আমি যখন হাসপাতাল এসে পৌঁছলাম, সূর্য পশ্চিমে ঢলেছে। মনুমেন্টের ছায়া দীর্ঘতরো হয়ে নামছে। রবীন্দ্রসদনের এদিকটাতে মানুষজন গাড়ি ঘোড়র উৎপাত অধিক নয়। মহানগর কোলকাতা এই বিশেষ স্থানটি অপেক্ষাকৃত শান্ত নিরিবিলি। বিশেষ করে এই ক্ষণটিতে যখন গোধুলির সঙ্গে বিদ্যুতের আলোর দৃষ্টি বিনিময় হয়।
ঝাকড়া গাছগুলোর ছায়া রাস্তার ওপর বাঁকা হয়ে পড়েছে। এখানে সেখানে নগর কাকের কয়েকটি জলসা চোখে পড়লো। পরিবেশের প্রভাব বলতে হবে। বায়স কলের সমবেত কাংস্যধ্বনিও মোলায়েম কর্কশতা বর্জিত মনে হয়। ট্রাফিকের মোড়টা বায়ে রেখে পিজি হাসপাতালে ঢোকার পর মনে হলো, লাল ইটের তৈরি কমপ্লেক্স বিল্ডিং আমাকে আস্ত গিলে খাওয়ার জন্য যেনো উদ্যত হয়ে রয়েছে।

হাসপাতালে ভিজিটিং আওয়ারের সময় শেষ হয়ে আসছে। মানুষজন চলে যেতে শুরু করেছে। আমার কর্তব্য কি ঠিক করতে না পেরে কম্পাউণ্ডের প্রাচীর ঘেঁষা নিম গাছটির তলায় দাঁড়িয়ে একটা চারমিনার জ্বালালাম। আমি একজনের খোঁজ করতে এসেছি। কিন্তু জানিনে কোন্ ওয়ার্ডে কতো নম্বর বেডে আছে। তার ওপর নতুন জায়গা এবং আমি পরিশ্রান্ত। সুতরাং সিগারেট খেয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হলো।

এই যে দাদা আগুনটা দেবেন? একজন মানুষ আমার সঙ্গে কথা বললো। গায়ে হাসপাতালের ইউনিফরম। আমার যা অবস্থা মনে হলো অকূলে কূল পেয়ে গেলাম। মানুষটা লম্বাটে, বাঁ চোখটা একটু ট্যারা। দারোয়ান হতে পারে, ওয়ার্ডবয় হতে পারে, আবার মেল নার্স হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি ম্যাচ জ্বালতে যাচ্ছিলাম। বাধা দিলো লোকটি। আহা শুধু শুধু একটা কাঠি নষ্ট করবেন কেন? দিন না সিগারেটটা। আমার হাত থেকে আধপোড়া সিগারেটটি নিয়ে লোকটি নিজের সিগারেট জ্বালালো।

ভাগ্যটা যে ফর্সা একথা মানতেই হবে। না চাইতে হাসপাতালের একজন খাস মানুষ পেয়ে যাওয়ায় মনে হলো ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। আমি জিগগেস করলাম, আচ্ছা দাদা, আপনি কি এই হাসপাতালের লোক? নাকে মুখে প্রচুর ধূম্ররাশি উদ্গীরণ করে জানালো, আমি চৌদ্দ নম্বর ফিমেল ওয়ার্ডে আছি। তারপর আমার দিকে একটা তেরছা দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে আপাদস্তক ভালো করে দেখে নিয়ে বললো, আপনি বুঝি জয়বাংলার মানুষ? আমার জবাব দেয়ার প্রয়োজন ছিলো না। কাপড়চোপড় মুখ ভর্তি দাড়ি এসব পরিচয়পত্রের কাজ করলো। লোকটা এরই মধ্যে হাতের সিগারেটটি শেষ করে একটুখানি আমার কাছে ঘেঁষে এলো। তারপর নিজে নিজেই বলতে থাকলো, মশায় আজ সারাদিন কি হ্যাঙ্গামাটাই না পোহাতে হলো। তিন তিন বেটা এ্যাবসেন্ট। ডবল ডিউটি করতে হচ্ছে। দিন আপনার একখানি চারমিনার। এখুনি আবার ডাক পড়বে। এমন একটা মোক্ষম মওকা পেয়ে কৃতার্থ হয়ে গেলাম। পারলে গোটা প্যাকেটটাই দিয়ে দিতাম। আপাতত সেরকম কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হওয়ায় একটি শলাকাতেই আগুন জ্বালিয়ে দিলাম। লোকটার সিগারেট টানার একটা বিশেষ ভঙ্গি আছে। অসন্তুষ্ট বিরক্ত শিশু যেমন মাতৃবুকে মুখ লাগিয়ে গিসগিসিয়ে টান মারে সেরকম একটা দৃশ্যের সৃষ্টি হতে চায়। কপালের বলিরেখাগুলো জেগে ওঠে, চোখের মণি দুটো বেরিয়ে আসতে চায়। বোধহয় আমাকে খুশি করার জন্যই বললো, জানেন দাদা, আমাদের ওয়ার্ডে আপনাদের জয়বাংলার একটি পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে। লোকটা এপর্যন্ত দু’ দু’বার ‘জয়বাংলা’ শব্দটি উচ্চারণ করলো। কোলকাতা শহরের লোকদের মুখে ইদানীং জয়বাংলা শব্দটি শুনলে আমার অস্তিত্বটা কেমন কুঁকড়ে আসতে চায়। শেয়ালদার মোড়ে মোড়ে সবচে সস্তা, সবচে ঠুনকো স্পঞ্জের স্যাণ্ডেলের নাম জয়বাংলা স্যাণ্ডেল। এক সপ্তার মধ্যে যে গেঞ্জি শরীরের মায়া ত্যাগ করে তার নাম জয়বাংলা গেঞ্জি। জয়বাংলা সাবান, জয়বাংলা-ছাতা, কতো জিনিস বাজারে ছেড়েছে কোলকাতার ব্যবসায়ীরা। দামে সস্তা, টেকার বেলায়ও তেমন। বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের ট্যাকের দিকে নজর রেখে এ সকল পণ্য বাজারে ছাড়া হয়েছে। কিছুদিন আগে যে চোখওঠা রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো, কোলকাতার মানুষ মমতাবশত তারও নামকরণ করেছিলো জয়বাংলা। এই সকল কারণে খুব দ্র অর্থেও কেউ যখন আমাকে জয়বাংলার মানুষ বলে চিহ্নিত করে অল্পস্বল্প বিব্রত না হয়ে উপায় থাকে না।

