দাদুর কথা মনে পড়তেই সীমান্তের বুকের ভেতর কান্নার ঢেউ উঠে। দাদু নেই। তবু রোজ সে দাদুর সাথে কথা বলে। প্রাণ ভরে গল্প করে। দাদু যেন সেই আগের মতো করে ওকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলের দিকে ছুটছেন। রিক্সায় বসিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। আবার স্কুল গেইটে দাঁড়িয়ে ‘টা টা’ জানাচ্ছেন।

ক্লাসের পর ক্লাস হয়। কিছু সময়ের জন্য দাদুর কথা ভুলে থাকে সীমান্ত।
সীমান্তের অপেক্ষায় দাদু বাইরে অলস সময় কাটান। কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেন না। সীমান্তকে ঘিরে দাদুর মনে অনেক স্বপ্ন। একদিন ও বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে। দেশের সম্পদ হবে। তার বংশের মান রাখবে।
স্কুল ছুটি হলে সীমান্ত সবার সাথে লাইন হয়ে বের হয়। দূর থেকে দাদুর প্রিয়মুখটি দেখে স্বস্তি খোঁজে সে।

দাদুর সাথে ওর সুন্দর এক একটি মুহূর্ত নিদারুণ স্মৃতি হয়ে ধরা দেয়। প্লে থেকে শুরু করে দাদুকে সে সারাক্ষণ পাশে পেয়েছে। দাদু ছিলেন ওর খেলার সাথীর মতো। একটু সুযোগ পেলেই বন্ধুদের সাথে খেলতে দিতেন। আর কোন ছোট্ট বন্ধু না পেলে দাদু নিজেই ওর সাথে খেলতেন।

সীমান্ত খুব জিদি ছেলে। কতোদিন মায়ের সাথে অভিমান করে খেতে চাইতো না। বাবামায়ের আদরেও খেতে বসতো না। মন খারাপ করে থাকতো। কিন্তু দাদুর চোখে চোখ পড়তেই সীমান্তের সমস্ত জিদ হাওয়ায় মিশে যেতো। ওকে দেখে তখন কেউই বুঝতে পারতো না, ও একটু আগে জিদ করেছিল, খেতে চায়নি। অথচ দাদুর হাতে কী মজা করে ভাত খাচ্ছে! সীমান্তের বাবা-মা বিস্ময় চোখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই দাদুর হাত ধরে ঘুরতে বেরিয়ে যেতো সীমান্ত। সীমান্তদের বাসা থেকে সামান্য দূরে প্রজাপতি পার্ক। নেভাল একাডেমির পাশে। চারিদিকে সবুজের আচ্ছাদন। একবার গেলে বারবার যেতে মন চায়। হরেক রকম প্রজাপতির মেলা। হাত বাড়ালে নদী-সাগরের মোহনার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যসহ নান্দনিক সমুদ্রসৈকত।
সেখানে সামনাসামনি দাদু-নাতি আসন পেতে বসতো। মাসে দুই-তিনবার দাদুর সাথে পার্কে যেতো।
ফুল, পাখি, প্রজাপতি নিয়ে খেলতে সীমান্ত খুব মজা পেতো। কৃত্রিম ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে দাদুর সাথে সেলফি তুলতো। উঁচুনিচু পাথরগুলোতে খুব সাবধানে পা রাখতে বলতেন দাদু। এরপর শিশুদের জন্য রাখা সবগুলো ইভেন্টে অংশ নিতো সীমান্ত। দাদু তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসতেন।

সন্ধ্যা হলেই সীমান্ত দাদুর সাথে বাসায় ফিরতো। রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়তো সীমান্ত তখন দাদুর কাছে গল্প শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতো। রাত দশটার মধ্যেই সীমান্তের বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়তেন। সীমান্ত তখন দাদুর কাছে গভীর মনোযোগ দিয়ে গল্প শোনতো।

