারোই আর মুখে রা নেই। কিন্তু তারেক চিৎকার শুরু করলো। বললো, মা এ অধিকার তোমার নেই। তুমি জানো, আমার জার্মান যাওয়ার কাগজপত্র রেডি হচ্ছে। তোমাদেরকে বলেছি তো, আমাদের ইন্ডাষ্ট্রির মালিক তার ছোট মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিতে চান বলে তোমাদের জানাতে বলেছিলেন। আমি তোমাদের জানিয়েছি। তোমাদের অমত হবে জানলে তো আমি এগোতাম না!

রাবিয়া সুলতানা চোখ বড় করে বললেন, বাবা, আমি এতগুলো মানুষের ভেতর কথা দিয়ে ফেলেছি যে। এই যে বাচ্চার কান্না যদি আমার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও আমি না ঠেকাই আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।
: তাই বলে আফসার চাচা আমার শ্বশুর হবে? মা, আমার জীবন এখন আমার! আমি বড় হয়েছি! আর ওরা তোমাকে অপমান করেছে!
: সেটা তারা যা বুঝেছে, করেছে। কিন্তু আমি আমারটা বোঝাই। জীবন সবভাবেই সুন্দর করা যায়। শুধু ধরণটা পাল্টে। আর এতবড় একটি ত্যাগের ফলাফল আল্লাহ তোমাকে না দিয়ে পারবেন না। সবুর করে দেখো!
: না মা, আমি মেলাতে পারছি না!
:তোমার ইন্ডাষ্ট্রির মালিক যদি তোমাকে বিদেশে পাঠানোর যোগ্য মনে করে থাকেন, সেটা তিনি এমনিই পাঠাবেন। অথবা তুমি নিজেই যেতে পারবে। নিশ্চয় আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। পাকিস্তানের কবল থেকে মাত্র দেশ স্বাধীন হলো। মানুষের জীবনযাত্রার মান এখন বাড়তে থাকবে। এ দেশের ছেলেমেয়েদের এরকম বিদেশে যাওয়ার বহু পথ তৈরি হয়ে যাবে। তোমার ইন্ডাষ্ট্রির মালিকের মেয়েকে বিয়ে না করলে যদি তিনি তোমাকে জার্মানিতে না পাঠান, তাহলে সে যাওয়াতে আমার আপত্তি আছে। আমি তোমাদের তিন ভাইবোনকে যেভাবে মানুষ করেছি, রমিজাকেও তোমার উপযুক্ত করে আমি গড়ে তুলবো। আর ওর বাচ্চাটা তো এ বংশেরই সন্তান। ওদের দায়িত্বও তুমি নেবে। মানুষ চাইলে সব হয়। খালি ইচ্ছেটাই আসল! সবারই কেন একই রকম জীবন যাপন করতে হবে! অন্যদের মতো মিলিয়ে সম্বন্ধ করতে হবে!
:কিন্তু মা মানুষ কি বলবে?

:মানুষ তোমাকে আদর্শ হিসাবে দেখবে। মানুষ তোমাকে মানুষ হিসাবে দেখার সাহস পাবে না। দেখবে মহামানব হিসাবে।
ছেলের ওপর মায়ের মতামত চাপানোর একটা জোর তো মায়ের ছিলোই। সে শুভবোধ দিয়েই তো তিনি ছেলেমেয়ে মানুষ করেছেন। তবু রাবিয়া সুলতানার নাভিশ্বাস উঠছিলো একাই ডোবা তরী কূলে টেনে তোলার মতো!
ঈমাম সাহেবকে খুঁজে পেতে আদিল শেখের দেরি হয়নি। দু’দিক থেকে দু’জনকে শুধু অজু করিয়ে বিয়ে পড়ানো হলো।

আর একজনকে দিয়ে আফসার শেখকে তার দোকানে খবর পাঠানো হলো কেজি দশেক মিষ্টি নিয়ে বাড়ি চলে আসতে। কি কেন, স্ত্রী’র আদেশের খালি এমন প্রতিউত্তর পাঠানোর সাহস আফজাল শেখের কোনোকালে ছিলো না। সে তাই মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলেও তার সবকিছু বুঝে উঠতে সময় লাগলো।
মিষ্টি বিতরণের অনেক পরে যারা বাড়ি ছেয়ে থাকলো, তাদের ভেতরে তিনি স্বামীকে ডেকে বললেন, তুমি এভাবে কর্মচারিসহ হন্তদন্ত হয়ে চলে এলে যে, দোকানে তালা লাগিয়ে এসেছো তো?
এই বিয়েতে আফজাল শেখ যারপর নেই ক্ষুব্ধ। তার মনে কত আশা ছিলো ছেলের উঁচু ঘরে বিয়ে হবে। বড়লোক বেয়াই আসবে। মানুষ তাকিয়ে দেখবে। তাই সে না হেসেই বললো, ঠিক মনে পড়তিছে না!
রাবিয়া সুলতানা বললেন, যাক লোকসান হলে আফসার শেখের হোক। তুমি আর ও দোকানে যাবে না।

এবার আফজাল শেখ চোখ বড় করে বললো, ক্যান?
:ওই দোকানে আফসার শেখ বসবে। দোকানে যা কিছু আছে দু’জন কর্মচারিসহ সব তাকে দিয়ে দিতে হবে। সে ওই দোকানের ইনকাম দিয়ে তার সংসার চালাবে। তুমি এখনি দোকানের চাবির ছড়া ওকে দিয়ে দাও। আর তুমি আপাতত বাড়িতে বিশ্রাম নাও। তোমার আরেক ছেলেও লেখাপড়ায় ভাল করছে। তারও ভাল চাকরি হবে ইনশাল্লাহ। তোমাকে আর ওই দোকানে মানায় না! স্বামীকে সাহস দিতে কথাগুলো একটু মজা করেই বললেন রাবিয়া সুলতানা। যেন এই সম্বন্ধটা সবার সয়ে যায়। খবরটা সবাই শুনে যায়। এর ভেতর বৃদ্ধ আলী শেখ তার মেঝো ছেলে আর তার বউকে ঘাড় ধরে এনে তার বড় বউমার পায়ের ওপর ফেললো।
রাবিয়া সুলতানা ছিঁটকে সরে গিয়ে বললেন, ওদের সাথে এখন আর পায়ে পড়ার মতো সম্পর্ক নেই আব্বা। তবে এবার তারা নিজেরা নিজেদের শুধরে নিলে সবার রক্ষা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে যখন যে যার ঘরে যাবে, তখনই আলী শেখের ছোট দুই ছেলের বউ এসে বড় বউয়ের দু’হাত চেপে ধরে বললো, বুজি, আপনি মাইজে ভাইজানের এতবড় উপকার করলেন। অত্ত বড় দোকানডা দিয়ি দেলেন, আমাগে দুইজনারে কী দেবেন, তা আইজই কবেন! আব্বা-আম্মা সাক্ষী থাকুক।

ছোট এই দুই জায়ের আব্দার তখন মন্দ লাগলো না রাবিয়া সুলতানার। তিনি হেসে বললেন, এই পরামর্শ করতেই বুঝি ঢেঁকিঘরের পিছনে গিয়েছিলে? যাক, এখন যা দেওয়ার মতো আছে তা আমি দেওয়ার মালিক নই। তবে তোমার ভাসুর যদি রাজি থাকেন, বাড়ির এই আমাদের ভাগের জমিটুকু তোমাদের এমনি দিয়ে দেবো। তোমাদের উঠোন বড় হবে। আর আমরা যে আমাদের শ^শুরের থেকে ভাগের ভাগ যে একবিঘে জমি পেয়েছি, সেখানা তো এই কাছেই। সেখানে নতুন করে মাটি কেটে বাড়ি বানাবো। এই ইট-বালি সেখানে টেনে নিয়ে যাবো, কি আর করা। কারণ আমাদের এখন বড় বাড়ির দরকার। আমার শেষ বয়সের জন্য একটা স্কুল বানাতে। যতদিন বাঁচি এই না করে তো থাকতে পারবো না! গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে লেখাপড়ায় কাঁচা থাকে বলে, বছরের পর বছর ফেল করে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। সামনে এগোতে পারে না।
উপস্থিত সবার মনে হতে লাগলো, আলী শেখের বড় ছেলের বউ যেন আলাউদ্দিনের চেরাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। যে যা চাচ্ছে, সব দিয়ে দিচ্ছে। বউটার হলো কি! সারাজীবন সবাই দেখেছে কেউ তার থেকে খালি হাতে ফেরে না। আবার তার তো কিছু কমেও না। দিনকে দিন একটু একটু করে বাড়ছেই।
ছোট আর সেজো বউ সরে গেলে একমাত্র ননদ রাজিয়া তার ছেলেসহ এসে বড় ভাবির পাশে দাঁড়ালো। বললো, ‘আমারে যা দেয়ার, তা তো আগেই দিছো। আর আমার কিছু লাগবি বড় ভাবি। তুমি যে এই বংশের কপালে রাজটিকা বসাইছো, এতেই আমি খুশি। তুমি খালি আমার ছেইলেডারে মাথায় হাত দিয়ে দোয়া কইরে দেও, সে যেন তার বড় মামা-মামীর ছেইলেমেইয়ের মতো অয়!’ ননদের কথায় রাবিয়া সুলতানা তাকে বুকে টেনে নিলেন।

সেদিনই বিকেল নাগাদ তারেক খুলনা যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হতে তার মাকে বললো, তোমাকে একটা কথা বলি মা। ভেবেছিলাম বলবো না…
:ছেলেমেয়ে বড় হতে হতে তাদেরও কিছু কথা থাকে মা-বাবাকে লুকোতে। ‘না বলতে চাইলে বলো না!’ রাবিয়া সুলতানা বললেন।
কিন্তু তারেকের ভাব দেখে রাবিয়া সুলতানা আবার বললেন, কিন্তু কথাটা কি, তা না শুনতে পারলে তো আবার আমার মন খচখচ করবে, যে ছেলেটা কী কথা বলতে চেয়েছিলো!

:মা, মোসলিমা আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলো। সে লিখেছিলো, তার বিয়ের জন্য তোমাকে প্রস্তাব পাঠাতে!
:তাই? তুমি কি লিখেছিলে?
:আমি তো লাভলীর বিষয়টা মনে মনে স্থির করে ফেলেছিলাম। তাই এটা মাথায় রাখিনি। ভুলে গিয়েছিলাম।
:লাভলী মানে, তোমাদের ইন্ডাষ্ট্রির মালিকের মেয়ে?
:হ্যাঁ মা!
:বাবা রে যা ঘটলো, এটা দেখতে তুচ্ছ হলেও একটা বড় কিছু ঘটলো। এর পুরস্কার আল্লাহ তোমাকে দেবেন। এতবড় কাজের ফলাফল মানুষের হাতে থাকে না। বংশের সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। একা ওপরে ওঠা নয়, সবাইকে নিয়ে উঠতে চাইলে তার ভেতর একটা শান্তি থাকে। তুমি একা ওপরে উঠবে আর তোমার চাচাতো ভাইবোনরা মানুষের ক্ষেত-খামারে কাজ করবে। কুলিগিরি করবে, এর থেকে কতদূরে নিতে পারবে নিজেকে, যেখানে গেলে এসব ঘটনা তোমার কানে যাবে না। চোখে পড়বে না।
তারেক কিছুটা রুষ্ট চোখে তাকিয়ে মাকে বললো, সব দায় মোচনের দায় এভাবে নিশ্চয় আমার ছিলো না!

:তোমার দাদা-দাদী জীবিত। তারাও যে স্বস্তি পেলেন, তারও তো একটা পুরস্কার আছে! তার সমস্ত জীবনের অবশিষ্ট ভারের কিছুটা আমরা নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম।
:কি জানি মা। আমি এখনো বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছি না।
ছেলের সমস্ত নতুন আশা-ভরসায় আপাতত ছাই ঢেলে রাবিয়া সুলতানা যেন অদৃশ্য শক্তির দিকে সরাসরি তার বরাত ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি আরো বললেন, তোমার বাবার পাঁচ ভাইবোনের ভেতর তিনি সবচেয়ে সহজ সরল। কিন্তু তোমার বাবার ছেলেমেয়ে একাই মানুষ হয়েছে। কারণ কি?

