ভালো থাকিস

রোজকার মতো আজও অফিস ফেরত কি যেন ভাবতে ভাবতে গাড়িয়াহাটের মোড়ে আসলো মিমো।রাস্তার কোনো একটা লাইটের ঝলকানি তার ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করে দিলো।ভাবনা ভুলে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো ফুটপাথে তারপর কি যেন একটা টাইপ করলো মোবাইলে।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি অনেকক্ষণ ধরে মাপছিলো মিমোকে।তারপর হুশ করে গায়ে ধাক্কা দিয়ে সটান পাশ থেকে হেঁটে বেরিয়ে গেল গা ঘেঁষে।মিমো একটু বেখেয়ালি ছিলো তাই ব্যাপারটা গুরুত্ব দিলো না।

অপেক্ষার সময় শেষ হচ্ছে না।বেশ কিছুদিন ধরে, বেশ কয়েকবার আসবো আসবো করেও দেখা করেনি রিতম, ঘটনার পিছনে কারণ কি তারও হদিস দেয়নি। কিন্তু আজ সে আসবেই বলেছে একদম পাক্কা, তাই মিমো অপেক্ষা করছে দাঁড়িয়ে।মনে দ্বন্দ্ব প্রতিবারের মতো আজও।রিতম কথা রাখবে তো আজও? গতো এক বছর ধরে যাকে বিশ্বাস করে যাচ্ছি, সে যে ঠিক কি ধরণের মানুষ, তা এখনও বুঝতে পারলাম না, ভাবতে ভাবতেই মিমো দেখলো, সামনে রাস্তায় কি যেন একটা গন্ডগোল শুরু হয়েছে।

এক জটলা লোকেদের দিকে দৌড়ে গেল ঘটনার হদিস পেতে।একে তাকে ঠেলে ঠুলে কাছে যেতেই মিমোর মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠলো।কোনো এক অচেনা শব্দের পুরুষ গলা ফোনের ভেতরে বলে উঠলো-ম্যাডাম, হোটে যান জীবন থেকে …রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটির মতো অবস্থা হবে নইলে।দেখছেন তো, কেমন লাশ হয়েছে।জানেন তো লোকটি কে?- খেয়ালী সেনের হাজবেন্ড, রিতমবাবুর হবু বউ।

রাস্তার লাইটগুলো আজ একটু বেশিই চকচক করছে আর বুকের ভেতরে কেমন একটা ঝড়।মন থেকে একটাই শব্দ চিৎকার করলো-
“ভালো থাকিস”।

অনিয়মের ভালোটা

“পেয়ার তুমহে কিতনা কারতেহে, তুমি ইয়ে সামাঝ্ নেহি পাওগে” – খাটের উপরে রাখা উইঙ্ক মিউজিকে গানটা অটো প্লে হচ্ছে বার বার। বাথরুমের মধ্যে শাওয়ার নিচ্ছিলো তন্দ্রা। হঠাৎ বাথরুমের দরজায় প্রচন্ড ধাক্কায় সে ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠলো -“সোনা, ধাক্কা দিস না, আমার দেরি হবে”। কিন্তু, সোনা কিছুতেই শোনার পাবলিক নয়, ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছে। আসলে বাইরে ইস্তিরি করতে পাঠানো জামা কাপরগুলোকে নিয়ে মেইন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে কমল, পঁচিশ বছর বয়সী একটি সুঠাম শরীরের ছেলে সে। চাকরি না পাওয়ায় ইস্তিরি করার বিজনেস শুরু করেছে রিসেন্ট। সেই অনেক্ষণ ধরে সোনাকে জ্বালাচ্ছে জলদি টাকাটা পেমেন্ট করতে বলার জন্য, তাই সোনা বার বার দরজা ধাক্কাচ্ছে বাথরুমের।

“কি মুশকিল” -কোনরকমে আধভেজা গায়ে, তোয়ালে জড়িয়ে নীচে, আর উপরে টিশার্টটা গলিয়ে বাথরুম থেকে বেরোলো তন্দ্রা। মাথায় তখনও অর্ধেকটা শ্যাম্পু লেগে রয়েছে। কোনরকমে হাত দিয়ে মুছতে মুছতে বললো- “তুই এখনও ঘরে, সাড়ে নয়টা বাজে, জলদি বেরিয়ে পড়” -বলে এক লাফে ঘরে চলে গেল তন্দ্রা। ছেলে যথারীতি বেরিয়ে পড়ল স্কুলের জন্য।
“তোমার কতো হয়েছে ভাই, বিলটা” ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার করলো। কমল বললো- “সিক্সটি ফাইভ রুপীজ, দিদি”। একটু দাঁড়াও, বা ঘরে এসে সোফাতে বসো, আমি আসছি। কমল বসার ঘরে সোফাতে এসে বসলো।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। ফুরফুর করে পারফিউমের সুগন্ধ আসছে ভেতরের ঘর থেকে। দরজার পাল্লাটা অল্প খোলা। মাঝে মধ্যে ভেতরের মানুষটির চলাচল দেখতে পাচ্ছিল কমল বাইরে থেকে। এতো সুন্দর পারফিউমের অনুভূতি, তার শরীর যেন দোলা দিচ্ছিলো সুগন্ধে। প্রথমবারে ভয় পেলো। দ্বিতীয় বারেও ভয় পেলো এগিয়ে দরজার ফাঁক থেকে দেখার। কিন্তু তৃতীয় বারে আর ভয় পেলো না। একটু এগিয়ে মুখ বাড়াতেই, দরজার ভেতর থেকে চুড়ি পরা হাতটা তাকে ভেতরে টেনে নিল।