সীমান্তের দাদা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দেয়া সৈনিকদের একজন। যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধের দিনগুলোর এক একটি ঘটনা আদরের নাতির কাছে গল্পের আদলে বলতেন। সীমান্তও সেগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতো। দাদুর কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে সীমান্তের মনেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর ভালোবাসার জন্ম হয়। দাদুর সবগুলো গল্পের শেষে একটাই আবদার ছিল- বড় হয়ে যেন দেশের অর্জিত স্বাধীনতার রক্ষা করতে সীমান্ত ভূমিকা রাখে। এই কচি বয়সে সীমান্তের মনে তা সুপ্ত বীজের মতো গেঁথে গেল।

সীমান্তের বাবা-মা দু’জনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠে তারা অফিসে চলে যান। আর বাসায় ফেরেন সন্ধ্যার দিকে। সীমান্তের সকল আবদার দাদুই পূরণ করেন। সীমান্তের দাদুও একাকী জীবনে একমাত্র নাতিকে পেয়ে জীবনের সকল কষ্ট ভুলে গেছেন।
সীমান্ত একটু সুযোগ পেলেই দাদুর কাছে গল্প শুনতে বায়না ধরে। দাদুর গল্প সীমান্তের খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলো। সীমান্ত মুগ্ধ হয়ে দাদুর গল্প শোনে।

সীমান্ত তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো। প্রতিদিনের মতো দাদুর সাথে স্কুলে যাচ্ছিল। আজ অবশ্য সীমান্তের সাথে কোন বইখাতা নেই। রিক্সায় দাদুর পাশে বসে আছে। দাদু বারবার ওর কপালে চুমু খাচ্ছিলেন। আর একটু পরপর ওর দিকে তাকাচ্ছিলেন। সীমান্তও অবুঝ বালকের মতো দাদুর মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। স্কুল গেইটে এসে ওকে দিয়ে দাদু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।

এক পা দুই পা করে সীমান্ত সবার সাথে অডিটোরিয়ামের দিকে চলে আসে। সকাল দশটা বাজতেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। পুরো অডিটোরিয়াম ছাপিয়ে স্কুলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো হয়। চারিদিকে শোকের আবহ। হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ পড়তেই ওর হৃদয় বিষাদে ভরে যায়। বঙ্গবন্ধুর গুলিবিদ্ধ নিথর শরীরটা সিঁড়িতে পড়ে আছে। সেই সাথে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত সিঁড়ি বেয়ে যেনো সমগ্র বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করেছে।

এরইমধ্যে ফরহাদ স্যার সেদিনের ঘটনা উল্লেখ করে বক্তব্য দেন। এরপর আর কয়েকজন শিক্ষক বক্তব্য দেন। সীমান্ত বক্তব্য শোনে আর দাদুর বলা গল্পগুলোর সাথে মিল খোঁজে। নিদারুণ মিল!
সীমান্ত মনে মনে ভাবে, ওরা কেমন করে পারলো স্বজাতি হয়ে জাতির জনককে হত্যা করতে! সীমান্ত এর কোন সদুত্তর পায় না। কিছু মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে।

এরইমধ্যে পিয়ন মতি লাল এসে রবি স্যারের কানে কানে কী যেন বললেন। রবি স্যার সীমান্তকে ডেকে অডিটোরিয়ামের বাইরে নিয়ে আসেন। কোনকিছু বোঝে ওঠার আগে সেখানে উপস্থিত হয় সীমান্তের বাবা। সীমান্ত বিস্ময় চোখে বাবার দিকে তাকায়। মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,
বাবা তো কখনও আমায় নিতে আসেননি। আজ এলেন, তাও অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে। তবে কী কোথাও কোন গন্ডগোল হলো! আবার ভাবে,
না, পনেরো আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের কারণে বাবার অফিসও তো বন্ধ। তাই হয়তো আমাকে নিতে এসেছেন।