:কারণ তুমি শক্ত হাতে তার সংসারের হাল ধরেছো বলে। তুমি নিজে ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে বাবার থেকে বেশি রোজগার করেছো বলে! বাবার দোকানটাও তো তোমার দেয়া!
:বেশি রোজগার করলেই সবার ছেলেমেয়ে মানুষ হয় না। যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে, যারা অন্যের দুর্দশায় নিজের করণীয়টুকু না করে, তাদের ছেলেমেয়ে কার কাছ থেকে কী শিখবে? আর আল্লাহই বা কেন তাদের ব্যতিক্রম ফলাফল দেবেন! আমি যুক্তির বাইরেও একটা বিশ^াস রাখি। নাহলে আমিও কি বুঝি না, আমি আমার ছেলেকে কোনখান থেকে কোনখানে নামালাম!

তারেক ছুটি নিয়ে আসেনি। তাই যতটুকু সময় হাতে নিয়ে এসেছিলো, ততটুকু সময় পর্যন্ত থেকে সে চলে গেলো। বাড়ির পরিবেশ আজ অন্যরকম। মানুষজনের আনাগোনা চলছেই। আজ আর আলী শেখ বাড়ি থেকে বের হয়নি। দোকানে যায়নি চা খেতে। আজ বরং তার মেয়ে রাজিয়া তার বড় ভাবীর থেকে দায়িত্ব ও উপাত্ত পেয়েছে বড় পাত্র ভরে বাইরের চুলোয় চা বানানোর। বাবার পোতা চাকরি পাওয়ার পর থেকে বাবার চা’য়ের নতুন নেশা হয়েছে জেনে রাজিয়াই আজ মগ ভরে ভরে চা দিচ্ছে। সাথে খড়ির বেড়ার এপাশে আরো চাচীদের সাথে সেঁটে থাকা তার অনভ্যস্ত মা’কেও অভ্যস্ত করার চেষ্টা করছে। বাদ যাচ্ছে না সে চাচীরাও। ওদিকে বড় বউয়ের বারান্দায় বিছানো শীতল পাটিতে গাদাগাদি করে বসা মুরুব্বিদের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে সে ঘন দুধের চা!

আলী শেখের গল্প যারা রাস্তার পাশে দোকানে বসে শুনতো, আজ তারা সবাই তার বাড়িতে এসে শুনছে। আর জেনে যাচ্ছে, বড় রাস্তার কাছে আলী শেখের যে ফসলি জমি, তাতে তার নাতি বড় করে পাকা বাড়ি তুলবে। তার মা পাকা বাড়িতে গ্রামের ছেলেমেয়ের জন্য সাধ্যমতো একটা পাকা স্কুলও করবে। যে স্কুলে লেখাপড়া করলে আর বাইরে প্রাইভেট পড়তে হয় না। আলী শেখের বড় বউমা যখন মুখ দিয়ে বের করছেন কথাটা, তখন তোমরা মনে করো ও বাড়ি হয়েই গেছে! সাথে স্কুলও।

এইসব ঘটনার বিশ বছরেরও পরে গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। সেই তখন অন্ধকার ঘরে জানালার কাছে একা বসেছিলেন মোসলিমা। সেদিন তার মন ভীষণ খারাপ ছিলো। ভাবছিলেন, তারেকদের বাড়িতে আজ যা ঘটলো, আফসার চাচার বিধবা মেয়ে এক সন্তানের মা রমিজার সাথে তারেকের বিয়ে হলো। আর এই তারেককে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখে বিভোর হয়েছিলো। মোসলিমা ভেবেছিলেন, তার চিঠি পেয়ে তারেক অভাবনীয় আবেগে ভাসবে। যা সে একা কেন তার বংশের কেউ কল্পনাও করতে পারার কথা নয়। কিন্তু একমাস পার হয়ে গেলো কোনো উত্তর সে দিলো না! তারপর আবার এমন ঘটনা! রীতিমতো অপমানে জ¦লে যাচ্ছিলেন তিনি।

মোসলিমা জানালার পাশে ওভাবে বসে থাকতে থাকতে পার হওয়া সন্ধ্যায় দেখতে পেলেন, পাটখড়ি জ¦ালিয়ে কে যেন ধীরে ধীরে তাদের বাড়ির দিকে আসছে। তবে কোনো পুরুষ যে নয়, তা বোঝা যাচ্ছে চলার গতি দেখে। আরেকটু পরে তার মনে হলো একজন নয় দু’জন নারী এগিয়ে আসছে। কাছে এলে দেখলেন রাবিয়া সুলতানা চাচী, আর তার মেয়ে সৌমি।
রাবিয়া সুলতানার কণ্ঠ শুনে বাড়ির সবাই যে যার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। এলেন মোসলিমার মাও। চাচী কারো বাড়ি খুব একটা আসেন না বলে সবাই তাকে ছেঁকে ধরলো। তার ওপর আবার আজকের ঘটনা নিয়ে একেকজন একেকরকম প্রশ্ন করে যেতে লাগলো, তিনি কেন এমন আত্মঘাতী কাজটি করতে গেলেন। কিন্তু রাবিয়া সুলতানা কারো প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি কেবলি অন্যান্য প্রসঙ্গ টেনে এনে সবার কৌতূহলকে চাপা দিতে চাইলেন। এর ভেতর আরেক পাশ থেকে মোসলিমার দাদা খন্দকার জমিরুদ্দিন তাকে ডেকে বললেন, তোমার ছেলের কাছে তার কোম্পানির মালিক মেয়ে বিয়ে দিয়ে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন বলে। তা তুমি ছেলেটার ভাগ্যটাকে এভাবে কবর দিলে কেন?
রাবিয়া সুলতানা গম্ভীর হয়ে মোসলিমার দাদার প্রশ্নের উত্তর দিলেন, আপনি ভুল শুনছেন চাচা। আমার ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিয়ে জার্মানিতে পাঠাতে চাননি। ছেলেকে ট্রেনিং দিয়ে আনলে তাদের কোম্পানির উন্নতি করতে পারবে তাই। আর তাদের মেয়েও মেয়ের যোগ্যতায় যাবে। বিয়ে হলে ভাল ছিলো, এই আর কি। হলো না বলে বোধহয় আমার ছেলের বিদেশ যাওয়া ঠেকে থাকবে না। কারণ যোগ্যতা থাকলে অন্য কোম্পানির মানুষের নজরেও সে পড়বে!
: কিন্তু আলী শেখের পরিবারটা তো তাতে জাতে উঠতো!
:এ আপনি কেমন কথা বললেন, চাচা? একজন কৃষকের যদি জাত না থাকে, তাহলে যারা শুধু ফসল বিক্রি করে খায়, যাদের ছেলেরা রাখি ব্যবসার মোটা টাকা গোনে, ফড়িয়াগিরি করে চলে, তাদের জাত থাকে কী করে?
:কথাগুলো কি তুমি আমাকে বললে আফসারের বউ?
:না তো চাচা। যারা ওসব করে তাদের বলছি।’ কথাগুলো বলতে বলতে রাবিয়া সুলতানা যে পথে এসেছিলেন, সেই পথের দিকে পা বাড়ালেন। কারো সাহস হয় না খন্দকার জমিরুদ্দিনের মুখের ওপর কথা বলা কাউকে খন্দকারের সামনে টেনে তাকে ঘরে তুলতে। কিন্তু মোসলিমার মনে হয়, রাবিয়া চাচী তাকেই কিছু বলতে এসেছিলেন। তিনি তাই নিজের ঘরে তাকে টেনে নিলেন, তার আপত্তি সত্ত্বেও। রাবিয়া সুলতানা রুষ্টভাব নিয়ে বললেন, আমি তোমার কাছেই এসেছিলাম। কিন্তু আমি যা বলতে এসেছিলাম, এখন আর বলতে ইচ্ছে করছে না। খেই হারিয়ে ফেলেছি। আসলে আজ যা আমি করছি, আমি যে তা জেনেবুঝে করছি, তা নয়। মনে হলো, এইসব আমাকে দিয়ে কেউ করিয়ে নিলো। আমার মাথার ভেতর হাঁটছে আমার আরো অনেক স্বপ্ন। যে স্বপ্নের একটিও আমার নিজের জন্য নয়। তবে আমি জানি না আমি পারবো কি না রমিজাকে যথাযোগ্য শিক্ষিত করে তারেকের যোগ্য করে তুলতে। তার সন্তানটিকে তার ছায়ায় মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়ে পৃথিবীতে অন্তত দুটি প্রাণের হাহাকার রোধ করতে। মনে হয় একটা মানুষ চাইলে সব ভাঙন রোধ করতে পারে না, কিন্তু কিছু তো পারে! আমি অন্তত সেই চেষ্টাটা করেছি রে মা, যেটুকু আমার সাধ্য ছিলো!
:চাচী, আপনি আমার কাছে কেন এসেছিলেন?
: আজ যাই মা। আরেকদিন না হয় গিয়ে শুনিস!
:চাচী, আমি জানি না, আমার কেন এত কষ্ট হচ্ছে! দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার কষ্টটাই হয়তো আজ আপনাকে টেনে এনেছে!

