সাংবাদিকের কাজ ছিলো দেখা আর লেখা। পড়া এবং বিশ্লেষণ করে সারকথা বের করে তার উপর নিবন্ধ করা। কনস্টিটিউশনাল জার্নালিজম বা সংবিধানের উপর সাংবাদিকতা করার একটি ঝোঁক থেকেই পাড়ি জমিয়েছিলাম জার্মানে। টিন বেইঅরন একজন বিখ্যাত শিক্ষক। একসময় তিনি পাকিস্তান সফরে এসে সে সময়ের পূর্বপাকিস্তান আজকের বাংলাদেশেও এসেছিলেন। তার লেখা বই চড়ষরঃরপধষ ঔঁৎহধষরংস সাংবাদিকতার একটি দর্শনশাস্ত্র হিসেবে উন্নত বিশ্বে সমাদৃত আছে এবং থাকবে। আমাদের দেশেও অনেকেই হয়তো সে বইটি পড়ে থাকবেন। দুই পর্বের বইটির প্রথম পর্বটির সূচনায় লেখা আছে, ‘সাংবাদিকের রাজনীতি জানতে হবে; কিন্তু রাজনীতি করতে হবে না। সাংবাদিকরা দেখবে, বুঝবে এবং লিখবে।’
সময় পার হয়ে গেছে। আজকে যদি টিন স্যার বেঁচে থাকতেন এবং বাংলাদেশ ঘুরে যেতেন তাহলে বুঝতেন, তিনি কতো ভুল কথা লিখে গেছেন। বাংলাদেশে সত্যিকারার্থে সেই দর্শনের কোনো সাংবাদিক এখন আছে- এটা স্পষ্ট করে বলা মুষ্কিল।
আদর্শিক পেশার কর্মী হিসেবে যে দু’চারজন প্রবীণ এবং নবীনের প্রচেষ্টা দেখা যায়, তাদেরকে খুঁজে নিতে হয় অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে। ঘটনার সত্যতা, ঘটনার বিশ্লেষণ এবং ঘটনার উপস্থাপনা কোনো না কোনো পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে। এই পক্ষ হলো রাজনীতির, পরিবেশের, অর্থনীতির, জীবনের, ধর্মের এবং ঘটনাপ্রবাহের।
কোনো না কোনো পক্ষে সংবাদপত্রের উপস্থাপনা চলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সকল পক্ষকে রাজনীতি দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে অথবা রাজনীতির শিরোনামে তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে- এমন নষ্ট ভাবনার দেশ হয়ে গেছে বাংলাদেশ। এখন আর এখানে মুক্ত সাংবাদিকতার সুস্থ কোনো পরিবেশ দৃশ্যমান হয় না। ধর্মের কথা বললেও দোষ, জীবনের কথা বললেও দোষ। শিক্ষার কথা বললে আস্তিক অথবা নাস্তিক, দেশের কথা বললে দালাল আর রাজনীতির কথা বললে লেজুড়বৃত্তিতা।
কারণে অকারণে আমরা কোনো না কোনো পক্ষের লেখক হয়ে গেছি। হয়ে গেছি সাংবাদিক। আমাদের কাছে এখন লেখার চেয়ে বলার বিষয়টিই মুখ্য হয়ে গেছে। এখন আর সংবাদপত্র পড়তে হয় না। দেশের নামিদামি, প্রবীণ-নবীন সব সাংবাদিকই এখন রাতের বেলায়, দিনের বেলায় এবং সন্ধ্যাবেলায় টিভি-চ্যানেলে বসে তাদের সংবাদজ্ঞান বিতরণ করেন নানান বাচনভঙ্গিতে।
দুই মতের দুই সাংবাদিক, দুই মতের দুই সম্পাদক, দুই মতের দুই মালিক প্রতিদিনই টেলিভিশনের টকশো’তে তাদের উপস্থাপনা ভালো লাগুক আর না-ই লাগুক, সঠিক বলুক আর না-ই বলুক, তথ্যবহুল হোক আর তথ্য ছাড়া হোক, সত্য হোক অথবা মিথ্যা হোক- আপন মতের উপর আশ্বস্ত হয়ে গলাবাজির মাধ্যমে এক নষ্ট প্রতিযোগিতা দর্শকশ্রোতাকে দেখতে ও শুনতে হচ্ছে। টকশো এখন বাংলাদেশের জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান।
এখানে সাংবাদিকতার আদর্শ বা অনাদর্শের কোনো বালাই নেই। সেনাবাহিনীতে কিছুদিন চাকরি করে টকশো’তে নামের নিচে লেখা থাকে সামরিক বিশেষজ্ঞ। জীবনে একটিও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংবাদ ও কলাম লিখেনি- এমন সব সাংবাদিকের নামের নিচে লেখা রাজনীতি বিশ্লেষক, লেখা থাকে গবেষক, লেখা থাকে বিশেষজ্ঞ, লেখা থাকে বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক জাতীয় বিভিন্ন স্বপ্রতিষ্ঠিত পদবি।