সে যাকগে। আমি জিগগেস করলাম, আপনার ওয়ার্ডে বাংলাদেশের পেশেন্টটির কি নাম জানেন নামধাম জানিনে। উনি আছেন উনত্রিশ নম্বর বেডে। বললাম, আমি এসেছি একজন রোগিনীর খোঁজে। কি অসুখ, কোথায় ভর্তি হয়েছে কিছুই বলতে পারবো না। আপনি কি এ ব্যাপারে কোনো উপকার করতে পারেন? চারমিনারের অবশিষ্ট সিগারেটগুলো তার হাতে তুলে দিলাম। লোকটি আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললো, চলুন না চৌদ্দ নম্বর ওয়ার্ডে, উনত্রিশের পেশেন্টটি যদি হয়ে যায়, তাহলে তো পেয়েই গেলেন। উনত্রিশের পেশেন্ট জয়বাংলার। অন্য কোনো পেসেন্ট থাকলে তার খবরও বলতে পারবে।
ছিপছিপে এল টাইপের একতলা বিল্ডিংটির লনের কাছে এলাম। লোকটি বললো, একটু দাঁড়ান, জিগগেস করে দেখি। চার পাঁচজন মহিলা লনে পায়চারি করছে সেদিকে লক্ষ করেই হাঁক দিলো, এই যে জয়বাংলার দিদিমণি। আপনাদের দেশের এক ভদ্দরলোক একজন ফিমেল পেশেন্টের খোঁজ করছে। দেখুন তো সাহায্য করতে পারেন কিনা। আমি তাকিয়ে দেখলাম, কপালের দিকে সরে আসা চুলের গোছাটি সরাতে সরাতে তায়েবা সুরকি বিছানো পথের ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। আমাকে ডাকছো নাকি গোবিন্দদা! আজ্ঞে দিদিমণি, আপনাদের জয়বাংলার একজন ভদ্দরলোক একজন ফিমেল পেশেন্ট তালাশ করছেন। আপনি একটু কথা বলে দেখুন তো।

এতোক্ষণে জানা গেলো লোকটির নাম গোবিন্দ। তায়েবা এরই মধ্যে তার পুরোনো সম্পর্ক পাতানোর ব্যাপারটি চালু করে ফেলেছে দেখছি। আমার চোখে চোখ পড়তে তায়েবা আনন্দে চকমক করে উঠলো। পিঠের ওপর ঢলের মতো নেমে আসা ছড়ানো চুলের রাশিতে একটা কাঁপন জাগিয়ে বললো, একে কোথায় পেলে গোবিন্দদা। দিদিমণি আপনার অতোসব জবাব দিতে পারবো না, আমি চলোম। ডঃ মাইতি আমাকে ওয়ার্ডে না পেলে একেবারে কাঁচা খেয়ে ফেলবে। ডঃ মাইতির কাঁচা খাওয়া থেকে বাঁচার জন্য গোবিন্দ চলে গেলো।

