হরিণী খুরের আগুন

ঘাসের শিকড়ে খেলা করে হরিণী খুরের আগুন
ঝানু শিকারী জানে খুরে তার নাক কাটা যায়,
তবু বিগগেম খেলে।

প্যাংলা পায়ের গতিময় মোচর রহস্যে
সারঙ্গিক হ্যাপার শিকার-
শিকারী-শরীর ঝলসে যায় খুরের শব্দব্রহ্মে,

এর চেয়ে এবার বরং নিষাদ অস্ত্রহীন হয়ে
ফুটফুটে হরিণচোখা শিশুটিকে তার
সবিনয়ে ছেড়ে দিক হরিণীর দলে-
সারা গায়ে সে কস্তুরী হাওয়া মেখে
অন্তত কিছুক্ষণ খেলুক
মেতে উঠুক শৈশব লীলায়…

নিষ্পাপ হাওয়ায় হাওয়ায়
শুদ্ধ হোক দস্যু রত্নাকর।
…………………………………………..

সারিত জীবনের স্বেচ্ছা নির্বাসন

মনের খোলস ছাড়িয়ে মহোৎসব
নিজেকে করেনি কখনো উন্মুক্ত
তবু এর মাঝে পাল্টে যাচ্ছে অহরহ খোলনলচে,
একদিন যতকিছু ঘটেছিলো
প্রত্যহ তা ঘটনা প্রবাহের মতো
দিন আনা দিন খাওয়া…

আকাশে ঝুলে আছে জীবন ঝুলন্ত মেঘের মতো
আঘাত পেলেই প্রকাশিত হবে
পেলব পালিশে ঢাকা কলঙ্করেখা
এ যেন সারিত জীবনের স্বেচ্ছা নির্বাসন
যত্নআত্তি করে নিজেকে নিজেই লুকিয়ে রাখা…
ফসল ফলুক না ফলুক জমিটুকু যত্নে রাখা চাই।
…………………………………………..

সময়হীন

তোমার আকাশে আমার কোনো ছায়া ছিলো না
সময়হীন তোমার কালো চুল—
ধীবরের জালে পড়া চুনো মাছ
কিংবা বুনোহাঁস আটকায় ফাঁদে,

তোমার আকাশে আমার কোনো সময় ছিলো না
ভাবনাহীন তোমার নাভিমূল—
ধরাপরা চারাগাছ
কিংবা নির্জনে বাঁশপাতা কাঁদে,

বস্তুত আমিই সময় এবং ভাবনাহীন।
…………………………………………..

অভিন্নতার স্বপ্ন

দেখো আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম
ভালোবাসার হাতটি তুমি বাড়িয়ে দাও
আমার বুকের চাদর ছিঁড়ে বুক চিতিয়ে আছি
তোমার বুকের তপ্ত ওমে স্নাত হবো

আমরা দুজন একই গাঁয়ের মাটি মেখে
এক পুকুরে চান করেছি—
ঝড় ঝঞ্ঝা বৃষ্টি বাদলে শরীর বিঁধে আছে
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে আমরা মরিনি কেউ
বন্যা খরায় ছিলাম পাশাপাশি
বিভেদের বীজে এখন মানবতার পরাজয়
ঘৃন্য কিছু মানুষ-পশুর অট্টহাসি আকাশচুম্বী

অবিশ্বাসের দাবানল চায় স্বর্গের দখল

হাজার প্রতিবন্ধকতা আসুক
বিপর্যয় ডেকে আনুক কেউ—
শুধু তুমি হাতটি বাড়াও
আমার বুকের স্পন্দন শুনে বলে ওঠো—
:এই তো আমি হাত বাড়ালাম
আমারা এখন নির্ভয়
আমরা মানবতা আমরাই বিশ্বাস
আমরা এক এবং অভিন্ন…
…………………………………………..

আঁতুড়ঘর

পাথরের বিছানায় ঝর্নার ঘরবাড়ি
সেই আশ্রয় গড়িয়ে
ছড়িয়ে পড়ে খাদের গভীরে,
যেখানে বাঘ আর হরিণেরা জল খায়,
ঝর্নার কোনো আপত্তি নেই তাতে
বরং মুক্তির স্বাদ পায়।

তার জল পান করে যখন কোনো শিকারি
সে বিষ হয়ে যেতে চায় কিন্তু পারে না,
শ্যাওলা ধরা বিছানায় ফিরে যেতে চায়
তাও সে পারে না—
ঝর্না শুকিয়ে যেতে চায়, পারে না,
কোনো দেবতা বা দেবদূত আসে না
যে তাকে ফের পবিত্র করে দেবে
নিদেনপক্ষে ফিরিয়ে দেবে পূর্বজন্ম
বরফ শয্যা, আঁতুড়ঘর।
…………………………………………..

রাজপথ

গাছের মতোই আমি কখনো স্থির
কখনো বা ফসিল হৃদয় পুষি
সহিষ্ণু আছি কি বৃক্ষ যেমন?

আমার শরীরে সিন্ধু বয়ে যায়
ছুঁয়ে যাই কখনো আকাশ আনীল
পেরেছি কি পরিধেয় হতে…

সূর্যের মতো আমি জ্বলে উঠি
মেঘের চুলের মতো বুনেছি মন
শিশুর শীত কি পেরেছি নিতে ?

