বাংলার ঘ্রাণ

কুসুমিত হয়ে জেগে ওঠে ভোর
পাতায় পাতায় বৃষ্টির পরশ
ধানশালিখের নাচানাচি রঙে ও মাধুর্যে
ধানের চারার মত নড়ে উঠে প্রাণ।

এভাবেই দিনের শুরু খুলে বোধের মোড়ক
ভেজা ধান বাতাসের শরীরে সোঁদা ঘ্রাণ
মেঘের চাতালে ছিটেফোঁটা অন্ধকার বিহঙ্গের ছবি
ধানকাটা শেষ, জমির আইলে খুটে খায় চড়ুই শালিক
ধ্যানমগ্ন সাদা বক বসে থাকে বোষ্টমীর বেসে
বুকের জমিনে তার বর্ষার ঘ্রাণ।

এই আমার বাংলা,
এই আমার বাংলার প্রাণ।
…………………………………………..

গৃহস্থাশ্রম

গাছে ঝুলছে ঘর গেরস্থালী
পাতায় পাতায় সংসার বাবুইয়ের
নিপুণ শিল্প কর্ম, বাতাসে দোলে
পাখিদের গৃহস্থাশ্রম।

মানুষ তুমিও শিখে নাও
মায়ামমতায় পাখিও করে সংসার
কোকিলের ডিম তা দেয় কাক
তুমিও তৈরী করতে পারো এমন গৃহস্থাশ্রম।
…………………………………………..

বাৎস্যায়ন

বহমান নদী সুন্দর, চলমান নারীও তাই
দূর থেকে পাহাড় সুন্দর, নারীও
কাছে গেলে সব পাহাড় মাটি -পাথরের টিলা,
ঝরাপাতার আস্তরে মোড়ানো
সব নদীই স্রোতস্বিনী তরতরিয়ে বহমান
কাছে গেলে অভিন্ন বাঙময় সব নারীই
নদীর বাঁক সুন্দর, কাছে গেলে ভিন্নতর কিছু নেই।

তবুও নদীতে যাই অবগাহন করি জলে
তবুও পাহাড়ে যাই ঝরাপাতার মর্মর মাড়িয়ে
নদীতে ডুবতে ডুবতে সাতার কাটি,
পাহাড়ে উঠতে উঠতে নেমে যাই খাদে
ঝরনার শুষ্ক পথে শুনি
কোকিলের গান, ঘুঘুর প্রেমময় ডাক
তবুও নারীর কাছে যাই, নারী আমাকে টানে
পাহাড়ের কাছে যাই পাহাড় আমাকে টানে
আহা কোকিল! আহা ঘুঘু!
আহা নদীর ঘোলা জল, ঝর্ণা প্লাবিত পাহাড়
আহা নারী!
কে জানতো বাৎস্যায়নে গভীর মূদ্রার হিসাব এমন।
…………………………………………..

প্রকৃতির শরীর

সারি সারি সুপারি গাছের ছায়া
বাগান জুড়ে আলোআঁধারির প্রেম
রোদ ভুলে যায় বৃক্ষের প্রকোষ্ঠে যেতে
তবু জাগে আলো ও ছায়া নিতান্ত মলিন।

রোদ হেলে গেলে পশ্চিমে
বৃক্ষের ছায়া দীর্ঘ হয়
ম্রিয়মান চাঁদের আলোকে চিঠি দেয়
বিকেলের রোদের ঝলক
সন্ধ্যার আঁধারে
তরুণীর বইর ভিতর যেভাবে চিঠি দিতো
সোমত্ত প্রেমিক যুবক।

রোদ চলে গেলে, সন্ধ্যার আঁধারে
ছায়াময় এলোকেশী বৃক্ষেরা
ডালপালা মেলে দুঃখগাঁথা গায়
ঝিঁঝিঁ পোকা করে আয়োজন
ঝরে পরা মৃত সুপারি ডালে।

জীবন খোঁজে প্রকৃতির শরীর
অমৃতের স্বাদ প্রকৃতির ভিতর।
…………………………………………..

নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের গল্প

যদিও প্রৌঢ়ত্ব তরতর করে বাড়ছে ক্রমশ
চিনে ফেলেছি জীবনের অন্ধিসন্ধি কানাগলি
তবুও নিষিদ্ধ ফুল দেখলে কাঁপে হৃদয়
ফাগুনে যেমন কোকিল ডাকে
সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে
তুমি ডাকছো এই অবেলায়।

আজকাল অসময়ে ঘুম ভেঙে যায়
কামনার প্রমত্ত ঘুঙুর আগুনের আঁচ দেয়
নতজানু হয় তোমার ছায়ায় ;
পাশ ফিরে খুঁজি, বুকের স্পন্দন টের পাই
হৃৎপিণ্ড উত্তাল হয়, নোনা স্বাদ স্মৃতিতে হারায়
পাশ ফিরে দেখি, তুমি পাশে নাই।

আজকাল তোমার স্নিগ্ধ শরীর
কামনার স্বচ্ছতা নিয়ে ছড়ায় বিবিধ সৌরভ
তবুও তোমাকে সমুদ্র মনে হয়
নোনাপানি কেঁপে কেঁপে হয় উথাল-পাতাল
আমি তোমার তীরের ঠিকানা খুঁজি
দেখি সেখানে এক নিস্তরঙ্গ সমুদ্র ঘুমায়।
…………………………………………..

সত্য জেগে থাকে

সত্য জানা বড়ো কঠিন
পর্বতের মতো ঘারে তুলে নিতে হয় বহু ভার
বহু কষ্ট নিতে হয় প্রাণে;
পর্বত বেয়ে নেমে আসে জল, কঠিন দুর্গতি বেয়ে সত্য
জল রূপ নেয় ঝর্ণার, মিথ্যা পরিশুদ্ধ হয় সত্যতে
ঘনান্ধকারেও সত্য জ্বলে ওঠে
সূর্যের মতো আলো দিতে।

বয়সের ভারবাহী মানুষ,
কুড়ায় জীবনের ধুলো, দেখে স্বার্থের সাম্রাজ্য
বেড়ে উঠে ঈর্ষার ভ্রুকুটিতে
দেখে ভালোবাসা থেকে ছিন্ন হয় রক্তের বীজ, আপনজন;
ফুলের পাপড়িতে জমে বিষ, ঘৃণা
পরে থাকে শূন্য ময়দান, পোড়া ছাই
তবু সত্য জেগে উঠে জীবনের মোহনায়।

সত্য জানা বড়োই কঠিন
স্বার্থ সচকিত চতুর্দিকে, অকৃতজ্ঞতা সর্বদা চুরমার করে,
ওলোটপালট করে সব
ভুতুড়ে জমিন স্পর্শ করে প্রতিদিন
ছুরি বিঁধে সরল জমিনে।

তবু সত্য জেগে থাকে
পার্বত্য নির্ঝর।
…………………………………………..

কবিতা কবে সৌরভ ছড়াবে

কবিতা লিখি বলতেই
কয়েকজন তাকালেন আমার দিকে, এমনভাবে তাকালেন
আমি যেন ভিন গ্রহের এলিয়েন,
আমি যেন নপুংসক বা একটা আনাড়ি
একজন বললেন’ আর কোন কাজ করেননা?
আমি নিশ্চুপ, মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বললাম
এই বিদ্যা ছাড়া চুরি ও হটকারি করার বিদ্যা তো শিখিনি-
একজন যুবা ক্যামেরার ফ্লাশ লাইট জ্বলার মতো একটু হাসলো
কয়েকটি মুখ যেন চকমকি পাথর হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ
একটা ঝড়ো বাতাসের গন্ধ পেলাম
বললাম, কিছু মনে করবেননা, আমি একান্তই ভুল করে
গরুর খোয়ারে ঢুকে পরেছি একজন শিশুর মতো-
দেখলাম কয়েকটা মুখ আবার তেতে লাল হলো
জুয়ায় হারা জুয়াড়ির মতো
বললাম আমি তবে যাই-
শক্তির কবিতা মনে মনে আওড়ালাম-
দেয়ালে দেয়াল কার্ণিশে কার্নিশ
ফুটপাত বদল হয় মধ্য রাতে..
চলে আসার সময় আমার মৃত মায়ের কথা মনে পড়লো
মা কবে আধ-ভাঙা ঘুমে আমার কপাল চুমে বলেছিলো
বাচা যাও কবিতাই লেখো, দেখো চাঁদের সৌরভের মতো তোমার কবিতাও সৌরভ ছড়াবে
মা আমি কি করবো এখন,
আমিতো শব্দ চিত্রকল্প উপমা ছাড়া আর কিছু জানিনা
আমার শরীর ও মন যে গুম হয়ে থাকে কবিতায়
আমার কবিতা কবে তোমার সোহাগের মত সৌরভ ছড়াবে?
…………………………………………..

