আমি ভালো নেই

ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথর
বাচ্চারা মুচকি হাসে
যুবক যুবতিরা করে চোখাচোখি,
সমবয়স্করা বলে আর কেন
অনেক খুঁজেছিস, এবার থামা দে।
বয়স্করা সহানুভূতি দিয়ে বলে
কেন খুঁজিস তারে।

মরিচিকা হয় না বাস্তব।
কিন্তু মন মানে না।
জঙ্গলে, দেবালয়ে ভাঙা মন্দিরে
পোড়ো বাড়িতে, কোথাও রাখিনি বাকি
খুঁজিতে তারে।
দিন, মাস, বছর ঘুরে যায়
পায়নি তারে।
মনে মনে ভাবি কুল পায় না তার,
তবুও খুঁজি।
এখনো পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায়,
মনে তার ভাবান্তর হয়।
বুকের ভেতরে মোচর দিয়ে ওঠে,
নিজেকে রাখতে পারিনা ঠিক।
শ্মশানে বসেও ভাবি
কবে পাব তার দেখা।
শুধু একটি কথা বলার তরে,
এই ভাবে কাটে বেশ কয়েক বছর।
সেদিন ও চাঁদ উঠেছিল আকাশে।
আপন আলোয় আলোকিত হয়ে
দূরে মিটি মিটি হাসে।
বল হরি ধ্বনিতে চারিদিক সমাহিত।
বসে থাকি এক মনে তাকিয়ে নদীর জলে
প্রতিদিনের নিত্য ঘটনা।
দু একটা চেনা মুখ দেখে দাড়িয়ে উঠে,
চমকে উঠে, একি!!
এরই তরে বসে আছি
দুফোটা তপ্তাশ্রু গড়িয়ে পরে চিবুকে।
অপলকে তাকিয়ে থাকি তার দিকে।
পুরানো স্মৃতির রোমন্থনে
বুকের ভিতরের মোচরে ফুটে ওঠে অনেক কিছু।
অনেকটা সময় কেটে যায়।
দেহটা পঞ্চভূতে লীন হতে থাকে
একটু একটু করে।
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি, আকাশে উঠতে থাকা
চিতার শেষ ধোঁয়া টুকুর দিকে।
একফালি সাদা মেঘ চিতার ওপর দিয়ে ভেসে যায়
হঠাৎ চিৎকার করে মেঘ কে বলে উঠি,
ওকে গিয়ে বলো আমি ভালো নেই
সেদিন সুধিয়েছিলো সে
ভালো আছো তো?
তাই বলি আবার ওকে বলো আমি ভালো নেই
…………………………………………..

স্মৃতির ভার

চলে গেল সে, রেখে গেল কিছু স্মৃতি।
দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের পথ চলা একসাথে,
সে কি ভোলা যায় এত সহজে!
তবুও ভুলতে হয় মানুষকে
নইলে জীবন থেমে যাবে। তাকি হয়!
বাস্তব বড় কঠিন, মেনে নিতেই হবে।
নদীর ঢেউ সময় কি কার ও পানে চায়।
সে আপন খেয়ালে চলে।
শাজাহান কি পেরেছিল তাজমহল গড়ে
স্মৃতি দিয়ে শূন্যতাকে বেঁধে রাখতে।
পারেনি।
আমিও পারি না, হেথা ওথা ছড়িয়ে থাকা
স্মৃতির ভার।
ভুলতে চেয়েছি বার বার, পারিনি তা
চেষ্টার কসুর করিনি, হেরে গেছি।
মানুষ কত অসহায়, তার কাছে
বুঝেও বোঝে না, আমিও বুঝিনি।
চোখটা চিক চিক করে ওঠে,
গলাটা ধরে আসে, জানি ফিরবে না, তবুও।
…………………………………………..

