ইচ্ছে

চায়ের দোকানের পাশে বসে থাকা
ক্ষুধার্ত সেই কুকুর গুলোর দিকে
ছুড়ে দেওয়া সস্তা বিস্কুটের মতো,
আমার দিকে প্রতিনিয়ত যেই মেকি
করুণা গুলো ছিটিয়ে দেওয়া হয়
সে সমস্ত অর্থহীন আবেগ গুলোতে
আমার যেন বরাবরই একটা অরূচি!

বরং
যদি পারো নৈঃশব্দ্য বুঝতে?
যদি পারো আগলে রাখতে?
যদি দিতে পারো একটা বুক?
যদি দিতে পারো একটা কাঁধ?
যদি পারো আমার বন্ধু হতে?
যদি ধরতে পারো আমার হাত?

দরজায় একটি বার কড়া নেড়ো।
খিলের আড়ালে অপেক্ষা করছে
সমান ইচ্ছেগুলো!
…………………………………………..

এক ফালি ছাদ

তোর বাড়িতে যেই ছাদটা রয়েছে
সেটার অর্ধেকটা দিবি আমাকে?

প্রতিদিন স্নানের পর যাব এলো চুল শুকোতে
ভিজে কাপড় গুলো যত দেবো টানটান মেলে
দেবো বই লেপ বালিশ সব রোদ্দুরে উত্তপ্ত হতে
আচার বড়ি ইত্যাদি দের রাখব তাপ পোহাতে।

শীতের সকালে যাব রোদের উষ্ণতা গায় মাখতে
সন্ধ্যেতে নিবিড় জ্যোৎস্না স্পর্শে যাব বিলীন হতে
একলা দুপুরে যাব পাখির সাথে আকাশে ভাসতে
বৃষ্টি পড়লে এক ছুটে যাব পাগলের মতো ভিজতে।

কখনও বা তারাদের নিচে শুধু চুপচাপ বসে থাকব
তুই আর আমি আর দুজনের ভাগের গোটা ছাদটা
তোর কাঁধে মাথা রেখে কাটবে একটা আস্তো রাত্রি
কথা নয় শব্দ নয় থাকবে শুধু এক রাশ নৈঃশব্দ।

তোর বাড়ির ওই ছাদটুকু নিয়েই
আমার তোর সাথে পুতুল খেলা সংসার!
…………………………………………..

জীবন্ত লাশ

মর্গের শীতল ঘরে,
নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা শরীর গুলো!
তাদের তোমরা লাশ বলে দাবি করো?
বেশ!
আর এই যে আমি তুমি আমরা সবাই?
আমরা সকলে বুঝি ভীষণ রকম জীবন্ত?
কেন?
নিঃশ্বাস নিচ্ছি বলে?
কথা বলছি বলে?
হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি বলে?
হাসছি বলে?
বেশ!

এই শরীর গুলো তে,
মৃত্যুর ভ্যাপসা গন্ধ নেই জানি।
পচন ধরে নি বলে মাছি বসে না।
ফাটল ধরে নি আঙুল গুলোর ডগায়।

কিন্তু
নিঃশ্বাসের আড়ালের দীর্ঘনিঃশ্বাস?
কথার আড়ালের নীরবতা?
চলার আড়ালের নিশ্চলতা?
হাসির আড়ালের ক্রন্দন?

আড়ালে থাকলে বুঝি মিছে হয়ে যায়?

এই সম্পূর্ণ বিশ্ব,
একটা মস্ত বড় মর্গ!
আর আমরা?
মর্গের জীবন্ত লাশ!
…………………………………………..

কৌতূহল

সিঁথিতে যেই রঙটা দেখতে পেয়েছেন
অধিক কৌতূহলের বশে?
সেটি আমার পোড়া কপালের
পচা চামড়া দিয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের চিহ্ন!
প্রতিনিয়ত যেসব প্রশ্ন ছুড়ে দেন
আমার দিকে কৌতূহলের বশে?
সেগুলো চুল্লিতে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া
আমার বিবাহের কিছু অবাঞ্ছিত শেষ চিহ্ন!

বিবাহিত জীবনের দাহ করেছি নিজ হাতে
সাদা থানের অন্দর মহলে মন আজ আরষ্ট।
ভদ্র সমাজ আমার দাহ করে চলেছে রোজ
প্রশ্নের বাণে কলঙ্কিতর কটাক্ষ বিষ স্পষ্ট।

যৌনক্ষুধার অভিপ্রায়ে আপনারা যারা
শুভার্থীর ছদ্মবেশে চেয়েছেন অন্দরে প্রবেশ?
একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যাঘ্রীর আমর্ষ
সইতে পারবে তো আপনাদের মর্দানি আবেশ?
…………………………………………..

নাড়ির টান

প্রথম যবে বুঝতে পেরেছিলাম তুই এসেছিস
তখন তুই সকলের চোখে কেবলি একটি ভ্রুণ।

কেউ বুঝতে পারেনি সেদিন
এমনকি তোর বাবাও না… যে
একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে
আমি সেদিনই মাতৃত্ব অনুভব করেছিলাম।
তৈরী হয়ে গিয়েছিল নাড়ির টান!

