দেখতে দেখতে সেপ্টেম্বর মাস চলে এসেছে। হাসপাতালে যাওয়া আমার নিত্যিদিনের অভ্যাস দাঁড়িয়ে গেছে। অন্য কোনো কাজকর্ম না থাকলে দিনে দু’বারও যাই। রোজই দেখতে পাচ্ছি তায়েবার প্রাণশক্তি আস্তে আস্তে থিতিয়ে আসছে। এখন সে নিজের শক্তিতে বিছানা থেকে উঠতে পারে না, তাকে তুলে বসাতে হয়। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। কোলকাতায় আমাদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে উঠেছে। তায়েবার মা, দু’বোন, বড়ো ভাই সকলেই কোলকাতায় আছেন। তার পার্টির কর্মীরাও নিয়মিত আসে, দেখাশোনা করে। কিন্তু তায়েবা শুয়ে থাকে। বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে সব কিছু দেখে। খুব কমই কথা বলে। আগে যে তায়েবাকে দেখেছে, এ অবস্থায় দেখলে মনে হবে এই মধ্যে আগের তায়েবার কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে যখন শুয়ে থাকে, দেখলে আমার মরা নদীর মতো মনে হয়। গতি নেই, স্পন্দন নেই। আমার বুকটা ধক করে উঠে। কি যে বেদনার স্রোত বয়ে যায় সে আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারবো না। এখনো জাহিদুল আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। ডোরা দেখলে অপ্রস্তুত বোধ করে। এমন একটা জিজ্ঞাসাচিহ্ন ফুটিয়ে তোলে, তার অর্থ দাঁড়ায় তুমি এখানে কেন?
কারো কোনো মন্তব্য আমি আর গায়ে মাখিনে। আমার সঙ্গে কেউ কথা বলুক, না বলুক আমার কিছু যায় আসে না। আমি যখন তার কেবিনে ঢুকি, দেখামাত্রই তায়েবার ঠোঁটে একটা ক্লান্ত সুন্দর হাসির রেখা জেগে উঠে। তার এই হাসিটাই আমাকে সবকিছু অগ্রাহ্য করতে শিখিয়েছে। আমার ইচ্ছে করে তার হাত পায়ে হাত বুলিয়ে দিই। মাথার উড়ো উড়ো রুক্ষ চুলগুলো ঠিক করে রাখি। খসে পড়া সাপের খোলসের মতো এলোমেলো শাড়িটা গুছিয়ে ঠিক করে পরিয়ে দেই। কিছুই করতে পারিনে আমি। সব সময় ঘরভর্তি মানুষ তাকে পাহারা দিয়ে রাখে। আমাকে মনের বেদনা মনের ভেতর চেপে রাখতে হয়।
আমাদের বেঁচে থাকাটাই একটা সগ্রাম। পরের বেলার ভাত কিভাবে জোটাবো সে জন্য অনেক ফন্দিফিকির করতে হয়। ভাগ্যগুণে একটা থাকার জায়গা পেয়েছি। সেখানে যারা থাকে সকলের অবস্থাই আমার মতো। যেখান থেকে যে পয়সা সংগ্রহ করে আনি, ও দিয়ে সকলে মিলে ভাত খাওয়া সম্ভব হয় না। প্রায় সময় আমাদের মাদ্রাজি দোকানে দোসা খেয়ে কাটাতে হয়। তার ওপর আমার আবার সিগারেট খাওয়ার নেশা। রোজ তায়েবার পেছনে কম করে পাঁচটি টাকা সংগ্রহ করতে কি পরিমাণ বেগ পেতে হয় বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এখানে সেখানে লেখালেখি করে অল্পস্বল্প অর্থ আমি আয় করেছি। তার পরিমাণ খুবই সামান্য। বাংলাদেশের নানা চেনাজানা মানুষ কিছু টাকা পয়সা দিয়েছে। অস্বীকার করবো না, প্রিন্সেপ স্ট্রীটে অস্থায়ী সরকারের অফিস থেকেও নানা সময়ে কিছু টাকা আমাকে দেয়া হয়েছে। কোলকাতার মানুষেরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কিছু টাকা আমার হাতে তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষক সহায়ক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তী অল্পস্বল্প কাজ করিয়ে নিয়ে সে তুলনায় অনেক বেশি টাকা আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু টাকার এমন ধর্ম, পকেটে পড়ার সাথে সাথে উধাও হয়ে যায়। যেদিকেই তাকাই প্রয়োজন গিলে খাওয়ার জন্য হাঁ করে ছুটে আসে।