নীলকন্ঠ

কত নামে তোমরা ডাকো মোদের
চামেলী, নিশীপদ্ম, রাতের রজনীগন্ধা
আরো কত কি।
কোনদিন ভেবেছ কি আমাদের নিয়ে?
না ভাবনি, তাই না?
গালভরা আদূরে কথা, ফাঁকা বুলি
আর কিছু নয়।
এই কথাটা ভুলে গেছ তোমারা
আমরাও মানুষ, কারোর বোন,
মেয়ে কিম্বা ঘরণী ছিলাম।
সমাজের পাক উদ্ধার করতে
জীবনটাই হয়ে গেল শেষ।
আমরা আছি তাই মা, বোনেরা নিরাপদ।
নীলকন্ঠ বলেনা আমাদের কেউ,
বুঝতেও পারিনা ঠিক।
সবার মাঝে ঘৃনা করে, রাতে আদর করে কাছে টানে।
ঘর থেকে ওপারে গেলেই সবাই ভদ্রলোক।
তাই না?
…………………………………………..

ব্যথা

সংকেতটা এসেছিল অনেকদিন
কিন্তু বলতে পারিনি কোনদিন।
তিল তিল করে শেষ করেছিল নিজেকে।
কিন্তু কেন? সে অনেক কথা
বুকভরা ব্যথা।

শুনবে তোমরা? বল শুনবো
বিশ্বাস হবে তো?
সে তো আমাদের ব্যাপার
শুরু কর, শোনা যাক
আমি ছিলাম একমাত্র রোজগেরে।
যে রোগ হয়ে ছিল তার ব্যায়ভার আমার সাধ্যতীত। মারণ রোগ!!
তখন তেমন চিকিৎসাও ছিল না।
অনেক ভেবে তাই লুকিয়ে ছিলাম,
সংসারের মুখ চেয়ে,
ছেলের জন্য বিশেষ করে।
এর কয়েক বছর পর রোজগার করতে শুরু করে সে
ভাবলাম, চিন্তা নেই আর
নিশ্চিন্তে যেতে পারব এবার।
বিধাতার কি করুণ বিচার।
রক্তের দাগের চেয়ে জলের আলপনা
স্থায়ী হল।
হঠাৎ বদলি হয়ে চলে গেল বৌ নিয়ে।
বুঝতে হলো না অসুবিধে, কিসের জন্য।
রমলা কেদে ফেললো,
এর জন্য এত স্বার্থে ত্যাগ তোমার।
শেষের সেদিন শুধু হেসেছিলাম
বলতে পারিনি কিছু,
দীর্ঘশ্বাসে চুপি চুপি বলেছিলাম সন্তান যে আমার।
আস্তে আস্তে চোখ দুটো বুজে এল
মহাপ্রস্থানের পথে।
…………………………………………..