সীমান্তের বাবা রবি স্যারের সাথে একান্তে কথা বলেন। এরপর সীমান্তকে সঙ্গে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বাসার সামনে দশ-বারো জন মানুষ কথা বলছেন। ঘরের ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ শুনে সীমান্ত বাবার সাথে বড়বড় পায়ে ঘরে প্রবেশ করে। সীমান্তের মা বিলাপ করে কাঁদছে। আর তাকে ঘিরে আশপাশের বাসার মহিলারাও কাঁদছে। সবার সামনেই মেঝের ওপর পড়ে আছে সীমান্তের দাদার কাপড়ে মোড়ানো নিথর দেহ।
সীমান্ত দাদুর মরদেহ দেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে বলে,
না, দাদু আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যেতে পারো না। এভাবে আর ঘুমিয়ে থেকো না। প্লিজ ওঠ, দাদু। সকালেই তো আমাকে স্কুলে দিয়ে এসেছিলে। তুমিই তো আমার সকাল-দুপুর-রাত। তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচাবো, দাদু।
এই কথা সীমান্ত দাদুকে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। সীমান্তের বাবা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন।
তাদের কান্নায় আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

দাদুকে হারিয়ে সীমান্ত যেন বড় একা হয়ে গেছে। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকে। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে না। কারো সাথে কথাও বলে না।
এক সপ্তাহের মতো সে স্কুলে যায়নি। ওর বাবা-মা ওকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। এরপর প্রতিদিন স্কুলে নেয়া-আসা করবার জন্য একজন লোক নিয়োগ করলেন। আবার স্কুলে যেতে শুরু করে সীমান্ত।

সীমান্ত আঁকাআঁকিতে খুব পটু। হাতের কাছে রঙপেন্সিল আর আর্টপেপার পেলেই হলো। অমনি আঁকা শুরু করে দেবে। এবছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে। এরইমধ্যে ওর সিলেবাসের সব ছবি আঁকা শেষ। কচি হাতে এতো নিখুঁতভাবে ছবি আঁকতে পারে, দেখলে মনে হবে বইয়ের ছবিটিই হুবহু কপি করেছে। ওদের স্কুলের রবি স্যার তো ক্লাসে এসে আগে ওর কাছে যাবেনই। এরপর মৃদু হেসে ওর পিঠে একটা মহব্বতি কিল দিয়ে ক্লাস শুরু করবেন।
রবি স্যারকে ওর খুব ভালো লাগে। এ যাবৎ সে যত ড্রইং স্যার দেখেছে তাদের মধ্যে রবি স্যারকে তার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। রবি স্যার সিলেবাস শেষ করে নতুন নতুন ছবি আঁকেন। ছবির পিছনের গল্প বলেন। স্যারের অঙ্কনে শৈল্পিক ছোঁয়া আছে। তাই রবি স্যারের ক্লাসে সে খুব মনোযোগী থাকে। রবি স্যারের মিষ্টি হাসি ওর খুব ভালো লাগে।

