তারপরদিন সকালবেলাও আমাকে হাসপাতালে যেতে হলো। তখন বোধ হয় বেলা দশটা এগারোটা হবে। তায়েবার মা, বড়ো ভাই, ডোরা, জাহিদুল হক এবং দোলা সবাই তায়েবার বিছানার চারপাশে ভিড় করে আছে। দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে পা দিতেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি কেমন অন্য রকম হয়ে যাই। এই পারিবারিক সম্মেলনে আমার তো কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়। স্বভাবতই আমি ভীরু এবং লাজুক প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু চলে আসাটা ছিলো আরো অসম্ভব। আমার দিকে প্রথম দৃষ্টি পড়লো তায়েবার। এই যে দানিয়েল ভাই, আসুন, ইতস্তত করছেন কেন? দেখতে পাচ্ছেন না মা এবং বড়ো ভাইয়া এসেছেন। আমি কেবিনে ঢুকে তায়েবার মাকে সালাম করলাম। মহিলা আমার মাথায় হাত রাখলেন। সহসা মুখে কোনো কথা যোগালো না। এ মহিলাকে তায়েবার বন্ধু বান্ধবেরা সবাই মা বলে ডাকে। আমিও চেষ্টা করেছি মা ডাকতে। কিন্তু বলতে পারবো না, কি কারণে জিভ ঠেকে গেছে। যা হোক, তিনি জিগ্গেস করলেন, কেমন আছো বাবা। আমি স্মিত হেসে বললাম, ভালো। তায়েবার বড়ো ভাইয়া তাঁকে আমরা হেনা ভাই ডেকে থাকি। জিগগেস করলেন, দানিয়েল তোমার সব খবর ভালো তো! তারপর বললেন, চলো, একটু বাইরে যাই। কেবিন থেকে বেড়িয়ে দু’জনে গেটের কাছের মহানিম গাছটির গোড়ায় এলে হেনা ভাই বললেন, চলো এখানে শানের ওপর একটু বসি। বসার পর জিগগেস করলেন, তোমার পকেটে সিগারেট আছে? ভুলে আমি প্যাকেটটা ফেলে এসেছি। নীরবে পকেট থেকে চারমিনার বের করে দিলাম। মুখে একটুখানি অপ্রিয় ভঙ্গি করে হেনা ভাই বললেন, আঃ চারমিনার খাচ্ছো। ভালো সিগারেটের প্রতি হেনা ভাইয়ের মস্ত একটা অনুরাগ আছে। মনক্ষুণ্ণ হলেও তিনি একটা চারমিনার ধরালেন। হেনা ভাই সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছেন। সারা গায়ে পাউডার মেখেছেন। চুলটাও বোধকরি আগের দিন কেটেছেন। আমাদের জীবনকে ঘিরে এতো সব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো যেন তাকে কিছু মাত্র স্পর্শ করেনি। আপাতত তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে গেন্ডারিয়ার বাড়ির খোস গল্প করার মুডে রয়েছেন। এ সময়ে তাঁর পায়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। তিনি বললেন, এ বিদ্যাসাগরী চটি জোড়া গতকাল কলেজ স্ট্রীট মার্কেট থেকে কিনলাম। জানো তো বিদ্যাসাগরী চটির মাহাত্ম্য। নীলদর্পন নাটকে নীলকর সাহেব যখন ক্ষেত্রমণিকে লুট করে নিয়ে যাচ্ছিলো বিদ্যাসাগর মহাশয় রাগে ক্ষোভে অন্ধ হয়ে পায়ের চটি জোড়া ছুঁড়ে মেরে ছিলেন। তা পরবর্তী দৃশ্যে গিরিশ ঘোষ যিনি নীলকর সাহেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, চটিজোড়া মস্তকে ধারণ করে হল ভর্তি দর্শকের সামনে এসে বলেছিলেন, জীবনে আমি অভিনয় করে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। তবে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চটি জোড়ার মতো এতো বড়ো পুরস্কার কোনোদিন পাইনি এবং পাবোও না। তারপর তো ড্রপসীন পড়ে গেলো। হল ভর্তি লোকের সেকি বিপুল করতালি। দৃশ্যটা একবার কল্পনা করতে চেষ্টা করো।

কেবিনে এসে দেখি ভাইবোন সবাই মিলে ডোরার রবীন্দ্র সঙ্গীতের গল্প করছে। জাহিদুল তাতে আবার মাঝে মধ্যে ফোড়ন কাটছে। উৎসাহটাই মনে হচ্ছে তায়েবার অধিক। এমন খোস গল্প করার আশ্চর্য প্রশান্তি এরা সকলে কেমন করে আয়ত্ব করলেন, আমি ভেবে অবাক হয়ে যাই। তায়েবা জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ডোরা তার জীবনের মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটিয়ে বসে আছে। আমাদের সকলের অস্তিত্ব চেকন সূতোয় ঝুলছে। এই ধরনের অবস্থায় নির্বিকার মুখ ঢেকে এঁরা রবীন্দ্র সঙ্গীতের আলোচনা কি করে করতে পারেন! জীবন সম্ভবত এ রকমই। আঘাত যতো মারাত্মক হোক, দুঃখ যতো মর্মান্তিক হোক, এসময় জীবন সব কিছু মেনে নেয়। দুনিয়াতে সব চাইতে আশ্চর্য মানুষের জীবন।