অভিমান

নীহারিকা উদাস ভাবে তাকিয়ে থাকে দূরের পানে
ঐ নীল আকাশের দিকে
মনটা হঠাৎ আরও উদাস হয়ে যায়।
হিসেব চায়না মিলতে
জটিল অঙ্ক, গুলিয়ে যায় সব।
কেন এমন হল
আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে মনে মনে।
সনৎ আসে হঠাৎ, একি মা;
তোমার চোখে জল।
ও কিছু নয়, কিছু পরেছে হয়ত।
লুকিয়েও পারে না লুকতে
ছোট খোকা, আজ এত তাড়াতাড়ি!!
সনৎ হাসে মনে মনে, কথা ঘোরতে চায় মা।
কেন এমন হয় বলতে পারিস?
হঠাৎ আত্মজ পর হয়ে যায় কেন?
উনি বলতেন বাস্তব, বড় কঠিন নীহারিকা।
অত বড় বড় কথা পারিনি বুঝতে সেদিন।
থাক ওসব কথা,
না বলতে দে আজ, বড় খোকা এমন কেন হল?
বৌমাতো খুউব ভালো।
না মা, দাদাও ভালো।
তোমার কি কোথাও অসুবিধে হচ্ছে?
ছি ছি তা কেন।
কাকলি তো তিন বাড়ি করত আগে।
এখন করে পাঁচ বাড়ি,
আমিও রোজগারের কাজে যাই।
বাবলু ছুটে এসে ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে।
বাবা ঠাম্মাকে বকেছ নাকি?
না না কেউ বকেনি ঠাম্মা কে।
তবে চোখে জল কেন?
আদরে আদরে ভরিয়ে দেয় বাবলু।
বড় খোকা তোর মত নয় কেন?
হাতের পাঁচটা আঙ্গুল কি সমান?
মনে মনে অনেক ভাবে নীহারিকা।
ওদিকে অপার ভৈভব, কিন্তু অশান্তির চোরাস্রোত ।
এদিকে অপার শান্তি।
ছোটখোকা তুই যদি ছেলে না হতিস
তবে একবার প্রণাম করতাম।
নারে রে, মনে মনে এটাই ভবি এখন।
রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়
ঘুম নেমে আসে দু চোখে
পাখির কলতান, নতুন সকাল
প্রতিদিনের মত বাবলু ডেকেই চলে
চিৎকারে সবাই এসে পরে।
চলে গেল নীহারিকা, একরাশ
বুকভরা ব্যথা অভিমান নিয়ে
…………………………………………..

ভেবেদেখো

আমার চলার পথে, বাধা দাও কেন তোমরা?
নিজের ক্ষতি নিজেরাই আন টেনে
বুঝতে পারনা তোমরা? নাকি ক্ষুদ্র স্বার্থর জন্য
বুঝেও বোঝ না।
কি বলতে চাইছি আমি,
বাড়ি ঘর দোকান আরও কত কি
দিনের পর দিন আরও কত কি গড়ে ওঠে দুধারে
নিরূপায় হয়ে মাঝে মাঝে রুদ্ররূপ ধরে
দুকুল ছাপিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাই সব কিছু।
তখন হিসাবে কষ লাভ ক্ষতির।
কতিপয় স্বার্থান্বেষের জন্য
ক্ষতি হয় কত লোকের, সর্বনাশ ডেকে আন তোমারা।
এখনো সময় আছে, থাম এবার।
…………………………………………..

একুশ বার

শিক্ষিত মন পারেনি মেনে নিতে এই সব।
অনেক বোঝানোর পর বাবার মুখ চেয়ে
রাজি হয় সে।
মা হারা সংসার কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা।
ছোট দুটো ভাই বোন
ভাবে মনে মনে একবার
হিসেব পারেনি মেলাতে
অনেক কঠিন অঙ্ক এযে
প্রতিবারের মত সেজে গুজে
পরিপাটি হয়ে হাসিমুখে
বসেছিল অভ্যাগতদের সামনে।
খুটিয়ে খুটিয়ে কি দেখছিল,
তা তারাই জানে সবচেয়ে ভালো।
প্রশ্ন আসে একে একে
কি কি পারি করতে, কোনটা লাগে ভালো
সুযোগ এলে চাকরি করবে নাকি?
ভেতরটা জ্বলে যায়।
এরই মাঝে ছোট ভাই বোন দুটি
থালা ভরা মিষ্টি নোনতা নিয়ে
লোলুপ দৃষ্টিতে অভ্যাগতদের সামনে রাখে।
চোখ এড়ায় না তার, বাবার সে কি হাসি মুখ,
আপ্যায়নের রাখেনি কোন খামতি।
কষ্ট ও হয়, আবার হাসে মনে মনে

সাত কাহনে মেয়ের গুনগান বুকটা হয় চওড়া ।
বুঝতে পারে নীলিমা,
কষ্টেও ঠোঁটের কোনে হাসি খেলে যায়।
কন্যাদায় গ্ৰস্থ পিতার কি করুণ পরিহাস