রাবিয়া সুলতানার দৃষ্টি কেমন গভীর হয়ে ওঠে। তবু তিনি হেসে বলেন, কষ্টটা কি আমার জন্য, যে আমি আসাতে তা লাঘব হবে?
:মনে হয় তাই চাচী। আপনি ছাড়া তো আদর্শ মানবার মতো সামনে কাউকে দেখি না। তাই তো আপনিই জুড়ে আছেন অন্তরের সবটুকু। আমি তো আর কোনো স্বপ্ন দেখেতে শিখিনি। আমি শুধু একজন রাবিয়া সুলতানা হতে চাই! যিনি ভালমন্দ যা-ই বুঝুন, তা তার সবাইকে চাপানোর হিম্মত রাখেন। এখনো তো বিদ্যাটুকু নাড়াচাড়া করতে গেলে আপনিই বিদ্যুতের মতো তাতে চমকে ওঠেন! সব আপনার শেখানো। ক্লাসের পড়া পড়ানোর পরও আপনি বই জোগাড় করে আমাদেরকে পড়তে দিতেন। আপনার সময়ে আপনি কী বই পড়েছেন, সেগুলো পর্যন্ত যতœ করে রেখে আমাদের দিয়েছেন পড়তে। কেন যে বড় হয়ে গেলাম। আর আপনার থেকেও দূরে সরে গেলাম! কেন যে এবাড়ি-ওবাড়ির সেই মধুর দিনগুলো হারিয়ে গেলো। আমাদের এত বড় বাড়িটা আপনার ওই তিন রুমের পুরনো টিনের ঘরের সাথে তুলনা করলে আমাদের বাড়িটাকে আমার খোয়াড় মনে হয়। গতানুগতিকতা থেকে যারা বেরোনোর চেষ্টা করে না! নতুন কোনো কিছুর চর্চা নেই। মান্ধাতা আমলের রীতিনীতি কচলানো ছাড়া।

মোসলিমার সাথে গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায় রাবিয়া সুলতানার। এর ভেতর মোসলিমার মা শ^শুরের ভয়কে তোয়াক্কা না করে তাদের মা মেয়েকে খেতে সেধেছেন। রাবিয়া সুলতানা খাননি। কিন্তু সৌমি পার পায়নি।
রাবিয়া সুলতানা মোসলিমাকে বলেছেন, আজ আমার কোথাও যাওয়ার কথা নয়। কারণ ঝুঁকির ধকলটাতে আমার যে বুক কাঁপছে না, তা নয়। তারওপর মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো রুচি হচ্ছে না। তবু তোমাকে একটা কথা বলতে আসছি। কথাটা হলো, তুমি আবার লেখাপড়া শুরু করো। চার চারটে বছর গ্যাপ দিয়েছো। ক্ষতি বেশ হয়েছে। আমাদের ধারে কাছে কলেজ নেই। প্রতিদিন গোপালগঞ্জ যাওয়া আসা মেয়েদের জন্য অসম্ভব। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। তুমি হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করো। অথবা কোনো আত্মীয় আছে কি না!
:না চাচী। অতো আপন কেউ নেই। আর বাবা, দাদা দু’জনের কেউই রাজি হবে না। একটা দিনের জন্য পাশের গ্রাম মামাবাড়িতেই যেতে দেয় না মা ছাড়া।

