“খালাম্মা আমাকে আপনার কাছে রেখে দেন। আমি এ বাড়ি থেকে আর কোথাও যাবো না।” এ কথা বলে শিহাবের মাকে জড়িয়ে ধরে রুনু খুব কান্না শুরু করে দিল।

মনোয়ারা বেগম (শিহাবের মা) একটু আশ্চর্যই হলো। ভাবলো-কি হলো মেয়েটার আর এরকম ছেলেমানুষি করার কারণটাই বা কি। তবে এটুকু বুঝলেন যে, মনের কোনো একটা ভাব বহুদিন চেপে রাখতে রাখতে হঠাৎ আবেগের বিস্ফোরণ হয়েছে।

আসলে, শিহাব আর রুনু পরস্পর বন্ধু। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই দু’জনের বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে। দুজনের বাবাই ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়ায় দুই পরিবারের মধ্যে একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ জন্যেই দুই বাড়িতে তাদের অবাধ যাতায়াত। দুজনের মধ্যে সবসময় খুনসুটি লেগেই থাকতো। আবার এত মিল দেখা যেত যে, একজন আরেকজনকে দুদন্ড না দেখলে অস্থিত হয়ে উঠতো। এমনভাবে বড় হয়ে উঠছিল যেন, একজনের উপর আরেকজনের পূর্ণ অধিকার বিরাজমান। পড়ালেখাটাও একই স্কুলে একই ক্লাস থেকে শুরু। শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেওয়ার পর হয়তো বয়ঃসন্ধিজনিত কারণে একটু দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। শিহাবকে দেখে রুনু পালিয়ে যায়। এটা কি লজ্জায় না জড়তায় সে বুঝতে পারে না। আগে যখন তখন যেখানে-সেখানে শিহাব রুনুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। মেলায় যেত। মফস্বলের ঐ মেঠো পথ ধরে একসাথে হেটে বেড়ানো-দৌড়াদৌড়ি করা এসবে কোনো সঙ্কোচ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ দুজনের এই মানসিক পরিবর্তন মনে মনে কেউ মেনে নিতেও পারছে না।

শিহাবের বড় বোনের বাসা জেলা শহরে। একদিন সে রুনুকে বললো- “রুনু, আপার বাসায় যাবো। কয়েক দিন থাকবো। চল্ বেরিয়ে আসি।”
এর আগেও রুনু বেশ কয়েকবার শিহাবের বড় বোনের বাড়ি বেড়াতে গেছে। দুজনে অনেক মজা করেছে। আর সেখানে তো রুনুকে সবাই ভীষণ ভালোবাসে। তাই তারও যেতে খুব ইচ্ছে হলো। তারপরও ভয়ে ভয়ে বললো-
“মা, যদি যেতে দেয় তবে যাবো। কিন্তু আগামীকালই চলে আসবো।”

শিহাব রুনুুর মাকে বলার পর উনি বললেন-
“দেখো বাবা, তোমরা এখন বড় হয়েছ। এভাবে যেখানে সেখানে একসাথে বেড়াতে গেলে লোকে নানা কথা বলবে। তখন মান-সম্মান নিয়ে চলাটাই দায় হবে।”

এ কথায় শিহাব ভীষণ কষ্ট পেল। ভাবলো-রুনুর সাথে আর সে কথাই বলবে না। তাই যাতে দেখা না হয় তাই পুরো গ্রীষ্মের ছুটিটা সে তার বোনের বাড়িতে কাটিয়ে দিলো।

এদিকে প্রায় এক মাস শিহাবকে না দেখতে পেয়ে রুনুর বুকের ভেতরটা কষ্ট ছাপিয়ে উঠলো। মাঝে কয়েকদিন শিহাবের খোঁজে ওর বাড়ি গিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। শিহাবের মা বেশ বুদ্ধিমতি মহিলা। শিহাব আর রুনুর মনের মধ্যে যে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটছে তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না। রুনু দেখতেও বেশ সুন্দরী হয়েছে। তিনি মনে মনে দুজনের মঙ্গল ও পরিণয় কামনা করলেন।

