ফ্রি স্কুল স্ট্রীট থেকে বৌ বাজারের হোস্টেলে এসে অবাক হয়ে গেলাম। ঘরের মধ্যেই মাদুর বিছিয়ে খাওয়া দাওয়া চলছে। খাসির মাংস, ভাত, ডাল সব দোকান থেকে আনা হয়েছে। খেতে বসেছেন নরেশদা, খুরশিদ, মাসুম, বিপ্লব এবং অপর একজন, যাকে আমি চিনিনে। বয়স তিরিশ টিরিশ হবে, গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। প্রথম দৃষ্টিতেই মনে হবে উনি কোনো ক্যাম্প থেকে এসেছেন। খুরশিদই পরিচয় করিয়ে দিলো। ক্যাপ্টেন হাসান। মুর্শিদাবাদের লালগোলার কাছাকাছি একটি মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে এসে থাকবেন। উনারা খেতে বসেছেন, শেকহ্যান্ড করার উপায় ছিলো না। একটা ব্যাপার আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশ থেকে যতো মানুষ কোলকাতায় এসেছে, তাদের একটা অংশ কি করে জানিনে আমাদের এই আস্তানাটা শিগগির কি বিলম্বে চিনে ফেলেছে। আমাদের সঙ্গে কি করে জানিনে নানা জাতের, নানা পেশার অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তাদের মধ্যে গায়ক আছে, এ্যাকটর আছে, সাংবাদিক, শিল্পী, ভবঘুরে বেকার, পেশাদার লুচ্চা, বদমায়েশ, চোরাচরও আছে। সকলের একটাই পরিচয় আমরা বাংলাদেশের মানুষ।
এই সময়ের মধ্যে আমাদের আস্তানাটির কথা গোটা কোলকাতা শহরে প্রচার হয়ে গেছে। আমরা সব ভাসমান কর্মহীন মানুষ। একে অপরকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করি। বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশের মানুষের কাছে না যাবে তো কোথায় যাবে? তারপরেও খুরশিদের কৃতিত্বটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রায় প্রতিদিন নিত্য নতুন মানুষকে এই হোস্টেলে নিয়ে আসার কৃতিত্ব মুখ্যত খুরশিদের। সে বাইরে বড়ো গলা করে নিজেকে আওয়ামী লীগের লোক বলে ঘোষণা করে। পেছনে অবশ্য কারণও আছে। আওয়ামী লীগের ছোটো বড়ো মাঝারি নেতাদের অনেককেই খুরশিদ চেনে এবং তাঁরাও খুরশিদকে চেনেন। পারতপক্ষে তাকে তারা এড়িয়েও চলেন। তাই কার্যত খুরশিদ আমাদের ডেরায় এসে তার আওয়ামী লীগত্ব জাহির করে। আজকের ক্যাপ্টেন হাসান ভদ্রলোককেও নিশ্চয়ই খুরশিদ নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। এতোসব খাবারদাবারের আয়োজনের পয়সা এসেছে কোত্থেকে। নির্ঘাত টাকাটা ক্যাপ্টেনের পকেট থেকে গেছে এবং এতে খুরশিদের শিল্পকলার সামান্য অবদান থাকা বিচিত্র নয়।

নরেশদা বললেন, কাপড়চোপড় ছেড়ে মুখ হাত ধুয়ে তুইও বসে যা। যা খাবার আছে তাতে আরো দু’জনের হয়ে যাবে। আমি মুখ হাত ধুয়ে এসে খেতে বসে গেলাম। আজ খুরশিদের মেজাজটি ভয়ঙ্কর রকম উষ্ণ হয়ে আছে। এমনিতেও উত্তেজনা ছাড়া খুরশিদের জীবন ধারণ এক রকম অসম্ভব। একটা না একটা ঝগড়া বিবাদের বিষয়বস্তু খুঁজে আবিষ্কার করতে তার কোনো জুড়ি নেই। আজকে তার অসন্তোষটা অন্যান্য দিনের চাইতে পরিমাণে অনেক অধিক। আমি তাই কৌতূহলী হয়ে জিগ্গেস করলাম, খুরশিদ আজ তোমার আলোচ্য বিষয়সূচী কি? নরেশদা জবাব দিলেন, খোন্দকার মুশতাক আহমেদ। মুশতাকের মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষও তোমার বিষয় হতে পারে, এতো আমি কল্পনাও করতে পারিনি। হলোই বা ভারতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিদেশ মন্ত্রী। আমি তো তোমাকে আরো ওপরের তরিকার মানুষ বলে মনে করতাম।
আমার কথায় খুরশিদের মেজাজের কোনো পরিবর্তন হলো না। সে প্রায় ধমক দেয়ার সুরে বললো, আরে মশায় শুনবেন তো। শালার বেটা শালা, নেড়িকুত্তার বাচ্চা কি কাণ্ডটা করে বসে আছে। এইখানে এই কোলকাতায় বসে বসে বেটা হেনরী কিসিঞ্জারের সঙ্গে এতোকাল যোগাযোগ করে আসছিলো। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামী হিসেবে ভান করে মুক্তিসগ্রামকে পেছন থেকে ছুরিকাহত করাই ছিলো তার প্ল্যান। তলায় তলায় আমেরিকার মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে আপোষের চেষ্টা করছিলো। শালা, মেনিবিড়াল কোথাকার। ফন্দি টন্দি এঁটে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার নাম করে ভারত থেকে বেরিয়ে পড়তে পারলেই ঝুলির ভেতর থেকে সবগুলো বেড়াল বের করবে এটাই ছিলো তার ইচ্ছা। মাঝখানে ভারতের ইনটিলিজেন্স তার সমস্ত ষড়যন্ত্রের কথা উদ্ঘাটন করে ফেলেছে। তাজুদ্দিন তার নিউইয়র্কে যাওয়া আটকে দিয়েছেন। তাজুদ্দিনকে যতোই অপবাদ দিক আসলে কিন্তু মানুষটা খাঁটি। দেশের প্রতি টান আছে।