তায়েবাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। এই ক’মাসে তার চেহারায় একটা বাড়তি লাবণ্য ফুটে উঠেছে। তার পিঠ ঝাপা অবাধ্য চুলের রাশি। চোখে না দেখলে চিনে নিতে কয়েক মিনিট সময় নিতো। তায়েবার এমন সুন্দর, সুগঠিত শরীরে কোথায় রোগ ঢুকে হাসপাতালে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে ভেবে ঠিক করতে পারিনি। আমার চোখে সরাসরি চোখ রেখে জিগগেস করলো, দানিয়েল ভাই, এতোদিন আসেননি কেন? কথার জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলেন যে? যান আপনার সাথে কোন কথা নাই। যান চলে যান। পরক্ষণে হাততালি দিয়ে খিল খিল করে হেসে উঠলো। এই যে আরতিদি, শিপ্রা, মঞ্জুলিকা, উৎপলা দেখে যাও কে এসেছে। তায়েবাকে কোনোদিন বুঝতে পারিনি। বোঝার চেষ্টাও ছেড়ে দিয়েছি। পায়ে পায়ে চারজন নারীমূর্তি এগিয়ে এলো এবং আমার মনে একটা খারাপ চিন্তা জন্ম নিলো। এ সমস্ত মহিলা রোগ সারাতে হাসপাতালে এসেছে, না বিউটি কম্পিটিশন করতে এসেছে। তায়েবা বললো, আসুন আরতিদি, পরিচয় করিয়ে দেই। ইনি হচ্ছেন দানিয়েল ভাই, ভীষণ প্রতিভাবান মানুষ। এসএসসি হতে এমএ পর্যন্ত সবগুলো পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আসছেন। স্কলারশীপ নিয়ে বিলেত যাবার ব্যবস্থাও পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিলো, মাঝখানে সংগ্রাম শুরু হয়ে গেলো, তাই..। আর আরতিদির বাড়ি ছিলো আপনাদের চাঁটগায়ে। আমার পাশের কেবিনে থাকেন। এ হচ্ছে শিপ্রাগুহ ঠাকুরতা। বরিশালের বানরীপাড়ার মেয়ে। আর যে মঞ্জুলাকে দেখছেন তারও আসল বাড়ি বাংলাদেশে ময়মনসিংহ জেলায়। পোড়ামুখী তিন বছর ধরে এই হাসপাতালে ডেরা পেতে আছে। অবশেষে উৎপলার হাত ধরে বললো, এর পরিচয় আপনি জানতে পারবেন না। ওর সাতপুরুষের কেউ কস্মিনকালেও পদ্মার হেপাড়ে যায়নি। একেবারে জাত ঘটি, তার ওপর আবার ব্রাহ্মণকন্যা। এখন ঠেকায় পড়ে এই মেলেচ্ছনির সঙ্গে রাত্রিবাস করতে হচ্ছে। ‘রাত্রিবাস’ শব্দটি এমন এক বিশেষ ভঙ্গি সহকারে উচ্চারণ করলো সকলে হো হো করে হেসে উঠলো। এই ঘটা করে পরিচয় করানোটা যে আমার ভালো লাগেনি তায়েবার অজানা থাকার কথা নয়। তুচ্ছ জিনিসকে বড়ো করে দেখানোর ব্যাপারে তার জুড়ি নেই। কিন্তু আজকের বাড়াবাড়িটা সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। জীবনে আমি ফার্স্ট সেকেণ্ড কোনোদিনই হতে পারিনি। একবার উত্তীর্ণ ছাত্রমণ্ডলীর তালিকায় ওপরের দিক থেকে লাস্ট এবং শেষের দিক থেকে ফার্স্ট হয়েছিলাম। গোটা ছাত্রজীবনে সাফল্যের সেই ধারাটিই আমি মোটামুটিভাবে রক্ষা করে আসছি। এজন্য আফসোসও নেই। বরঞ্চ পরীক্ষায় যারা ভালোটালো করে তাদের প্রতি রয়েছে আমার মুদ্রাগত আক্রোশ। মুখে সাত আট দিনের না-কামানো দাড়ি। পায়ে জয়বাংলা চপ্পল, জামা-কাপড়ও তেমনি। অনাহার, অর্ধাহার, অনিদ্রার ছাপ মুখে ধারণ করে আমি জয়বাংলার মূর্তিমান শিলাস্তম্ভে পরিণত হয়েছি। এটাই আমার বর্তমান, এটাই আমার অস্তিত্ব। এই কোলকাতা শহরে অনেক মানুষ আমাদের সমাদর করেছে আশাতীত দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়েছে, অনেকে হেলাফেলাও করেছে। ভালো লাগুক, খারাপ লাগুক সব নির্বিচারে মেনে নিয়েছি। কিন্তু তায়েবার আজকের আচরণ আমার কাছে একটা ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা বলে মনে হলো। তার ঠিকানা সংগ্রহ করে হাসপাতাল অবধি আসতে আমাকে কি কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে! পারলে মুখে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে সোজা পা ঘুরিয়ে ফেরত চলে যেতাম। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূল ছিলো না। তাছাড়া শরীরে মনে এতোদূর ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত ছিলাম যে সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায় আনকোরা একটি অভাবিত নাটক জমিয়ে তোলা সম্ভব ছিলো না।