ভাই বোন দুটো বোঝে না এসবের মাথা মুণ্ড।
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে খাবারের দিকে।
ভগ্নাংশ যদি কিছু পায়, চিলের মত,
ছো দিয়ে তুলে নেবে।
মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে।
শুনে বাবার সেকি পরিতৃপ্ত হাসি।
এই প্রথমবার এ কথা শুনছে, একুশবারে।
মনে মনে হাসে আমাকে ভেতরে যেতে বলে।
আড়াল থেকে শুনছে সব কিছু।
রং একটু পরিষ্কার হলে ভালো হত,
সে যাই হক।
খোলস ছাড়ে এক এক করে
চাহিদার ফর্দ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।
হাসিমুখে ঢোক গিলে বলে, ওসবের চিন্তা
করবেন না, শুনে জ্বলে ওঠে আন্তরাত্মা।
ছিটকে ঘরে ঢুকে বলে, বাজারের পণ্য নাকি,
অবাক বিস্ময়ে সববাই তাকিয়ে থাকে, যে যার ফিকে
অসহায় বাবার সে কি করুণ দৃষ্টি।
তবে কেন শিখিয়েছিলে লেখাপড়া?
এসব মেনে নিতে চায়না মন, আসুন আপনারা।
সেদিন বাবা মেয়ে ঘুমতে পারেনি কিছুতেই।
তবে ওরা পেরেছিল ঘুমতে, অকাতরে
ছোট ভাই বোন দুটি।
…………………………………………..

সোচ্চার

প্রতিবাদী ভাষা মানেনি কোন বাঁধা
জমে থাকা ক্ষোভ উগরে এসেছিল।
জনজাগরণের জনপ্লাবন রুখতে পারেনি তারা।
ফাঁকা আওয়াজ, সস্তার বুলি, প্রতিশরুতির বন্যা
এতে আর কতদিন ভোলাবে মোদের?
ভিসুভিয়াসের তরল লাভার মত উগরে দিয়েছিল সে।
জনসেবা? সে তো ভাল কথা, কেউ করেনি বারন
এসো তবে আমাদের সাথে, হাতে হাত
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ট্রামে বাসে বাদুর ঝোলা হয়ে
দেখিনা কেন তোমাদের? কিংবা ট্রেনের সাধারণ
শ্রেণীতে।
দেশের, দশের সেবায় নেই দলের প্রয়োজন।
মোদের সাথে মোদের মত হয়ে মিশে দেখ,
সবাই আপ্লুত নয়নে কাছে টেনে নেবে।
একটু পেছিয়ে যাও, ইতিহাস ঘেঁটে দ্যাখ,
তখন এসেছিল যারা, তাদের জন্য এখনও
চিক চিক করে চোখ দুটো
প্রচারের জৌলুস দরকার হয়নি তাদের।
ওরা পেরেছিল, সব কিছু ছেড়ে কাছে আসতে, আত্ম বলিদান নিতান্তই জলভাত ছিল
তাদের কাছে।
তাই বলি তোমাদের, কথাটা মনে ধরেছে কি?
তা তোমারাই জান, শুধু ভাবি আর দেখি
নেতারা হল স্ফীতকায়, প্রজারা হল ক্ষীণকায়।
কত কোটি মানুষের পাতে পিয়াজ টুকুও জোটেনা এখনও, হিসেব রেখেছ কি কোনদিন?
পঞ্চ ব্যঞ্জনের উদগারে পরিতৃপ্ত ঢেকুরে
চাপা পড়ে যায়
ওদের না পাওয়ার কান্না।
…………………………………………..