মাসখানেক পর শিহাব বাড়ি এসেও রুনুর সাথে দেখা করতে গেল না। কিন্তু মাকে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো। আর বাড়িতে তার সরব উপস্থিতি বুঝাতে লাগলো। রুনু শিহাবের উপস্থিতি টের পেয়ে খুব দ্রুত চলে এসে খালাম্মা-বলে ডাকতে লাগলো। শিহাবের মা বলেই ফেলল-
“কি আমাকে কি দরকার। ঝগড়া যার সাথে জমিয়ে রেখেছিস তার সাথেই কর।”
রুনু লজ্জা পেয়ে বললো-
“ঠিক আছে, খালাম্মা আমি যাই।”

শিহাবের মা তখনি রুনুর হাত ধরে বললো-
“আরে যাবি কিরে। দুপুরে খেয়ে তারপর যাবি। আচ্ছা! তুই এখন আর আগের মতো আসিস না কেন? তোকে কি কেউ বারণ করেছে নাকি।”

শিহাব এতক্ষণ রুনুকে দেখছিল কিন্তু কিছু বলছিল না। এতক্ষণে বললো-
“মা, ঐ আদরের দুলালীকে ধরে রেখো না। বেশিক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকলে যদি আবার সম্মান যায়।”

শিহাবের মা তখন বললো-
“কি বলছিস এসব। একমাস বাড়িতে না থেকে কাকে কি বলতে হয় তা ভুলে গেছিস নাকি?”
শিহাব আর কিছু বললো না।

দুপুরে একসাথে খেলো কিন্তু কেউ কারো সাথে কোনো কথা বললো না। যাওয়ার সময় শিহাবের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বললো-“তুই মোট এক লক্ষ চার হাজার চারশো সেকে- বাড়ি ছিলি না। পড়াশুনা তো একটুও করিসনি। দেখিস এবার প্রি-টেস্টে আমি তোর থেকে ভালো করবো।”

দু’জনে ক্লাস টেনে পড়ে। শিহাব বরাবরই ক্লাসে ফার্স্ট। রুনু প্রত্যেকবার কয়েক নম্বরের ব্যবধানে সেকে- হয়। শিহাব তখন বললো-
“তুই যদি আমাকে টপকাতে পারিস, তবে তোকে একটা জিনিস দেবো, যা!”

রুনু মুখ ভেংচিয়ে বললো- “মনে থাকে যেন।”

এভাবে চলতে চলতে পরীক্ষা শেষ হলো। রেজাল্টও হলো। শিহাব রুনুকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য ইচ্ছে করেই অংক পরীক্ষায় ৪টা অংক দিল না। এতে করে রুনু শিহাবের থেকে বেশি নম্বর পেয়ে গেল। ক্লাস শেষে একবার আড়চোখে রুনু শিহাবের দিকে তাকিয়ে বাড়ি চলে গেল।

পরদিন খুব ভোরে রুনু শিহাবের রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালো। রুনু বুঝতে পারছে না কেন তার এমন হচ্ছে। সমসময় শিহাবকে দেখতে ইচ্ছে করে, কথা বলতে ইচ্ছে করে। শিহাব কখনো তার জীবনে নেই, এটা ভাবতেও যেন সে ভয় পায়। সারারাত ঘুম হয়নি শুধু শিহাবকে ভেবেছে। ইচ্ছে হচ্ছিল রাতেই দেখা করে। ভোরে আকাশ ফর্সা না হতেই পুরস্কারের ছুতায় শিহাবের রুমের দরজায় টোকা দিল।

শিহাব ঘুম মাখানো কণ্ঠে দরজা খুলে বললো- “কিরে আমার ঘুমের বারোটা না বাজালে তোর হতো না, না?”

রুনু অতি আল্লাদের সুরে হাত বাড়িয়ে বললো- “আমার পুরস্কারটা নিতে এসেছি। এক্ষুনি দে। নইলে সারাদিন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো।”

শিহাব হাত উচিয়ে বললো- “মারবো এক থাপ্পড়। যা এখান থেকে। আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছে।”

এ কথা শুনে রুনু ভীষণ কষ্ট পেলো। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা তার রুমে এসে অনেকক্ষণ কাঁদলো আর ভাবলো সে যেমন শিহাবের জন্য ভাবে, শিহাব কি তার জন্য ভাবে না? তাহলে এমন নিষ্ঠুরভাবে বলতে পারতো না।

রাগে অভিমানে রুনু কয়েকদিন স্কুলেও গেল না, শিহাবের বাড়িতেও গেল না। সেদিন ভোরে রুনুর সাথে যে দুর্ব্যবহার করেছিল শিহাবের সেটা মনেই নেই। সে আগেও রুনুকে অনেক মেরেছে, বকেছে তাই তার কাছে সেই ব্যাপারটাও স্বাভাবিক এবং শিহাব তা ভুলেই গিয়েছে।