তায়েবার মা তায়েবার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। ভদ্রমহিলার তেজোব্যঞ্জক মুখমণ্ডলে এক পোঁচ ঘন গাঢ় বিষাদের ছায়া। সকলেই কথা বলছে, তিনি বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন। সাদা কালো চুলের রাশি এক পাশে হেলে পড়েছে। অসাধারণ ব্যক্তিমণ্ডিত চেহারা। যৌবনে কি সুন্দরীই না ছিলেন। মহিলার দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। চেহারায় এমন একটা আকর্ষণী শক্তি আছে, বারবার তাকাতে বাধ্য করবে। আপাতত মাধুর্যমণ্ডিত মনে হলেও ধারালো কঠিন কিছু আত্মগোপন করে আছে। অনেকবার এই মহিলার কাছাকাছি এসেছি। কিন্তু খুব কাছে যেতে সাহস পাইনি। মহিলার প্রতি যেমন গভীর আকর্ষণ অনুভব করতাম, তেমনি আবার ভয়ও করতাম।
উনারা যখন উঠলেন, তখন বেলা সাড়ে এগারোটা হবে। আমি কি করবো স্থির করতে না পেরে উশখুশ করেছিলাম। তায়েবার মা বলে বসলেন, বাবা দানিয়েল, তুমি আমার সঙ্গে এসো। আমি সসংকোচে জানতে চাইলাম, কোথায়? তিনি বললেন, ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে আমার দেওরের বাসায়। আর কেউ যাবে না? না দোলা যাবে ক্যাম্পে। হেনা দিনাজপুরে লোকদের সঙ্গে থাকে। ডোরার কোথায় রিহার্সেল না কি আছে। তায়েবা কলকলিয়ে উঠলো, যান দানিয়েল ভাই, মার সঙ্গে যেয়ে চাচার সাথে পরিচয়টা করুন। আপনার অনেক ভালো হবে। চাচার সঙ্গে খাতির করতে পারলে উর্দু ভাষাটা তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারবেন। চাচাঁদের বাড়িতে কেউ বাংলা ভাষায় কথা বলে না। যান আপনার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
আমি একটা টানারিক্সা চেপে তায়েবার মাকে নিয়ে পথ দিলাম। যেতে যেতে তিনি আমাকে বললেন, আমার দেওরের বাসা যেখানে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে একটু সাবধানে কথাবার্তা বলতে হবে। ওরা কেউ বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলে না, এমন কি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে প্রাণের থেকে ঘৃণা করে। তথাপি আমি থাকছি, কারণ আমার অন্য কোথাও থাকার জায়গা নেই। ওরা আমাদের থাকতে জায়গা দিয়েছে। কারণ এই বাড়িটার অর্ধেকের দাবিদার ছিলাম আমরা। কিন্তু সে কথা আমরা কখনো উত্থাপন করিনি। ওদের জীবনের এমন একটা ধাঁচ তার সঙ্গে আমার একেবারেই মেলে না। আর আমাদের মধ্যে কি সব ঘটছে না ঘটছে সে বিষয়ে তাদের সামান্যতম জ্ঞান নেই। যেই কথাগুলো বললাম, মনে রাখবে। তোমাকে এই বাড়িটাতে অনেকবার আসতে হবে। তায়েবাদের পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে আবছা আবছা অনেক কথা শুনেছি। সেগুলো কানে নেয়ার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করিনি। শুনেছিলাম তাদের বাবার পরিবারের কেউ বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলেন না। বর্ধমান তাদের স্থায়ী নিবাস হলেও হাঁড়ে-মাংসে, অস্তি-মজ্জায় তায়েবার বাবা চাচারা মনে করেন তারা পশ্চিমদেশীয়। বাংলামুলুক তাদের পীরমুরিদী ব্যবসার ঘাঁটি হলেও অত্যন্ত যত্নে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের ভেদ চিহ্নগুলো ঘষে মেঝে তকতকে ঝকঝকে করে রাখে। এ ব্যাপারে উর্দু ভাষাটা তাঁদের সাহায্য করেছে সবচাইতে বেশি। স্থানীয় মুসলিম জনগণ তাদের এই বিচ্ছন্নতাবাদী মাসসিকতাকে অত্যন্ত পবিত্র জ্ঞান করে মেনে নিয়েছে। কারণ পীর বুজুর্গরা উর্দু ভাষার মাধ্যমে ধর্মোপদেশ দেবেন, কোরান কেতাবের মানে বয়ান করবেন এটাতো স্বাভাবিক। সাথে সাথে তারা যদি দৈনন্দিন কাজকর্মে ঐ ভাষাটিকে ব্যবহার করেন, তাতে তো দোষের কিছু নেই, বরং স্থানীয় জনগণের চোখে তাঁদের সম্ভ্রম অনেকগুণে বেড়ে যাওয়ার কথা। এই পরিবারটিতে তায়েবার মায়ের মতো একজন মহিলার বিয়ে হওয়া সত্যিকারের বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক অঘটন ঘটে যায়।