:সৌমি মেট্রিক পাশ করলে আমি তো যেখানে যেভাবেই হোক, ওকে যে কোনো কলেজে ভর্তি করে দেবো। মেয়েদের লেখাপড়া করে স্বাবলম্বী হওয়াটা জরুরি। নাহলে তো তারা মানুষই না। ক্রীতদাসী। উপার্জন না করা বউ আর বাড়ির কাজের লোকের ভেতর আমি তো কোনো তফাৎ দেখি না এবং কাজের লোকেরা একবাড়িতে না পোষালে অন্যবাড়িতে কাজ খোঁজে। কিন্তু বিয়ে করে আনা বউ? তার তো খোঁয়াড় পছন্দ হোক না হোক, সংসার মনে করে থাকতেই হয়! সবাই চরিত্র চরিত্র করে, অজ্ঞ-অন্ধজনের ধারণায় যে চরিত্র, তা ধুয়ে পানি খাবে! পরিশ্রম যে মেয়ে করতে শেখে, মোটকথা প্রশিক্ষিত যে কোনো মেয়ের সাথে যে কাউকে হিসেব করে কথা বলতে হয়। খালি সার্টিফিকেট দিয়েও কিছু হবে না। অনেক এমএ পাশ মহিলাকে দেখেছি, প্রাইমারিতে পড়া নিজের ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করানোর যোগ্যতা নেই। তাই অর্জিত বিদ্যাটাকে সব ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে জানতে হবে!
রাবিয়া সুলতানা দম নিতে থামলেও মোসলিমা কথা খুঁজে পাননি। তাই রাবিয়া সুলতানা আবার শুরু করেন, এই যে চার চারটে বছর ধরে পাশ করে ঘরে বসে আছো, দু’চারটে ছেলেমেয়ে পড়ালেও বিদ্যাটা শান হতো। এটা শুধু টাকার জন্য করে না মানুষ। তাই লজ্জার তো কিছু ছিলো না! ছুরি-কাঁচি ধার দিলে যেমন শান হয়, বিদ্যাও ধার না পেলে মরিচা ধরে…
: ঠিক বলেছেন চাচী! এখন তো তাই লেখাপড়া সম্পর্কে ভয় ধরে গেছে, আর পারবো কি না!
রাবিয়া সুলতানা বুঝতে পারেন, ওবাড়ির সবাই যে যার মতো শুয়ে পড়েছে। সৌমির খোঁজ নিয়ে দেখলেন সে মোসলিমার বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে। বাড়ি থেকে বের হতে শাশুড়িকে বলে এসেছেন, খন্দকার বাড়ি যাচ্ছি। দেরি হতে পারে। তবে এত দেরি হবে তা তিনি ভাবেননি! পাশাপাশি বাড়ি বলে কেউ এগিয়েও নিতে আসেনি।
রাবিয়া সুলতানা এদিক ওদিক চেয়ে বললেন, শোনো মুসলিমা, যা বলতে আসিনি, তা-ই এখন বলা শ্রেয় মনে করছি তোমার দাদার কথার পিঠে। আর যা বলতে এসেছিলাম, তা বলে লাভ হবে না…
:চাচী, আপনি যা ইচ্ছে বলেন, শুনতে তো পারি!
:বলতে এসেছিলাম, তুমি লেখাপড়া করো। কিন্তু তোমার তো গা ঝাড়া দিয়ে বেরোনো কোনো উপায় দেখি না!
:ঠিক বলেছেন চাচী।
:আচ্ছা, সায়েমকে তোমার কেমন লাগে?
:কোন হিসাবে?
:যদি বলি স্বামী হিসাবে?
:চাচী, সায়েম আমার থেকে এক বছরের ছোট!
:সে আমি জানি। তুমি ভাবো। আর যদি মনে করো ওকে তোমার পছন্দ হয়, তোমাকে একাই আমার শ্বশুরের ভিটায় গিয়ে উঠতে হবে! কোনো প্রস্তাব পাঠিয়ে আমরা অপমানিত হতে পারবো না!
: তারেক ভাই আপনাকে কিছু বলেছে?
: বলেছে বলেই তো ছেলের পরকালের দায় মিটাতে আসছি। তাকে তোমার চিঠির উত্তর দেয়া উচিত ছিলো। অথবা আমাকে জানানো উচিত ছিলো। তুমিও কি আমার পর! চিঠির কথা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে এই অপারগ কষ্টটা যেন আমার আরেকজন সৌমি পেয়েছে! তুমি চিঠিখানা তারেককে না লিখে তারেকের মাকে লিখতে। তাহলে হয়তো আগেই বিহিত হয়ে যেতো। তবে একটা কথা, আমি তো জানি না, এরি ভেতর সায়েম কাউকে পছন্দ করে ফেলেছে কি না! যদি তা না হয়, তাকে বোঝানোর ভার আমার!
:কিন্তু আমি যে ওর বড়, এটা কি সায়েম মেনে নেবে? আর ও তো লেখাপড়ায় এগিয়ে গেছে। আমি তিমিরে…
:তিমির থেকে আলোতে টেনে নেবো বলেই তো এই পথ ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না!

রাবিয়া সুলতানা মোসলিমাদের বাড়ি থেকে যখন বের হলেন, রাত তখন অনেক। তার আসাটা খন্দকার বাড়ির সবাই দেখেছে চলে যাওয়াটা কেউ দেখেনি। তবে মোসলিমাদের বাড়ির সবাই পরে ভাবছে তারেকের মা মোসলিমাকে কী দিয়ে গেল যে সে অমন আনমনা হয়ে গেলো। মোসলিমা ক’দিন নিজের ভেতরে বিষয়টা চেপে রেখে তার মাকে বললেন। মা সব শুনে বললেন, তার বাবাকে। বাবা বললেন, তার বাবাকে। মানে মোসলিমার দাদাকে। খন্দকার জমিরুদ্দিন তা শুনে সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। বললেন, তোমাদের মাথা খারাপ হয়েছে? আলী শেখ আমার ক্ষেতে কত কাজ করছে। আর তার নাতির সাথে আমার নাতনির বিয়ে?
মোসলিমার দাদি বললেন, বিষয়টা দূরের হলে কথা ছিলো না। কিন্তু বাড়ির কাছে তো। চোখে লাগে। আমাদের ইজ্জত সাত হাত ডেবে যাবে।
মুসলিমার মা বললেন, আম্মা, আপনারা বেঁচে আছেন, তাই আপনাদের ওপর দিয়ে আমার কথা চলে না। তবে মনে হয় সম্বন্ধ করতে অতীত নয়, ভবিষ্যৎ দেখতে হয়। আব্বাই তো খবর নিয়ে আসতো, তারেকের সাথে তার কোম্পানির মালিক তার তারেকের সমান সমান লেখাপড়া করা মেয়ে বিয়ে দিতে চায়! সেখানে আমরা কি? আপনারা আপনার ছেলেদের মোটামুটি লেখাপড়া শিখিয়ে আড়তদার বানিয়ে খালি বছর বছর টাকা বাড়াতে শিখিয়েছেন। এই প্রজন্মেরও একটা ছেলেমেয়েকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আপনারা দেখান না। আপনাদের ছেলেমেয়েগুলোও হয়েছে তেমন। পুরনো গৎবাঁধা নিয়ম ভাঙতে মা-বাবার অবাধ্য হতে হলেও হওয়া উচিত।’

মোসলিমার দাদা বড় খন্দকার আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন তার এই বড় পুত্রবঁধুটির ওপর। বললেন, আমি মরলে তোমরা যা খুশি করো। আমি বেঁচে থাকতে আলী শেখ আমার সাথে একপাতে বসতে পারবো না!
মোসলিমার মা মনে মনে বললেন, তা হলে ততদিনই অপেক্ষা করি!