আমি কিছু কাজ করতে চেয়েছিলাম। বেশি নয়, অন্ততঃ দিনে পাঁচটা টাকা জোটাবার জন্য আমি কিছু কাজ করতে চাই। তিন ঘণ্টা কুলিগিরি করেও যদি পাঁচটি টাকা পাই আমি করতে রাজি। ওই টাকাটি না পেলে আমার পক্ষে তায়েবার হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হবে না। আর ইদানিং একটা সঙ্কোচবোধ আমাকে ভয়ানক আড়ষ্ট করে ফেলেছে। তায়েবার অসুখের কথা বলে চাইলে ওই টাকাটা হয়তো আমি কারো না কারো কাছ থেকে আদায় করতে পারি। আমার চেনাজানা মানুষের সংখ্যা নেহায়েত অল্প নয়। নানা সময়ে আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাদের কাছে হাত পেতে চেয়ে নিতে কোনো রকমের কুণ্ঠা বোধ করিনি। তায়েবার অসুখের নাম করে কারো কাছে টাকা চাওয়া গেলেও আমার পক্ষে সম্ভবত নেয়া হবে না। দু’তিন দিন আগে অর্চনা হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে রেস্টুরেন্টে চা খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলো। ওখানেই সে আমার হাতে পাঁচশো টাকার একটি নোট দিয়ে বলেছিলো, দানিয়েল, টাকাটা রাখো। এ সময়টাতে তোমার বোধ হয় খুবই টানাটানি চলছে। আমি হাতে স্বর্গ পেয়ে গিয়েছিলাম। এই সময়ে পাঁচশো টাকা অনেক টাকা। তথাপি অর্চনার টাকাটি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ধন্যবাদ দিয়ে বলেছিলাম, টাকাগুলো তোমার কাছে থাকুক, আমার যখন খুব প্রয়োজন পড়বে চেয়ে নেবো। অর্চনা বললো, তুমি বরাবর একগুয়ে। আর তাছাড়া…। তাছাড়া কি? তুমি আমাকে বন্ধু মনে করো না। আমি বললাম, অর্চনা আমি তোমাকে ঠিকই বন্ধু মনে করি, এই কোলকাতা শহরে তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই যার কাছে আমার মনের বোঝা হালকা করতে পারি। তুমি না থাকলে নিঃসন্দেহে আমার কষ্ট অনেকগুণে বেড়ে যেতো। আমার টাকার ভীষণ প্রয়োজন, তথাপি তোমার টাকাটি গ্রহণ করতে পারবো না। দয়া করে কিছু মনে করো না লক্ষ্মীটি। অর্চনা টাকা ব্যাগে রাখতে রাখতে বললো, বক্তৃতাটি কি একটু দীর্ঘ হয়ে গেলো না? আমি কোনো কথা না বলে গড়িয়াহাটার ট্রামে না ওঠা পর্যন্ত তাকে সঙ্গ দিলাম।

আমি যে কিছু কাজ করতে চাই একথা বন্ধুবান্ধব অনেককেই বলেছি। সেদিন সন্ধ্যেবেলা হাসপাতাল থেকে বৌ বাজারের হোস্টেলে ফেরার পর নরেশদা জানালেন। সৌগতবাবু একটা কাজের খবর দিয়ে গেছেন। শুনে আমিতো অবাক হয়ে গেলাম। সৌগত বন্দ্যোপাধ্যায় লোকটিকে আমি কখনো পছন্দ করিনি। তাই তাঁর সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলাপ পর্যন্ত করা হয়নি। আজ তিনি আমার চূড়ান্ত বিপদের সময় এতো বড়ো একটা উপকার করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের সঙ্গে একটা বোঝাঁপড়া করার চেষ্টা করলাম। নরেশদা এক টুকরো কাগজ আমার হাতে তুলে দিলেন। দেখলাম, লেখা রয়েছে অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পাদক সাপ্তাহিক নতুন খবর, ৯১ নম্বর মঠলেন, কোলকাতা-৯১। নরেশদাকে জিগ্গেস করলাম, নতুন খবর নামে কোলকাতায় একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে তাতো জানতাম না। আমাকে কি ধরনের কাজ করতে হবে কিছু বলেছেন