জ্যোৎস্নাপ্লাবন

ভালোবাসা এক অপূর্ব নেশা
ঈশ্বর বন্দনার মতো তৃপ্তির ঢেকুর
ভালোবাসলে মানুষ হয় কৃষ্ণচূড়া গাছ
রক্তিম পাপড়িতে ঢেকে যায় সব।

ভালোবাসলে মানুষ সময়ের হিসাব যায় ভুলে
হৃদয়ে প্রেমিকের অস্তিত্ব টের পায় প্রতি পলে
শরীরও স্বর্গ হয় নন্দনতত্ত্বের লাবণ্যে
ভালোবাসলে মানুষ পুড়ে যায় অনিদ্র দহনে।

ভালোবাসা হলো ঈশ্বরের আশীর্বাদ
ভালোবাসা হলো হৃদয়ে জ্যোৎস্নাপ্লাবন।
…………………………………………..

মৃত্যু অনিবার্য, ভালোবাসাও তাই

চূড়ান্ত ভালোবাসা বলে কিছু নেই
কিছুটা আবেগ কিছুটা পাওয়ার আকাঙ্খা
দূর থেকে চাঁদ দেখার মত
ভালোবাসা মানে সারা জীবন কষ্ট
না পাওয়ার কষ্ট, পেয়ে হারানোর কষ্ট
তবুও ভালোবাসে মনুষ
না জেনেও মৃত্যুকে যেমন।

মৃত্যু অনাবিল ভালোবাসা জীবনের।

মৃত্যুই শুধু
তাড়াতে তাড়াতে নিয়ে যায় মানুষকে
পরিপূর্ণ জীবনের দিকে
অপূর্ব বাঁচোয়া হয়ে, ভালোবাসা যেমন।

মৃত্যু অনিবার্য, ভালোবাসাও তাই।
…………………………………………..

রুপালী ক্ষীরের মতো বাংলার রূপ

বৃষ্টির ফোটায় শুরু একটি ব্যাকুল ভোর
কাঁঠাল পাতারা ভিজছে নীরবে, টুপটাপ শব্দ মেখে
একটা খাকি বক ঘাটের কিনারে চুপ, যেন ধ্যানমগ্ন ঠাকুর।
দূরে বেতবনে ডাহুকের ডাক ডুবডুব, উঠুনে পাঁতি হাস ডাকে প্যাকপ্যাক
ভেজা কাক প্রাণের অঘ্রাণে ডাকে কা- কা- স্বরে
জারুলের মগডালে, যেন চিনে নেয় বাংলার অপরুপ রূপ।

ধানের মাচার পাশে রুপালী ক্ষীরের মতো
মেঘ ভাঙা রোদ খেলা করে
প্রাণের উৎসবে মাতে বৃষ্টি ভেজা কুমড়া ফুল
তালশাঁসের নরম শিকড় খুঁটে খায় শালিকের দল
এভাবেই শুরু একটি ভোর
একটি দেহাতী নারী হেটে যায় মন্দিরের দিকে
টুপটাপ নির্জনতা নিয়ে
পায়ের নিচে তার সাদা ঘাস ফুল চিতই পিঠার মতো চেপটা হয়
এই আমার বাংলা এভাবেই বাংলার অপরূপ রূপ কথা কয়।