এখন সাংবাদিকের কাজ লেখার চেয়ে মনে হয় বলাটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যখন স্বাভাবিক কোনো অনুষ্ঠানে যান, সেখানে লেখা হয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। সবার নামধাম উপস্থাপন করে লেখাটিকে বড় করা সঙ্গত মনে করলাম না। তাছাড়া আমি নিজেও টকশো’তে যাই না- এ কথা সঠিক নয়। তবে গত চার বছর রাজনীতির বিতর্কিত ধারায় পরিচালিত কোনো টকশো’তে আমি না যেতে পেরে নিজেকে খুব সুস্থ বোধ করছি। নিকটসময়ে টকশো’ আলোচক নামে দুটি সমিতিও বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দ্রুত ঐ সংগঠনের নেতারা ঐ সাংগঠনিক পরিচয়ে টকশো’তে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি সময়ের ব্যাপার মাত্র।
অনলাইন সংবাদপত্র, টেলিভিশন সাংবাদিকতা সমান্তরালে চলতে গিয়ে প্রিন্টমিডিয়ার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই অধিকাংশ সংবাদপত্র। হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা প্রচারসংখ্যা অনেক হলেও লোকসংখ্যা আনুপাতিক হারকে আমাদের পত্র-পত্রিকা কখনই স্পর্শ করতে পারেনি।
বলা হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন মত প্রকাশের দেশ। এটা যারা বলেন, তারাই সাংবাদিকের বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে বহুধারায় বিভক্ত করে রেখেছেন। এখনো বাংলাদেশে সাংবাদিক কারাগারে আছে, সম্পাদক আছে রিমান্ডে। টিভি-চ্যানেল বন্ধ আছে একাধিক। উল্লেখযোগ্য পত্রিকা সরকারের ঘোষণায় বন্ধ না থাকলেও মৃত এবং মৃতপ্রায়ের সংখ্যা দু’শ ছাড়িয়ে যাবে। কিছু আছে, দৈনিক পত্রিকা বের হয় সাত আট দিন পর পর। সাপ্তাহিক বের হয় মাসে একটি। বাকিগুলো না-ই বা বললাম। তারপরও প্রায় প্রতিমাসে একটি দুটি সংবাদপত্র প্রকাশের ছাড়পত্র স্বস্ব জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে আসছে বিভিন্নভাবে।
এদেশে ঘুষ ছাড়া যেমন পুলিশ চলে না ঠিক তেমনি জেলাপ্রশাসকের অফিসে গোয়েন্দা সংস্থার দফতরে ঘুষ না দিলে পত্রিকা প্রকাশের ছাড়পত্রও পাওয়া যায় না। নানান জটিলতার মধ্যে সত্যাশ্রয়ী একটি দৈনিক নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া একটি কঠিন কাজ। সরকারদল সমর্থিত পত্রিকা জনকণ্ঠ নাকি নয় মাস সাংবাদিকদের বেতন দিচ্ছে না। পেশাদার একজন সাংবাদিকের কাছে এই সংবাদটি যে কতোটা দুঃখজনক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ পত্রিকাটি প্রতিদিন বেরুচ্ছে এবং কিছু না কিছু লোক তা নিয়মিত পড়ছে। শত শত জেলা ও থানা প্রতিনিধি এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র শখের বশে সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে স্থানীয় সংবাদ পাঠায় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিয়েই স্থানিকভাবে ঘুরে বেড়ায়। সংবাদপত্রের উন্নয়নের নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে। মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানই হলো সরকারসমর্থিত সাংবাদিক। যারা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষিত না হলেও দলীয় তোষামুদে ডক্টরেট। দেশের বৃহত্তম সংবাদ সংস্থাটি অহেতুক সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কতোগুলো অথর্ব লোকদের পেশাস্থান হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