ক্যাপ্টেন হাসান হাত ধুয়ে এসে তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, তাজুদ্দিন বলুন, মুশতাক বলুন থিয়েটর রোডে যারা বসে তারা সকলে একই রকম। নিজেদের মধ্যে দলাদলি করছে, সর্বক্ষণ একজন আরেকজনকে ল্যাঙ মারার তালে আছে। দেখছেন একেকজনের চেহারার কেমন খোলতাই হয়েছে। খাচ্ছে দাচ্ছে, আমোদ-ফুর্তি করছে। সবাই তোফা আরামে আছে। যুদ্ধটা কি করে চলছে সেদিকে কারো কি কোনো খেয়াল আছে? কেউ কি কখনো একবার গিয়ে দেখেছে ক্যাম্পগুলোর কি অবস্থা? সাহেব আমরা যে অবস্থায় এখন থাকছি, বনের পশুও সে অবস্থায় পড়লে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। আমাদের বলা হয়েছে যুদ্ধ করো। কিন্তু কি দিয়ে যুদ্ধ করবে আমাদের ছেলেরা? শুধু হ্যান্ডগ্রেনেড দিয়ে কি পাকিস্তানী সৈন্যের দূরপাল্লার কামানের সঙ্গে পাল্লা দেয়া যায়? আমরা প্ল্যান করি ভারতীয়রা সে প্ল্যান নাকচ করে। নালিশ করে প্রতিকারের কথা দূরে থাকুক, কোনো উত্তর পর্যন্ত পাওয়া যায় না। আমরা ছেলেদের সব জেনেশুনে প্রতিদিন আত্মহত্যা করতে পাঠাচ্ছি। একেকটা সামান্য অস্ত্র জোগাড় করতেও প্রতিদিন কত দুয়ারে ধন্না দিতে হয়। মাঝে মাঝে ভয়ঙ্কর দুঃখ হয়, এতো কষ্ট করে আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে কেনো মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে এখানে এলাম। ক্যাম্পে থাকলে তবু ভালো থাকি। ছেলেদের সঙ্গে এক রকম দিন কেটে যায়। কিন্তু কোলকাতা এলে মাথায় খুন চেপে বসে। ইচ্ছে জাগে এই ফর্সা কাপড় পরা তথাকথিত নেতাদের সবকটাকে গুলি করে হত্যা করি। এ্যায়সা দিন নেহি রহেগা। একদিন আমরা দেশে ফিরে যাবো। তখন এই সব কটা বানচোতকে গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে মারবো। দেখি কোন্ বাপ সেদিন তাদের উদ্ধার করে। কোলকাতায় নরোম বিছানায় ঘুমিয়ে পোলাও কোর্মা খাওয়ার মজা ভালো করে দেখিয়ে দেবো। ক্যাপ্টেন হাসান চেয়ারের হাতলে তোয়ালেখানা রেখে পকেট থেকে ইন্ডিয়া কিং এর প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালেন এবং নরেশদাকে একটা দিলেন।

থিয়েটর রোডের লোকদের বিরুদ্ধে এসব নালিশ নতুন নয়। সবাই নালিশ করে। কিন্তু তাদের করবার ক্ষমতা কততদূর তা নিয়ে কেউ বিশেষ চিন্তাভাবনা করে বলে মনে হয় না। আমি মনে মনে তাজুদ্দিনের তারিফ করি। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। আমার বিশ্বাস সবদিক চিন্তা করে দেখার ক্ষমতা তাঁর আছে। কিন্তু তিনি কতোদূর কি করবেন। আওয়ামী লীগারদের মধ্যে অনেকগুলো উপদল। ভারত সরকার সবক’টা উপদলকে হাতে রাখার চেষ্টা করছে। আবার তাদের অনেকেই তাজুদ্দিনকে প্রধান মন্ত্রীত্বের আসন থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে। পাকিস্তানী এবং আমেরিকান গুপ্তচরেরা এখানে ওখানে ফাঁদ পেতে রেখেছে। তাদের খপ্পরে আওয়ামী লীগারদের একটা অংশ যে পড়ছে না, একথাও সত্যি নয়। এই প্রবাসে অন্য একটি সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছে। ভারত সরকারের মর্জিমেজাজ যেমন মেনে চলতে হয়, তেমনি অজস্র উপদলীয় কোন্দলের মধ্যে একটা সমঝোতাও রক্ষা করতে হয়। ভারত সরকারের বিশেষজ্ঞদের আবার একেকজনের একেক মত। কেউ মনে করেন এদলকে হাতে রাখলে ভালো হবে। আবার আরেকজন মনে করেন, আখেরে এই উপদলের টিকে থাকার ক্ষমতা নেই। সুতরাং অন্য দলটিকে ট্রেনিং, অস্ত্র শস্ত্র, টাকা পয়সা দিলে উপকার হবে। দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্যুত অবস্থায় সবকটা উপদলই মনে করছে তারাই প্রকৃত ক্ষমতার দাবিদার। কোনো নেতা ক্ষমতা দাবি করছেন, কেনোনা তিনি শেখ মুজিবের আত্মীয়। আরেক নেতা ক্ষমতা দাবি করছেন, কারণ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মীয়-স্বজনদের দু’চোখে দেখতে পারেন না। হয়তো আরেক নেতা মনে মনে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধিতা করেন বলেই ক্ষমতা অধিকার করতে চান। ধৈর্য ধরে সবকিছু দেখে যাওয়া ছাড়া তাজুদ্দিনের আর করবার কি আছে?

সবাই মুখ হাত ধুয়ে বসে বসে পান চিবুচ্ছি। এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে মাসুম ঘরে প্রবেশ করে বললো, নরেশদা, দানিয়েল ভাই শিগ্গির চলুন রেজোয়ান আত্মহত্যা করেছে। মাসুমের মুখে সংবাদটি শুনে আমরা সকলেই অভিভূত হয়ে গেলাম। দু’চারদিন আগেও আমাদের আড্ডায় এসেছিলো, সর্বক্ষণ অপরকে হাসাতো। সব সময়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা নবদ্বীপ হালদারের কমিক মুখস্ত বলতো। এই যুদ্ধ, দেশত্যাগ, খুন, জখম, বীভৎসতা কিছুই যেনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। মাঝে মাঝে আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, মানুষ এতো হাসে কেমন করে? স্বীকার করতে আপত্তি নেই, রেজোয়ানের প্রতি মনের কোণে একটুখানি বিদ্বেষ পুষে রাখতাম।