তায়েবার মা শ্বশুর বাড়িতে প্রবেশ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা পরিবেশ থেকে। তাঁদের বাড়ি ছিলো বোলপুরের কাছাকাছি। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের একেবারে সন্নিকটে। তায়েবার মা বালিকা বয়সে পাঁচ ছয় বছর শান্তিনিকেতনে পড়ালেখা করেছেন। বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতে এসে একটা প্রকাণ্ড সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলেন। নতুন বৌ উর্দু ভাষায় কথা বলে না। এমনকি পারিবারিক ভাষাটি শিক্ষা করার কোনো চারও নতুন বৌয়ের নেই। দীর্ঘ ইতিহাস সংক্ষেপ করে বলতে গেলে শ্বশুর বাড়িতে স্বামী এবং দাসী চাকর ছাড়া আর কেউ তার সাথে কথা বলে না। এই অবস্থাটা অনেকদিন কেটেছে। এই সময়ে ভারতবর্ষ দু টুকরো হয়ে হিন্দুস্থান পাকিস্তান হলো। নতুন বউ স্বামীকে অনেক করে বুঝিয়ে সুজিয়ে বর্ধমান এবং কোলকাতার সমস্ত স্থাবর সম্পত্তির দাবি ছেড়ে দিয়ে পূর্বপাকিস্তানের দিনাজপুরে এসে নতুন সংসার পেতে বসেন।
নতুন সংসারে থিতু হয়ে বসার পর মহিলা তাঁর পুত্রকন্যাদের গড়ে তোলায় মনোযোগ দিলেন। শ্বশুর বাড়ি থেকে মুসলিম সমাজ সম্বন্ধে একটা প্রচণ্ড ভীতি নিয়ে এসেছিলেন। দিনাজপুরে বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে অনেকদিন বসবাস করার পরও সে ভীতি তাঁর পুরোপুরি কাটেনি। সমাজে বাস করতেন বটে, কিন্তু একটা দূরত্ব সব সময় রক্ষা করতেন সে কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য সব সময় হিন্দু শিক্ষক নিয়োগ করতেন। তাছাড়া বালিকা বয়সে তাঁর মনে শান্তিনিকেতনে যে সংস্কৃতির রঙ লেগেছিলো, অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সেও তা ফিকে হতে পারেনি। ছেলেমেয়েদের রবীন্দ্রনাথের গান শেখানো এবং রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ানোর একটা অনমনীয় জেদ মহিলাকে পেয়ে বসে। এই ফাঁক দিয়ে প্রগতিশীল রাজনীতি, কমিউনিস্ট পার্টি এসব একেবারে বাড়ির অন্তঃপুরে প্রবেশ করে। তিনি নিজেও এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। মহিলার স্বামী নির্বিরোধ শান্তশিষ্ট মানুষ। সংসারের সাতে পাঁচে থাকেন না। অধিকন্তু মহিলা তার ইচ্ছাশক্তির সবটুকু পরিকল্পনার পেছনে বিনা বাধায় ব্যয় করতে পেরেছিলেন।

তায়েবারা তিন বোন যখন একটু সেয়ানা হয়ে উঠলো তিনি তাদের স্থায়ীভাবে ঢাকায় রেখে লেখাপড়া গানবাজনা ইত্যাদি শেখাবার একটা উপায় উদ্ভাবন করলেন। বিনিময় করে দিনাজপুরে যে ভূসম্পত্তিটুকু পেয়েছিলেন, তার একাংশ বিক্রি করে ঢাকা শহরে গেন্ডারিয়ায় এই ছোট্টো বাড়িটা কিনলেন। বাড়ির পেছনের খালি জায়গাটিতে দু’টি কাঠচেরাই কল বসালেন এবং ছোট্টো ছেলেটাকে তার দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন। সেই সময়ে ঢাকা শহরে জাহিদুলরা রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার প্রসার নিয়ে আন্দোলন করছিলেন। এই রবীন্দ্র সঙ্গীতের সূত্র ধরেই জাহিদুল এবং রাশেদা খাতুনের সঙ্গে তায়েবাদের পরিচয়ের সূত্রপাত। তায়েবার মা তো জাহিদুলদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলেন। এতোদিন তিনি মনে মনে এমন সুরুচিসম্পন্ন কাউকে সন্ধান করছিলেন, যার ওপর তাঁর অবর্তমানে মেয়েদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তবোধ করতে পারবেন। একথা মানতেই হবে যে অনেকদিন পর্যন্ত জাহিদুল এবং রাশেদা খাতুনেরা সে দায়িত্ব। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছিলেন। আমি নিজের চোখেই দেখেছি রাশেদা খাতুন আপন পেটের মেয়েটির চাইতে ভোরার প্রতি অধিক যত্নআত্তি করেছেন। আর জাহিদুল প্রতিদিন তাদের খবরাখবর নিচ্ছে। কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস! আজ রাশেদা খাতুন আর ভোরা পরস্পরের সতীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহিদুল ডোরাকে বিয়ে করেছে, আর জাহিদুলকে দেখিয়ে দেয়ার জন্যে রাশেদা খাতুন শশীভূষণকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে গেছেন। এই সবকিছুর জন্য কি একটা যুদ্ধই দায়ী? দেশে যদি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতো তাহলে এই জীবনগুলো কি এমনভাবে বেঁকে চুরে যেতো? কি জানি জীবন বড়ো আশ্চর্য জিনিস। জীবনের বিস্ময়ের অন্ত নেই।