বছর ঘুরে আবার ফিরে আসে শোকের মাস আগস্ট। একদিন রবি স্যার ক্লাসে এসে শিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন শেখানোয় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। প্রতিদিনের মতো রবি স্যার আজ তার পিঠে একটা মহব্বতি কিল দিলেন না। মৃদু হাসলেন না। চেহারায়ও কোন আনন্দের ছাপ নেই। রবি স্যারের মুখ দেখে সীমান্ত নিশ্চিত হয়ে গেছে, আজ স্যারের মন ভালো নেই। মুহূর্তে সীমান্তেরও মন খারাপ হয়ে যায়। সে সি.ডব্লিউ খাতা সামনে নিয়ে অপ্রস্তুতভাবে বসে আছে। রবি স্যার বিষয়টা আঁচ করতে পেরে তার কাছে এসে বললেন,
-সীমান্ত, আজ তোমার কী হয়েছে? এখনও আঁকছো না কেন?
সীমান্ত ইতস্তত করে বলল,
-স্যার, আপনাকে একটা প্রশ্ন করব?
-হ্যাঁ, করতে পার।
-স্যার, আজ কী আপনার মন খারাপ?
-কেন? মন খারাপ হতে যাবে কেন?
-না মানে, স্যার। আপনাকে তো প্রতিদিন হাসিখুশি দেখি। আজ কেমন যেন বিষন্ন দেখাচ্ছে।
রবি স্যার হেসে ওঠে বললেন,
-ওহ্! এই কথা। না, আমার মন খারাপ না। তবে আজ থেকে একটু ব্যস্ততা বেড়ে গেল।
এই কথা বলে রবি স্যার ক্লাসের সামনে এসে সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
-প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, তোমরা কী জানো এখন কোন মাস চলে?
সবাই সমস্বরে বলে ওঠলো,
-স্যার, আগস্ট মাস।
-কেউ কী বলতে পারবে এ মাসের আরেক নাম কী?
এবার সবাই মাথানিচু করে চুপচাপ বসে রইলো।
সীমান্ত দাঁড়িয়ে বলল,
-স্যার, আমি পারব। এটি আমাদের জাতীয় শোকের মাস। ১৫ আগস্ট, ১৯৭১ সালে কিছু কুলাঙ্গার বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সেদিন ঘাতকরা আমাদের জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালির কপালে কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়েছিল। সেই থেকে আগস্ট মাস আমাদের জন্য শোকের মাস।
সীমান্তের কথা শেষ হতে না হতেই রবি স্যার জোরে হাততালি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ক্লাস হাততালির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে।

এরইমধ্যে স্কুলের পিয়ন মতি লাল নোটিশখাতা নিয়ে হাজির হলো। রবি স্যার তার কাছ থেকে নোটিশখাতা নিয়ে একবার মনে মনে পড়লেন। তারপর বোর্ডে লিখে দিলেন। সবাইকে তা দেখে দেখে ডায়রিতে তুলে নিতে বললেন।
এবারের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘শোক দিবসে ইচ্ছে মতো ছবি আঁকা’।

স্কুল থেকে বাসায় ফিরে এসে সীমান্ত ভাবতে লাগল,
কী ছবি আঁকা যায়! শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর ছবি অবশ্যই আঁকব। তার সাথে আর কী যোগ করা যায়!
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। কিন্তু কোন বুদ্ধি মাথায় এলো না তার। রাত দশটা পার হলো। সবাই ঘুমোচ্ছে। শুধু সীমান্তের চোখে ঘুম নেই। লাইট জ্বলতে দেখে সীমান্তের মা এসে বললেন,
-কীরে তুই এখনও ঘুমোছনি?
-না, মা, আমার ঘুম আসছে না।
-একি কথা! আমি লাইট অফ করে দিচ্ছি। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক। দেখবি ঘুম এসে যাবে।
-আচ্ছা, মা।
সীমান্তের মা লাইট বন্ধ করে চলে গেলেন। সীমান্ত কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে রইলো।