প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কাটি কেটে গেলে মাসুমের মুখে রেজোয়ানের আত্মহত্যার কারণটা জানতে পারলাম। কিছুদিন আগে রেজোয়ানদের আড্ডায় কুমিল্লা থেকে মজিদ বলে আরেকটি ছেলে আসে। রেজোয়ানরা থাকতো রিপন স্ট্রীটে। মজিদ আর রেজোয়ান দু’জনেই কুমিল্লার কান্দিরপাড় এলাকার একই পাড়ার ছেলে। মজিদ কোলকাতা এসে সকলের কাছে রটিয়ে দেয় যে রেজোয়ানের যে বোনটি উম্যান্স কলেজের প্রিন্সিপাল, সে একজন পাকিস্তানী মেজরকে বিয়ে করে ফেলেছে। এই সংবাদটা পাওয়ার পর রেজোয়ান দু’দিন ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকে। কারো সঙ্গে একদম কথাবার্তা বলেনি। অনেক চেষ্টা করেও কেউ তাকে কিছু খাওয়াতে পারেনি। অবশেষে রাত্রিবেলা ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। সকালে সে বিছানা ছেড়ে উঠছে না দেখে রুমের অন্যান্যরা ঘুম ভাঙ্গাতে চেষ্টা করে দেখে মরে শক্ত হয়ে গিয়েছে। আর মুখের লালা পড়ে বালিশ ভিজে গেছে। তার মাথার কাছে পাওয়া গেলো একটি চিরকুট। তাতে লিখে রেখেছে, বড়ো আপা, যাকে আমি বিশ্বাস করতাম সবচাইতে বেশি, সে একজন পাকিস্তানী মেজরের স্ত্রী হিসেবে তার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমোচ্ছে, একথা আমি চিন্তা করতে পারিনে। দেশে থাকলে বড়ো আপা এবং মেজরকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতাম। এখন আমি ভারতে। সুতরাং সে উপায় নেই। অথচ প্রতিশোধ স্পৃহায় আমার রক্ত এতো পাগল হয়ে উঠেছে শেষ পর্যন্ত নিজেকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেই। যার আপন মায়ের পেটের বোন দেশের চরমতম দুর্দিনে, দেশের শত্রুকে বিয়ে করে তার সঙ্গে একই শয্যায় শয়ন করতে পারে তেমন ভাইয়ের বেঁচে থেকে লাভ কি? কি করে আমি দেশের মানুষের সামনে কলঙ্কিত কালো মুখ দেখাবো। আমার মতো হতভাগ্যের বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না। সকলকে কষ্ট দিতে হলো বলে আমি দুঃখিত এবং সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ইতি রেজোয়ান।

শুনেই আমি, নরেশদা এবং খুরশিদ রিপন স্ট্রীটে ছুটলাম। সেখানে গিয়ে শুনি রেজোয়ানের লাশ থানায় নিয়ে গেছে। অগত্যা থানায় যেতে হলো। ময়না তদন্ত ছাড়া লাশ বের করে আনতে কম হ্যাঙ্গামাহুজ্জত পোহাতে হলো না। এতে সমস্যার শেষ নয়। তারপরেও আছে কবর দেয়ার প্রশ্নটি। আমরা কোলকাতা শহরে সবাই ভাসমান মানুষ। মৃত ব্যক্তিকে এখানে কোথায় কবর দিতে হয়, কি করে কবর দিতে হয়, এসব হাজারটা কায়দাকানুনের কিছুই আমরা জানিনে। তাছাড়া আমাদের সকলের পকেট একেবারে শূণ্য। টাকা থাকলে বুকে একটা জোর থাকে। সেটাও আমাদের নেই। কি করি। আমাদের একজন ছুটলো কাকাবাবু মুজফফর আহমদের কাছে। তিনি নিজে অসুস্থ মানুষ। তাঁকে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হয়। তিনি এক সময়ে বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন, এই দাবিতে আমরা সময়ে অসময়ে তার কাছে গিয়ে হাত পেতেছি। তিনি সাধ্যমতো আমাদের দাবি পূরণ করেছেন। এই রকম একটা ব্যাপার নিয়ে তাঁকে বিব্রত করা ঠিক হবে কিনা এ নিয়ে আমাদের মনে যথেষ্ট দ্বিধা ছিলো। তবু তাঁর কাছে যেতে হলো। তিনি তাঁর পার্টির একজন মানুষকে বলে গোবরা কবরস্থানে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপরেও আমাদের টাকার প্রয়োজন। লাশকে গোসল দিতে হবে, কাফন কিনতে হবে, কবর খুঁড়তে হবে, কবরস্থানে নিয়ে যেতে হবে, জানাজা পড়াতে হবে-এসবের প্রত্যেকটির জন্য টাকার প্রয়োজন। টাকা কোথায় পাওয়া যাবে। আমাদের আরেকজন ছুটলো প্রিন্সেপ স্ট্রীটে অধ্যাপক ইউসুফ আলির কাছে। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাহলেও আমাদের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক আছে। ইচ্ছে করলে তিনি টাকাটা ম্যানেজ করে দিতে পারেন। আমাদের অনুমানই সত্য হলো। ইউসুফ সাহেব কাফন দাফনের টাকাটা ব্যবস্থা করলেন। ক্ষেত্র বিশেষে জীবিত মানুষের চাইতে মৃত মানুষের দাবি অধিক শক্তিশালী।

রেজোয়ানকে গোসল ইত্যাদি করিয়ে কবর দিতে দিতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। আমার ধারণা হয়েছিলো মৃত্যু আর আমাকে বিচলিত করে না। পঁচিশে মার্চের পর থেকে ভারতে আসার পূর্ব পর্যন্ত মৃত্যু তো কম দেখিনি। আমি নীলক্ষেত দেখেছি, রাজারবাগ দেখেছি, শাঁখারি বাজার দেখেছি। আমার নিজের কানের পাশ দিয়েও পাকিস্তানী সৈন্যের রাইফেলের গুলি হিস হিস করে চলে গেছে। কিন্তু রেজোয়ানের মৃত্যুটি একেবারে অন্যরকম। আমার সমস্ত সত্তার মধ্যে একটা আলোড়ন জাগিয়ে দিয়ে গেছে। যার বোন পাকিস্তানী মেজরকে বিয়ে করেছে, তাকে আত্মহত্যা করতে হয়। সেদিন আমাদের সকলের হৃদয় এমন গভীর বিষাদে ভারাক্রান্ত ছিলো যে কেউ কারো সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারিনি।