তায়েবা আমাকে তার কেবিনে নিয়ে গেলো। দুটো মাত্র খাট, পানির বোতল, গ্লাস ইত্যাদি রাখার একটা কাঠের স্ট্যাণ্ড, স্টীলের একটা মিটসেফ জাতীয় বাক্স, যেখানে প্রয়োজন মতো কাপড় চোপড় রাখা যায় এবং ভিজিটরদের জন্য একটি টুল… এই হলো আসবাবপত্তর। তায়েবা বিছানায় উঠে বালিসটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে আমাকে টুলটা দেখিয়ে বললো, বসুন। জানেন তো ভিজিটরদের রোগীর বিছানায় বসতে নেই। তাছাড়া আপনার পায়ে সব সময়ে রাজ্যের ময়লা থাকে, কোনো সুস্থ মানুষও যদি আপনাকে বিছানায় বসতে দেয়, পরে পস্তাতে হয়। কথাটা সত্যি। আমি ওদের বাসায় গেলে আগেভাগে আরেকটি চাদর বিছিয়ে দিতো। তারপর আমি বসতাম। এভাবে খাটজোড়া ধবধবে সাদা চাঁদরের অকলঙ্ক শুভ্রতা রক্ষা করা হতো।’

এই সময়ে হাসপাতালের শেষ ঘণ্টা বেজে উঠলো। না চাইতেই একটা সুযোগ আমার হাত এসে গেলো। আমতা আমতা করে বললাম, জায়গাটি তো চেনা হলো, আরেকদিন না হয় আসা যাবে। আজ চলি। যতোই মৃদুভাবে বলি না কেন, আমার কথাগুলোতে রাগ ছিলো, ঝাঁঝ ছিলো। এটুকু না বুঝতে পারার মতো বোকা নিশ্চয়ই তায়েবা নয়। সে শশব্যস্তে বললো, সেকি কতোদিন পরে এলেন, এখুনি চলে যাবেন?। বসুন দু’চারটা কথাবার্তা বলি। আমি বললাম, শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে, এখন যাওয়াই উত্তম। তায়েবা শাড়ির আঁচল আঙুলে জড়াতে জড়াতে বললো, সেজন্য আপনাকে চিন্তা করতে হবে না, আমি মাইতিদাকে বলে সব ম্যানেজ করে নেবো। আমি স্পষ্টতই অনুভব করলাম, আমার বুকের ভেতরে ঈর্ষার একটা কুটিল রেখা। জানতে চাইলাম, মাইতিদাটি কে? জবাবে বললো, মাইতিদা হচ্ছে ডঃ মাইতি। অসম্ভব ভালো মানুষ। কিন্তু বাইরে ভদ্রলোক ভীষণ কড়া। একটু পরেই আসবেন, আলাপ করলেই বুঝতে পারবেন কি সুন্দর মন। তার কথায় আমি স্প্রীংয়ের মতো লাফিয়ে উঠলাম। দোহাই তায়েবা উদ্ধার করো। দিদিমণিদের সামনে তুমি আগে একটা সার্কাস দেখিয়ে ফেলেছে। আরো একটা সার্কাস তুমি তোমার মাইতিদার সামনে দেখাবে বলে যদি মনস্থ করে থাকো। আমি তাতে রাজী হতে পারবো না। তারচে বরং আমি চলি। সুন্দর মনের মানুষদের নিয়ে তুমি থাকো। তোমার সুন্দর মনের মানুষদের গুণপনা এই সময়ে গোটা কোলকাতা জেনে ফেলেছে।