হঠাৎ কয়েকদিন দেখতে না পেয়ে শিহাবের রুনুর জন্য ভাবনা হলো। স্কুল থেকে বেরিয়ে সোজা রুনুর বাড়ি গিয়ে তাকে ডাকতে লাগলো। ডাক শুনে রুনুর অভিমান আরও বাড়তে লাগলো। সে শিহাবের সামনে আসলো না। শিহাব রুনুর মাকে জিজ্ঞেস করলো- “কি হয়েছে খালাম্মা। রুনু স্কুলে যায় না কেন?”

রুনুর মা বললো- “জানি না। তুমি ওর সাথে কথা বলে দেখতো। শরীরও তো সুস্থ আছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। কারো সাথে খুব বেশি কথাও বলে না।”

শিহাব রুনুর রুমে গেল। রুনুর মাথাটা ধরে ঝাকুনি দিয়ে বললো-
“কিরে পাগলি, এরকম মুড অফ করে আছিস কেন? ডাকছি, শুনছিস না?”

রুনু শিহাবের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললো-
“আমার মন খারাপ থাকলে তোমার কি যায় আসে।”

শিহাব দেখলো রুনুর চোখ ছলছল করছে। তাই তার নাকে ধরে টান দিয়ে বললোÑ- “অবশ্যই আসে যায়।”

রুনু বললো- “কি?”

শিহাব রুনুর মাথায় একটা আলতো চড় দিয়ে বললো- “তোর মন খারাপ থাকলে আমার দুঃখ আসে আর সুখ চলে যায়, বুঝলি।”

রুনু তখন আদুরে গলায় বললো- “তাহলে ঐদিন অমন করলি কেন?”

এবার শিহাব বুঝলো রুনুর মুড অফ এর কারণ। নিজের কান ধরে বললো-“আচ্ছা, এই অবস্থা! আমার ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দিস।”

রুনুর রাগ এবার একেবারেই চলে গেল। বললো- “ঠিক আছে তুই তো আমাকে কিছু দিলি না। তোর জন্য একটা গিফট আছে।”

এই বলে সে একটা লাল রঙের মাউথ অর্গান বের করে শিহাবের হাতে দিল। আর বললো- “প্রতি পূর্ণিমাতে তুই আমাকে এটা বাজিয়ে শোনাবি।”

শিহাব মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছে কিন্তু তা গোপন রেখে বললো- “পূর্ণিমা তো রাতে হয়। আমি তোকে কীভাবে বাজিয়ে শোনাব।”

রুনু তখন বললো- “সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি তোর সামনে আসলেই তো হলো।”

শিহাব বললো- “ঠিক আছে। তবে আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় যতগুলো পূর্ণিমা আসবে, প্রতিটাতেই এটা সুর দেবে।” এই বলে সে চলে গেল।

এরপর থেকে দুজনের মেলামেশা আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেল। মাঝখানে যে একধরণের জড়তা, সংকোচ সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে তারা বেরিয়ে আসলো। যেন, নতুন করে দুজন দুজনকে চিনতে শিখেছে, জানতে শিখেছে।

দেখতে দেখতে পূর্ণিমা এসে গেল। শিহাব রুনুর কথামতো বাড়ির সামনে এসে মেহগনি আর কৃষ্ণচূড়ার যে বাগানটা আছে সেখানে বসে মাউথ অর্গানে সুর দিতে লাগলো। রাত যত বাড়ছে, চাঁদ তত আলো দিচ্ছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না এসে বাগানে লুকোচুরি খেলছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, রুনু আসছে না। শিহাবও অপেক্ষায় আছে। রাত প্রায় ১টার দিকে আস্তে আস্তে রুনু এসে হাজির হলো। শিহাব ওর দিকে তাকালো। চাঁদের আলোয় রুনুকে অপরূপ লাগছে। এভাবে কখনো দেখেনি তাকে।

হঠাৎ রুনু বলে উঠলো-“বলেছিলাম না আসবো।”

শিহাব আর কিছু না বলে মাউথ অর্গান বাজাতে লাগলো। রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। কারো খেয়াল ছিল না। একসময় শিহাব রুনুুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।