রেজোয়ানকে কবর দিয়ে সকলে চলে এলো। আমার সকলের সঙ্গে ফিরতে ইচ্ছে হলো না। নরেশদা বললেন, কিরে দানিয়েল যাবিনে। আমি বললাম, আপনারা যান আমি পরে আসছি। সকলের অন্তঃকরণ গভীর ভাবাবেগে পরিপূর্ণ। কেউ কাউকে টেনে নিয়ে যাবার মতো অবস্থা ছিলো না। আমি রেজোয়ানের কাঁচা কবরের কাছে ছাতাধরা একটি পাথরের বেঞ্চির ওপর বসে রইলাম। চারপাশে সারি সারি কবর। গোবরা কবরস্থানে চারদিক থেকে চরাচরপ্লবী অন্ধকার নেমে আসছে। হাজার হাজার মৃত মানুষ ঘুমিয়ে আছে। আমি একা হাতের ওপর মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছি। কেবল কেয়ারটেকারের কুকুরটি অদূরে দু’পায়ের ওপর বসে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। বোধ করি ভাবছে কবরস্থানে এই ভরসন্ধ্যায় জীবিত মানুষ কেনো? মানুষের জীবন মৃত্যু এসব ছায়াবাজির খেলা বলে মনে হলো। নিজের অস্তিত্বটাও অর্থহীন প্রতীয়মান হলো। আকাশে ছায়াপথে লক্ষ লক্ষ তারা মানুষের পৃথিবীর গুরুত্ব কতোটুকু। আমার আগে পৃথিবীতে কতো মানুষ এসেছে, তারা কতো কি কাজ করেছে, চিন্তা করেছে, কতো যুদ্ধবিগ্রহ করেছে, তারপরে সকলে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। মানুষের সুখ দুঃখ, দ্বন্দ্ব বিবাদ ওই সুদূরের তারকারাজি অনাদিকাল থেকে সব কিছু মুগ্ধ চোখে দেখে আসছে। আমি যেনো মৃত মানুষদের চুপি চুপি সংলাপ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাদের অভিশপ্ত কামনা বাসনার ঢেউ যেনো আমার বুকে এসে আছড়ে পড়ছে। কেবল রেজোয়ানের কাঁচা কবরটির অস্তিত্ব কাটার মতো যন্ত্রণা দিচ্ছিলো। ছেলেটা দুদিন আগেও আমাদের সঙ্গে হাঁটাচলা করেছে। অবিশ্রাম হেসেছে, অপরকে হাসিয়েছে। এতো সকালে তার মরার কথা নয়। বাংলাদেশের যুদ্ধটা না লাগলে হয়তো ছেলেটাকে এমন অকালে মরতে হতো না। আমার মগজের মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বদলে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের যুদ্ধটা চক্কর দিতে লাগলো। বড়ো ভাগ্যহীন এই বাঙালি মুসলমান জাতটা। আবহমানকাল থেকে তারা ভয়ঙ্করভাবে নির্যাতিত এবং নিষ্পেষিত। সেই হিন্দু আমল, বৌদ্ধ আমল, এমনকি মুসলিম আমলেও তারা ছিলো একেবারে ইতিহাসের তলায়। এই সংখ্যাগুরু মানবমণ্ডলি কখনো প্রাণশক্তির তোড়ে সামনের দিকের নির্মোক ফাটিয়ে এগিয়ে আসতে পারেনি। যুগের পর যুগ গেছে, তাদের বুকের ওপর দিয়ে ইতিহাসের চাকা ঘর ঘর শব্দ তুলে চলে গেছে। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রেজোয়ান ছেলেটা যে অকালে মারা পড়লো তার মধ্যে ইতিহাসের দায়শোধের একটা ব্যাপার যেনো আছে।

বাঙালি মুসলমানেরাই প্রথম পাকিস্তান চেয়েছিলো। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্থান, সীমান্ত প্রদেশ কোথায়। লোকে পাকিস্তানের কথা বলতো। জিন্নাহ সাহেব বাংলার সমর্থন এবং আবেগের ওপর নির্ভর করেই তো অপর প্রদেশগুলোকে নিজের কজায় এনেছিলেন। যে বাঙালি মুসলমানদের অকুণ্ঠ আত্মদানে পাকিস্তান সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিলো, সেই পাকিস্তানই তিরিশ বছর তাদের ওপর বসে তাদের ধষর্ণ করেছে। একটা জাতি এতোবড়ো একটা ভুল করতে পারে? কোথায় জানি একটা গড়বড়, একটা গোঁজামিল আছে। আমরা সকলে সেই গোঁজামিলটাই ব্যক্তিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে অদ্যাবধি বহন করে চলেছি। পাকিস্তানের গণপরিষদে তো পূর্বপাকিস্তানের সদস্যরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাভাষার দাবিটি তো তারা সমর্থন করতে পারতেন। হলেনই বা মুসলিম লীগার। তবু তারা কি এদেশের মানুষ ছিলেন না? তাদের সাত পুরুষ বাংলার জলহাওয়াতে জীবন ধারণ করেননি? তবু কেন, বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠার জন্যে আমাদের ছাত্র তরুণদের প্রাণ দিতে হলো? পূর্বপুরুষদের ভুল এবং ইতিহাসের তামাদি শোধ করার জন্য কি এই জাতিটির জন্ম হয়েছে?

উনিশশো আটচল্লিশ থেকে সত্তর পর্যন্ত এই জাতি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। আর চূড়ান্ত মুহূর্তটিতে আমাদের সবাইকে দেশ ও গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে আসতে হয়েছে। আমাদের হাতে সময় ছিলো, সুযোগ ছিলো। কোলাহল আর চিৎকার করেই আমরা সে সুযোগ এবং সময়ের অপব্যবহার করেছি। পাকিস্তানের কর্তাদের আমরা আমাদের বোকা বানাতে সুযোগ দিয়েছি। তারা সৈন্য এনে ক্যান্টনমেন্টগুলো ভরিয়ে ফেলেছে এবং সুযোগ বুঝে পাকিস্তানী সৈন্য আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। আমরা আমাদের যুদ্ধটাকে কাঁধে বয়ে নিয়ে ভারতে চলে এসেছি। হয়তো যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। তারপর কী হবে? আমাদের যুদ্ধটা ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মন বলছে পাকিস্তান হারবে, হারতে বাধ্য। কিন্তু আমরা কি পাবো? ইতিহাসের যে গোঁজামিল, আমরা বংশপরম্পরা রক্তধারার মধ্য দিয়ে বহন করে চলেছি তার কি কোনো সমাধান হবে? কে জানে কি আছে ভবিষ্যতে।
ঢেউ দিয়ে একটা চিন্তা মনে জাগলো। যাই ঘটুক না কেন, আমার বাঙালি হওয়া ছাড়া উপায় কি? আর কি-ই বা আমি হতে পারি? দুনিয়ায় কোন জাতিটি আমাকে গ্রহণ করবে। গোরস্থানের কেয়ারটেকার এসে বললো দশটা বেজে গেছে। এখখুনি গেট বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং আমাকেও চলে আসতে হলো।