বিষয়ের বিষ

খবরটা ছুটে এসে দিয়েছিল প্রতিবেশী একজন।
চকিতে ছুটেছিল পরিতোষ
অনিমেষের বাড়ি।
ছোটবেলার বন্ধুত্ত দুজনের,
ছিয়াত্তর বছরের বন্ধন।
পাখির কলকাকলিতে ফোটে ভোরের আলো
এতো! দেখি সব শেষ।
শরীরটা ঝুলছে পাখার সাথে,
ঘাড়টা নুজ্ঝ্য জিভটা বেরিয়ে,
শেষ বেলা কষ্ট পেয়েছে খুব মনে হয়।
মনে মনে ভেবে শুকনো হেসে নিজেকে সামলায়।
এক এক করে পাড়ার সবাই আসে
বুকভরা চাপা দীর্ঘশ্বাস, বলার কিছু নেই
নিস্তব্ধতা ভাঙে পরিতোষ।
এটাই হবার ছিল, তাইই হল।
বিপদে আপদে ছায়ার মত ছিল দুজনে।
পাড়ার সবাই বলে এই হল বন্ধুত্ব।
অনিমেষের একই ছেলে, থাকেনা খুব দূ্রে
বড় জোর একশ মাইল দূরে।
হয়ত কোন শুভাকাঙ্ক্ষী খবরটা দিয়েছিল ফোনে।
তিন ঘন্টার মধ্যেই এসে পরে প্ৰানতোষ
ছেলে বৌয়ের সাথে।
বুক ভরা কান্না চোখ ভরা জল, সে কি চিৎকার।
মনে মনে হাসে পরিতোষ
একেই বলে কুমীরাশ্রু।
পুলিশ আসে, দেহটা নামিয়ে রাখে কিছুক্ষণ, সকলের তরে।
কোনদিনই রাখেনি বাবার কোন খোঁজ,
তবে আজ কেন এত আঁখিজল?
সবজন হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ,
প্রতিবেশীরা ক্ষোভে ফোঁসে,
হিসেবটা মেলাতে থাকে পরিতোষ,
কম তো রেখে যায়নি অনিমেষ।
স্থাবর অস্থাবর মিলিয়ে তা হবে
দু কোটির মত।

দিন পনের পর পাড়ার সবাই আসে,
পরিতোষ বলে প্রানতোষে, এবার এস তুমি।
করেছ অনেক তুমি এটা জানে সবাই।
গর্জে ওঠে, প্রানতোষ প্রচন্ড চিৎকারে।
হ্যাঁ এস, শব্দটা হয়েছিল একটু বেশীই গম্ভীর।
এ সব কিছুই আমার!
একসাথে গর্জে উঠে ছিল সবাই, তোমার!
ইশারায় সবাইকে থামায় সে
হ্যাঁ আমার, আমারই।
তোমার নয়, এসবের মালিক রামকৃষ্ণ আশ্রম।
থানা, প্রশাসন, পাড়ার কিছু লোক
এরা সবাই সাক্ষী, এই যে দলিল,
উনি ঠিকই বলছেন, একসাথে বলে ওঠে সবাই।
এবার এস তবে, করনা সময় নষ্ট।
আর দাঁড়ায় না সে।
…………………………………………..