তায়েবা হঠাৎ সাপের মতো ফোঁস করে উঠলো। আপনি আমার অসুখের সংবাদ নিতে এসেছেন, নাকি যে সব কথা শুনতে শুনতে আমার কান পঁচে গেছে, সেগুলো পাঁচ কাহন করে বলতে এসেছেন। চলে যান, আপনি এখুনি চলে যান। একখানা লাউড স্পীকার ভাড়া করে আমার লোকদের কথা কোলকাতা শহরে ঘটা করে প্রচার করুন। ভাড়ার টাকা আমি দেবো। এই আচমকা বিস্ফোরণে আমি দমে গেলাম। টুলটা নেড়ে বিছানার কাছে এসে বসতে বসতে বললাম, তুমি এই মহিলাদের সামনে আমাকে এমনভাবে অপমানটা করলে কেন? কই অপমান করলাম, কোথায় অপমান করলাম? মনটা আপনার অত্যন্ত সংকীর্ণ। এই যে বললে প্রতি বছরে আমি ফার্স্ট হয়ে আসছি। বারে, অন্যায় কি করেছি। আপনি তো অনেক কাজ করে পড়াশোনা করেন। সব ছেড়ে ছুঁড়ে একটুখানি মন লাগালে আপনিও অনায়াসে ফাস্টটাস্ট কিছু একটা হতেন। আর যারা ফার্স্ট সেকেন্ড হয় তারা আপনার চাইতে ভালো কিসে? নিজের তারিফ শুনতে কার না ভালো লাগে। মনের উষ্মর ভাবটি কেটে গেলো। আমি হাসি মুখে বললাম, আর বিলেত যাওয়ার ব্যাপারটি। আরে দূর দূর ওটা একটা ব্যাপার নাকি, আজকাল কুকুর বেড়ালেরাও হরদম বিলেত আমেরিকা যাচ্ছে। আপনি চাইলে অবশ্যই যেতে পারেন। তাছাড়া…। আমি বললাম, তা ছাড়া আর কি। তাছাড়া আপনি একটা গেঁয়োভূত। একেবারে মাঠ থেকে সদ্য আসা একটি মিষ্টি কুমোড়। আমি বললাম, আমি যে মিষ্টি কুমোড় সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কুকুর বেড়ালও বিলেত আমেরিকা যাচ্ছে একথা সত্যি। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছো টিকিট করে ওসব দেশে যেতে হয়। আপনি সব কথার কুষ্ঠিনামা বের করতে চান। চাল বোঝেন, চাল? ঐ মেয়েরা প্রতিদিন কথায় কথায় আমার সঙ্গে চাল মারে। আজ না হয় আমিও একটা চাল মারলাম। আপনি এটুকুও বোঝেন না? তুমি তো পরিচয় করিয়ে দিলে, তোমার দিদি, তোমার সই, তোমার বান্ধবী, এখন বলছে সব চালবাজ। আমার দিদি, আমার সই, আমার বান্ধবী ঠিক আছে, কিন্তু চাল মারতে অসুবিধেটা কোথায়? আপনি মেয়েদের সম্পর্কে জানেন কচু। সে বুড়ো আঙুলটি উঠিয়ে দেখালো।

শুনুন দানিয়েল ভাই, তায়েবা ঝলমল করে উঠলো। সেদিন হাসপাতালে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে। এখানকার ধনী ঘরের এক মহিলা সেদিন বিউটি পারলারে গিয়ে ছাতার মতো এক মস্ত খোঁপা তৈরি করিয়ে আনে। বাড়ি আসার পরে কি হলো জানেন, মহিলার মনে হলো তার মগজের ভেতর কিছু একটা নড়ছে, লাফ দিচ্ছে। এরকম একটা আজগুবী অসুখের কথা কেউ কখনো শোনেনি। সকলের খুব দুশ্চিন্তা। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো। কেউ বিশেষ কিছু করতে পারলো না। মহিলাকে নাকি স্যার নীলরতন হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো। সেখানে ডাক্তারেরা কিছু করতে পারেনি। অবশেষে তাকে এক রকম ফেন্ট অবস্থায় এ হাসপাতালে আনা হয়। ডাক্তারেরা স্থির করেন, মহিলার খোঁপাটি খুলে যন্ত্রপাতি দিয়ে দেখতে হবে মগজের ঘটনাটি কী। সত্যি সত্যি নার্সরা যখন মাথার খোঁপাটি খুলতে লেগে গেলো, মহিলা ফেন্ট অবস্থায়ও দু’হাত দিয়ে খোঁপা খুলতে বাধা দিচ্ছে। পরে যখন খোঁপা খোলা হলো অমনি এক টিকটিকি বাহাদুর লেজ দুলিয়ে লাফ দিলো। খোঁপা বাঁধার কোন ফাঁকে আটকা পড়ে গেছে টের পায়নি। সেই থেকে টিকটিকিটি যতোই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে, মহিলার মনে হয়েছে, মাথার মগজ খুলি ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সত্যি ঘটনা, বুঝলেন মেয়েরা কেমন হয়? আমি বললাম, যতোদূর জানি, তুমিও তো একজন মেয়ে, তোমার বিষয়েই বা অন্যরকম হবে কেমন করে। তায়েবা কৃত্রিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললো, আপনি এখনো মিষ্টি কুমোড়ই থেকে গেছেন। কিছু শিখতে পারেননি।