চলতে থাকলো কৈশোরের সেই প্রচ- আকর্ষণে সৃষ্ট অনুভূতির খেলা। এভাবে দুজন খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে এসএসসি পাশ করে এলাকার একটি কলেজেই একই সাথে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলো। এতদিনে তাদের ভালোলাগা পরিপূর্ণতা পেয়ে রূপ নিয়েছে ভালোবাসায়। কেউ কাউকে কখনো মুখ ফুটে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি বলেনি। শুধু অতল সুখের সাগরে ভেলা ভাসিয়ে দুজনে ভাসতে লাগলো।

কিন্তু এ বিশ্ব সংসারে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না। কলেজের এক অনুষ্ঠানে এলাকার আমেরিকা প্রবাসী একটি ছেলে রুনুকে দেখলো। ভালো লেগে গেলো প্রবলভাবে। তাই আর দেরী না করে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালো। প্রতিষ্ঠিত ধনাঢ্য ছেলে পেয়ে রুনুর পরিবার ভীষণ খুশি। বিশেষ করে রুনুর চাচারা এবং মায়ের আগ্রহই বেশী। এদিকে দামি সব গিফট দিয়ে ছেলেটি পরিবারের সবার মন জয় করে ফেলেছে। শুধু রুনুকে টলাতে পারছে না। তার এক কথা, এই মুহূর্তে বিয়ে করা কোনোভাবেই সম্ভব না। রুনুর ইচ্ছা পড়াশুনা শেষ করে সমাজে একটা ভাল জায়গা করে নিয়ে তারপর বিয়ে। আর তাছাড়া রুনুর মতে, তার চেয়ে ১৮ বছরের বড় কোনো লোককে সে তার স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবে না।

কিন্তু আনোয়ার হোসেন নামে ঐ ছেলেটি রুনুর চাচা-চাচাতো ভাই সবাইকে নানারকম লোভ দেখিয়ে একেবারে বশ করে ফেলেছে। যার ফলে রুনুর সিদ্ধান্তের আর কোনো মূল্য রইল না। মান-সম্মানের ভয় দেখিয়ে একরকম জোর করেই রুনুর এনগেজমেন্ট হয়ে গেল আনোয়ার হোসেনের সাথে। ১৫ দিন পরেই বিয়ের দিন পাকা হয়ে গেলো।

ভালো সম্পর্ক হওয়ার কারণে শিহাবের মাকে সবকিছুতেই ডেকে আনা হয়। তিনি শুধু মুখ বুজে সব দেখে যান, কিছুই বলতে পারেননি কারণ তার ছেলে তো রুনুর হবু বরের তুলনায় কিছুই না। কোন মুখে ছেলের কথা বলবেন। এদিকে শিহাবেরও একই অবস্থা। সে না পারছে কিছু বলতে, না পারছে সইতে। মনের সমস্ত কষ্ট চাপা দিয়ে সবার সামনে শুধু অভিনয় করে যাচ্ছে।

বিয়ের ঠিক ৩দিন আগে পূর্ণিমা। শিহাব ভাবলো এবার সুর তোলা ঠিক হবে না। রুনু আসলে ওর ক্ষতি হবে। দুই পরিবারের মধ্যে একটা বিরূপ সম্পর্কের সৃষ্টি হবে। ওদের বাড়িতে অনেক আত্মীয়-স্বজন এসেছে। কেউ দেখে ফেললে মান-সম্মানের হানি হবে।

এত কিছু ভাবার পরও সে স্থির থাকতে পারল না। বাগানে না গিয়ে নিজের রুমে বসেই বাজাতে লাগলো। রুনু গভীর রাতে সুর আন্দাজ করে শিহাবের রুমের সামনে আসলো। শিহাব দরজা খুলে রুনুকে দেখে অবাক হয়ে বললো-
“রুনু আজ তোর আসা উচিত হয়নি। কালই তোর গায়ে হলুদ, কেউ দেখে ফেললে ভীষণ বিপদ হবে।”

রুনু তখন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো-
“বিপদের আর কী বাকি আছে। আমি তো বিপদের মুখেই আছি।”

শিহাব বললো- “রুনু তুই বাড়ি যা। আমি আর এটাতে সুর তুলব না। আর তুই কেন বিপদে থাকবি। দুদিন পর আমেরিকা যাবি। যা চাইবি তাই পাবি। তোর বাড়ির সবাই তো ভীষণ খুশি তোর এ বিয়েতে।”