সায়েম ইকোনমিক্সে এম পাশ করলো। বিসিএসেও উত্তীর্ণ হলো। তার আগেই রাবিয়া সুলতানা মুসলিমা সম্পর্কে একটু বলে রেখেছিলেন। কিন্তু সায়েম তাতে সহজে রাজি হয়নি। কারণ দুটো। প্রথমত মুসলিমা তার বড়।
দ্বিতীয়ত সে মেট্রিক পাশ করে আর লেখাপড়া করেনি।

রাবিয়া সুলতানা ছেলেকে বুঝিয়েছেন, মানুষের দ্বারা সবই সম্ভব। আর মোসলিমা তোমার বড় তা ক’জন মনে রেখেছে! মনে রাখলেই কি, এ বিষয়ে লেখাপড়া করে দেখো, পুরুষের চেয়ে নারী বড় হলেও কোনো অসুবিধে নেই। যদিও নারীরা নিজেরাই তাদের শক্তির সন্ধান পায় না। তবে সময় এসেছে মূল্যায়নের। নিজের থেকে স্ত্রী’র বয়স বেশি এরকম ক’টা উদাহরণ চাও? সত্যজিৎ রায়ের মতো মহান শিল্পস্রষ্টার স্ত্রী বিজয়া রায়ও তার থেকে কয়েক বছরের বড় ছিলেন এবং সে বিয়েটি করতে সবার অমতে গিয়ে সত্যজিৎকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তবু বড় ভালবেসে তিনি সবার অমতে বিজয়াকে বিয়ে করেছিলেন। আরেক কথা, মোসলিমা সব বইপত্র জোগাড় করেছে, সে প্রাইভেট পরীক্ষা দেবে।
:মা বিয়ের বিষয়ে এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটা ব্যতিক্রম।
:আমি চাই আমার ছেলেমেয়েরাও ব্যতিক্রম হোক!
ঘরে বসে পাড়ার স্কুলপড়–য়া ছেলেমেয়ে পড়াতে পড়াতে স্কুলের লেখাপড়ায় মা-ই বারবার ফার্স্ট হবেন এ বিশ্বাস রাবিয়া সুলতানার সব ছেলেমেয়ের থাকলেও, তারা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি নিয়ে এসে মায়ের ওপর আর সে ভরসা রাখতে পারে না। তারপর রাবিয়া সুলতানাকে বাঁকাপথ ধরতে হয়। বলেন, আমি জানি শহুরে উচ্চবিত্ত পরিবারে বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু বাড়িঘরের চেহারা যতই বদল করো, তোমার মাকে তো তারা জানবেন আন্ডার মেট্রিক এক খেটে খাওয়া নারী। যাতে তিনবেলা নাড়ার চুলোয় রান্না করতে হয়। তোমার বাবাকে দোকানদারের আর কি বেশি ভাববেন? কিন্তু খন্দকার তোমার দাদাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলেছেন। তার প্রতিশোধ নেয়াও কি তোমাদের কোনো ভাইয়ের উচিত নয়? গ্রামে ভালো পরিবারে সম্বন্ধ করার ভেতর একটা রাজনীতিও থাকে।

দলে ভারী হওয়া। সেইটা না হয় তোমাকে দিয়ে হলো!

সায়েম বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে না। মায়ের ওপর মৃদু চটে উঠে বলে, মা, ভাইকে বিয়ে দিয়ে তুমি যা করলে, তা আত্মঘাতী কাজ করলে!
রাবিয়া সুলতানা ধীরে ধীরে বললেন, আমি গোড়া থেকে সংস্কার চেয়েছি। এর সুফল এক প্রজন্ম পর আসবে। গোড়ার গলদটা আগে সরালাম। আমি তোমার দাদার বড় পুত্রের স্ত্রী হিসাবে এটা আমার কর্তব্য ছিলো তাকে তার মানসিক বিপর্যয়ের থেকে রক্ষা করা। তিনি যেন শান্তিতে মরতে পারেন। তোমার দাদা আমাদের চরম দুরবস্থার ভেতর আমাকে ছেলের বউ করে এনেছিলেন এবং সারাজীবন আমাকে উনি মায়ের মতো সম্মান করেছেন। বড় মানুষকে বড় প্রতিদানই দিতে হয়! আমি যা করেছি, অনেকটা তার জন্যও করেছি!
সায়েম বললো, কিন্তু তুমি তো বাবার চেয়ে বেশি লেখাপড়া জানা!

রাবিয়া সুলতানা বললেন, এ বাড়িতে কম লেখাপড়া জানা ছেলেদের বেশি লেখাপড়া জানা বউ আরো ক’জন আছেন। তা তোমরা ক’জন জানতে পেরেছো? কার কার শ^শুর কাকে কাকে ডেকে সে কথা বলেন?
সায়েম মুসলিমাকে বিয়ে করতে রাজি জেনে খন্দকার বাড়িরই গরজ উপচে পড়তে থাকে। কারণ সে শিক্ষক হিসাবে একটি সরকারি কলেজে নিয়োগ পেয়েছে। তারপর থেকে খন্দকারদের পুকুরে যেদিন জাল ফেলা হয়, অর্ধেক মাছ চলে আসে আলী শেখের বাড়ি। আর সেই মাছ রাবিয়া সুলতানা মধ্য উঠোনে দাঁড়িয়ে তার চার দেবর-ননদের ঘরে যার যার পরিবারের সদস্যানুযায়ী ভাগ করে দেন। নিজে যা রান্না করেন, বাড়ির অন্যসব মুরুব্বিদের ডেকে শ্বশুরের সাথে একসাথে খাওয়ান। দুই পরিবারের ব্যবধান নিয়ে কথা বলার চেয়ে মানুষ অপেক্ষা করে শুভ কাজটি কবে সম্পন্ন হবে।