বড়ো স্বপ্ন ছিল… জানিস?
মন বলতো তুই মেয়ে হবি।
সারাদিন পেটের ওপর হাত রেখে
আকাশ কুসুম কল্পনা করতাম।
তোর নাম, তুই কেমন দেখতে হবি…
এইসব আর কি !
আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম
তুই আমার পাশে শুয়ে খেলা করছিস আপন মনে।
তোর গায়ে একটা লাল রঙের জামা।
মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে
খিল খিল করে হাসছিস!
তোর প্রথম ছবি?
Ultrasound এর ছবি তে একটা ক্ষুদে ডট্!
সেই ছিল আমার সম্বল!

এমনি এক দুপুরে
তোর কথা ভাবতে ভাবতে
হঠাৎ বুঝতে পারলাম সব শেষ হয়ে গিয়েছে।
এখনও যেন স্পষ্ট শুনতে পাই…
স্ক্যান সেন্টারের ডাক্তার বাবুর কথাটা…
“হার্টবিট্ পাওয়া যাচ্ছে না!”
“বাচ্চা নেই!”
আমার চোখের সামনে তখন শুধু কালো অন্ধকার!

পরে শুনেছি কান্নাকাটি করে আর প্রলাপ বকে,
সবাই কে খুব বিরক্ত করেছিলাম।
তোর বাবা ক্ষুন্ন হয়ে তার মা কে বলেছিলো,
“ওকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দাও!”

কেউ বুঝতে পারেনি সেদিন
এমন কি তোর বাবাও না… যে
নাড়ির টান এত সহজে ছেড়া যায় না !
আমার লাল জামা পরা পরী হয়ে
তুই আজও বেঁচে আছিস আমার মধ্যে!
…………………………………………..

সময়ের ব্যবধান

তুই যখন বলিস ভালোবাসা?
আমি বুঝি বেকারত্বের লজ্জা।
তুই যখন বলিস বিয়ের কথা?
আমি বুঝি শূন্য হাঁড়ির কান্না।
বিরহ বেদনা আমার কি হয়না?
চারে বাবা প্রয়াত আর দশে মা!
বড়দা মানুষটাকে চিনলাম কই?
মা গত হওয়ায় সে থেকেও নেই।

তুই হয়তো দিন তিন চার কাঁদবি।
কষ্ট পেয়ে উপোস যাবি সপ্তাহ এক।
তারপর এ প্রেম নামের বস্তুটি নিয়ে
তোর যখন বিলাসিতা কেটে যাবে?
বুঝবি যৌন প্রেমের থেকে ঢের সত্য
মায়ের আঁচল আর পিতার শাসন।
ঢের বেশি প্রয়োজন একটা চাকরি
এক থালা ভাত ও একটু শান্তি ঘুম!
…………………………………………..

নারী-২

সিঁথিতে পেরেক ঠুকে
তৈরী হয় সিঁদুর।
নাকে কানে লাগাম পড়িয়ে
তৈরী হয় দুল নাকছাবি।
লোহার হাতকড়া পড়িয়ে
তৈরী হয় নোয়া।
কোমরে দড়ি পড়িয়ে
তৈরী হয়ে বীছে।
গলায় বেড়ি পড়িয়ে
তৈরী হয় নেকলেস।
পায়ে শেকল পড়িয়ে
তৈরী হয় নূপুর।
সেই শেকলের ঘষাতে
তৈরী হয়ে আলতা।

বহুমূল্য গহনায় মুড়ে
সেজে ওঠে নব বধূ।
লাল ঘোমটার আড়ালে
ঢেকে যায় স্বপ্ন বহু।
…………………………………………..

নিশিকাব্য

গভীর রাত
দো তলার ছাদ
অনেকটা আকাশ
এক ফালি চাঁদ।

আধ মগ চা
পোড়া সিগারেট
ভাঙা ছাইদানি
ফীলিং গ্রেট!

মায়াবী জ্যোৎস্না
নিবির আনিমেষ
তোর মৃদু স্পর্শের
ঈষদুষ্ণ রেশ।

এই অস্থির মন
তোর শান্ত বুক
এক কাঁধ ভরসা
আমার চিবুক।
…………………………………………..

শেষ দেখা

স্টেশন ঘড়িটায় তখন
ভোর চারটে বেজে দশ।
রেলগাড়ির লৌহ চাকা
তখন ঘুরতে শুরু করেছে।
মনে হলো শেষ দেখাটা
ছিল বেমানান আব্দার।

মাঘ মাসের ভোর।
কুয়াশা ছিল ভীষণ।
মনেও!