তারপরের দিন আমার পক্ষে হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পয়সার ধান্ধায় কোলকাতার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধি ছুটে বেড়াতে হয়েছে। তাছাড়া এক সঙ্গে আমরা অনেক মানুষ থাকি। যৌথ জীবনযাপনের নানা সমস্যা তো আছেই। আমাদের কাজ নেই, কর্ম নেই, তবু জীবন প্রতিনিয়ত সমস্যার সৃষ্টি করে যায়। নিজেদের মধ্যে ঝগড়াবচসা, অভিমান এসব তো লেগেই আছে। সে সবের ফিরিস্তি দিয়ে বিশেষ লাভ হবে না।

রোববার দিনটিতে আমি সন্ধ্যের একটু আগেই হাসপাতালে গেলাম। গিয়ে দেখি জমজমাট ব্যাপার। ডোরা এসেছে, দোলা এসেছে। তায়েবার মাও এসেছেন। আর তায়েবা বালিশে হেলান দিয়ে বসে অর্চনার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে। আজকে তায়েবাকে খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। চমৎকার একটা ধোয়া সাদা শাড়ি পরেছে। খোঁপায় বেলী ফুলের মালা জড়িয়েছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো গেন্ডারিয়ার বাড়িতে আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছে। আমাকে প্রথম দেখতে পেলো অর্চনা। সে কলকল করে উঠলো, এই যে দানিয়েল, কাল থেকে টিকিটিরও দেখা নেই কেন। আমি হেসে বললাম, আটকে গিয়েছিলাম। তায়েবাদি হাসপাতালে, আর তুমি গা ঢাকা দিয়ে আছে। আমি জিগগেস করলাম, অর্চনা তুমি কালও এসেছিলে নাকি? অর্চনাদি কালও এসেছিলেন এবং অর্ধেকদিন আমার সঙ্গে কাটিয়ে গেছেন। আজকে আমার জন্য বেলী ফুলের মালা নিয়ে এসেছেন। খোঁপা থেকে মালাটা খুলে হাতে নিয়ে দেখালো। কি ভালো অর্চনাদি। তার সঙ্গে কথা বললে মনটা একেবারে হাল্কা হয়ে যায়। অর্চনা কৃত্রিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললো, বাজে বকোনা তায়েবাদি, তোমার মতো এতো প্রাণখোলা মেয়ে এতোদিন হাসপাতালে পড়ে আছো এ খবর আমি আগে পাইনি কেন? দু’মহিলার এই পারস্পরিক প্রশস্তি বিনিময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। তায়েবার মা আমার কাছে জানতে চাইলেন, বাবা দানিয়েল, কাল কি তোমার কোনো অসুখবিসুখ হয়েছিলো। তোমাকে খুব দুর্বল এবং বিমর্ষ দেখাচ্ছে। আমি মাথা নেড়ে বললাম, না আমি সুস্থই ছিলাম। তাহলে তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো। মা, তুমি যেনো একটা কি। মনে করতে চেষ্টা করো, তাঁকে কখন তুমি সুস্থ মানুষের মতো দেখেছিলে। সব সময় তো একই রকম দেখে আসছি। গোসল করবে না, জামাকাপড় পরিষ্কার রাখবে না, দাড়ি কাটবে না–আর এমন একটা মেক আপ করে থাকবেন, দেখলে মনে হবে রোগি অথবা সাতজন পাঁচজনে ধরে কিলিয়েছে। কথা বলা অবান্তর। এই নালিশটি তায়েবা আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই করে আসছে। তায়েবার কথা শুনে ডোরা খিলখিল করে হেসে উঠলো। ডোরার এই হাসিটিও আমার পরিচিত। গেন্ডারিয়ার বাসায় তায়েবা অপরিচ্ছন্ন থাকার অনুযোগ করলেই ডোরা এমন করে হেসে উঠতো। আশ্চর্য ডোরা আজও তেমন করে নির্মলভাবে হাসতে পারে? নানা অঘটন ঘটে যাচ্ছে। তবু মনে হচ্ছে সকলে ঠিক আগের মতোই আছে। কিন্তু আমি একা বদলে যাচ্ছি কেন? বোধ করি মানুষের ভালো মন্দ সব কিছুর বিচারক সেজে বসি বলেই কি আমার এ দুরাবস্থা। মানুষের কৃতকর্মের বিচারক সেজে বসার আমার কি অধিকার? তায়েবার মা কথা বললেন, কি বাবা হঠাৎ করে গম্ভীর হয়ে গেলে কেন? ডোরা ফোড়ন কেটে বললো, একটুখানি গম্ভীর না দেখালে লোকে ইন্টেলেকচুয়াল বলবে কি করে? কথাটা তায়েবার, ডোরা ধার করে বললো। কোলকাতা এসে দেখেছি ডোরার মুখ খুলে গেছে। সে কায়দা করে কথা বলতে শিখে গেছে। এবার দোলা মুখ খুললো। বেচারিকে তোমরা খেপাচ্ছো কেন? আসলে দানিয়েল ভাই খুব সরল-সহজ ভালো মানুষ। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় নাক সিধে চলেন, ডানে বামে তাকান না। তার দোষ ঐ একটাই, তিনি রসিকতা বোঝেন না। আজকে হাসপাতালে এসে আমার একটা ভিন্নরকম ধারণা হলো। এতোদিন মনে করে এসেছি এরা তায়েবার এই ভয়ঙ্কর অসুখটিকে কোনো রকম গুরুত্ব না দিয়ে সবাই নিজের নিজের তালে আছে। আজকে মনে হলো, সবাই তায়েবাকে তার মারাত্মক অসুখটির কথা ভুলিয়ে রাখার জন্যই এমন হাসিখুশি এমন খোশগল্প করে। মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধ ঘনিয়ে উঠলো। আমিই তো প্রথম থেকে তায়েবাকে তার একান্ত ব্যথার জায়গাটিতে আঘাত করে আসছি। হাবে ভাবে আচার আচরণে তায়েবাকে তার ভাই বোন আত্মীয় স্বজন থেকে আলাদা করে ফেলার একটা উগ্র আকাক্ষার প্রকাশ ক্রমাগত দেখিয়ে এসেছি। এটা কেমন করে ঘটলো? তায়েবার ওপর আমার কি দাবি? যদি বলি তায়েবাকে আমি প্রাণের গভীর থেকে ভালোবাসি। তাহলে ভালোবাসার এমন উদ্ভট দাবি কেমন করে হতে পারে যে আমি তাকে তার ডাল মূল থেকে আলাদা করতে চাইবো। আমি নিশ্চিত জানি সে মারা যাবেই। প্রতিদিন একটু একটু করে তার জীবনপ্রদীপের তেল শুকিয়ে আসছে। তথাপি আমার মনের অনুক্ত আকাক্ষা এই মৃত্যু পথযাত্রী তায়েবার সবটুকুকে আমি অধিকার করে ফেলবো। পারলে তার স্মৃতি থেকেও নিকটজনের নামনিশানা মুছে ফেলবো। নিজের মনেরে ভেতর জমাটবাঁধা একটা ঈর্ষার পিণ্ড যেনো দুলে উঠলো। এই প্রথম অনুভব করলাম, আমি একটা পশু, একটা দানব। যা পেতে চাই সব কিছু ভেঙ্গে চুরে ছত্রখান করে গুঁড়িয়ে পেতে চাই। অথচ মনে মনে একটা ভালো মানুষীর আত্মপ্রসাদ অনুভব করে দুনিয়ার তাবৎ মানুষকে আসামী বানিয়ে বিচারক সেজে বসে আছি। সেই সন্ধ্যেয় হাসপাতালে আমার মনের এই কুৎসিত দিকটির পরিচয় পেয়ে ক্রমশ নিজের মধ্যেই কুঁকড়ে যেতে থাকলাম। স্বাভাবিকভাবে কোনো কথাবার্তা বলতে পারছিলাম না।