এই মহিলা যার পাশে আমি বসে আছি, যার তেজোব্যঞ্জক মুখমণ্ডলে চিন্তার বড়ো বড়ো গভীর বলিরেখা পড়েছে, যাকে দেখলে সব সময় সিংহীনির কথা মনে উদয় হয়েছে, জানিনে তিনি কি ভাবছেন তিনি সারা জীবন যে সমস্ত বস্তুকে মূল্যবান মনে করে লড়াই করে এসেছেন, সেগুলো কি এখনো তাঁর মনে কাজ করে যাচ্ছে? সমস্ত জীবন ধরে যে অপার আগ্রহ নিয়ে আকাশ দেখবেন বলে অক্লান্ত জঙ্গল কাটার কাজ করেছেন, আজ সেই নীল নির্মেঘ আকাশ থেকে তাঁর মাথায় বজ্র ঝরে পড়লো। তিনি দোষ দেবেন কাকে? দায়ী করবেন কাকে? তায়েবার মার পাশাপাশি রিকশা চেপে যাচ্ছি। আমি জানি তিনি আমার কাছে কিছু জিগগেস করবেন না। আমিও কিছু জানতে চাইবে না। হঠাৎ গলায় ঘর্ঘর শব্দটি শুনতে পেলাম। ভদ্রমহিলার হাঁপানি ছিলো সেটি জাগতে চাইছে। ভদ্রমহিলা প্রাণপণ শক্তিতে ঠোঁট দুটো চেপে ধরে বললেন, এই রিকশা বাঁয়ে রাখো। এরই মধ্যে আমরা ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে এসে দাঁড়ালাম। বাড়িটার গঠনশৈলী দেখে মনে হবে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে যে ধরনের বাড়ি হতো এটি তার একটি। প্রকাণ্ড চওড়া দেয়াল। লাল ইটগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। দরোজা জানালাগুলো আকারে আয়তনে বেশ বড়োসরো। কার্ণিশের কাছে দু’তিনটে অশ্বথ গাছের চারা বেশ উঁচু হয়ে উঠেছে। কতোকাল সংস্কার হয়নি কে জানে।

তায়েবার মা আমাকে বললেন, তুমি এখানে দাঁড়াও আমি ভেতরে যাই। যা বলছি মনে থাকে যেনো। তোমার তো আবার অস্থির মেজাজ। একটু বুঝে শুনে। কথাবার্তা বলবে। আমার তো মনে হচ্ছে এখানে আমাকে অনেকদিন থাকতে হবে। মহিলা পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। আমার মনে হলো এই বাড়িতে এখনো সদর অন্দর মেনে চলা হয়।
একটু পর বুড়ো মতো দাড়িঅলা এক লোক এসে বললো, আপ মেরে সাথ আইয়ে। লোকটির পেছন পেছন আমি তিন তলা দালানের একটি ঘরে প্রবেশ করলাম। ছাদটি অনেক উঁচু। বিরাট বিরাট লোহার বীমের ওপর বসানো রয়েছে ছাদ। দরোজা জানালায় খুব দামী মোটা কাপড়ের পর্দা টাঙ্গানো আছে। কিন্তু সেগুলো এতো ময়লা যে দেখতে ইচ্ছে করে না। ঘরে হাল আমলের একজোড়া সোফা সেট আছে বটে। কিন্তু না থাকলেই যেনো অধিক মানানসই হতো। দেয়ালে মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফ, বাগদাদ শরীফ ও আজমীর শরীফের ছবি মোটা মোটা দামী ফ্রেমে টাঙ্গানো। সোনালী অক্ষরে আরবীতে আল্লার নাম, মুহম্মদের নাম বাঁধিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া দেওবন্ধ থেকে প্রকাশিত একখানা ইসলামী ক্যালেন্ডার দেয়ালে ঝুলছে। সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হলো আমি অন্য একটা জগতে এসে প্রবেশ করেছি। অবাক হয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছি। এই সময়ে খুবই মোলায়েম ভঙ্গিতে সালাম দিয়ে এক ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন। তাকিয়ে দেখলাম, দোহারা চেহারার অত্যন্ত দীর্ঘকায় গৌরকান্তি এক ভদ্রলোক। মুখে অল্প অল্প দাড়ি। হঠাৎ করে দেখলে বাঙালি বলে মনে হতে চায় না। আমি উঠে দাঁড়ালাম, তিনি বললেন, বসেন বসেন, আমি তায়েবার চাচা। আমার নাম আসগর আলী শাহ্। বুঝতে পারলাম ভদ্রলোকের মাতৃভাষা বাংলা নয়।

ভদ্রলোক বললেন, ভাবীর মুখে আপনার কথা শুনেছি। আপনি কেমন আছেন, তবিয়ত ভালো তো। আমি উপস্থিত মতো কিছু একটা বলে ভদ্রতা রক্ষা করলাম। তারপরে ভদ্রলোক মৃদু হাততালি দিলেন। সেই আগের লোকটি দেখা দিলো। তিনি আদেশ দিলেন, মেহমান কি লিয়ে শরবত আওর নাশতা লে আও। কিছুক্ষণ পর লোকটি খাঞ্চায় করে নাস্তা এবং শরবত নিয়ে এলো। খাঞ্চাটি রূপোর এবং ওপরে ফুলতোলা কাপড়ের ঢাকনা দেয়া, গেলাসটি মজবুত এবং কারুকাজ করা। এই বাড়িতে সব কিছুই পুরোনো। এমনকি তায়েবার চাচা যিনি আমার বিপরীতে বসে আছেন, বসনেভূষণে অপেক্ষাকৃত একালের সম্ভ্রান্ত মুসলমান ভদ্রলোক মনে হলেও কোথায় একটা এমন কিছু আছে আমার মনে হতে থাকলো ভদ্রলোকের সঙ্গে উনবিংশ শতাব্দীর একটা যোগ রয়েছে। ভদ্রলোক সেটা ঢেকে রাখার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। সে যা