হাসপাতাল থেকে আমি সবটা পথ হেঁটেই বৌবাজারের হোস্টেলে এলাম। ট্রাম-বাসে চড়ার ইচ্ছেও মনের মধ্যে জাগ্রত হয়নি। মনে হচ্ছে আমি একেবারে কাঙাল বনে গেছি। আমার চিন্তা করার কিছু নেই, আকাক্ষা করারও কিছু নেই, ভরসা করার কিছু নেই। তবু হোস্টেলে আসতে পারলাম কেমন করে, সে আমি বলতে পারবো না। গেটের গোড়ায় এসে দেখি ভূড়িঅলা দারোয়ানটির বদলে দুবলা পাতলা দারোয়ানটি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে বসে খৈনি টিপছে। আমাকে দেখতে পেয়ে পান খাওয়া গ্যাটগ্যাটে দাঁত দেখিয়ে হেসে বললো, বাবু কোটিমে যাইয়ে আজ, হাওয়া বুহুত গরম আছে। কোনো উত্তর না দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলাম।

যে রুমে আমরা থাকি, সেখানে মাঝারি রকমের একটা কনফারেন্স বসে গেছে। বাংলাদেশের ছেলেদের অধিকাংশই হাজির আছে। তাছাড়া আছেন কোলকাতার সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনি পোস্টাফিসে চাকরি করেন। ফর্সাপনা সুন্দর চেহারার সদানন্দ মানুষটি। সবসময় পরিষ্কার পাজামাপাঞ্জাবি পরেন এবং দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কেটে থাকেন। অবসর সময়ে কবিতা লিখেন, কিন্তু কোলকাতার কাগজগুলো, এমন কি লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরাও তাঁর প্রতি এমন নির্দয় যে কবিতা কেউ ছাপতে চান না। বিশ্বাসের দিক দিয়ে তিনি বিপ্লবীও বটেন। কি কারণে বলতে পারবো না, কোনো বিপ্লবী পার্টির সদস্য হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কথাবার্তা বলে দেখেছি পশ্চিমবাংলার বিপ্লবী পার্টিগুলোর নীতি আদর্শের প্রতি তার ভীষণ রকম অনাস্থা এবং নেতৃবৃন্দের প্রতি সুমন্তবাবুর ভয়ানক রাগ। কথায় কথায় তিনি অবজ্ঞা প্রকাশ করেন। অবশ্য ইদানীং সুমন্তবাবুর বেশ পুষিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের এইসব ভাসমান কর্মহীন উদ্দেশ্যহীন ঘরহারা লক্ষ্মীছাড়া ছেলেদের সঙ্গে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত মার্কামারা সত্যিকার একটি গণবিপ্লবের তাত্ত্বিকভিত্তি নিয়ে হামেশা আলাপ আলোচনা করে থাকেন। তার ধারণা পশ্চিমবাংলা হেজেমজে গেছে। সমাজকে নিয়ে কিছু যদি করার থাকে, তা বাংলাদেশের ছেলেদের দিয়েই সম্ভব। তত্ত্বের জঙ্গলে ওদের ধ্যান ধারণা এখনো পথ হারিয়ে ফেলেনি। বাংলাদেশের প্রতিটি ছেলেকেই সুমন্তবাবু তার আকাঙ্ক্ষিত গণবিপ্লবের একেকজন সৈনিক হিসেবে দেখেন। এরই মধ্যে উদ্যোগী হয়ে বাংলাদেশের ছেলেদের নিয়ে তিন তিনটে কবিতার সংকলন প্রকাশ করে ফেলেছেন। তিনটিতেই সুমন্তবাবুর তিনটি কবিতা সগৌরবে স্থান করে নিয়েছে। মানুষটি রসগোল্লার মতো। মনে হয় টিপলেই রস বেরুবে। কি কারণে বলতে পারবো না, আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয়টা মামুলিপনা অতিক্রম করে হৃদ্যতার স্তরে পৌঁছুতে পারেনি। আমার পরনে ধুতি দেখে মাসুমই প্রথম ফোড়ন কাটলো। দানিয়েল ভাই, বলুন দেখি কোলকাতার হাওয়া এখন কার গায়ে লাগছে? মাসুম কোলকাতার মানুষের মতো টানটোন লাগিয়ে ঢাকার বাংলা ভাষাটি বলতে চেষ্টা করছে আজকাল। একবার সেদিকে ইঙ্গিত করেছিলাম। আজ আমার পরনে ধুতি দেখে মাসুম তার শোধ দিতে চেষ্টা