মোসলিমাকে বউ করার আগেই রাবিয়া সুলতানা বলেছিলেন, তোমার কাছে আমার একটা শর্ত। আর সেটা তোমাকে পুরণ করতে হবে। তা হলো, বিয়ের পর তুমি সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি অর্জন করবে। এর ভেতর ছেলেমেয়ে পেটে এলে তাকেও রাখতে হবে। লেখাপড়া বাদ দেবে না। ছেলেমেয়ে হলে আমি পেলে দেবো। অথবা তোমার রাজিয়া ফুপুকেও পাশে পাবে। লেখাপড়া শিখে সরকারি স্কুল-কলেজে চাকরি না পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি তো পাবে! অন্তত কলেজে যেন শিক্ষকতা করতে পারো! মোসলিমা সেদিন রাবিয়া সুলতানার কথাগুলো শুনেছিলেন ঠিকই। কিন্তু বিশ^াস করতে পারেননি, তিনি জীবনে তা সফল করতে পারবেন।
মুসলিমা প্রায়ই ভাবেন, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আকণ্ঠ ডুবে চিঠি লিখেছিলাম তারেককে। উত্তর না পেয়ে অনুশোচনায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো। ওপরে ওঠার উজ্জ্বল সিঁড়ি ফেলে আমার চিঠিতে তারেক ফিরতো না এটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তবু যে সে তার মাকে কথাটা বলেছিলো, তাতেই তার মা যে সহমর্মিতা দিয়ে বিষয়টি দেখেছিলেন, নাহলে এরচেয়ে ভাল ঘর-বর দেখে বিয়ে হলেও তার আজকের মোসলিমা খাতুন হয়ে ওঠা হতো না! কে তাকে ইন্টার থেকে লেখাপড়ার সুযোগ দিতো? লেখাপড়ার পরিবেশ তৈরি করা থেকে প্রেরণা যুগিয়ে চলা, এ তো সবার কর্ম নয়! রাবিয়া সুলতানাকে মা বা আম্মা ডাকতেন না মোসলিমা। আগের মতো চাচীই ডাকতেন। সবাই তাতে আপত্তি করলে, রাবিয়া সুলতানা বলেছেন, মায়ের থেকে চাচী আর কতদূরের! ঠিকাছে লিমার যা ইচ্ছে ডাকুক!

মুসলিমা ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেছিলেন। তবু তার কেবলি মনে হতো, সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি অর্জন করলেও চাচীর মতো আলোকিত হতে পারিনি। চাচীর মতো অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে পারিনি। পারিনি জীবনে তেমন একটাও অন্তত মহৎ সিদ্ধান্ত নিতে!
মোসলিমা শাশুড়ির প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যলোচনা করে শিউরে ওঠেন। সমাজ-সংসারের সাধারণ নিয়ম টপকে কেমন করে তিনি এই সিদ্ধান্তগুলো নিতেন এবং নিজের ধারণাতে অটল থাকতেন। স্বামীর সরলতা বা একগুঁয়েমি কোনোটা নিয়েই তিনি কখনো কটাক্ষ করে কথা বলেননি বরং বুঝিয়ে নিজের মতে এক করেছেন, এ বিষয়টাও তার কাছ থেকে শিক্ষণীয় ঠেকে।

পুরনো বাড়ি ছেড়ে নিজ তদারকিতে নতুন বাড়ি করলেন। মেয়ে সৌমিকে আমাদের কাছে রেখে বুয়েটে পড়ার সুযোগ দিলেন। তারপর সৌমি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করলো। এখন সে চাকরি ও সংসার একসাথে করছে।
রমিজাকে নিয়ে তারেক কানাডায় সেটেলড। রমিজার সেই ছেলে, যে তার মাকে পালকিকে উঠতে দেখে দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছিলো, সে এখন কানাডার একটি নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং তারেক রমিজার একটি মেয়ে হয়েছে। সেও ওখানে পরিবেশের ওপর লেখাপড়া করেছে।
মোসলিমা ভাবেন, কোনো কাজে আজো চাচীর তাড়াহুড়ো নেই। এই বয়সে এসে এখনো তিনি সব সময় কিছু না কিছু করছেন। রাজিয়া ফুপুকে যখন চাচী শেলাই কাজ শেখাতেন, মুরুব্বিরা কেউ কেউ বলেছিলেন, ‘বড় বউ, তুমি দেখি সব বানাতে পারো। তাহলে কেন, তুমি নিজে শেলাই করো না?’
উত্তরে চাচী বলতেন, ‘আমার মাস্টারি করতেই ভালো লাগে। আমি যখন থাকবো না, তখনও আমার শেখানো বিদ্যা, আমার বুলি, আমার পরামর্শ মানুষ বয়ে বেড়াবে, এটা ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে।’