হোক, ভদ্রলোক ঢাকনা উঠিয়ে বললেন, নাস্তা নিন। আমি তো দেখে অবাক। পাঁচ ছটা বিরাট বিরাট পরোটা, আবার তার সঙ্গে পেয়ালা ভর্তি খাসির মাংস, হালুয়া, শরবত এতোসব খাবো কি করে। পেটে জায়গা থাকতে হবে তো। তাছাড়া আমি সকাল বেলা খেয়ে বেরিয়েছি। তিনি বললেন, কিছু মুখে দিয়ে দেখেন। একেবারে না করতে নেই। আমিও বুঝতে পারলাম একেবারে না খেলে তিনি অপমানিত বোধ করবেন। এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিলাম। পরোটা মাংসের স্বাদ পেয়ে মনে হলো আমি যে প্রথমে পেটে ক্ষুধা নেই মনে করেছিলাম সেটা সত্যি নয়। দেখতে দেখতে চারটা পরোটা, পেয়ালার সমস্ত মাংস খেয়ে ফেললাম। সেই লোকটি আমাকে চিলুমচিতে হাত ধুইয়ে দিলেন। আমি চামচ দিয়ে কেটে কেটে প্লেটের সব হালুয়া খেয়ে শেষ করলাম। ভদ্রলোক এক দৃষ্টে আমার খাওয়া দেখতে লাগলেন। হালুয়া খাওয়া শেষ হলে ভদ্রলোক শরবতের গেলাসটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, শরবত পান করেন। আমি ঢকঢক করে শরবতটাও খেয়ে নিলাম। ভদ্রলোক আমার খাওয়ার ধরন দেখে কিছু একটা মনে করেছেন। সেটা আমি বুঝতে পারলাম। আমাকে লজ্জা থেকে উদ্ধার করার জন্যই বললেন, ভাবী বলেছেন, আপনি অনেক এলেমদার মানুষ। অনেক কেতাব লিখেছেন। তা এখন আপনাদের খবর কি? যুদ্ধ কেমন চলছে? আমি একটুখানি মুশকিলে পড়ে গেলাম। ভদ্রলোককে কি জবাব দেই। জানতে পেরেছি ভদ্রলোক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোরতরো বিরোধী। এই ফ্রী স্কুল এলাকাটিও ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক স্থান। এখানকার কশাইরা ছেচল্লিশে হিন্দু মুসলমানের রায়টে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। এখনো ভারত পাকিস্তানে কোনো ধরনের গোলযোগ হলে এই ফ্রি স্কুল স্ট্রীট থেকে শহরের রাজপথে পাকিস্তানের সপক্ষে মিছিল বের হয়ে যায়। উনিশশো পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ সালের সেই বিখ্যাত শ্লোগানঃ কান মে বিড়ি মুমে পান, লেড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের রেশ এখানকার মানুষের মন থেকে একেবারে অবসিত হয়ে যায়নি। তথাপি ভদ্রলোককে সন্তুষ্ট করার জন্যে কিছু একটা বলতে হয়। তাই বললাম, সবটাতো আমি জানিনে তবে এটা নিশ্চিত যে একদিন আমরা জিতব। জিতবেন তো বটে, তবে আপনারা নয়, জিতবে হিন্দুস্থান এবং হিন্দুরা। আপনারা তো জানেন না, লাখো জান কোরবান করে মুসলমানেরা পাকিস্তান কায়েম করেছে। আর আপনারা সেটা ভেঙ্গে ফেলতে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক আমার হাত ধরে বললেন, একটু এদিকে আসুন। তিনি আমাকে জানালার পাশে নিয়ে গেলেন। তারপর একটা একতলা বাড়ির দিকে অঙুলি প্রসারিত করে বললেন, ওই যে দেখছেন ওটা আবদুল ওয়াহেদের বাড়ি। আবদুল ওয়াহেদ কে ছিলো জানেন? জবাবে আমি অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তিনি অবাক হয়ে গেলেন। আপনি আবদুল ওয়াহেদের নাম শুনেননি? আমি আবার অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তিনি দু’হাতে তালি দিলেন। সেই বুড়ো লোকটি দেখা দিলে তিনি বললেন, হান্নান সাহেবকো বোলাকে লে আও।

কিছুক্ষণ পর একজন পৌঢ় ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে সালামালায়কুম দিলেন। ভদ্রলোক বেশ বুড়ো। চোখের ভূরু পর্যন্ত পেকে গেছে। শাহ আসগর আলী সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও দাঁড়াতে হলো। শাহ সাহেব বললেন, ইনি হান্নান সাহেব, আবদুল ওয়াহেদের চাচা। উনার সঙ্গে কথাবার্তা বলুন। তারপর পৌঢ় হান্নান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ইয়ে জয় বাংলাকা আদমী হ্যায়। তাজ্জব কা বাত ইয়ে হ্যায় কভি আবদুল ওয়াহেদ কো নাম নেহি শুনা।