নাকি। তিনি জবাবে বললেন, না সেসব কিছু বলেননি। শুধু তোমাকে আগামীকাল সাড়ে ন’টার সময় তৈরি থাকতে বলেছেন, তিনি এসে তোমাকে নিয়ে যাবেন। সেদিনও বাংলাদেশের ছেলেরা কেউ হোস্টেলে ছিলো না। সকলে মিলে হাওড়াতে একটা অনুষ্ঠান করতে গেছে। ঘর ফাঁকা। আমার ঠিক কি হয়েছে খুলে বলতে পারবো না। যখন অধিক লোকজন থাকে একটুখানি নির্জনতার জন্য মন উতলা হয়ে ওঠে। আর যখন লোকজন থাকে না নির্জনতা বোঝার মতো বুকের ওপর চেপে বসে। নরেশদার ভেতর কি ঘটছে অনেকদিন জিগগেস করা হয়নি। অঞ্জলি কোলকাতা আসতে চায় কিনা। তার বাবা মা এখন রাজার মঠে বড়ো ভায়ের বাসায় কি অবস্থায় আছেন, ভদ্রতার খাতিরে হলেও এসকল সংবাদ জিগ্গেস করা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু আমার কোনো কথা বলার প্রবৃত্তি হলো না। তিনি জিগগেস করলেন, এখন কি করবি? আমি বললাম, ঘুমোবো। কাল সৌগতবাবুর সঙ্গে যাবি? হ্যাঁ বলে মশারিটা নামিয়ে দিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম।
পরের দিন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নটার সময় সৌগতবাবু এসে হাজির। বললেন, তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নিন। অনিমেষদা আবার সময়নিষ্ঠ মানুষ। তাঁকে কথা দিয়েছি ঠিক দশটার সময় আমরা আসবো। অধিক কথা না বাড়িয়ে জামা কাপড় পরে সৌগতবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। বাসের জন্য বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হলো। আমরা যখন মঠলেনে এসে নামলাম দশটা প্রায় বাজে। প্রচণ্ড ভিড়ে ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠেছি। নতুন খবরের অফিসে পৌঁছতে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নিলো না। মঠলেন বড়ো ঘিঞ্জি জায়গা, আমাদেরকে প্রায়ান্ধকার সিঁড়ি বেয়ে একটি সেকেলে লাল ইট বের হওয়া দালানের তিন তলায় উঠতে হলো। সিঁড়ির বাঁদিকে ছোটো একটি নেমপ্লেট লাগানো। দরোজা ভোলাই ছিলো। আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। অফিস কামরাটি খুব বড়ো নয়। একপাশে দেখলাম দু’জন কম্পোজিটর কম্পোজ করছে। টাইপের খাঁচার পাশ ঘেঁষে একটা চেকন লম্বা টেবিল পাতা। একজন অল্পবয়েসী মানুষ বসে বসে পুফ কাটছে। মাঝখানটিতে সম্পাদক অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টেবিল। একটা ছোটো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সামনে ভদ্রলোক রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। ভদ্রলোকের খুব ধারালো চেহারা। নাকটি তীক্ষ্ণ এবং বাঁকানো। গোঁফজোড়া ছুঁচোলো করে ছাটা। পরনে ধুতি এবং মটকার পাঞ্জাবি। ভদ্রলোকের চোখজোড়া ভীষণ উজ্জ্বল। বয়েস কতো হবে বলা মুশকিল। পঁয়তাল্লিশ হতে পারে, আবার পঞ্চাশও হতে পারে। কিছু মানুষ আছে যাদের চেহারা দেখে বয়েস আন্দাজ করা যায় না।

সৌগত বন্দ্যোপাধ্যায় নমস্কার করে বললেন, এই যে অনিমেষদা, দেখলেন তো কাঁটায় কাঁটায় দশটায় এসে হাজির হয়েছি। অনিমেষবাবু তাঁর রিভলভিং চেয়ারে একটুখানি নড়ে চড়ে বসলেন। টেবিল থেকে পেপার ওয়েটটা তুলে নিয়ে নাড়াচাড়া করলেন। তারপর বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে বললেন, বসো বসো সৌগত, একটা কাজের মতো কাজ করে বসে আছো দেখছি। জীবনে তোমাকে এই প্রথম সময় রক্ষা করতে দেখলাম। তারপর তোমার পকেট বিপ্লবী দলের সংবাদ কি। এই বুঝি তোমার নতুন কমরেড।