রুনু তখন শিহাবের হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো- “কিন্তু তুমি তো খুশি নও। আর আমার চাওয়া তো তুমি। এখনো সময় আছে চল সবাইকে গিয়ে বলি।”

শিহাব তখন রুনুর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো- “তুই কি পাগল হয়েছিস! আমাদের ব্যাপারটা কেউ তো মেনে নিবেই না বরং উল্টো ফল হবে। দুই পরিবারের মধ্যে শত্র“তা সৃষ্টি হবে। রুনু তোর কাছে আমার অনুরোধ তুই চলে যা। জীবনে সবার সব আশা পূরণ হয় না। তবে একটা কথা মনে রাখিস সমাজ স্বীকৃতভাবে হয়তো আমি তোর কেউ না কিন্তু মনে-প্রাণে আমি তোরই আছি। আর পাগলামি করিস না। চষবধংব.”

রুনু আর কিছু না বলে সোজা তার ঘরে চলে আসলো। শিহাব বিয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলোতে অংশগ্রহণ করলো ফলে কেউ কিছু বুঝতে পারলো না। অনেক জাকজমকপূর্ণ পরিবেশে অবশেষে রুনুর বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের মাসখানেকের মধ্যে রুনু তার বরের সাথে আমেরিকা পাড়ি দিল।

বিয়ের পর রুনু শিহাবের সাথে তার বরের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। খুব ভালো বন্ধু হিসেবে। আনোয়ার সাহেবও শিহাবকে ভীষণ ভালোভাবে নেয়। তাই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও শিহাবের সাথে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। এভাবে প্রায় তিন বছর কেটে গেল।

শিহাব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করছে। এর মাঝে রুনু তার দুই বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে একাই দেশে বেড়াতে আসে। এসেই শিহাবকে খবর পাঠায়। শিহাব দেখে রুনু আর আগের মতো কিশোরী নেই, পূর্ণাঙ্গ নারী হয়ে গেছে। সেই চঞ্চলতাও নেই, কেমন একটা ভাব-গম্ভীর মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছে তার মাঝে।

শিহাব রুনুর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল- “তুই এমন হয়ে গেছিস কেন?”
রুনু বললো- “আমি যার সাথে থাকি সে তো তোমার মতো না। তোমার মতো জ্বালায় না। কখনো বকা দেয় না, মারে না এমনকি মজাও করে না। সবসময় সব ব্যাপারে সিরিয়াস। আর অর্থের প্রাচুর্য্যতার দরুণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাহিদা মেটায়।

শিহাব মুচকি হেসে বললো- “তাহলে তো ভালোই হয়েছে। সবাই তো এমন নির্ঝঞ্ঝাট জীবনই আশা করে। তুই তো বেশ সুখেই আছিস।”

রুনু কথাটা শুনে একটু শুকনো হাসির ভান করে বললো- “তা বলতে পারিস। বস্তুগত সুখের আমার অভাব নাই। কিন্তু যে ন্যাচারাল ফিলিংস নিয়ে বড় হয়েছি তা হারিয়ে ফেলেছি। এখন সামাজিকতা রক্ষা করা, দায়সারা কাজগুলো সম্পন্ন করা, এই নিয়ে বেঁচে থাকা, এই আর কি।”

শিহাব রুনুর জীবন সম্পর্কে এমন অভিব্যক্তি শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
“কতদিন আছিস দেশে।”
“তুমি থাকতে বললে আর যাবো না।”
“তাই কি আর হয়। সমাজ সেটা মেনে নেবে না। আর তোর বর আমাকে খুব বিশ্বাস করে, ভালো জানে। তোর বাবা-মাকেই বা কি জবাব দেব। তুইতো স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালোই সংসার করছিস।”

রুনু তখন বেশ জোরে শব্দ করে হাসলো। কিন্তু তার চোখ দুটো ছল ছল করছে। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললো-
“হ্যাঁ, সংসার ভালোই করছি। কর্তব্যবোধ আর দায়িত্ববোধ বলে যেসব নির্দেশনা দিয়ে একটা যন্ত্রমানবকে সুইচ অন করে দেওয়া হয়, তেমন আর কি, তা পালন করে যাচ্ছি। আমি তো এমন জীবন চাইনি। আমার মধ্যে যে সত্যিকার অনুভূতিগুলো বিদ্যমান আমি তারই অনুশীলন করতে চেয়েছি মাত্র। কিন্তু কই, তা তো পারলাম না। শুধু সামাজিকতার বেড়াজালে বন্দী হয়ে ছটফট করে যাচ্ছি। আমার বরের সেটা বুঝার সামর্থ্যই নই। সে শুধু টাকা উপার্জনের নেশায় মত্ত।”