হাসপাতালের শেষ ঘণ্টা বেজে উঠলো। অর্চনা উঠে দাঁড়িয়ে বললো, তায়েবাদি আজ আসি। শিগগির আবার আসবো। সে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, শোনো দানিয়েল, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। থাক্ ভালোই হলো, কথাটা মনে পড়লো। পারলে এরই মধ্যে একবার সময় করে আমাদের বাড়িতে আসবে, একটা জরুরী ব্যাপার আছে। জরুরী ব্যাপারের কথা শুনে আমি অর্চনার পিছু পিছু করিডোর পর্যন্ত এলাম। জানতে চাইলাম, আসলে ব্যাপারটা কি? অর্চনা বললো, জানো আমার এক দূর সম্পর্কীয় দাদা এসেছেন ফ্রান্স থেকে। তিনি এক সময়ে অনুশীলন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপর নেতাজী সুভাষ বোসের সঙ্গে আজাদ হিন্দুফৌজে যোগ দিয়েছিলেন। আমরা অনেকদিন তার কোনো সংবাদ পাইনি। অনেক বছর পরে জানতে পারলাম, তিনি ফ্রান্সে চলে গিয়েছেন এবং এক ফরাসী মহিলাকে বিয়ে করেছেন। আমরা তো তাঁর। কথা একদম ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি তো তাকে কোনোদিন চোখেও দেখিনি। হঠাৎ করে গত সপ্তাহে তিনি আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। বাড়ির লোকজন কলিযুগেও এমন আশ্চর্য কাণ্ড ঘটতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে। তিনি সংবাদপত্রে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সংবাদ পাঠ করে আর টেলিভিশন রিপোর্ট দেখে সোজা কোলকাতা চলে এসেছেন। একেই বলে বিপ্লবী। তিনি এখন আমাদের বাড়িতেই আছেন। তুমি একদিন আসবে। তোমার সঙ্গে কথা বললে দাদা ভীষণ খুশি হবেন। অর্চনা চলে গেলো।

অর্চনাকে বিদায় করে তায়েবার কেবিনে ঢুকে দেখি জাহিদুল এবং হেনা ভাই দু’জন এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে সহজভাবে কথাবার্তা বলতে পারলাম। আমি নিজের ভেতরে সহজ হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছি বলেই যেনো চারপাশের জগতটা আমাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে। দোলা, ডোরা এবং তায়েবার মা উনারাও উঠে দাঁড়ালেন। দোলাকে যেতে হবে ধর্মতলা। সেখান থেকে অন্য মেয়েদের সঙ্গে দমদম তার ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে। ডোরা, জাহিদুলের সঙ্গে কোনো বাড়িতে গান গাইতে যাবে। আর মাকে হেনা ভাই ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে রেখে তারপর নিজের ডেরায় চলে যাবেন। আমি নিজে খুব অস্বস্তি অনুভব করছিলাম। সকলে গেলো, অথচ আমি রয়ে গেলাম। ভাবলাম, চলেই যাই। কিন্তু তায়েবাকে বলা হয়নি। কথাটা কিভাবে তাকে বলবো, চিন্তা করছিলাম। কেবিনে আর কেউ নেই। উৎপলাকে বোধ হয় অন্য কোথায় শিফট করা হয়েছে। মাঝখানে শুনছিলাম, তার অসুখটির খুব বাড়াবাড়ি চলছে। জিগগেস করতে ইচ্ছে হয়নি। পাছে একটা খারাপ জবাব শুনি। তায়েবাই নীরবতা ভঙ্গ করে প্রথম কথা বললো। আচ্ছা দানিয়েল ভাই, একটা কথা জিগগেস করি। আমি বললাম, বলো। আপনি এতো অপরিষ্কার থাকেন কেন? এটা বহু পুরোনো কথা। সুতরাং জবাব দিলাম না। সে বললো, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন ঝটার শলার মতো দাড়িগুলো কি রকম খোঁচা খোঁচা হয়ে আছে। এভাবে গালভর্তি বিশ্রী দাড়ি নিয়ে ঘোরাফেরা করতে আপনার লজ্জা লাগে না। চুপ করে রইলাম। আজকাল ওর কথার পিঠে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছি। কি চুপ করে রইলেন যে, কথা বলছেন না কেন। তার কথার মধ্যে দিয়ে আঁঝ বেরিয়ে এলো। অগত্যা আমি বললাম, তায়েবা, লজ্জাবোধ সকলের সমান নয়।