সৌগত অনিমেষবাবুর অন্যসব কথার জবাব না দিয়ে বললেন, আপনি একজন অনুবাদক চেয়েছিলেন। আমার ধারণা ইনি ভালো অনুবাদ করতে পারবেন। ভদ্রলোক বাংলাদেশ থেকে এসে ভীষণ অসুবিধেয় পড়ে গেছেন। তার এক নিকট আত্মীয়ার ভীষণ অসুখ। আপনি যদি কিছু সাহায্য করতে পারেন। এবার তিনি আপাদমস্তক আমাকে একবার ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর জানতে চাইলেন, আপনি বংলাদেশ থেকে এসেছেন? আমি মাথা নাড়লাম। ভদ্রলোক বললেন, বাংলাদেশ মানেই তো অসুবিধে। ওই মুসলমানের দেশে এতোদিন পড়েছিলেন, আগে চলে আসেননি কেনো? ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি একরকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। আমার চোখমুখ লাল হয়ে গেলো। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। কি বলতে হবে খুঁজে না পেয়ে সৌগতবাবুর দিকে তাকালাম। দেখি তিনিও মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তিনি আমার চাইতে কম অবাক হননি।

সৌগতবাবু আমতা আমতা করে বলতে চেষ্টা করলেন, আপনি অনুবাদ করার লোক চেয়েছিলেন, আমার ধারণা ইনি ভালো অনুবাদ করবেন, আপনি টেস্ট করে দেখতে পারেন। আরে রাখো তোমার টেস্ট, আগে কথাবার্তা বলতে দাও। তারপর অনিমেষবাবু আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, কি মশায়, চুপ করে আছেন, আগে চলে আসেননি কেন? আমি মৃদুকণ্ঠে বললাম, আগে চলে আসবো কেমন করে? তিনি ফের জিগগেস করলেন, এখন কি করে চলে আসতে পারলেন? আমি বললাম, পাকিস্তানী মিলিটারি আক্রমণ করে বসলো, তাই বাধ্য হয়ে…। আমার মুখের কথা শেষ হওয়ার আগে ভদ্রলোক কণ্ঠস্বর চড়িয়ে বললেন, মুসলমানদের লাথি আঁটা এতোদিন খুব মধুর লেগেছিলো তাই না, এখন মুসলমানে মুসলমানে লাঠালাঠি লেগেছে, আপনারা সকলে একসঙ্গে হুড়মুড় করে আমাদের ওপর চড়ে বসেছেন। অগত্যা আমাকে। বলতে হলো আমিও মুসলমান। তাঁর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না। হলেনই বা মুসলমান। তাতে এমন কি এসে গেলো। আমি মশায় সাফ কথার মানুষ। হিন্দু মুসলমানের ভিত্তিতে যখন দেশ ভাগ হয়েছে, হিন্দুদের সে দেশ থেকে অনেক আগেই চলে আসা উচিত ছিলো। দেড় কোটিরও বেশি হিন্দু পূর্বপাকিস্তানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার জন্য দশ কোটি মুসলমানকে আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে। দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুরা ভারতবর্ষে চলে এলে আমরা মুসলমানদের ভারত ছাড়তে বাধ্য করতাম। সব সমস্যার সাফ সাফ সমাধান হয়ে যেতো। ওই হিন্দুরা পূর্বপাকিস্তানে থেকে যাওয়ার জন্যই ভারতকে মুসলমানে মুসলমানে মারামারি কাটাকাটিতে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। ভারতের কি আর কোনো সমস্যা নেই? সে কথাও থাকুক। ভারতবর্ষ হিন্দুদের দেশ বলেই না হয় হিন্দুরা ভারতবর্ষে এসেছে। কিন্তু আপনারা কোন্ মুখে দলে দলে চলে এলেন? আমি অনিমেষ বাবুর কথায় রাগ করতে পারলাম না। আমার লেগেছে একথা সত্যি। তারপরেও মনে মনে ভদ্রলোকের প্রশংসা না করে পারলাম না। তার মধ্যে আর যাই হোক কপটতার বালাই নেই।