এই সময়ে ডান হাতে স্টেথিসকোপ দোলাতে দোলাতে এক ভদ্রলোক কেবিনে প্রবেশ করলেন। বয়স খুব বেশি হবে না। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের কোঠায়। চোখের দৃষ্টি অসম্ভব ধারালো। চেকন করে কাটা একজোড়া শাণিত গোঁফ। ধারালো চিবুক। একহারা গড়নের চেহারাখানা ব্যক্তিত্বের দীপ্তিতে খোলা তলোয়ারের মতো ঝকঝক করছে। সন্ধ্যের এ আলো আঁধারিতেও আমার দৃষ্টি এড়ালো না। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই যে এদিকে আসুন তো। আমি এগিয়ে গেলে তিনি অনেকটা ধমকের ভঙ্গিতে জিগগেস করলেন, কি বেল বাজলো আওয়াজ শুনতে পাননি? আমি মৃদুস্বরে বললাম, পেয়েছি। পেয়েছেন তো হাসপাতালে বসে আছেন কেন? আপনাদের ঘাড় ধরে বের করে না দিলে শিক্ষা হবে না দেখছি। এই যে মাইতিদা থামুন, থামুন। আমাদের দুজনের মাঝখানে তায়েবা এসে দাঁড়িয়েছে। আপাততঃ আপনার চোখা চোখা কথাগুলো তুলে টুলে রাখুন। আমি কতো বলে কয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়ার জন্য দানিয়েল ভাইকে সেই বিকেল থেকে আটকে রেখেছি। এদিকে আপনি তাকে ঘাড় ধরে বের করে দিচ্ছেন। ডঃ মাইতি স্মিত হেসে বললেন, এই তোমার দানিয়েল ভাই, যিনি ফার্স্ট ছাড়া কিছুই হন না। মশায় আপনার অসাধারণ কীর্তিকাহিনী শুনতে শুনতে তো পাগল হবার উপক্রম। অধীর আগ্রহে দিন গুণছি, কখন এসে দর্শনটা দেবেন। শুনেছি মশায়ের কোলকাতা আগমনও ঘটেছে তায়েবার অনেক আগে। যাক ভাগ্যে ছিলো, তাই দেখা হলো। তিনি আমার সঙ্গে শেকহ্যাণ্ড করলেন। তারপর বললেন, আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমি ওয়ার্ডে। একটা রাউন্ড দিয়ে আসি।

উৎপলা এখনো বাইরে থেকে ফেরেনি। কেবিনে আমরা দু’জন। এই ফাঁকে আমি জিগ্গেস করলাম, তায়েবা, তোমার শরীর কেমন? কেমন আছো? রোগের অবস্থা কি? তায়েবা মৃদু অথচ দৃঢ়স্বরে বললো, ওসব কথা থাকুক। আমার শরীর ভালো, আমি ভালো আছি। আমি বললাম, আগরতলা আসার সময় তোমাদের সঙ্গে শেষ দেখা। তোমরা তো আমার সঙ্গে এলে না, কোলকাতা এসে খবর পেলাম, তোমরাও আগরতলা এসে একটা ক্যাম্পে উঠেছে। কোলকাতায় নানাজনের কাছ থেকে নানাভাবে তোমার খবর পেয়েছি। একজন বললো, তোমাকে তিনদিন পার্ক সার্কাসের কাছে রাস্তা পার হতে দেখেছে। আরেকজন বললো, তুমি সকাল বিকেল তিনটি করে টিউশনি করছে। শেষ পর্যন্ত নির্মল একদিন এসে জানালো, তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। কোন্ হাসপাতাল, কি রোগ কিছুই জানাতে পারলো না। তোমার ঠিকানা যোগাড় করতে যেয়ে প্রায় একটা খুনখারাবী বাধিয়ে বসেছিলাম। তায়েবা বললো, সেসব কথা থাকুক। আপনার খবর বলুন, কোথায় আছেন, কখন এসেছেন? দু’বেলা চলছে কেমন করে বাড়ি ঘরের খবর পেয়েছেন? আপনার মা বোন এবং ভায়ের ছেলেরা কেমন আছে?