ক্ষান্ত স্বান্ত কখনো ছিলো না
হতবাক আমি বিষ্ণু অবতার
আকাশের রাজপথে চুর্ণি ওড়াই!
…………………………………………..

এমন নরম রাতে

এখন উঠোন ফাঁকা
সকলেই চলে গেছে দ্রুত ঘরমুখো
এখানে একপাশে এঁটো শালপাতা রাখা
একফোঁটা বৃষ্টি নেই, কে জানে এবারও সুকো
হবে কি না!
ঠেলাগাড়িতে পাতা চলে বিষণ্ন মুখে—
বাবা থাকলে বলতে পারতেন কি জানি না
কোন বাতাসে বৃষ্টি থাকে সুখে!

দিগন্তে মেঘ আসা যাওয়া করছে ঘুরে ঘুরে
অনাবৃষ্টির দিনেও হয়ে গেলো ভোজ নির্বিঘ্নে
সুর বাজে ছেঁড়া নোংরা শালপাতার শরীর জুড়ে
শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে রাত্রি কুহরণে

এমন নরম রাতে মনটা ভিজিয়ে দাও
শুকনো শরীর আনুক জন্মলীলার খেলা
যারা পারো যতো খুশি রত্ন কুড়াও
অলীক বর্ষণে মনের মুকুরে বাড়ুক বেলা।
…………………………………………..

আবার আসবো এখানে

আমার ঘরের মধ্যকার মাটি খুঁড়ে
কিছু দুঃখ পুঁতেছিলাম
সেই দুঃখগুলো শব্দ হয়ে
আমার বুকে তিরের মতো বিঁধে আছে

এক নারী গোছা গোছা ফুল নিয়ে
কেমন সহজেই বলেছে, শব্দগুলো মরছে।’
সে কি জানে
এগুলো পৃথিবীর বিখ্যাত কবিতার শব্দ!

কৈশোরের সেই দুঃখ মরেও মরেনি
এই বয়সে সেই নারী নেই
আছে শুধু একগোছা ফুল—

একহাতে ফুল আর অন্যহাতে
বুকে বেঁধা শব্দ নিয়ে
আবার আসবো আমি এখানে।
…………………………………………..

নদী ও নারী

এক নারী এক নদীর সাথেই চলেছিলো
ধূ ধূ চড়ায় সঙ্গী ছিলো চিল
পেত্নী আছে বুকে ভেবে মধ্যনদীর বিল
ভীষণ কেঁদেছিলো

হঠাৎ যদি
বাঁকটি ফেরায় সেই নদী
নগ্ন গায়ে সুপ্ত নারী সাতশত বার
কিশোর থেকে যৌবনে পা বাড়ায়
কমলদিঘি টপকে হাঁটে সবুজ সমুদ্দুর
ঝিনুক বুকে চাঁদকে দেখে সমুদ্র সৈকত

নদীর জলে হরিণচোখা নারীর আবাসভূম
অক্ষি নাকি সাগর হয়ে যায়
নারীর এ সব গোপন কথা নদীই জেনেছিলো
বরং নারী দাঁড়িয়ে আছে
নদীই কেবল হেঁটেছিলো…

নারীর দু চোখ খোলা
এক চোখে তার কান্নাহাসি নদীর আনাগোনা
অন্য চোখে বালির ভিতর মুক্তো খোঁজা…
নদীর আছে সাতশো জোড়া চোখ
কেবল তবু দু চোখে তার দেখা
ভাঙন এবং গড়া—
নারীরা কি এ সব কথা জানে

নারীই প্রথম নদীর প্রেমিকা?
…………………………………………..

বর্ণমালা

অ আ ক খ যুগ যুগ ধরে বসে আছে পাশাপাশি মালা হয়ে
বাল্যের স্মৃতি শৈশবের স্বপ্ন জীবনের প্রণয় দুঃখ সুখ
সবই সেই বর্ণমালায় সাজানো।
দুপাড়েই জেগে থাকে অবিনাশী অক্ষরের আন্তর আকুলতা।

বর্ণমালার সিঁড়ি বেয়ে
চণ্ডীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ
মুকুন্দরাম থেকে নজরুল জীবনানন্দে দৃঢ় হয় জীবনের সন্নিবন্ধ
সরল বর্ণরেখা ছবি হয়ে হৃদয় উন্মোচিত করে
কখনো অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো তীক্ষ্ণ হয়
গড়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা।

তবু বাংলা ভাষার বিপন্নতা কাটেনি
ভাষার সন্তান নিজেকে নিজেই প্রতারিত করছে
মা তুমি এ সব জেনে কি ঝাঁটার ডগায় ঘাতক-কাঁটা সরাও
কিংবা তুমি আরও এক ঊনিশে একুশে চাও ?
কেন তুমি আজও পাহারা দাও স্বপ্নে জাগরণে
ঝর্না হয়ে ঝরে পড়ো তৃষ্ণার বুকে ?

তুমি আমাদের প্রাণ।
তুমি ভালো থেকো পবিত্র বর্ণমালা তবু ভালো থেকো।