সে বিছানা থেকে সটান সোজা হয়ে বসলো। আমার চোখে সরাসরি চোখ রেখে বললো, আপনি আমাকে খুব সোজা মেয়ে পেয়েছেন তাই না, সব সময় যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেন। অর্চনাদির মতো কোনো শক্ত মহিলার পাল্লায় পড়লে দু’দিনে আপনার মাথার ভূত ঝেটিয়ে একেবারে সিধে করে দিতো। আমি আর কদিন। আল্লার কাছে মুনাজাত করি অর্চনাদির মতো কোনো শক্ত মহিলার সঙ্গে যেনো সারা জীবন আপনাকে ঘর করে কাটাতে হয়। তায়েবা ঠাট্টাচ্ছলে কথাগুলো বললো বটে, কিন্তু আমি সহজভাবে নিতে পারছিলাম না। সে অর্চনাকে নিয়ে কি অন্য রকম একটা ভাবনা ভাবতে আরম্ভ করেছে? আমি বললাম, এর মধ্যে অর্চনার কথা আসবে কেন? তার সঙ্গে আগে যোগাযোগ ছিলো, কিন্তু চাক্ষুস পরিচয় তো এই কদিনের। তায়েবা বললো, অর্চনাদির কথা বললে আপনি অতো আঁতকে উঠেন কেন? তার কথা আমি বার বার বলবো। একশো বার বলবো। অত্যন্ত ভালো মেয়ে। আমার ভীষণ মনে ধরেছে।

আমি উসখুস করছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে, শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে। তারপরেও হাসপাতালে যদি থাকি কেউ কিছু বলতে পারে। এখানকার নিয়মকানুন বড়ো কড়া। কি কারণে বলতে পারবো না, আমি চলে আসতে চাই, একথাটা তায়েবাকে বলতে পারছিলাম না। কোথায় একটা সংকোচ বোধ করছিলাম। এই দোদুল্যমানতা কাটাবার জন্য একটা চারমিনার ধরাবো স্থির করলাম। কেবিনের বাইরে পা দিতেই তায়েবা অনুচ্চস্বরে বললো, কোথায় যাচ্ছেন? আমি বললাম, একটা সিগারেট খেয়ে আসতে যাচ্ছি। বাইরে যেতে হবে না। এখানে ওই উৎপলার বেডে বসে খান। আমি ইতস্তত করছিলাম। তায়েবা বললো, আপনার ভয় নেই। মনের সুখে সিগারেট খেতে পারেন। ডাঃ ভট্টাচার্য আজ কোলকাতার বাইরে গেছেন। থাকার মধ্যে আছেন মাইতিদা, তাঁকে আমি সামাল দেবো। আমি সত্যি সত্যি উৎপলার বেডে বসে একট সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগলাম। সে বললো, বুঝলেন দানিয়েল ভাই, তাড়াতাড়ি চলে যাবেন না। আজকে আপনার সঙ্গে অনেক্ষণ গল্প করে কাটাবো। হোস্টেলে এক ভদ্রলোককে নয়টার সময় আসতে বলেছি। তার সঙ্গে আমার টাকা-পয়সার একটা ব্যাপার আছে। এসে যদি ভদ্রলোক ফেরত যান, আবার কবে দেখা হয় বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া প্রয়োজনটা আমার। আমারই প্রয়োজনে ভদ্রলোককে আমি অনুরোধ করেছি আসতে। তাই মনে মনে একটুখানি দমে গেলাম। তায়েবা সেটা বুঝতে পারলো। কি, আপনার সঙ্গে গল্প করতে চাই সেটি বুঝি পছন্দ হলো না। পছন্দ না হয় তো চলে যান। আমি আপনাকে আটকে রাখিনি। আমি তো অর্চনাদি নই যে জরুরী প্রয়োজনে আপনাকে নির্দেশ দিতে পারি।
আমি সিগারেটটা ফেলে দিয়ে টুলটা টেনে তার বিছানার পাশে এসে বসলাম। বললাম, ঠিক আছে গল্প করো আমি আছি। কতোক্ষণ থাকবেন? আমি বললাম, যতোক্ষণ গল্প করো। আমি সারারাত গল্প করতে চাই, সারারাত আপনি থাকবেন? সারারাত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থাকতে দেবে? সে মাথার বেণীটি দুলিয়ে বললো, সে দায়িত্ব আমার। এবার সে সত্যি সত্যি রহস্যময়ী হয়ে উঠলো। জানেন দানিয়েল ভাই, আপনার সঙ্গে কথা বলতে ঘেন্না হয়, আপনি এতো বিষণ্ণ এবং অপরিষ্কার থাকেন। মাঝে মাঝে তো বমি বেরিয়ে আসতে চায়। এটাতো ভূমিকা মাত্র। আসলে তায়েবা গোটা রাত কিসের গল্প করতে চায়, সেটা আমাকে ভয়ানক কৌতূহলী করে তুললো। আমি ভুলে গেলাম যে সে একজন মৃত্যুপথযাত্রী রোগী। সে যেমন করে হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে বসেছিলো, তেমনি হঠাৎ আবার বিছানার ওপর নেতিয়ে পড়লো। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলতে লাগলো। আমি কেমন যেনো ভয় পেয়ে গেলাম। এই অবস্থায় কি করি। ডঃ মাইতিকে ডাকবো কিনা চিন্তা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর তার শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে এলো। চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো। আহ্ দানিয়েল ভাই। আপনি আরেকটু এগিয়ে এই আমার মাথার কাছটাতে বসুন এবং হাতখানা দিন। ডান হাতখানা এগিয়ে দিলে দু’হাতে মুঠি করে ধরে দু’তিন মিনিট চুপ করে রইলো। স্বপ্নের মধ্যে কথা বলছে এমনি ফিস ফিস করে বললো, জানেন এবার আমি সাতাশে পা দিয়েছি। রাঙ্গা আমার দু’বছরের ছোটো। তার একটি মেয়ে আছে। গোলগাল পুতুলের মতো। আঃ কি সুন্দর! দেখলে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। রাঙ্গার বয়সে বিয়ে হলে এতোদিনে আমারও ছেলেমেয়ে থাকতো। গোটা জীবনটা কি করে কাটালাম, ভাবলে দুঃখে বুক ফেটে যেতে চায়। তায়েবার এসমস্ত কথার প্রত্যুত্তর আমার জানা নেই। বুকটা ভারাক্রান্ত হয়ে আসছিলো। বহু কষ্টে চোখের পানি চেপে রাখলাম। কিছু বললাম না। তায়েবা বলে যাক যা মন চায়। তার প্রাণ পাতালের তলা থেকে যদি অবরুদ্ধে কামনা বাসনার স্ফুলিঙ্গগুলো বেরিয়ে আসতে চায়, আসুক। এতোকাল মনে হয়েছিলো তায়েবা ঠিক মানবী নয়। সাধারণ মেয়েদের মতো সে কামনা বাসনার ক্রীতদাসী নয়। অন্য রকম। আজ এই সন্ধ্যেয় ওপরের নির্মোক বিদীর্ণ করে তার অন্তরালবর্তী নারী পরিচয় এমন স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতে দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। আমি তার মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। দানিয়েল ভাই, আমার সারা শরীরে প্রচণ্ড আগুনের তাপ। আমি জ্বলে যাচ্ছি, পুড়ে যাচ্ছি। আর বুকে কি ভয়াবহ তৃষ্ণা, মনে হয় সমুদ্র শুষে নিতে পারি। তৃষ্ণা, তৃষ্ণা, তৃষ্ণার তাপে আমি জ্বলে পুড়ে মরছি। আর বেশিদিন নয়, শিগগিরই আমি মারা যাবো। তারপর সবকিছুর শেষ হবে! ও মা! আপনি অতো দূরে কেনো? কাছে আসুন, আপনি এত লাজুক এবং ভীতু কেনো? কই আপনার হাত দুটি কোথায়? সে আমার দু’হাত টেনে নিয়ে বুকের ওপর রাখলো। স্তন দুটি কবুতরের ছানার মতো গুটিসুটি মেরে বসে আছে। আমার বুকের মধ্যে যেমন একটা ভূমিকম্প হচ্ছিলো, তেমনি একটা পুলকপ্ৰবাহও রি রি করে সমস্ত লোমকূপের গোড়ায় গোড়ায় কাঁপছিলো। এই নারী, এতোকাল যাকে মনে করে আসছি ধরাছোঁয়ার বাইরে, সমস্ত জ্ঞানবুদ্ধির অতীত, কতো সহজে আমার কাছে নিজেকে উন্মোচন করেছে। মুসা নীলনদের তল দেখেও কি এতোটা পবিত্র পুলকে শিউরে শিউরে উঠেছিলেন? দানিয়েল ভাই শব্দটা বাদ দিয়ে শুধু আমার নামটা ধরে ডাকলো। জানো তোমাকে ভালোবাসি। এতোদিন বলিনি কেনো জানো? আমি অনেকদিন আগে থেকে, এমনকি তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পূর্ব থেকেই আমার অসুখটার কথা জানতাম। আমার ভয় ছিলো, জানালে কেটে পড়বে। আর তোমাকে ভালোবাসি একথা জানাতে পারিনি, একটা কারণে পাছে তুমি মনে করো, আমি প্রতারিত করেছি। এ দোটানার মধ্যে বহু কষ্টে আমার জীবন কেটেছে। আজকে আমার কোনো দ্বিধা কোনো সংশয় নেই। দুনিয়া শুদ্ধ মানুষের সামনে বলতে পারি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আজ আমার কোনো ভয়, কোনো ডর নেই। আমার ভেতর বাইরে এক হয়ে গেছে। আজ কোনো দ্বিধা, কোনো সংশয় নেই। আহঃ তোমাকে আমি দেখতে পারছিনে! ওইখানে যেয়ে একটু আলোর কাছে বসো। ভালো করে দেখি। আমি আলোর কাছে সরে বসলাম। আহঃ চুলে পাক ধরতে আরম্ভ করেছে! মনে আছে, যেদিন প্রথম আমাদের গেন্ডারিয়ার বাড়িতে গিয়েছিলে গায়ে একটা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি ছিলো। বুকের কাছটিতে রঙ লেগে লাল হয়ে গিয়েছিলো। মনে হয় গতোকাল এঘটনা ঘটে গেছে।