করছে। মাসুমের কথার পিঠে কথা বলার মতো মনের অবস্থা ছিলো না। নীরবে নরেশদার পাশে গিয়ে একটা বালিশ টেনে নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম। নরেশদা জিগগেস করলেন, কি খবর? আমি বললাম, ভালো নয়। কি রকম বলো দেখি। এসব শেষ হোক, পরে বলবো। আমি চোখ দুটো বন্ধ করে রইলাম। মনে হচ্ছিলো একটা প্রচণ্ড সংজ্ঞাহীনতা আমাকে এখুনি গ্রাস করে ফেলবে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়তে পারছিলাম না। এক ভদ্রলোক যিনি আমার সম্পূর্ণ অচেনা, অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে ঘরভর্তি মানুষের সামনে কথা বলছিলেন। বোধকরি তিনি আগের থেকেই কথা বলছিলেন। আমার আগমনে হঠাৎ করে তাঁর কথায় ছেদ পড়ে থাকবে। বাংলাদেশের ফ্রিডম ওঅরের কথা শুনে লেখাপড়া ছেড়ে ইংল্যাণ্ড থেকে কোলকাতা এসেছি আজ পঁচিশ দিন। কিন্তু এখানে এসে কি দেখেছি? দেখেছি থিয়েটর রোডে যারা বসে আছে তাদের অধিকাংশই এ বাঞ্চ অফ রাস্কেলস। খাচ্ছে দাচ্ছে মজা করছে এভাবে নাকি ফ্রিডম ওয়রের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভয়ঙ্কর ডিজ-ইলুশনড হয়ে গেছি। মাও সে তুংও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আপনারা নিশ্চয়ই লংমার্চের খবর জানেন!

আপনার মাও সে তুং এখন বাংলাদেশের ব্যাপারে কি করছেন, সে খবর রাখেন? পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশে খুন, জখম, হত্যা, ধর্ষণ সবকিছু অবলীলায় চালিয়ে যাচ্ছে। আর আপনার মাও সে তুং সে ইয়াহিয়ার জল্লাদসৈন্যদের ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজ ভর্তি করে বোমা, কামান, অস্ত্রশস্ত্র পাঠাচ্ছে। লংমার্চ তো অতীতের ঘটনা, হালের খবর বলুন। আমার মনে হলো, প্রশ্নকারীর কণ্ঠস্বরটি আমার পরিচিত। ওহ মনে পড়েছে। গান্ধী পিস ফাউণ্ডেশনের মনকুমার সেন একবার যিনি এখানে এসেছিলেন, এই ভদ্রলোক তাঁরই বড়ো ছেলে। নামটি মনে আসছে না। অমর্তসেন না কি একটা হবে। তার বাড়িতে একবার খেতে গিয়েছিলাম। সকলেই কথা বলছে। কোনো আগামাথা নেই। কোথায় শুরু এবং শেষ কোথায় হচ্ছে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। বাংলাদেশের সালাম এবার মুখ খুললো। মাওলানা ভাসানী মাও সে তুং এবং চৌ এন লাইয়ের কাছে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন, যাতে চীন পাকিস্তানের এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে কোনো রকম সহায়তা না করে। আরে থোন ফালাইয়া, আপনার মাওলানা ভাসানীর টেলিগ্রাম দুইখান চৌ এন লাই আর মাও সে তুং যতন কইর্যা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে থুইয়া রাখছে। মাওলানা এখন ইন্ডিয়া কেনো আইছে হেইডা কইবার পারেন? তাবিজ দেয়ার মৌলবী, আপনেরা তারে বিপ্লবী লিডার বানাইছেন। কথাগুলো খুরশিদের। খুরশিদ সম্পর্কে একটু পরিচয় দিতে হয়। সে সব জায়গায় ঘটা করে আওয়ামী লীগের লোক বলে প্রচার করে। জায়গা বুঝে মাঝে মাঝে হাই কম্যাণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, একথা বলতেও পেছ পা হয় না। তবে মুশকিল হলো আওয়ামী লীগের লোকেরা তাকে পাত্তা দেয় না। সত্যিকার আওয়ামী লীগের কাছে ঘেঁষতে না পেরে খুরশিদ আমাদের ডেরায় এসে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের মুণ্ডুপাত করে। ইংল্যান্ড প্রত্যাগত ভদ্রলোক জিগ্গেস করলেন, বাই দ্যা বাই, ক্যান এ্যনি ওয়ান অব ইউ টেল মি হোয়ার মাওলানা ইজ নাউ। উয়ি হিয়ার দ্যাট হি ওয়াজ আন্ডার অ্যারেস্ট। মাওলানা ভাসানীকে ধরে লাল কেল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আরেকজন বললো, অ্যারেস্ট করা হয়েছে একথা সত্যি নয়। তবে তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। আমি নিজে অবশ্য শুনেছি পয়লা মাওলানাকে বালিগঞ্জের একটা বাড়িতে রাখা হয়েছিলো। মাওলানা সন্ধ্যে হলেই সে বাড়ির ছাদের ওপর পায়চারি করতেন। তাঁর লম্বা দাড়ি, পাঞ্জাবি, বেতের টুপি এসব দেখেই আশেপাশের মানুষের সন্দেহ হতে থাকে যে, এ মাওলানা ভাসানী না হয়ে যান না। তাছাড়া মাওলানার আরেকটা একগুয়ে স্বভাবের জন্য ভারত সরকার তাঁকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। আর তা এই, সন্ধ্যেবেলা সব সময়ে আজান দিয়ে ছাদে চাদর বিছিয়ে মাগরেবের নামাজ পড়তেন।

এক সময় মাওলানা ভাসানী প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেলো। আলোচনা শুরু হলো শেখ মুজিবকে নিয়ে। খুরশিদ বললো, থিয়েটর রোডের যে সকল মাস্তান আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙ্গিয়ে সব কিছু লুটপাট করে খাচ্ছে, এখানে বঙ্গবন্ধু হাজির থাকলে পেঁদিয়ে তাদের পিঠের ছাল তুলে ফেলতেন। সালাম ঠোঁট উল্টে জবাব দিলো, আরে রাখো তোমার বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানীদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেই ধরা দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো বিপ্লবী সংগ্রামে নেতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তোমার ওই বঙ্গবন্ধুর মতো শক্রর কাছে সগৌরবে আত্মসমর্পণ করেছে তার কোনো নজীর আছে কি? শেখ মুজিব সব সময় স্যুটকেশ গুছিয়ে রাখতেন। আন্দোলন শুরু হওয়ার পূর্বেই জেলে চলে যেতেন, আর আন্দোলন শেষ হয়ে গেলে বিজয়ী বীরের বেশে জেলখানা থেকে বেরিয়ে ক্রেডিটটুকু নিতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। শেখ পাকিস্তানের জেলে আর আমরা এখানে কোলকাতার পথে পথে ভেরেণ্ডা ভেজে চলছি। এই অবস্থাটার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী তোমার ওই শেখ মুজিব এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ। শেখের মতো এতো বড়ো জাতীয় বেঈমান আর দ্বিতীয়টি নেই। খুরশিদ হুঙ্কার দিয়ে উঠলো, খবরদার সালাম, ছোটো মুখে বড়ো কথা বলবে না। অন্য লোকের নাম বললে কিছু মনে করতাম না। বঙ্গবন্ধুর নামে কিছু বললে মুখের বত্রিশটি দাঁতের একটিও আস্ত রাখবো না। সালাম এবং খুরশিদ উঠে দাঁড়িয়ে পরস্পর শক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে একটা মীমাংসায় পৌঁছার উপক্রম করলে সকলে ধরাধরি করে দু’জনকে থামিয়ে দিলো।
এ ধরনের ঘটনা হামেশাই ঘটে থাকে। এ রকমের একটা বিস্ফোরণের পর আলোচনা আর স্বাভাবিক খাতে এগুচ্ছিলো না। ইংল্যান্ড প্রত্যাগত ভদ্রলোক বললেন, সরি, আমার একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। সুতরাং এখুনি আমাকে উঠতে হবে। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে সুমন্তবাবুও উঠে গেলেন। বোঝা গেলো, ইংল্যান্ড প্রত্যাগত ভদ্রলোকটি সুমন্তবাবুই সংগ্রহ করে এনেছিলেন। আসরের একেকজন করে উঠে যাচ্ছিলো। ওমা এমনি করে সবাই উঠে গেলে চলবে কেনো? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এখনো তোলাই হয়নি। মাসুমকে কথা বলতে শুনলাম। ‘গুরুত্বপূর্ণ’ শব্দটি মনে হয় সকলের মনে একটু দাগ কাটলো। মাসুম খোঁচা খোঁচা কাঁচা পাকা দাড়িঅলা এক ভদ্রলোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললো, নাহিদ ভাই, এবার আপনার কাহিনীটা একটু বলুন। তিনি যে দুঃখে পড়েছেন চেহারাসুরত দেখলেই মনে হয়। উড্রান্তের মতো চোখের দৃষ্টি। জামার একটি হাতা গুটানো, অন্যটি ছেড়ে দেয়া। ভদ্রলোক কথা শুরু করতে গিয়ে একটু একটু করে কাঁপছিলেন। গলার স্বরটিও কাঁপছিলো। যাহোক তিনি তাঁর কাহিনীটা বলতে আরম্ভ করলেন। বগুড়া দখল করার পর আমরা দেড় মণ সোনা স্টেট ব্যাংকের স্ট্রং রুমের সেফটি ভল্ট ভেঙ্গে এখানে নিয়ে আসি। আমরা তিনজন সোনাসহ নৌকোতে করে বর্ডারে এসে পৌঁছোই। সেখান থেকে গাড়িতে করে কোলকাতা এসে দু’টো স্যুটকেশ কিনে সোনাগুলো ভাগাভাগি করে রাখি। তারপর তিনজন শেয়ালদার কাছে একটা হোটেলে উঠি। একদিন না যেতেই অন্য দু’জন বললো, আমাদের পেছনে ভারত সরকারের স্পাই লেগেছে। যদি কোনো রকমে জানতে পারে সোনা আছে, সবকিছু কেড়েকুড়ে নেবে এবং আমাদের জেলে পুরে রাখবে। পরামর্শ দিলো মাল সরিয়ে দেয়া প্রয়োজন। দু’জন হোটেল ছেড়ে স্যুটকেশ দুটো নিয়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলো। আমাকে বলেছিলো, তিনজন এক সঙ্গে গেলে কেউ সন্দেহ করতে পারে। আমি সরলভাবে তাদের কথা বিশ্বাস করেছি। তারা কোনো সেফ জায়গায় ওঠার পর আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে।

সেই যে গেলো আর কখনো তাদের দেখা আমি পাইনি। নরেশদা বললেন, এই সোনা তো বাংলাদেশের জনগণের সম্পত্তি। আপনারা এখানে নিয়ে এলেন কেনো। থিয়েটর রোডের কর্তাব্যক্তিদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো নালিশ টালিশ করেননি। নাহিদ সাহেব বললেন, থিয়েটর রোডে অনেক ঘোরাঘুরি করেছি। কেউ আমার কথা কানেও তুলতে চান না। যে তিনজন আমরা সোনা নিয়ে এসেছিলাম, তার মধ্যে একজন এমপি-র আপন ছোটো ভাই। আরেকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্টের শালা। তারা এখন কোথায় আছে, কি করছে কিছু জানিনে। অথচ এদিকে শুনতে পাচ্ছি সেই সোনা ইতিমধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেছে। দেখছেন তো এই অবস্থায় আমার কথা কে গ্রাহ্য করে তিনি নিজের দীনদশার প্রতি ইঙ্গিত করলেন। সত্যিই তো এরকম একজন মানুষ দেড় মণ সোনা বয়ে নিয়ে এসেছে, শুনলে এখন কে বিশ্বাস করবে। ভদ্রলোক বললেন, এখন আমি কি করি বলুন তো, পথে-ঘাটে বের হওয়া এক রকম অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোলকাতার এবং বাংলাদেশের চেনা অচেনা মানুষ ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি যদি কোলকাতা শহর ছেড়ে না যাই, তাহলে আমাকে খুন করা হবে। অথবা পাকিস্তানের গুপ্তচর