হঠাৎ দাদু এসে সীমান্তকে বললেন,
-দাদু ভাই, এতো কী চিন্তা করছো?
-না মানে ইয়ে, দাদু। এতোদিন আমাকে ছেড়ে তুমি কোথায় ছিলে? তুমি জানো, তুমি চলে যাবার পর থেকে আমি খুব একা হয়ে গেছি। তোমার মতো করে আমার সাথে কেউ খেলতে আসে না। রিক্সায় বসে কেউ আমায় আদর করে না। বিকালবেলা প্রজাপতি পার্কে নিয়ে যায় না। রাতে মজার মজার গল্প শোনায় না। তোমার মতো করে কেউ আমায় দেখে না। তুমি আর আমায় ছেড়ে যেয়ো না, প্লিজ দাদু।
এই কথা বলে সীমান্ত দাদুর বুকে মাথাটা রেখে হাউমাউ করে কাদঁতে লাগলো।
দাদুর চোখের পানি সীমান্তের গায়ে পড়তেই সে বলল,
-দাদু, তুমিও কাঁদছো। ওহ্! বুঝেছি, আমাকে একা রেখে গিয়ে তুমিও মনে হয় একা হয়ে গেছো।
এবার দাদু সীমান্তকে বললেন,
-আমি তো এসে গেছি। আর কোন সমস্যা নেই। এখন বল, একা একা কী চিন্তা করছিলে?
-দাদু, আমাদের স্কুল থেকে বলা হয়েছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।
-এবারের বিষয় কী?
-‘শোক দিবসে ইচ্ছে মতো ছবি আঁকা’।
দাদু একটু ভেবে বললেন,
-তাহলে শোন, যেহেতু শোকের মাস বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকবেই। তাতে আনকমন কিছু আনতে পারো।
-আনকমন কী আনব?
-বঙ্গবন্ধু আমাদের সবার প্রিয়। বাঙালির ঘরে ঘরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মানুষজন আছেন। রক্তের সম্পর্ক না হয়েও তিনি আমাদের আত্মার আত্মীয়। স্বার্থের কারণে রক্তের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। কিন্তু কারো সাথে কারোর আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেলে তা আজীবন টিকে থাকে।
-একদম খাঁটি কথা বলেছো, দাদু। কিন্তু আমার ছবি!
-সেটাই বলছি, বঙ্গবন্ধু আমার মতো তোমারও প্রিয়। তাই বঙ্গবন্ধুর সাথে তোমার সবচেয়ে প্রিয় কিছু যোগ করতে পারো।
সীমান্ত হো হো হেসে ওঠে বলল,
-বুঝেছি! তোমার কথা শুনে আমার মাথায় একটা চমৎকার আইডিয়া এসে গেছে।
হঠাৎ সীমান্তের হাসির আওয়াজ শুনে বাবা-মা দু’জনেই দৌড়ে আসেন। লাইট অন করতেই দেখেন সীমান্ত খাটের নিচে পড়ে প্রলাপ বকছে।

সীমান্তের বাবা-মা দু’জনে ওকে ধরাধরি করে খাটের ওপরে শুইয়ে দিলেন। সীমান্ত চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
-এতো রাতে তোমরা এখানে কেন? তাছাড়া আমার দাদু কোথায়?
সীমান্তের বাবা স্ত্রীর মুখের দিকে একবার তাকালেন। এরপর সীমান্তকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
-ওহ্! তার মানে তুমি স্বপ্নে হেসেছিলে। তোমার দাদুর সাথে, তাই না?
-হ্যাঁ, দাদু তো আমায় বলেছিলেন আর কোনদিন আমায় ছেড়ে যাবেন না। তবে চলে গেলেন কেন?
এই কথা বলে সীমান্ত কেঁদে ওঠে।
সীমান্তের কান্নায় বাবামায়ের চোখেও জল আসে। এরপর ওকে সান্ত্বনা দিয়ে খাটে শুইয়ে দিলেন। রুমের সব লাইট অফ করে তারা সীমান্তের পাশেই শুয়ে পড়লেন ।

১৪ আগস্ট, সকাল ১০টা। স্কুলের অডিটোরিয়ামে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। সবাই যার যার মতো করে ছবি আঁকছে। সীমান্ত আর্ট পেপারে বাহারি রঙয়ে তার সবচেয়ে প্রিয় দু’জন মানুষের ছবি আঁকলো। বীর বাঙালির ছবি। একজনের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক, আরেকজনের সাথে আত্মার। ছবিতে শোকের আবহ সৃষ্টির জন্য ছোট ছোট কাজ করলো সে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিত্রাঙ্কন শেষ হলো। সবাই যার যার ক্লাসের দিকে চলে গেল।