“এতোদিন আসোনি কেন তুমি- আমি কতো অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য, সোনাকে অনেকবার পাঠিয়েছি খোঁজ নিতে, তুমি ছিলে না। না বলে কোথায় গেছিলে”? তারপর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা।

হঠাৎ ঝন ঝন করে চুড়ির শব্দ বেজে উঠলো আবার ঘরে। চারিদিকের আওয়াজগুলো নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুধু কিছু অচেনা শব্দ ঘর জুড়ে। আর ক্ষণে ক্ষণে কান্নার গোঁ গোঁ গুমরানো আওয়াজ। অভিমান জন্ম দিচ্ছে যেন অভিমানী শব্দের। বেসামাল মন ঝপঝপ করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। উথলে উঠছে বুকের উপর মাথা রেখে বোতাম ছেঁড়ার শব্দ। দেওয়ালের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ার শব্দে, বুকের উপর অভিমানী আলতো কিলের প্রত্যাশার আওয়াজ, সবকিছু। শুধু শব্দ!!

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তন্দ্রা। “আমার দেরি হচ্ছে, চাবিটা নিজের বাড়িতে নিয়ে যাস ঝিমলি”। এবার মারামারিটা বন্ধ কর দুজন।

তন্দ্রা বেরিয়ে গেল, মেইন দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে। চাবিটা ঘরের ভেতরে ছুঁড়ে দিলো। পাশের বাড়ির ঝিমলি সকাল থেকেই আজ তন্দ্রার ঘরে। কেউ তাকে খোঁজ দিয়েছিল কমল বাড়ি ফিরেছে। তন্দ্রাদির জামা-কাপড়গুলো দিতে আসবে। তাই সকাল থেকেই তন্দ্রার ঘরে লুকিয়ে বসেছিল। অনেকদিন না বলে ফাঁকি দেওয়া কমল আজ ধরা পড়লো ঝিমলির চুড়ির আওয়াজে। গোটা দিনটাই তারা তন্দ্রার ঘরে কাটালো আপন মনে করে। সিঙ্গেল মাদার তন্দ্রা, নিজে হয়তো পারলো না নিজের বিয়েটা ধরে রাখতে, কিন্তু ঝিমলিকে সে নিজের বোনের মতো ভালোবাসে। তাই হয়তো…

অজানা অনুভূতি

রাত্রি তখন দেড়টা। জানলা থেকে ঠান্ডা হাওয়া আর তারই সঙ্গে ঝুম ঝুম বৃষ্টির শব্দ শুধু শোনা যাচ্ছে। প্রায় দশ পা দূরে, মেইন রাস্তা দিয়ে দুটো কুকুর হেঁটে যাচ্ছিল। অঙ্গীরা, রোজকার মতোই জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে রাতের গন্ধ উপভোগ করছিল। রোজ রাতে, সে এই সময়ে, জানলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়, আজও তাই। বাইরে ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাস, সঙ্গে জোৎস্না ঢেকেছে কালো মেঘে বৃষ্টির আড়ালে।

পুরানো কিছু চাপা স্মৃতির অসুখ তার মনে। কোনো এক অজানা স্মৃতি, যাকে সে কোনোদিনও দেখেনি, মাঝে মাঝে চোখের সামনে দেখতে পায়। পুরানো জন্ম? অনেকেই ভাবে, অঙ্গীরা বানিয়ে বলে। কিন্তু কি ঘটে, বা কি সে দেখে, সবটাই সে জানে এবং সবটাই কিন্তু কাল্পনিক নয়। এসব তার মাথায়, ঠিক এই সময়ে, রাত্রির অন্ধকারে চক্র কাটে।

সিগারেটের ধোঁওয়া ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎ আজ রাস্তায় চোখ গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল তার। কুকুর দুটো তার দিকে জ্বলন্ত হলুদ চোখ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোঁ গোঁ শব্দ সঙ্গে পাগলের মতো মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে তারা। কিছু বুঝতে পারলো না অঙ্গীরা জানলার ভেতর থেকে। কিন্তু বোঝা গেল, তার ডান কাঁধে একটি স্পর্শ করা হাত আর বাঁ কাঁধে একটা হলুদ সূর্যমুখী। মাথাটা একটু যেন হেলে যাচ্ছে পিছনে, কোনো অজানা অচেনা একটি পুরুষালী বুকের খাঁজের সন্ধিক্ষণে।

রাত দেড়টা- বোবা সিগারেট, ফাঁকা ঘর আর অঙ্গীরা। কুকুরগুলো তাকিয়েই থাকলো!