হঠাৎ দূরে ভেসে ওঠে
আবছা নীল সোয়েটার।
তারপর দ্রুত হাতছানি।
ক্রমশঃ স্পষ্ট হলে তুমি।

মনে হলো স্বর্গ হতে
ভূমিষ্ঠ হলে যেন!
পান পাতার মতো
কুয়াশা সরে গিয়ে
হলো শুভ দৃষ্টি।

রেলগাড়ির লৌহ চাকা
তখন ক্রমান্বয়ে ধাবমান।

অশ্রুজলে ঝাপসা দৃষ্টিতে
আবছা যুগ্ম শান্ত চোখ
তারপর নীল সোয়েটার
অবশেষে অস্পষ্ট তুমি।
…………………………………………..

ব্যবধান

আষাঢ় মাস
দাড়ি বুড়োর দেশ

বড্ড প্রিয় স্থান!

যামিনী দেবীর তখন মধ্য বয়েস
কোপাই নদীর ভরা যৌবন
শরীর জুড়ে তার বাঁধ ভাঙা কামোচ্ছ্বাস
পূর্ণিমার রূপালী জ্যোৎস্নার উষ্ণতায়
গা ভিজিয়ে নিজ মনে খেলছে প্রকৃতি।

ওদিকে বহু দূর থেকে,
বাতাসে ভেসে আসছে বাউল গান।
কে জানি গাইছে লালন।
কী ভীষণ দরদ সেই কন্ঠে!

“মিলন হবে কতদিনে
আমার মনের মানুষের ও সনে।
ও তা হয়না কপাল গুনে
আমার মনের মানুষের ও সনে।’’

বড্ড প্রিয় পরিবেশ!

তীরে বসে
তুমি আর আমি।

পাশাপাশি।

মধ্যেখানে
এক আকাশ অনুরাগ।

সেই আকাশের বুকে
সহস্র কোটি অন্তরায়।
…………………………………………..

পাশাপাশি

যেদিন বুকে জমাট বাঁধবে
একটা দম বন্ধ করা কষ্ট?
দু চোখের কাজল একটু যাবে ভেস্তে?

পাশে এসে বসিস!
কোনো কথা নয় তবে।

তোর জামার শান্ত বুক পকেটের ওপর,
সেই ভেস্তে যাওয়া কাজলের
একটু চিহ্ন দিস শুধু ফেলতে!
…………………………………………..

মনের মানুষ

নাহ্!
আর সচল তাজা স্বাভাবিক পুরুষ চাই না
আমায় বরং এনে দে একজন ছন্নছাড়া
ভাঙা চোরা ছেঁড়া ফাটা ছিন্নভিন্ন মাংস পিণ্ড
আদরে যতনে গড়ে তুলব তাকে পুনর্বার।

আমি শিল্পী!
যদি পারিস এনে দে একটি মাটির চূর্ণ পাত্র
নরম করে কুমোর চাকায় আবার দি ঢেলে
সতর্ক আলতো হাতে ধীরে ধীরে হবে সৃষ্টি
আমার মনের মানুষ মৃত্তিকা গন্ধ শরীরে।

শহুরে খাঁচার যান্ত্রিক কয়েদি
লোহায় গড়া রক্ত বিহীন দেহ
হিসেবের বৃত্ত লক্ষণ রেখা
ভিক্ষুকের হাতেও যেন নিঃস্ব।

ক্ষমা হোক আমার!
পারবো না!

ধাতুপূর্ণ জীবনের উত্তরজীবী হতে
হিসেবের বৃত্তে অবরুদ্ধ হতে
বিকলাঙ্গ সমাজে বলি হতে।

পারবো না!
ক্ষমা হোক আমার!
…………………………………………..

আমায় নিয়ে চল

অশান্ত পাখির অস্থির ডানা যেখানে শান্তি পায়
একটি বার সেখানে আমায় নিয়ে চল।
দগ্ধকরণ সূর্যের তেজ যেখানে গলে যায়
একটি বার সেখানে আমায় নিয়ে চল।

বুদ্ধিজীবীদের যেখানে বুদ্ধি পেয়েছে লোপ
মানবিকতার অস্তিত্বের যেখানে জন্ম হয়।
বহিরাবরণের যেখানে নেই কোনো মূল্য
মনের খবর কেবলই কবিদের খাতায় নয়।

রাজনীতির ধূসর রূপ পৌঁছায়নি যেখানে
প্রযুক্তির অতিরিক্ত স্পর্শে এঁটো হয়নি যে দেশ।
উন্মুক্ত লজ্জা সসম্মানে হয় ঢেকে দেওয়া
আর পুঁথিগত বিদ্যাই যেখানে নয় শেষ।

ঈশ্বর বলতে যেখানে মানুষ বোঝে একটা শক্তি
ধর্মকে লোহার খাঁচা থেকে উড়িয়ে দেয় মানুষেরা।
রাজনীতিজ্ঞরা যেখানে নিয়ম করে কবিতা লেখে
আর প্রেমে পড়ে হিসেবে ভুল করে ব্যবসায়ীরা।

সবুজ ঘাস আর নীল আকাশ মিলে মিশে হয় এক
সাঝঁ বেলার মুখে ঝাপটা মারে নিশার আঁচল।
শান্তি ঘুম এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় যেখানে
দোহাই তোকে লক্ষ্মীটি, একবার আমায় নিয়ে চল!