আমি মনে করলাম, আর বসে থেকে লাভ কি? অন্ততঃ একটা নতুন অভিজ্ঞতা তো হলো। আমি স্যাণ্ডেলে পা গলিয়ে বললাম, তাহলে আমি আসি। সৌগতবাবুকে আমার সঙ্গে আসতে বলবো কিনা ভাবনায় পড়ে গেলাম। অনিমেষবাবু বললেন, আপনার খারাপ লেগেছে বুঝতে পারি। কিন্তু আমি মশায় যা ভাবি বলে ফেলি। আমার ভেতর ঢাক ঢাক গুড় গুড় কিছু পাবেন না। বসুন, চা খান। চলে যাবেন কেন, আপনি তো কিছু কাজ চেয়েছিলেন। আমার তো একজন অনুবাদক প্রয়োজন। তারপর তিনি কম্পোজিটরদের একজনকে ডেকে বললেন, ভূপতি যাও নিচে থেকে, চা এবং সিঙ্গারা নিয়ে এসো। উঠি উঠি করেও উঠতে পারলাম না। সৌগতবাবু বললেন, অনিমেষদা, চা আনতে তো কিছু সময় লাগবে, ততোক্ষণে আপনি দানিয়েল সাহেবকে টেস্ট করে দেখেন, অনুবাদে হাত আছে কিনা। অনিমেষবাবু ধমক দিয়ে বললেন, সৌগত নড়াচড়া করবে না। ঠিক হয়ে বসো। আমি তোমাদের শখের কমিউনিস্টদের মতো হিপোক্র্যাট নই। আমার অনুবাদের মানুষ দরকার, উনি যদি ভালোভাবে করতে পারেন, অবশ্যই কাজ দেবো। সহজ কথাটা সহজভাবে বলি বলে মনে করো না, আমার কোনো ভদ্রতাজ্ঞান নেই।

এবার অনিমেষবাবু অপেক্ষাকৃত সহজ ভঙ্গিতে আমার সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি জানতে চাইলেন আমার বাড়ি কোথায়। আমি বললাম, চট্টগ্রাম। তিনি বললেন, আমাদের বাড়িও একসময় ওদিকে ছিলো। পঞ্চাশের রায়টের পর সবকিছু বেচেকিনে চলে এসেছি। আমি তাঁর বাড়ি চট্টগ্রাম কোথায় জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, না চট্টগ্রাম নয়, তবে সীমান্তের অপর পাড়েই তাঁদের বাড়ি। যশোর জেলার নড়াইল মহকুমায়। এরই মধ্যে চা এলো, সিঙ্গারা এলো। আমার দিকে প্লেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, খান। চা খাওয়া শেষ হলে একটা সিগারেট খাওয়া যাবে কিনা অনুমতি চাইলাম। তিনি বললেন, ফিল ফ্রি। সংবাদপত্রের অফিসে আবার কেউ সিগারেট খাওয়ার অনুমতি চায় নাকি। তারপর তিনি আমাকে ইংরেজি টাইপ করা একটি প্রবন্ধ দিয়ে বললেন, একটা পৃষ্ঠা অনুবাদ করে দেখান, দেখি আপনার হাত কেমন। আমি একটু সরে বসে অনুবাদ করতে লেগে গেলাম। প্রবন্ধটির শিরোনাম হলো আর্যদের আদি নিবাস। স্বামীজী বিরূপাক্ষ হলেন লেখক। তিনি প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন, ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা আর্যদের বহিরাগত প্রমাণ করে যে সকল বইপুস্তক লিখেছেন, সেগুলো একেবারেই প্রমাণসিদ্ধ নয়। আর্যদের আদি নিবাস হলো ভারতবর্ষে। এই ভারতবর্ষ থেকেই আর্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার একটা পৃষ্ঠা অনুবাদ করতে আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগলো। তারপর আমি অনুবাদ করা অংশটি নিয়ে অনিমেষবাবুর টেবিলে রাখলাম। তিনি চশমা খুলে পড়ে দেখলেন। বললেন, আপনি তো মোটামুটি ভালোই অনুবাদ করেন। শুধু একটি শব্দ আমি পাল্টাচ্ছি। যেখানে সিন্ধুনদের পানি বলেছেন,আমি পানি কেটে জল শব্দটি বসাচ্ছি। আমি বললাম, জল পানিতে আমার কিছু আসবে যাবে না।