জুতো মচমচিয়ে ডঃ মাইতি কেবিনে প্রবেশ করলেন। আমাকে দেখতে পেয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আরে দানিয়েল সাহেব যে। আসুন আপনার হেন্ডসেক করি। আমিও হাত বাড়িয়ে দিলাম। করমর্দনের পালা সাঙ্গ হলে ডঃ মাইতি বললেন, এবার দানিয়েল সাহেব আপনাকে একটা কৈফিয়ত দিতে হবে। আমি বললাম, কিসের কৈফিয়ত ডঃ মাইতি। আপনার তো থাকার কথা নয়, হাসপাতালে ছ’টার পরে কাউকে থাকতে দেয়া হয় না। এখন আটটা বেজে তিরিশ মিনিট। মাইতিদা উনি চলে যেতে চেয়েছিলেন, আমি এক রকম জোর করেই রেখে দিয়েছি। জবাব দিলো তায়েবা। ভালো করোনি। এখানকার একটা ডিসিপ্লিন তো আছে। সেটা যদি জোর করে ভেঙ্গে ফেলো আমরা টলারেট করবো কেনো? তায়েবা ডঃ মাইতির কথায় কোনো জবাব না দিয়ে বললো, ঠিক আছে দানিয়েল ভাই, চলে যান। আমিও চলে আসার জন্য পা বাড়িয়েছিলাম। এমন সময় ডঃ মাইতি তায়েবার হাত ধরে হো হো করে হেসে উঠলেন। দিদি তোমার আচ্ছা রাগ তো। এটা যে হাসপাতাল, বাড়ি নয়। সে কথা তোমাকে কেমন করে বোঝাই। ঠিক আছে, সাহেব আর দশ মিনিট বসুন। বিছানার একপাশে বসলাম। এখনো তায়েবার রাগ কমেনি। দানিয়েল সাহেব আপনি কেমন আছেন? আমি বললাম, ভালো। সে রাতের পর আপনার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। মাঝে মধ্যে সময় হলে গরীবের দরোজায় একটু টোকা দেবেন। সে রাতের পর থেকে কেন জানিনে আমি ডঃ মাইতির মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। কেমন ভয় ভয় করে। তায়েবা বললো, কালকে আসবেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। আমাকে হাসপাতাল থেকে চলে আসতে হলো।