প্রব্রজ্যা

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে কোকিলের ডাক
কাকজোছনায় ঘুমন্ত কোকিলের ভ্রম
কাঁঠালীচাপার শাখাটি জানালায় ঝুলছে
বইয়ের অক্ষরের ঘুম পেয়ে গেল…

বৈশাখী পূর্ণিমায় রাজপুত্র গৌতম ঘর ছেড়েছিলেন।
প্রব্রজ্যা নেবার এটাই সঠিক সময়
ঈশ্বরের পদচারণা শুনতে পাচ্ছি
আজ্ঞাচক্রে জ্বলে উঠেছে পবিত্র শিখা।
…………………………………………..

চৈত্রদিন

সবুজ শুভেচ্ছা পাতার ডাক শুনে
হুড়মুড়িয়ে চলে এসেছে চৈত্রদিন
ফুটে রয়েছে বসন্তের ফুলহার,
স্মিত লাবণ্যে প্রকৃতি অপরূপা-
চৈত্র ঘুঘুর ডাকে বিমনা বধূটি
মেয়েবেলার স্মৃতি -সিন্দুক খুলে রাখে…
…………………………………………..

ষোড়শোপচার

খড়-বিচালির গল্পকথা নয়,
নিকোনো উঠোনের পবিত্রতাও নয়-
চাষীবৌয়ের এঁটো হাতে লেগে থাকে
ছাপোষা দুঃখ- পাঁচালির জল ছাপ,
ষোড়শোপচার সাজিয়ে লক্ষ্মীপুজো করে
গোলাভরা ধানের স্বপ্নে মঙ্গলশঙ্খ বাজায়…
…………………………………………..

বনৌষধি

বৃষ্টিঅরণ্যের মাথায় সূর্যদেবের সপ্তাশ্ব এসে থামল,
শতাব্দী-প্রাচীন আদিম বৃক্ষেরা দুহাত বাড়ায়-
পিতামহ ভীষ্মের মত তারা অরণ্যকে রক্ষা করে,
সুন্দরী অর্কিড, ফুলে ভরা হেলিগোনিয়া রৌদ্রস্নান করবে-
হুড়মুড়িয়ে মেঘের পঙ্গপাল ছুটে এল
মেঘ-বৃষ্টিতে ভেজা ভেজা কুহেলি- অরণ্য..
শাশ্বত অরণ্যের আত্মা যেন কাঁদছে-
উড়ন্ত জলকণা আর নীল কুয়াশা
পার্থিব অসুস্থতার বনৌষধি
রত্নভান্ডারটি আগলে আছে-
মানুষকে তারা চায় না…
…………………………………………..

সত্তা

১) নিজস্ব মুকুলিত সত্তার ভিতরে
চুপ-নদীটি বসে থাকে-
ভালোবাসা জাগলে নদীতে জোয়ার ওঠে…
২) কবির চৈতন্য জুড়ে মেঘলা আকাশ
প্রতিটা কবিতা জুড়ে হিমকুচি আলো-
কবিতার গোত্র চেনাবে কে ?
৩) সরোবরের টলটলে জলে, গোপনে
আঁচল পেতে চাঁদ ধরেছি-
কাকজোছনা করেছে আড়ি…
৪) সমবয়সী মেঘের সাথে
চুটিয়ে এক্কা-দোক্কা খেললাম-
সোনালি চুলের পুতুলটা হাসছে..
…………………………………………..

মহামন্ত্র

সারাটা বিশ্ব ক্রমাগত নিঃস্ব হয়ে পড়ছে
প্রস্ফুটিত সত্য অকম্পিত স্থির…
স্বপ্নেরা তির তির ভাসছে নারীটির নিজস্ব নদীতে,
চৈত্যে, গুমফায় ধ্বনিত হচ্ছে বুদ্ধবাণী।

সপ্তপর্ণ ছড়িয়ে দিচ্ছে অনন্ত সুবাস-
পদ্ম-শালুকে ভিজে উঠছে জলতোয়ার
নরম বুক-
একটুকরো নীল আকাশে কবি ছড়িয়ে দিচ্ছেন
দু-টুকরো কাব্যময় দৃষ্টি-
মনে মনে জপ করছেন মহামন্ত্র
হে কবিতা, তুমিই নির্বাণহীন সত্য’…
সামান্যতা থেকে মুক্তির উপায় এখানেই।
…………………………………………..

চরিত্র

আমি দেখি চরিত্রের ভেতর
চরিত্রেরা সুকৌশলে লুকিয়ে আছে-
বাইরে আধবোজা চোখে
অতুলপ্রসাদী, রামপ্রসাদী গায়,
নুনসাগরের কুমিরের মত অশ্রু ঝরে…
আসলে সবটাই সত্যি নয়
মিথ্যের বেশভূষা পরিপাটি বেশ-
কুয়াশার চাদর সরালে
আকাশটার আসল রং চেনা যায়…
…………………………………………..

পৃথিবীজননী

ত্রিপত্রে সাজানো আছে নারীর উত্তরণ-
কন্যা- ভার্যা-মাতা
আকাশে যখন ফোটে হৃদয়মঞ্জরী
গতিময় হয়ে ওঠে রাতের ভুবন,
পৃথিবীজননী এসে আঁচল উপুড় করে
ঢেলে দেন শান্তিসুধা… স্নেহ একরাশ…

দোলনা দোলানো হাতে অসির ঝঙ্কার
কখনও ঝাঁসির রানী,
অপ্রমেয়া শিবানী-
ক্ষত্রিয় ধ্বংস করে ধর্মযুদ্ধে জয়ী…
পৃথিবীজননী তুমি, তোমার আঁচলে
লেখা থাকে অনন্ত জীবনের কথকতা…
…………………………………………..

কাজরি গাথা

মা গাইছেন চিরপুরাতনী গান
দূরের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে
অতি মৃদু কোমল গান্ধার সুর
জোৎস্নাময়ী মা আমার, আঁচলে স্নেহ- সুগন্ধ

ভোরের আকাশে অস্ফুট আলোর কাঁচুলি
ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে তারারা নিরুদ্দেশ,
রবি কবিতায় জেগে উঠছে প্রকৃতি-
নিজের মনেই থাকতে ইচ্ছে করে সারাটি দিন…

ঝিল্লিমুখর শ্রাবণের রিমঝিম সন্ধ্যায়
মেঘের স্তনন শুনতে শুনতে
অক্ষরপ্রতিমার চোখ ভিজে যায়-
কাজরি গাথায় মনকেমনের মুগ্ধবোধ…
…………………………………………..

আর্যসত্য

মৃত শিশু কোলে নিয়ে চলেছেন এক উদভ্রান্ত নারী
শিশু তো নয় যেন নিথর চাঁদ-
দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছেন মৃত সঞ্জীবনী ওষুধ
পেছনে পড়ে রইলো বিপুল ঐশ্বর্য…

কে যেন তাকে নিয়ে গেলেন আম্রকুঞ্জে
বুদ্ধ শোনালেন গাথা-
সংসারের অনিত্যতা,
নারী খুঁজে পেলেন না মৃত্যুহীন গৃহ
একমুঠো সর্ষেও আনা হল না…

মহাকারুণিক ধৰ্মদেশনা দিলেন-
“দুঃখসত্যই হল প্রথম আর্যসত্য”
কিসা গৌতমী নামের নারীটির
দুঃখের প্রতি বিরাগ জন্মাল,
দৃষ্টিবিশুদ্ধি…
মিথ্যা দৃষ্টির বিপরীতে
নম্র, নত, শঙ্খচূর্ণ ভোর-
নারীটি অর্হৎ…