সেদিন শিহাব আর কোনো কথা বললো না। রুনু শিহাবের মায়ের সাথে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে বাড়ি চলে গেল। শিহাব হলে চলে যাওয়ার আগে একদিন রুনুকে নিয়ে শপিং-এ গিয়েছিল। শিহাব রুনুর কেনাকাটা দেখে অবাক হয়ে গেল। সে একটা দোকান থেকে ২ লক্ষ টাকার শাড়িই কিনলো। আর সব মিলিয়ে ৩ ঘণ্টার মধ্যে ৫ লক্ষ টাকার শপিং করে বাড়ি ফিরলো। শিহাবের মতে বেশিরভাগ মেয়েই তো এসব পছন্দ করে। কিন্তু রুনুকে দেখে মনে হলো, সে প্রচণ্ড অভিমানে এসব করছে।

শিহাব পরদিন হলে চলে গেল। রুনু সব মিলিয়ে দুই মাস পর তার বরের কাছে চলে গেল। এর মধ্যে শিহাবকে আরও কয়েকবার খবর পাঠানোর পরও সে ইচ্ছে করেই আর রুনুর সাথে দেখা করেনি। সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে শিহাব জানে কোনো একটা দিকের প্রতি অতি মনোযোগে পরে মনোরোগে পরিণত হতে পারে। তাই ইচ্ছে করেই রুনুর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা।

এদিকে শিহাব পুরোদমে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলো। অনার্স ফাইনাল শেষ করলো। রুনু প্রায়ই ফোন দেয়। শিহাব রুনুর ভালোর কথা ভেবেই কৌশলে এড়িয়ে চলে। কিন্তু শিহাবের এই এড়িয়ে যাওয়াটা রুনুর মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে। কষ্টের বীজ আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে থাকে। ইচ্ছে করে সবকিছু ছেড়েছুড়ে শিহাবের কাছে চলে আসতে। পাঁচ বছর পর রুনু দুইবারের মতো দুই ছেলে সাথে নিয়ে স্বামীসহ দেশে বেড়াতে আসে।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিহাব ৬-৭দিন ধরে বাড়িতে এসেছে। সে জানতো না যে রুনু দেশে এসেছে। বিকেলে হঠাৎ রুনুকে দেখে শিহাব ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। বললো- “কিরে তুই! কবে আসলি?”
“তুমি তো আমার ফোনই রিসিভ করো না। আমি কি অবস্থায় আছি, কোথায় আছি সেটা তুমি কি করে জানবে। আমি গত রাতে এসেছি।”

শিহাব আর কথা না বলে বাইরে চলে গেল। রুনু শিহাবের মায়ের কাছে বসে গল্প শুরু করে দিলো। শিহাবের মা বললো- “তুই এই বাড়িতে থাকলে তো আমার কোনো চিন্তাই ছিল না। কেন যে ঐ আমেরিকা গিয়ে পড়লি?”

রুনু তখন বললো- “আমি তো যেতে চাইনি। আপনারাই জোর করে পাঠালেন। আমি এখনো যেতে চাই না।”
“এখন এসব বললে হবে? তোর বর যেখানে থাকবে তোকে তো সেখানেই থাকতে হবে।”
“আমি তো ঐ বর চাইনি। সবাই মিলে আমাকে এত বড় শাস্তি দিয়েছেন।”

শিহাবের মা রুনুর কথায় আশ্চর্য হলো। ওর বাড়ির সবাই বলে রুনু খুব সুখী। ওর স্বামীও খুব ভালো। আর রুনু এসব কি বলছে। তারপর বললো-
“শাস্তির কথা বলছিস কেন? বিয়ের পর তো এরকমই হয়। সবাইকে ছেড়ে যেতে হয়।”

তখন রুনু অনেকটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ফেললো- “খালাম্মা আমাকে আপনার কাছে রেখে দেন। এ বাড়ি থেকে আমি আর কোথাও যাব না।”

মনোয়ারা বেগম তখনি বুঝিয়ে রুনুকে তার বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। আর শিহাবকে হলে চলে যেতে বললো। শিহাব চলে গেলো। এরপর রুনুর সাথে শিহাবের আর দেখা হয়নি।