জন্মান্তরের ভালোবাসা

জন্ম থেকেই ছেলেটা, দেখতে ভীষণ মায়াবী
আধো আধো বোলে অনেক কিছুই বলে সে
বাবা মা হেসেই খুন। একটু বড় হলে
অন্য কথা কয়, প্রথম প্রথম বিশেষ
দিত না আধিক্য, কিছুদিন পরে বলে, নাম আমার অভিষেক, তোমরা নও
আমার কেউ। বার বার এক ই কথা বলে
কেমন যেন হয়ে যায় অন্যমনস্ক,
বাচ্চার পরিপক্কতায় অবাক হয় সবাই।
ডাক্তার, বৈদ্য, ঝাড়, ফুঁক রাখেনি কিছু বাকি
শেষে এক বিশেষজ্ঞ বলে, এ জাতিশ্বর
প্রথম বাবা মা শুনে ভাবে এও কি সম্বভ!
স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজ, সেখানেও
একই পুনরাবৃত্তি। সহপাঠীরা বলে,
মাঝে মাঝে কোন জগতে পাড়ি দিস?
একদিন এক ভালো লাগা বন্ধুকে বলে,
শোন মন দিয়ে আমার আসল বাড়ি বাকুড়ায়।
সে কি! সত্যি বলছি, যখন শুয়ে থাকি
চোখের সামনে ভেসে ওঠে সব কিছু।
সেই খেলার মাঠ, ভাঙা মন্দির, চন্ডিতলা
মা বাবা ভাই বোন এর ছবি ও আর একজন।
তাদের কথা পড়লে মনে, মনটা উদাস হয়ে যায়।
নিয়ে যাবি সেখানে একদিন। যাব, তবে এখন নয়।
বিধাতার কি করুণ পরিহাস,
শশীকলার মত বাড়তে থাকে মিঠু,
একবার দেখলে চোখ ফেরান দায়।
কত ই বা বয়স, বড় জোর চোদ্দ কি পনের।
শরীরের নিপাট বুনন, হাসলে যেন পূর্ণিমার চাঁদ
মাটিতে পড়ছে লুটিয়ে।
নিভৃতে গড়েছে তারে কোন বিধাতা,
প্রশ্ন জাগে মনে মনে।
এত নিখুঁত! চাঁদে কলঙ্ক আছে জানি
এ যেন ব্যাতিক্রমের ব্যতিক্রম
কেমন উদাস হয়ে যায় মাঝে মাঝে,
মায়ের চোখ এড়ায় না কোন কিছু।
শুধায় তারে, কি ভাবিস মনে মনে?
হেসে হালকা করে বলে ও কিছু নয়।
সময় থামে না, তাকে ধরা যায় কি?
বেশ কিছু দিন পরে, একদিন সন্ধ্যাবেলায়
মার কোলে মুখ গুজে, বলে ওঠে মিঠু

জানতে চেয়েছ বহুবার, তাই না মা?
সময় হয়েছে আজ জানাবার,
মা হেসে শুধায় কি জানাবি তুই?
আমার গত জনমের পরিচয়।
মায়ের মন ছলাৎ করে ওঠে, আগের জনম!
কোনদিন শুনিনি তো কিছু।
শাবিনা খাতুন, বাঁকুড়ায় বাড়ি মোর,
এক ই মেয়ে আমি বড় আদরের,
বলেই, আকাশের দিকে কেমন ফ্যাল ফ্যাল ভাবে তাকিয়ে থাকে।
মায়ের মন সাত পাঁচ, আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে।
মিঠু বলতে থাকে, নিয়ে যাবে আমাকে
সেই গাঁয়ে, যেখানে আমার সাথীকে,
আমাকে একসাথে বেঁধে শুইয়ে ছিল
জলন্ত চিতায়। আতকে ওঠে মা!
ভয় পেও না, এটাই সত্যিই।
নিয়ে যদি যাও যাব, নৈলে একাই যাব।
কথা ঘুরিয়ে মা বলে যাব নিয়ে, এখন নীচে চল।
এদিকে মনটা চঞল হয়ে ওঠে,
কার তরে বার বার চোখ দুটি ঘোরে ফেরে?
মনটা আজ উরু উরু, কেন জানেনা সে,