সৌগতবাবু বললেন, দেখি অনিমেষদা। তারপর মূলপ্রবন্ধ এবং অনূদিত অংশ টেনে নিয়ে দেখতে লাগলেন। অনুবাদের অংশটি পড়া শেষ করে বললেন, তাহলে এখন থেকে আপনি আর্যদের আদি নিবাস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এই ধরনের প্রবন্ধের পাঠক এখনো পশ্চিমবঙ্গে আছে নাকি। আপনার কাগজ কেউ পড়ে? সৌগত, তুমি একটা আস্ত আহামক। শখের কমিউনিস্টগিরি করে বেড়াও বলে দেখতে পাওনি। দশ বছর থেকেই প্রতি সপ্তাহে আট হাজার কাগজ ছেপে আসছি। বাজারে দেয়ার প্রয়োজন হয় না, গ্রাহকদের বাড়িতে আমি কাগজ পাঠিয়ে দেই। তারা আমাকে ডাকে চাঁদা পাঠান। তোমার ভুলে যাওয়া উচিত নয়, তোমার মতো পশ্চিম বাংলায় সকলে বিটকেলে জাতখোয়ানো বামুন নয়। কিছু খাঁটি এবং সৎ ব্রাহ্মণ এখনো আছেন। সৎ হিন্দুও অনেক আছেন। তারা অনেকদিন থেকেই আমার কাগজ নিয়মিত পাঠ করে আসছেন। তুমি যদি দেখতে চাও আমি গ্রাহক লিস্ট দেখাতে পারি। অনিমেষবাবুর খোঁচা খেয়ে সৌগত একটু নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, বুঝলাম, সৎ হিন্দুরা আপনার কাগজ পড়েন। কিন্তু আপনি কাগজে কি লিখেন? কেননা আমি হিন্দুদের কথা লিখি। হিন্দুদের মহান ঐতিহ্যের কথা লিখি। স্বার্থের কথা লিখি। হিন্দুরা যে মহান জাতি সে কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেই। অনিমেষবাবুর কথার মধ্যে কোনো জড়তা নেই। যে কেউ তাঁর কথা শুনলে বুঝতে পারবেন, তার মন এবং মুখের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। অনিমেষবাবু বললেন, সৌগত, আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তোমার বাংলাদেশের কমরেডের সঙ্গে কথাবার্তাটা আগে ফয়সালা করে নেই। প্রতি হাজার শব্দে আমি পঁচিশ টাকা করে দিয়ে থাকি। আমাদের যিনি অনুবাদ করতেন, তিন চার মাস যাবত অসুস্থ। বাঁচবেন কিনা সন্দেহ। তোমার বন্ধু যদি রাজি থাকেন, তাঁকে কাজটা দিতে আমি প্রস্তুত। সৌগত বাবু বললেন, কিন্তু দাদা আমার একটা খটকা থেকে গেলো। আপনার কাগজ হিন্দুদের কাগজ। একজন মুসলিম যদি অনুবাদ করে আর সে লেখা যদি আপনি ছাপেন, তাতে কোনো দোষ হবে না? অনিমেষবাবু স্পষ্টভাবে বললেন, না কোনো দোষ হবে না। কেন দোষ হবে? যদি হিন্দু সংস্কৃতি, হিন্দু সভ্যতা সম্বন্ধে তোমার কোনো ধারণা থাকতো, তুমিও বুঝতে পারতে এতে দোষের কিছু নেই। আমি একজন সৎ এবং নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ হিসেবে অনুভব করি সঠিক বিষয়টি চিন্তা করা ছাড়া আমার আর কোনো কর্তব্য নেই। যুগে যুগে ব্রাহ্মণেরা তাই করে এসেছে। ক্ষত্রিয়েরা যুদ্ধ করেছে, বৈশ্যরা ব্যবসা করেছে, শূদ্ররা পরিশ্রম করেছে। আর ব্রাহ্মণ সব সময়ে বিধান দিয়েছে। কেউ না কেউ ব্রাহ্মণের কাজ করে দিয়েছে। একজন গুণবান পণ্ডিত ব্রাহ্মণের লেখা একজন মুসলমান দিয়ে অনুবাদ করালে এবং সে লেখা হিন্দুদের পড়তে দিলে এতে দোষের কিছু থাকতে পারে বলে আমি মনে করিনে। সৌগতবাবু এবং অনিমেষবাবুর বিতর্কটি শুনে আমি তো দিশেহারা। ভাবনায় পড়ে গেলাম। কাজটা নেবো কিনা। আমার যে অবস্থা রাস্তায় কুলিগিরি হলেও আপত্তি ছিলো না। আমার দৈনিক মাত্র পাঁচ ছয়টি টাকার প্রয়োজন। কুলিগিরিতে শারীরিক পরিশ্রম লাগে কিন্তু মানসিক নির্যাতন নেই। এই কাজটি গ্রহণ করলে তার চাইতে ঢের কম শ্রমে আরো বেশি আমি পেতে পারি। আমার অন্তরাত্মা বলছে, এই কাজের ভেতরে এমন কিছু আছে, গ্রহণ করলে আমি নিজের কাছে নিজে ছোটো হয়ে যাবো। কিন্তু তায়েবার কথা মনে হওয়ায় বুকটা হু হু করে উঠলো। কথা দিলাম, অনুবাদের কাজটা আমি করবো।