হান্নান সাহেবের সঙ্গে আমাকে বসিয়ে দিয়ে শাহ আসগর আলী সাহেব কাজের দোহাই দিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। হান্নান সাহেব আমার সঙ্গে বিশুদ্ধ বাংলায়। কথা বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি বলতে থাকলেন, এই কোলকাতা শহরে এক সময়ে তাঁরা মিষ্টির দোকানে বসে মিষ্টি খেতে পারতেন না। দোকানের বাইরে মুসলমানদের দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ভদ্রলোক আমার মাথায় হাত দিয়ে বলতে লাগলেন, তখনো আপনাদের জন্ম হয়নি। সে জন্য পাকিস্তান কি চীজ বুঝতে পারবেন না। আমি বিনীতভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, পাকিস্তান কি বস্তু সে বিষয়ে কিছুটা কঠিন জ্ঞান আমাদের হয়েছে। পাকিস্তানীরা তিরিশ বছর আমাদের ওপর শোষণ করেছে। বিগত পঁচিশে মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তারা আমাদের দেশের লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে। স্মৃতি ভারাতুর বৃদ্ধকে যতোই বোঝাতে চেষ্টা করিনে কেন, তিনি তার স্মৃতি স্বপ্নের জগৎ থেকে এক তিলও অগ্রসর হতে রাজী নন। ফের তিনি বলে যেতে লাগলেন, জিন্নাহ সাহেব পাকিস্তানের ডাক দিয়েছেন। কিছু কিছু এলেমদার মানুষকে সংগঠিত করবার কোনো লোক ছিলো না, আমার ভাইপো ওয়াহেদ মিয়া ছাড়া। ওই যে আপনাদের শেখ মুজিব। তিনিও তো আমার ভাইপোর পেছন পেছন ঘোরাফেরা করতেন। তখন টিঙটিঙে ছোকরা শেখ মুজিবকে চিনতো কে? ওয়াহেদের চেষ্টার ফলেই তো তিনি অল বেঙ্গল স্টুডেন্টস মুসলিম লীগের সামনের কাতারের একজন নেতা বনে গেলেন। ওই যে একতলা বাড়িটা দেখছেন, ওখানে শেখ মুজিব কতোদিন কলোরাত কাটিয়েছেন। ওই বাড়িতে শুধু শেখ মুজিব কেনো, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, স্যার নাজিমুদ্দীন, আবুল হাশিম প্রমুখ মুসলিম লীগের বড়ো বড়ো নেতারা তশরিফ আনতেন। একবার তো স্বয়ং কায়েদ-ই-আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ্ অসুস্থ আবদুল ওয়াহেদকে দেখতে এসেছিলেন। আমি অনুভব করতে পারলাম, ফ্রি স্কুল স্ট্রীটের বাসিন্দাদের চোখে এই বাড়িটা অত্যন্ত পবিত্র। কেননা এই বাড়িতে এমন একজন মানুষের জন্ম হয়েছিলো যিনি পাকিস্তান নামক একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে শ্রম, স্বপ্ন সব ব্যয় করে অকালে প্রাণত্যাগ করেছিলেন। পাকিস্তানের আদর্শের প্রতি এই সমস্ত লোক এতো অনুগত, তথাপি তারা অন্যদের মতো পাকিস্তানে বসবাস করতে যাননি কেনো? সত্যিই তো এটা একটা গভীর প্রশ্ন। আমি হান্নান সাহেবকে জিগগেস করলাম, আপনারা পাকিস্তানকে এতো ভালোবাসেন, তবু বসবাস করতে পাকিস্তান যাননি কেনো? এই সময়ে তায়েবার চাচা শাহ আসগর আলী ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনিও শুনলেন প্রশ্নটা। জবাবে বললেন, হ্যাঁ এটা একটা কথার মতো কথা বটে। শুরুতে আমরা ধরে নিয়েছিলাম, কোলকাতা পাকিস্তানের মধ্যে পড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত কোলকাতা তো হিন্দুস্থানের অংশ হয়ে গেলো। আমরা সাত পাঁচ পুরুষ ধরে এই কোলকাতায় মানুষ। এর বাইরে কোথাও যেতে হবে সে কথা চিন্তাও করতে পারিনি। তাছাড়া আমার মনে বরাবর একটা সন্দেহ ছিলো। পূর্বপাকিস্তানের মুসলমানেরা সত্যিকারের ইসলামী আহকাম মেনে চলে একথা বিশ্বাস করতে মন চাইতো না। আমার কিছু কিছু আত্মীয়স্বজন পূর্বপাকিস্তানে বসবাস করতে গেছেন। তাঁদের চলাফেরা দেখে মনটা দমে গিয়েছিলো। দেখে শুনে আমার ধারণা হয়েছিলো, তামাম হিন্দুস্থানের মুসলমানেরা লড়াই করে যে পাকিস্তান কায়েম করেছে এই মানুষগুলো সেই রাষ্ট্রটিকে টিকে থাকতে দেবে না। বাংলা ভাষার নামে কোনো মুসলমান এতো হল্লাচিল্লা করতে পারে, তাতো ছিলো আমার ধারণার অতীত। বলুন, এসব হিন্দুদের চক্রান্ত নয়? তখন পাকিস্তান ধ্বংসের আলামত স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম। হিজরত করতে পারতাম। কিন্তু লাভ হতো না। এখন যেমন হিন্দুস্থানে আছি তখনো হিন্দুস্থানে থাকতে হতো। আপনাদের বাংলাদেশ তো আরেকটা হিন্দুস্থান হতে যাচ্ছে, সেখানে সত্যিকার মুসলমানদের স্থান কোথায়? এঁদের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন। পাকিস্তান কি বস্তু বাস্তব অর্থে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা এদের নেই। এঁরা আছেন তাঁদের স্বপ্ন এবং স্মৃতির জগতে। যেহেতু তারা মনের থেকে হিন্দুদের ঘৃণা করেন, সেজন্য