বলে ভারতের পুলিশের কাছে তুলে দেয়া হবে। আমি এখন কি করবো বুঝতে পারছিনে। আপনারা কি আমাকে কোথাও আশ্রয় দিতে পারেন? তার গল্পটি কেউ অবিশ্বাস করলো না। কেনোনা এরকম ঘটনা এই একটি নয়। আকছার ঘটছে। মুখে মুখে অনেক সহানুভূতিও প্রকাশ করা হলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। খুরশিদ কিন্তু নাহিদ সাহেবকে একটা পাকা আশ্বাস দিয়ে ফেললো। কাল এই সময়ে আপনি এখানে আসবেন। থিয়েটর রোডে নিয়ে গিয়ে তাজুদ্দীন সাহেবকে সব কিছু খুলে বলে বদমায়েশদের শায়েস্তা করার ব্যবস্থা করবো। আজ বাড়ি চলে যান। নাহিদ সাহেব বললেন, এখানে আমার বাড়ি কোথায় যে যাবো? খুরশিদ বললো, যেখানে থাকেন, চলে যান। আমার তো থাকার কোনো জায়গা নেই। খুরশিদ বিরক্ত হয়ে বললো, কাল কোথায় ঘুমিয়েছিলেন। কালতো গোটা রাত শেয়ালদা স্টেশনে কাটিয়েছি। দূর মশায় আপনাকে নিয়ে আর পারা গেলো না। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলো। আমার চোখ দুটো ঘুমে ঢুলে আসছিলো। এতে ক্লান্তশ্ৰান্ত অবস্থায় কি করে যে এতোসব কথাবার্তা নীরবে শুনে আসছিলাম, তার কারণ কি ঠিক বলতে পারবো না। সবাই চলে গেলে নরেশদা জিগগেস করলেন, গতরাতে কি তোমার ঘুম হয়নি? আমি বললাম, না। এখন কি ঘুমোবে? বললাম, হ্যাঁ। কিছু খাবে না। ঘুম জড়ানো অস্পষ্ট গলায় জবাব দিলাম, খেয়ে এসেছি।

বেলা তিনটের দিকে আমার ঘুম ভাঙলো। দেখি রুমে আর কেউ নেই। নরেশদা বসে বসে সুবলচন্দ্র মিত্র এবং হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়ের অভিধান দুটো নিয়ে কিসব করছেন। অভিধান পাঠ করা এবং একটার সঙ্গে একটা মিলিয়ে দেখা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যেস। ঢাকায় থাকার সময়ে আমরা তো ধরেই নিয়েছিলাম, বছর তিনেকের মধ্যে তিনি নিজে একখানা অভিধান জন্ম দিতে যাচ্ছেন। জিগ্গেস করলেন, দানিয়েল গতরাতে কোথায় ছিলে? আমি বললাম, তায়েবার ডাক্তার মাইতিবাবুর কোয়ার্টারে। তায়েবার রোগ সম্পর্কে ডাক্তার কিছু বললেন? বললাম, হ্যাঁ লিউক্যামিয়া। ওটা নাকি ক্যান্সারের একটা ভ্যারাইটি। ডাঃ মাইতি বললেন, এ ধরনের রোগির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই নাকি? গলার স্বরটা চমকে গেলো। তিনি অভিধান দুটো বন্ধ করে গালে হাত রেখে কি সব ভাবলেন। এখন তুমি কোথায় যাবে? আমি বললাম, গোল পার্কের কাছে অর্চনাদের বাড়ি আছে না সেখানেই যাবো। অর্চনা তো চাকরি করে কলেজে। তিনি কি কলেজে যাননি? এখন গেলে পাবে? আমি বললাম, আজ অফিসে আসবে না। গিয়ে দেখি পেলেও পেতে পারি। সেকি খাবে না? আপনি খেয়েছেন? হ্যাঁ, আমাকে খেতে হয়েছে। রাজার মঠ থেকে দাদা এসেছিলেন। তাঁকে সহ খেয়ে নিয়েছি। মা বাবার কোনো খবর টবর পেলেন? হ্যাঁ, মা বাবা আজ তাঁর বাড়িতে এসে পৌঁছেছেন। আমি বললাম, ভালো খবর। তিনি এখন কোথায়? খবরটা দিয়েই চলে গেছেন আবার। কাপড় চোপড় পরে আমি জিগগেস করলাম, নরেশদা আপনার কাছে টাকা আছে? বললেন, কতো? এই ধরুন পনেরো বিশ। তিনি আমার হাতে বিশ টাকার একখানি নোট দিলেন। আমি বেরিয়ে আসছি, তিনি ডাক দিলেন, একটু দাঁড়াও তায়েবার হাসপাতালের ওয়ার্ড নম্বর এবং বেড নম্বরটি লিখে দিয়ে যাও। আমি কাগজ নিয়ে লিখে দিলাম।