সেই মাঠ সেই ধানক্ষেত বার বার মন ছুটে
যেতে চায় সেথায়।
তবে কিসের বাঁধা অভিষেক, শুধায় অরূপ।
শুনবি তবে? হ্যাঁ শুনব।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। মনের গোপন গহনে
কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছে যে আজ।
দুজনে বেড়িয়ে পরে, কারো মুখে কথা নেই।
এক পলক তাকে দেখার জন্য ভেতরটা
ছটফট করতে থাকে। ছুটে চলে ট্রেন,
দুজনেই চুপচাপ, অজান্তেই এসে পড়ে স্টেশন।
ছুটে চলে গাড়ি সেই ঠিকানায়,
যেখানে ফেলে এসেছিল স্মৃতির ভার।
ভোরের আলো ফুটছে পাখির কলতানে
মন বীনার তারে জাগে সুরের মূর্ছনা।
আন্দোলিত হৃদয়ে হেঁটে চলে,
তুমি বলেছিলে নিয়ে যাবে, চল আজি তবে
কোন বাঁধাই হবেনা মোর পথের কাঁটা,
হার মানে, বেড়িয়ে পরে মা বাবা।
সে কি অমোঘ আকর্ষণ,
যাক রসাতলে সব কিছু, শুধু একটিবার
যেন দেখা পাই তার।
মনের অলিন্দে অন্য এক অনুভূতি,
যার হয় সেইই বোঝে অন্য কেউ নয়।
গায়ের মেঠো পথে চলে তিনজনে,
কত পরিচিত সেই পথ ভেসে ওঠে ফেলে
আসা স্মৃতি।চলতি পথের দু একজন
পাশ দিয়ে যেতে যেতে তাকিয়ে থাকে
অবাক বিস্ময়ে!
দিন শেষে সন্ধ্যা নামে, পরিচিত পথ,
পূর্ণিমার চাঁদ যেন হেসে লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। কি যেন বলতে চায় সে,
কেউ না বুঝলেও বোঝে দুটি মন।
সেই ভাঙা মন্দির, পরিচিত আল পথ,
তরতরিয়ে ছুটে চলে মিঠু, পিছনে বাবা মা।

পূর্ণিমার পূজা, কাসর ঘন্টা থাকে বাজতে
মিঠুকে দেখে পরিচিত বয়স্করা আঁতকে ওঠে।
এও কি সম্ভব! অস্ফুটে বলে ওঠে
কয়েকজন সাবানা না!
সেই দুটি চোখ দেখিবার তরে
তৃষিত নয়ন বারে বারে ফেরে
রাখতে পারেনা নিজেকে ঠিক
ভেসে ভেসে ওঠে সেই মুখখানি।
ছুটে চলে দুটি মন দুর্বার গতিতে।
সেদিন ও ছিল পূর্ণিমার সন্ধ্যা।
কুচক্রীরা মিলে দুটি প্ৰাণ কেড়েছিল
চিতার আগুনে।
মন্দিরে ঢুকেই তাকিয়ে থাকে দুজন দুজনের দিকে। অবাক বিস্ময়!
সমস্বরে বলে ওঠে সাবানা না!
তোরা আবার!!
চিৎকারে ফাটিয়ে তোলে দুজনে
হ্যাঁ, আমরা এসেছি আবার এই পৃথিবীতে।
হার মানে সবাই, দুটি তৃষিত মনের কাছে
নত মস্তকে।
বিধাতার দান এর পরে নেই কারো অধিকার
বিচারের তরে।
মিলিত হয় দুটি তৃষিত হৃদয়।
মা বাবা অপলকে তাকিয়ে থাকে।
একদিন যেথা ভিজেছিল মাটি রক্তর হোলিতে
আজ সেথা ভিজিল মাটি অনন্দাশ্রুতে।
মুছে গেল জাতের নামে বদজাতি সব।
যারা ফেলছিল একদিন চিতায়,
তারা হার মানে ভালোবাসার কাছে।
সেই পূর্ণিমার সন্ধ্যায় সিঁদুরের রক্তে
সিঁথি রাঙিয়ে দিল সে।
উলু শঙ্খ ধ্বনিতে মুখরিত চারিদিক
সে এক আবেগঘন মুহূর্ত।
অপ্রকাশনিয় ভাষায় নিবেদিত দুটি প্রাণ
দুজনের তরে।
ছুটে আসে বহুজন দেখিবার তরে।
মনে মনে চেয়েছিল ক্ষমা সেদিনের নিষ্ঠুর আঘাতে।
ভেজা চোখে আশিষ মেগেছিলো,
বিধাতার কাছে।