তাঁদের একটা কল্পস্বর্গের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ট অংশের চিন্তাভাবনা এই একই রকম। তারা ভারতে বসবাস করবেন, কিন্তু মনে মনে চাইবেন পাকিস্তানটা টিকে থাকুক। আমি ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে তায়েবার চাচার বাড়িতে এসেছি কোনো বিষয়ে বিতর্ক করার জন্য নয়। এ ব্যাপারে তায়েবার মা আমাকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন। সুতরাং শাহ আসগর আলী এবং হান্নান সাহেব পাকিস্তানের পক্ষে যা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ করে শুনে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর রইলো না। ইচ্ছে হচ্ছিলো ছুটে পালিয়ে আসি। কিন্তু পারছিলাম না তায়েবার মার কথা ভেবে। যেখানে আমার এক দণ্ড অপেক্ষা করতে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে সেই পরিবেশে এই মহিলা কি করে দিবসরজনী যাপন করছেন, সে কথা চিন্তা করে চুপ করে রইলাম। এই পুঁতিগন্ধময় অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মহিলা সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। উনিশশো সাতচল্লিশ সালে স্বেচ্ছায় এই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তাঁর মনে অগাধ অটুট বিশ্বাস ছিলো। তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের জন্য ভিন্ন রকমের একটা সুন্দর জীবন নির্মাণ করতে পারবেন। সামাজিক আচার সংস্কার দু’পায়ে দলে যা শ্ৰেয় উজ্জ্বল সুন্দর বলে মনে হয়েছে, সেদিকে সমস্ত কর্মশক্তিকে ধাবিত করেছেন। আজকে আবার তাঁকে সেই বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে। এ যেনো বয়স্ক সন্তানের মাতৃগর্ভে ফিরে যাওয়ার মতো ব্যাপার। যে অবস্থায় তিনি এই বাড়ি এই আত্মীয়-স্বজনদের ছেড়ে গিয়েছিলেন সেই বাড়ির অবস্থা এখনও তেমনই আছে, তিল পরিমাণ পরিবর্তন হয়নি। আত্মীয় স্বজনেরা সেই স্মৃতির স্বপ্নের জগতে বসবাস করছেন। মাঝখানের তিরিশটি বছর যেনো কিছু নয়। চেষ্টা করলে তিনি অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে পারতেন। এ বাড়িতে কেনো উঠলেন তা আমার বোধবুদ্ধির সম্পূর্ণ বাইরে। আমি বাইরের মানুষ। আমার কাছে এরা যেভাবে কথাবার্তা বললেন, তার মধ্যে গভীর একটা ঘৃণার রেশ রয়েছে। মহিলা কি উঠতে বসতে প্রতিনিয়ত আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হচ্ছেন না? এইসব কথা ঢেউ দিয়ে মনে বার বার জেগে উঠছিলো। তায়েবার মা আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছেন, নিশ্চয়ই তাঁর কোনো উদ্দেশ্য আছে।

অনেক কথাবার্তার পর শাহ আসগর এবং হান্নান সাহেব আমাকে রেহাই দিলেন। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। উঠে যাওয়ার সময় শাহ সাহেব বললেন, আপনি আরাম করে বসুন। ফ্যানের স্পীড বাড়িয়ে দিলেন। ভাবী সাহেবা বোধ করি আপনার সঙ্গে কি আলাপ করবেন। উনারা চলে গেলে তায়েবার মা ঘরে প্রবেশ করেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে জিগেস করলেন, কি বাবা দানিয়েল, তোমার কি খুব খারাপ লেগেছে? এঁরা এ রকমই। সে কথা তো তোমাকে আগে বলেছি। আশা করি আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন সম্বন্ধে তোমার একটা ধারণা হয়েছে। আমি ঈষৎ হাসলাম। তিনি আমার উল্টোদিকে বসলেন। তারপর ঠোঁট ফাঁক করে একটুখানি হাসবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু হাসিটা ভারী মলিন দেখালো। তিনি বললেন, তোমাকে বাবা ডেকে এনেছি একটু কথাবার্তা বলার জন্য। দেখছে না চারপাশে কেমন দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। কথা না বলে না বলে ভীষণ হাঁফিয়ে উঠেছি। এভাবে কিছুদিন থাকলে আমি নিজেও অসুখে পড়ে যাবো। এখন যে এখানে সেখানে অল্প-স্বল্প হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি সেটিও আর সম্ভব হবে না। আসলে মহিলা কোন্ কথাটির অবতারণা করতে যাচ্ছেন। সেটি আমি অনুমান করতে চাইলাম। আমি জানতাম তার স্বভাব বড়ো চাপা। খুব প্রয়োজন না হলে মনের কথা কখনো মুখে প্রকাশ করবেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি জানতে চাইলেন, আমি কোলকাতা এসেছি কবে এবং চট্টগ্রামে আমার মাও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কোনো বিপদ হয়েছে কিনা। তারপর তিনি এদিক ওদিক ভালো করে তাকিয়ে জিগগেস করলেন, তায়েবার অসুখটা কি জানো? আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ জানি। তিনি এ নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। ডোরার খবরও কি পেয়েছো? আমি বললাম, হ্যাঁ পেয়েছি। মহিলা বললেন, আমার হয়েছে কি বাবা জানো চারদিক থেকে বিপদ। কাউকে কইতেও পারছিনে, আবার সইতেও পারছিনে। জাহিদুলটা এমন একটা কাণ্ড ঘটাবে তা আমি কখনো বিশ্বাসই করতে পারিনি। তার সততা এবং ভালো মানুষীর ওপর আমি বড়ো বেশি নির্ভর করেছিলাম। ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছাড়লেন। তিনি আবার জিগ্গেস করলেন, হেনার খবর শুনেছো কিছু? বললাম, হেনা ভাই সম্পর্কে আমি কিছু জানিনে। আজ সকালে হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। জানো হেনা একটা বিয়ে করে ফেলেছে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এরই মধ্যে হেনা ভাই আবার বিয়ে করে ফেললেন? মনের ঝাঁঝ কথার মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়লো। চেপে রাখতে পারলাম না। আমার মনোভাব টের পেয়ে মহিলা হেনা ভাইয়ের পক্ষ সমর্থন করে বললেন, বিয়েটা করে হেনা মানুষের পরিচয় দিয়েছে। মেয়েটির স্বামীকে পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করেছে। দেখাশুনা করার কেউ ছিলো না। কচি মেয়ে কোথায় যাবে? তাই বিয়ে করে এখানে নিয়ে এসেছে এবং বালুহাক্কাক লেনে আলাদা বাসা করে থাকছে। আমি মনে করি হেনা ভাই আরো কিছুকাল পর বিয়েটা করলে শোভন হতো। কি করবো ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেলে কি আর মা বাবার কথার বাধ্য থাকে! আমার হয়েছে কি বাবা জানো সমূহ বিপদ। কোথাও গিয়ে শান্তি পাইনে। মনে সর্বক্ষণ একটা উথাল পাতাল ঝড় বইছে। দু’দণ্ড স্থির হয়ে বসবো সে উপায় নেই। এরই মধ্যে আবার হাঁপানির জোরটা অসম্ভব রকম বেড়ে গিয়েছে। আমার বড়ো মেয়েটি যে ছিলো আমার সব রকমের ভরসার স্থল, এখন হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। আমার বুকে ভীষণ ব্যথা, ভীষণ জ্বালা। কোথায় যাবো, কি করবো পথ খুঁজে পাচ্ছিনে। ভদ্রমহিলার দু’চোখ ফেটে ঝর ঝর করে পানি বেরিয়ে এলো। বুকটা কামারের হাপরের মতো ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। মাত্র অল্পক্ষণ। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা সহকারে আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে অপেক্ষাকৃত শান্ত হয়ে বসলেন। আশ্চর্য সংযম। ভদ্রমহিলা স্বাভাবিক কণ্ঠে নিচু স্বরে বললেন, লোকে মনে করতে পারে এই ছেলেমেয়েরা আমার গর্ভের কলঙ্ক। কিন্তু মায়ের কাছে ছেলেমেয়ে তো ছেলেমেয়েই। তারা যতো ভুলই করুক আমি কিছু মনে করিনে। কথাগুলো নিজেকে না আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বললেন, বুঝতে পারলাম না।

মহিলা আমার আরো কাছে ঘেঁষে এলেন। আমার হাত দুটি ধরে বললেন, বাবা আমার একটি অনুরোধ রাখবে? আমি বললাম, বলুন। তিনি বললেন, আগে কথা দাও রাখবে। আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ। তোমার প্রতি তায়েবার একটা অন্ধ আকর্ষণ আছে। তুমি হাসপাতালে তাকে দেখতে এলে সে বড়ো খুশি হয়। তোমরাও খুব সুখে নেই জানি। তবু সময় করে যদি একটু ঘন ঘন দেখতে যাও। বলো মায়ের এই অনুরোধটা রক্ষা করবে? জবাব দিতে গিয়ে আমার চোখে পানি বেরিয়ে গেলো। তিনিও আমার মাথাটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললেন। আমরা দু’জন দু’জনকে বুঝতে পেরেছি। তবু আমি আমতা আমতা করে বললাম, কেউ যদি কিছু মনে করে। আমি হাসপাতালে যাই ওটা অনেকে সুনজরে দেখে না। কারো মনে করাকরি নিয়ে বাবা কিছু আসে যায় না। কথাবার্তা শেষ করে ফ্রি স্কুল স্ট্রীট থেকে বেরিয়ে এলাম। মনে হলো মধ্যযুগীয় অন্ধকার গুহা থেকে মুক্তি পেলাম।