রাবিয়া সুলতানা কিছুদিন আগে হঠাৎ মোসলিমাকে আচমকা একটি প্রশ্ন করলেন। যা তার স্বভাবের সাথে যায় না। মোসলিমা একটু বিব্রত বোধ করলেন তাতে! তবু হেসে তিনি বললেন, চাচী, এত বছর পর আপনার মনে এই প্রশ্ন কেন এলো?
:প্রায়ই মনে হয় আমি যেসব সিদ্ধান্ত আমার ছেলেমেয়ের ওপর চাপিয়েছি, আমি খুব বেশি অন্যায় করে ফেলেছি কি না! বিশেষ করে তুমি তো ভালোবাসতে তারেককে। সেখানে সায়েমের সাথে আমি যে জোড়াটা বেঁধে দিলাম, তুমি এবং সায়েম তোমরা দু’জনকে পেয়ে দুজনই সুখি হতে পেরেছো তো? নিজের ছেলেকে তো এ প্রশ্ন করা যায় না। তাই…
:এ প্রশ্নটা কি আপনার এখন মনে এলো, না কি আগেও হতো?
:আগেও হতো। কিন্তু পৃথিবীতে সবকিছুরই ক্ষমতা আছে নিজের থেকে ঠিক হয়ে যাওয়া। তাই আমার বিশ্বাস ছিলো, তোমরা যে যার মতো মানিয়ে নেবে, সেটা সায়েমের সাথে তুমি। তারেকের সাথে রমিজা! কিন্তু তবু তোমাকে নিয়ে একটা খটকা আমার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই জানতে ইচ্ছে করে তোমরা দুজন একে অপরকে নিয়ে সুখি তো?
শাশুড়ির কথায় মোসলিমা ভাবতে লাগলেন, সুখ-দুঃখকে কখনো তো কোনো সংজ্ঞায় ফেলে মাপতে যাইনি! সংসার-সন্তান-লেখাপড়া-চাকরি সব মিলিয়ে জীবনটা তো রেলগাড়ির মতো গড়গড়িয়ে চলছে। তার প্রতি সায়েমের উচ্ছ্বাস যেমন কোনোদিন টের পাননি। তেমনি দায়িত্ব পালন বা মনোযোগেরও অভাব ছিলো না। তারপরও কোথায় যেন আবছায়ার মতো তারেক ছিলো তার মনের কোথাও। বা মোসলিমা নিজেই রেখেছিলেন একটুকরো সোনার কুটোর মতো। সেদিন অতো বছর পর শাশুড়ি প্রশ্নটা করে ভালোই করেছিলেন। সেই তখনই মোসলিমা লেগে থাকা ছায়াটাকে খুব বাহুল্য মনে করে তাড়িয়েছেন। মোসলিমা প্রচ-ভাবে বুঝেছিলেন, তার জন্য সায়েমই যথার্থ।
দুইদিন পরে তিনি শাশুড়িকে উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, চাচী, ইচ্ছে করে সময় নিলাম যে আপনার প্রশ্নটা নতুন কোনো বোধ সৃষ্টি করে কি না। আমি একটি সত্য উত্তর আপনাকে দিতে চেয়েছিলাম। বিশ্বাস করেন, ঘুরেফিরে একটা দৃশ্যই আমাকে একটা কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে নেয়।
:যেমন?
:সেই যে বিকেল নাগাদ আপনি আপনার বড় ছেলের সাথে এক সন্তানের মা, দেবরের বিধবা মেয়ে রমিজাকে বিয়ে দিলেন। তারপর জানতে পারলেন আমি তারেককে চিঠি লিখেছিলাম। সে কথা শোনার পর বেলা থাকতে সময় পাননি। রাতে আমাদের বাড়িতে পাটখড়ি জ্বালিয়ে সৌমিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাটখড়ি জ্বালানো পথের সেই আগুনের আলোটুকুই আমাকে এইখানে নিয়ে এসেছে। বাবা-দাদা আমাকে বড় ঘর-বর দেখেই বিয়ে দিতেন। আমি অবশ্যই বড় ঘরনি হতাম। কিন্তু আমি তো আজকের মোসলিমা খাতুন হতাম না! তাই আমার মনের বাহুল্য আবর্জনা ওই আগুনেই পুড়ে যায়!

রাবিয়া সুলতানা আশ্বস্ত হলেন, তার ছোট বউমার কথায়। কিন্তু তাকে কিছু
বললেন না!
নতুন বাড়িটাতে স্কুল করে, বাড়ির আরো ক’জন শিক্ষিত মেয়েকে দক্ষভাবে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখানোর ট্রেনিং দিয়ে রাবিয়া সুলতানা গ্রামেই থাকতেন। তবু মোসলিমার ছেলেমেয়ে হওয়ার পর প্রায়ই সহযোগিতা করতে তার কাছে চলে আসতেন, ওই মেয়েদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে। ট্রেনিং দেয়া মেয়েদের একজন আফসার শেখের ছোট মেয়ে রাফেয়া। রমিজার ছোটবোন।

রাবিয়া সুলতানা একাই নন, তিনি কখনো তার ছোটছেলের বউ মোসলিমার কাছে ননদ রাজিয়াকেও পাঠাতেন। কখনো শহুরে বাতাস গায়ে লাগাতে পাঠাতেন স্বামীকেও। মোসলিমা শাশুড়িকে বলতেন, চাচী আমিও তো গ্রামেরই মেয়ে। দৌড়-ঝাঁপ করে বড় হয়েছি। আপনার মতো আমিও সব সামলাতে পারি। আপনি পাশে থাকলে আমার সাহসটা বেড়ে যায় বটে। কিন্তু নিজের কাজের ক্ষতি করে আমার সুবিধা-অসুবিধা বড় করে দেখলে আমার ভালো লাগে না!

সায়েম মহম্মদ ঢাকার বাইরের একটা কলেজের প্রিন্সিপাল। প্রতি সপ্তাহেই তিনি ঢাকাতে আসতে পারেন না। কখনো মাসও পার হয়ে যায়।

মোসলিমার ছেলেমেয়ে দুটিই ডাক্তার। নিজেদের কাজে তারা ব্যস্ত থাকে। শাশুড়ির বয়স হলেও যখনি আসেন, মোসলিমা নিজের সাথে সাথে সবখানে তবু তাকে নিয়ে যান। এমনকি নিজের কর্মক্ষেত্র কলেজে নিয়েও কলিগদের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। শাশুড়িকে সামনে রেখে সবার সাথে গল্প করেছেন, কীভাবে তিনি মোসলিমার থেকে একবছরের ছোট সায়েমের সাথে মোসলিমার বিয়ে দিয়েছেন সেই অন্ধকার আমলের গ্রামে। বলছেন, যখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ দূরে থাক রাস্তাও ছিলো না। পাশের গ্রামের হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেছিলাম। তখন বৃষ্টি নামলে হাঁটু সমান কাদা মাড়িয়ে দীর্ঘ পথ যেতে হতো… সেই তখন আমার শাশুড়ি সত্যজিৎ রায়কে তার ছোট ছেলে সায়েম মহম্মদের সামনে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন আমার সাথে বিয়েতে রাজি করাতে।

চিঠিখানা লেখা হলে মোসলিমা সায়েমকে ডেকে বললেন, এই নাও চিঠিখানা। আজ তো বৃহস্পতিবার। রোববার, তরশু কলেজে গিয়ে কাউকে দিয়ে পোস্ট করাইও। তার আগে দেখে নিও, কী লিখেছি। কাকে লিখেছি।
সায়েম চিঠিখানার ভাঁজ খুলে বললেন, ও, মা’কে লিখেছো? ত্রিশ সেকেন্ডে তিনি চিঠিখানা পড়ে শেষ করে মোসলিমাকে পাঁজাকোলে তুলে চক্কর খেতে খেতে বললেন, ‘তুমি প্রিন্সিপাল হয়েছো! আর আমাকে এখনো বলোনি!’

: ভাগ্যিস, বাসার কাজের লোক তখন ছুটিতে ছিলো!