রবি স্যার ছবিগুলো মূল্যায়ন করতে বসলেন। একটা একটা করে দেখে নম্বর দিতে লাগলেন। হঠাৎ একটা ছবি দেখে চমকে উঠেন! একি বঙ্গবন্ধুর অর্ধেক ছবির সাথে অন্য একজন বৃদ্ধ মানুষের অর্ধেক ছবি! তারওপর ছবিতে জেনুইন শোকের আবহ প্রকাশ পাচ্ছে। সবগুলোর মধ্যে এই ছবিটির অঙ্কন রবি স্যারের মনে ধরেছে। একেবারে শৈল্পিক সৃষ্টি! ড্রইংয়ে কোন খুঁত নেই। তারপর নামটা দেখলেন। সীমান্ত। রবি স্যার মনে মনে বললেন,
ও ছাড়া আর কেউই এমন করে আঁকতে পারার কথা না। কিন্তু এটাকে কীভাবে ফার্স্ট করি? বঙ্গবন্ধুর ছবির সাথে আরেকজনের ছবি। তাও অর্ধেক করে!
হঠাৎ ভাবলেন,
না, বিষয়টা প্রিন্সিপাল স্যারকে জানানো দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ।
প্রিন্সিপাল স্যারও ছবিটি দেখে খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। অসাধারণ কারুকাজ। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়, ওর মাথায় এমন আইডিয়া আসলো কীভাবে! তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর পাশে কে এই ভদ্রলোক?
এরপর এক এক করে সবগুলো ছবি দেখে প্রিন্সিপাল স্যার বললেন,
-রবি স্যার, আপনি ছেলেটিকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। আমি ওর সাথে কথা বলব।
-জ্বি, স্যার, আমি ওকে এক্ষুণি নিয়ে আসছি।
এই কথা বলে রবি স্যার সীমান্তদের ক্লাসের দিকে চলে আসেন। সীমান্তকে সঙ্গে করে আবার প্রিন্সিপাল স্যারের কক্ষে প্রবেশ করেন।
প্রিন্সিপাল স্যার সীমান্তকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
-এই ছবি কী তুমি এঁকেছো?
-জ্বি, স্যার।
-তুমি অর্ধেক আঁকলে বঙ্গবন্ধুর ছবি আর অর্ধেক আঁকলে অন্য কারোর। এর মানে কী?
সীমান্ত একটু সামনে এগিয়ে এসে বলতে লাগল,
-স্যার, আমাদের এবারের চিত্রাঙ্কনের বিষয় ছিল
‘শোক দিবসে ইচ্ছে মতো ছবি আঁকা’। আমি অনেক ভেবেছি। কিন্তু ঘুরেফিরে বইয়ের ছবিগুলোই পেয়েছি। শেষে ভাবলাম এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটি কে? আমি দেখলাম আমার দাদুই আমার হৃদয়ের অর্ধেকটা জায়গা দখল করে আছেন। তারপর ভাবলাম বাকি অর্ধেকের কথা। দেখি সেখানে আছেন আমাদের সবার প্রিয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরম শ্রদ্ধায়।

প্রিন্সিপাল স্যার অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,
-বঙ্গবন্ধুকে তো তুমি সরাসরি দেখোনি। তবে কার কাছ থেকে এমন ভালোবাসা শিখলে?
-স্যার, আমার দাদুর কাছ থেকে।
-তোমার দাদু!
-হ্যাঁ, স্যার, আমার দাদু ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয়জন। দু’বছর আগে ঠিক ১৫ই আগস্ট তারিখে আমার দাদুকে হারিয়েছি। সেই থেকে আমার কাছে এই দিনটার মানে অন্য রকম।
-ওহ্! আচ্ছা।
সীমান্ত আবার বলল,
-দাদুর কাছ থেকে আমি রোজ মুক্তিযুদ্ধে দাদুদের বিজয়ের গল্প শুনতাম। বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম অবদানের গল্প শুনতাম। সেই থেকে দাদুর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমারও অন্য এক ভালবাসার জন্ম হয়।

সীমান্তের কথা শুনে প্রিন্সিপাল স্যার গর্ব করে বললেন,
-সীমান্ত, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তোমার ভালোবাসা আমাদের মুগ্ধ করেছে। তোমার মতো করে আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে। আসলেই তো বঙ্গবন্ধু থাকবেন বাঙালির গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে, অঙ্কনে, ইতিহাস-ঐতিহ্যে। আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায়।