আমার তো বলবার মতো কোনো খবর নেই। তায়েবাকে জানাবো কি? কোলকাতা শহরে আমরা কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে দিন কাটাচ্ছি, বিশেষ করে মুসলমান ছেলেরা। আমাদের সঙ্গে মা বোন বা পরিবারের কেউ আসেনি। সে কারণে শরণার্থী শিবিরে আমাদের ঠাই হয়নি। আমরাও শিবিরের মানুষদের প্রাণান্তকর কষ্ট দেখে মানে মানে শহরের দিকে ছিটকে পড়েছি এবং কোলকাতা শহরে গুলতানি মেরে সময় যাপন করছি। একজন আরেক জনকে ল্যাং মারছি। বাংলাদেশের ফর্সা কাপড়চোপড় পরা অধিকাংশ মানুষের উদ্দেশ্যবিহীন বেকার জীবনযাপনের ক্লেদ কোলকাতার হাওয়া দুষিত করে তুলছে। আমরা সে হাওয়াতে শ্বাস টানছি। সীমান্তে একটা যুদ্ধ হচ্ছে। দেশের ভেতরেও একটা যুদ্ধ চলছে। অবস্থানগত কারণে আমরা সে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি ভুলে থাকতে চাই। কিন্তু পারি কই? যুদ্ধে চলে গেলে ভালো হতো। দেশের স্বাধীনতার জন্য কতোটুকু করতে পারতাম জানিনে। তবে বেঁচে থাকবার একটা উদ্দেশ্য চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। আমার যুদ্ধে যাওয়া হয়নি। যুদ্ধকে ভয় করি বলে নয়। আমাদের দেশের যে সকল মানুষের হাতে যুদ্ধের দায় দায়িত্ব, তারা আমাকে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠাবার যথেষ্ট উপযুক্ত বিবেচনা করতে পারেননি। আমি তিন তিনবার চেষ্টা করেছি। প্রতিবারই মহাপুরুষদের দৃষ্টি আমার ওপর পড়েছে। অবশ্য আমাকে বুঝিয়েছেন, আপনি যুদ্ধে যাবেন কেন? আপনার মতো ক্রিয়েটিভ মানুষের ইউজফুল কতো কিছু করবার আছে। যান কোলকাতা যান। সেই থেকে কোলকাতায় আছি। হাঁটতে, বসতে, চলতে, ফিরতে মনে হয় আমি শূণ্যের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছি। এ সব কথা তায়েবাকে জানিয়ে লাভ কী? কোন্ বাস্তব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে তাকে এই হাসপাতাল অবধি আসতে হয়েছে। সবটা না হলেও অনেকটা আমি জানি। তাকে খুশি করার জন্য বললাম, আমরা বাংলাদেশের বারো চৌদ্দজন ছেলে বৌবাজারের একটা হোস্টেলে খুব ভালোভাবে আছি। তুমি তো দাড়িঅলা নরেশদাকে চিনতে। এই হোস্টেলে তাঁর তিন ভাই আগে থেকে থাকতো। আমাদের অসুবিধে দেখে তারা দু’টো আস্ত রুম ছেড়ে দিয়েছে। রান্নাবান্না বাজার সব কিছু নিজেরাই করি। আমি এখানকার একটা সাপ্তাহিকে কলাম লিখছি। শীগগীর নরেশদা একটা কলেজে চাকরি পেতে যাচ্ছেন। এখানে বাংলাদেশের লক্ষ্মীছাড়া ছন্নছাড়াদের নিয়ে একটা সুন্দর সংসার গড়ে তুলেছি। আর শুনেছি বাড়িতে সবাই বেঁচেবর্তে আছে। তায়েবা আমার হাতে হাত রেখে বললো, দানিয়েল ভাই, আপনি একটা পথ করে নেবেন, এ কথা আমি নিশ্চিত জানতাম।

এরই মধ্যে জুতোর আওয়াজ পাওয়া গেলো। তায়েবা অবলীলায় বলে দিলো ওই যে মাইতিদা আসছেন। সত্যি সত্যি ডঃ মাইতি এসে কেবিনে প্রবেশ করলেন। তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, দানিয়েল সাহেব, আমি রসকষ হীন মানুষ। রোগী ঠেঙিয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করি। শুনেছি আপনি একজন জিনিয়স, আপনার সাথে কি নিয়ে আলাপ করা যায় ভেবে স্থির করে একদিন জানাবো। আজ ভয়ানক ব্যস্ত; ক্ষমা করতে হবে। এখন আমি উঠবো।
তায়েবা বিছানা থেকে তড়াক করে নেমে ডঃ মাইতির ঝোলানো স্টেথেসকোপটা নিজের হাতে নিয়ে বললো, মাইতিদা আপনাকে দু’মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, দানিয়েল ভাই, কালও কি আপনি হাসপাতালে আসবেন? আমি মাথা নাড়লাম। তাহলে আমার জন্য অল্প ক’টা ভাত আর সামান্য ছোট মাছের তরকারি রান্না করে নিয়ে আসবেন। মরিচ দেবেন না, কেবল জিরে আর হলুদ। ছোট্ট মেয়েটির মতো আবদেরে গলায় বললো, মাইতিদা, আমাকে আগামীকাল ভাত খেতে না দিলে আপনাদের কথামতো আমি ইনজেকশন দেবো না, ক্যাপসুল খাবো না, হেন টেস্ট তেন টেস্ট কিছুই করতে দেবো না। ডঃ মাইতির হাত ধরে বললো, আপনি হ্যাঁ বলুন মাইতিদা। ডঃ মাইতি বেশ শান্ত কণ্ঠে বললেন, বেশতো দানিয়েল সাহেব, কালকে ভাত মাছ রান্না করে নিয়ে আসুন। কিন্তু আমি ভাবছি, পুরুষ মানুষের হাতের রান্না তোমার মুখে রুচবে কিনা? তায়েবা বললো, রুচবে, খুব রুচবে। দানিয়েল ভাই ট্যাংরা মাছ পান কিনা দেখবেন। ডঃ মাইতি ঘড়ি দেখে বললেন, এবার আমি উঠবো। দানিয়েল সাহেব, আপনিও কেটে পড়ুন। এমনিতে অনেক কনসেসন দেয়া হয়েছে।