সরকারের সাংবাদিক নেতাদের লালন-পালন করার সংবাদ সংস্থাটি এখন অলাভজনক সংবাদ সংস্থাই নয়; এটি শুধুমাত্র একটি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আড্ডাখানা। কথাগুলো সময়ের বিবেচনায় উপস্থাপন করলাম কোনো হতাশা থেকে নয়; আগামী সুন্দর চিন্তায়, নবীন-প্রবীণ সাংবাদিক অর্থাৎ যারা প্রকৃতার্থেই সাংবাদিক; টকশো’মার্কা সাংবাদিক নয়, দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নের জিন্দাবাদ বা জয়বাংলা মার্কা সাংবাদিক নয়, পরিচয়পত্রধারী সংবাদকর্মী নয়- এমনসব সাংবাদিকরা যদি আজকের এ সময়কে যথার্থ মূল্যায়ন করতে না পারেন, সাংবাদিকতার নীতি ও আদর্শবর্জিত মানুষগুলোকে যদি সাংবাদিকতা থেকে বের করে ঐ লোকগুলোকে তাদের চারিত্রিক পেশায় পাঠিয়ে দিতে না পারেন- আগামী সময় তা হলে হয়ে যাবে বড় দুঃসময়। এই পেশার প্রতিটি দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যাবে বিকাশের পথ খুঁজে না পাওয়ায়।
ভোরের সময়। একটি দৈনিক পত্রিকার নাম। চার বছর নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে সত্যাশ্রয়ী একটি পত্রিকা হিসেবে। এর বিকাশ বা কর্মপ্রয়াস কখনই সহজতর ছিলো না। আগামী সময়ে থাকবে না- এটা আমি মনে করি না। একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু হলেই আমার খুব ভালো লাগে। ভাবি, সংখ্যা কম হলেও কয়েকজন পেশাজীবী মানুষ হয়তো একে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে পারবে। দেশের রাজনীতি এখন পুরোটাই দুর্নীতির চাদরে ঢাকা। এর মধ্য থেকে যদি সত্যাশ্রয়ী কোনো মানুষ সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তখন আমার খুশি না হওয়ার কোনো কারণ থাকে না। অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বাঙালি পাঠকদের কাছে যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ঠিক তেমনি ইংরেজি এবং আরবি জানা পাঠকরাও বিদেশে বসে এই পত্রিকাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পাঠ করছে। জেনে নিচ্ছে, বাংলাদেশের খবর। কোনো কোনো কাগজ এই তিনটি ভাষা ছাড়াও অন্য ভাষাতেও ভার্সন ব্যবস্থা করেছে। এই ব্যাপক প্রসারিত গণমাধ্যমটির কোনো নীতিমালা এদেশে নেই। এদেশে সাংবাদিকরা সংবাদপত্রের মালিক হতে পারে না। টেভিচ্যানেলের মালিকানা পায় না। যে দু’একটি পায়, সেটি হয় আঁতুড়ঘরেই মারা যায়, নয় তো বা খুব কষ্টসহ্য করে চলে। এদের আগামী চলার পথ হবে কুসুমাস্তীর্ণ। তবে এ কথা সত্য যে, অসুস্থ রাজনীতিতে সুস্থ গণমাধ্যম যেমন আশা করা যায় না, ঠিক তেমনি অসুস্থ সাংবাদিকতা এবং নীতি বর্জিত সংবাদমাধ্যম দিয়ে সুস্থ রাজনীতি, সমাজ ও দেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।