তায়েবার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে পেছন ফিরে একবার হাসপাতাল কমপ্লেক্সটির দিকে তাকালাম। ছেঁড়া ছেঁড়া অন্ধকারে বিরাট বাড়িটাকে নিস্তব্ধতার প্রতিমূর্তির মতো দেখাচ্ছে। মৃত্যু এবং জীবনের সহাবস্থান বাড়িটার শরীরে এক পোচ অতিরিক্ত গাম্ভীর্য মাখিয়ে দিয়েছে মনে হলো। হাসপাতাল কম্পাউণ্ড থেকে বেরিয়ে এসপ্ল্যানেডের পথ ধরলাম। পনেরো নম্বর ট্রাম ধরে আমাকে বৌবাজারে নামতে হবে। উল্টোপাল্টা কতো রকমের চিন্তা মনের ভেতর ঢেউ তুলছিলো। তায়েবার অসুখটা কি খুব সিরিয়াস? তার মা কি দিনাজপুর থেকে কোলকাতা আসতে পেরেছে? ডোরা শেষ পর্যন্ত পিলে চমকানো এমন একটা দুর্ঘটনার সৃষ্টি করলো। এতো বড়ো একটা কাণ্ড ঘটাবার পরেও জাহিদ নামের মাঝ বয়েসী মানুষটি কি করে, কোন্ সাহসে হুলোবেড়ালের মতো গোঁফ জোড়া বাগিয়ে তায়েবাকে হাসপাতাল দর্শন দিতে আসে। আমি তো ভেবে পাইনে। ট্রাম দাঁড়াতে দেখে দৌড়ে চড়তে যাচ্ছি, এমন সময় পেছনে ঘাড়ের কাছে কার করস্পর্শ অনুভব করলাম। তাকিয়ে দেখি ডঃ মাইতি। তিনি বললেন, দানিয়েল সাহেব, একটা কথা বলতে এলাম। মাছ রান্না করার সময় একেবারে লবণ ছোঁয়াবেন না। আমি বললাম, আপনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন গেণ্ডারিয়ার বাসাতেও তায়েবা কখনো লবণ খেতো না। তিনি জানতে চাইলেন, আপনি কতোদিন তায়েবাকে চেনেন। আমি বললাম, তা বছর চারেক তো হবেই। তিনি আমাকে জেরা করার ভঙ্গিতে বললেন, তার কী রোগ আপনি জানেন? বললাম, জানিনে, মাঝে মাঝে দেখতাম নিঃসার হয়ে পড়ে আছে। কিছুদিনের জন্য হাসপাতাল যেতো। আবার ভালো হয়ে চলে আসতো। শুধু এটুকু জানি সে লবণ খেতো না। আর চা টা ঠাণ্ডা করে খেতো। তিনি বললেন, এর বেশি আপনি কিছু জানেন না? বললাম, বারে জানবো কি করে। মহিলাদের রোগের কি কোনো সীমা সংখ্যা আছে? তাছাড়া তায়েবা আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি, আসলে তার অসুখটা কী? তিনি বললেন, উচিত কাজ করেছে, এসব আপনাকে পোষাবে না। আপনি অন্যরকমের মানুষ। আর শুনুন ভাত তরকারি আনার সময় লুকিয়ে আনবেন। ডঃ ভট্টাচার্য জানতে পেলে ওকে হাসপাতালে থাকতে দেবেন না। এটুকু কষ্ট করে মনে রাখবেন। তারপর নিজে নিজে বিড় বিড় করে বললেন, মেয়েটি তো ফুরিয়েই যাচ্ছে। যা খেতে চায় খেয়ে নিক। ডঃ মাইতি একটা চাপা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। আমার বুকটা ভয়ে আশঙ্কায় গুড় গুড় করে উঠলো। ডঃ মাইতি বললেন, আপনার ট্রাম, আমি চলি।