যদি গতকাল সময়মতো হাসপাতালে না নিয়ে আসতে তাহলে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে হয়তো মারা যেতাম।
ধন্যবাদ। বড় উপকার করলে। পৃথিবীতে এখানো ভাল মানুষ আছে। সময়ের অনেক দাম। সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে ফল পাওয়া যায় না। বড় ইতিহাস হলো সময়। সময় কাজের অনুপ্রেরণা দেয়।এই জন্যে সময়ের কাজ যথাসময়ে করতে হয়। যারা ভালো মানুষ তারা সময়কে বুকে ধারন করে। আল্লাহর রহমতে তোমার সহযোগিতায় এখন বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে।
গতকাল থেকে আমার জন্যে কষ্ট করছ। এখন পর্যন্ত তোমার নাম জানা হল না। কেমন মানুষ আমি। কিছু মনে কর না বাবা।
এই কথাগুলো বলেই অসহায় দৃষ্টিতে ফারাবির দিকে তাকিয়ে রইলেন সোহরাব উদ্দিন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ পুরুষ ওয়ার্ডের এগার নম্বর বেডে শুয়ে আছেন তিনি। চিন্তিত কিন্তু চেহারায় মায়া ভরা।
বিনিয়ের সাথে কথাগুলো বলল ফারাবি। ফারাবি বলল,
কিছু মনে করার কারণ নেই। তাছাড়া আপনি অসুস্থ । আমি ফারাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি।
বাহ্! ভাল লাগল। কোন ডিপার্টমেন্টে পড়।
পলিটিক্যাল সাইন্স। মাস্টার্স শেষ বর্ষ।
থ্যাংক্স ব্রিলিয়্যান্ট বয়। আজকালকার ছেলে মেয়েরা এই সব বিষয়ে পড়তে চায় না। কেমন যেন অনিহা। বিবিএ, এমবিএ, ফিজিক্স, ম্যাথ, ইংলিশ, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। এখন আবার নতুন করে যোগ হয়েছে ফ্যাশন, মিউজিক, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি।
আমি সোহরাব উদ্দিন। তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান পড়াই।
ও আপনি প্রফেসর ড. সোহরাব উদ্দিন। বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ও কলাম লেখক। স্যার, পত্রিকায় পাতায় আপনার লেখা অনেক পড়েছি । আজ বাস্তবে দেখে ভাল লাগছে। কী সৌভাগ্যে আমার!
ফারাবির চোখে তৃষ্ণা নিবারণের ঝিলিক। প্রফেসর ড. সোহরাব উদ্দিনের সেবা করতে পারায় নিজিকে ধন্য মনে করে। তাঁর মতো এক জীবন্ত কিংবদন্তী, সমাজ বিজ্ঞানী ও গবেষক কমই থাকেন। তিনি দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।
সোহরাব উদ্দিন বিছানা থেকে উঠে বেডের রেলিংর সাথে হেলান দিয়ে বসলেন। টিস্যু দিয়ে চোখের কোন মুছলেন। হাসিমাখা মুখে ফারাবিকে বলেন,
গতকাল থেকে আমার জন্যে অনেক করলে। আজ আমার সাথে বাসা পর্যন্ত চলো।
যাব স্যার। আপনি না বললেও আমি আপনার সাথে যেতাম। তাছাড়া আপনি এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ নন। আপনার শরীর অনেক দূর্বল।
তা ঠিক আছে। কিন্তু আমার মনে শক্তি আছে। যা তোমাদের নেই। তোমাদের মনের উপর কন্ট্রল নেই। নিজের মনকে তোমরা বিশ্বাস করতে পার না।
আমি একাই যেতে পারবো। তবুও তোমাকে বললাম । কারণ, তুমি ভিন্ন ধরণের । তোমার সাথে গল্প করব।
শুধু চা দিলাম। আশা করি ভাল লাগছে। চা তৈরির অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। সেই তোমার মতো বয়স থেকে। হলে থাকতে অভ্যেস হয়েছে। নেশা বলতে চা আর মাঝে মাঝে কফি। আমি সিগারেট ফুকতাম না। অনেকে বলে সিগারেট নাকি চিন্তার জট খুলে দেয়। কঠিন সমস্যা সমাধানের উপায় বের করে দেয়। এগুলো মিথ্যে কথা। এক প্রকার ভন্ডামি। তুমি কি বল ফারাবি, ঠিক বলছি না।
ফরাবি দ্রুতই বলে, “ঠিক কথা স্যার। যত ভন্ডামি ধুমপান আর নেশাকে ঘিরে। টি এস সি, জাদুঘর গেট, পাবলিক লাইব্রেরীর গেট, হকিম চত্ত্বর, সোহরাওযার্দী উদ্যান এই পবিত্র জায়গাগুলোতে দেখা যায়, মেয়ে ছেলে এক সাথে সিগারেট ফুকছে, গাজা খাচ্ছে, আরো কত কি। ওরা তো নিজেকে প্রগতিশীল ও স্বাধীন মনে করে। স্যার, এগুলো যদি প্রগতিশীলতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হয়, তাহলে সেই প্রগতিশীলতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হলো অপরাধ জগতের যোগসূত্রের প্রথম ধাপ।”
সোহরাব উদ্দিন কিছুক্ষণ মৌন থেকে চায়ের কাপে লম্বা একটা শেষ চুমুক দিয়ে বললেন “তুমি ঠিক বলেছ। তোমার এই কথা সমাজ বিজ্ঞানের সাথে মিল রয়েছে।”
স্যার, সমাজ আর রাষ্ট্র আলাদা বিষয় নয়। একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।
সোহরাব উদ্দিন মুচকি হেসে বললেন,
তুমি মেধাবী বটে। ফারাবি একটা রিকুয়েস্ট আছে। আজকের রাত আমার বাসায় থেকে যাও। এই বৃদ্ধ লোকটিকে দয়া কর।
সোহরাব উদ্দিন এমন আবেগ তাড়িত হয়ে কথা বললেন। ফারাবি না করতে পারলনা। অনুগত ছেলের মতো রাজি হলো।
পাশের মসজিদ থেকে মাগরীবের আযানের মধুর ধ¦নি সন্ধ্যার কোমল বাতাসকে আরো মোহনিয় করে তুলছে। কি সুন্দর সে আহবান। হৃদয়ে শান্তির পরশ বুলে দেয়। হৃদয়কে করে সবুজ দিগন্তের মতো উদার।
বেলকুনিতে ইজি চেয়ারে বসে উদাস চোখে বাহিরে তাকিয়ে রইছেন সোহরাব উদ্দিন। ফারাবিকে বলছেন, “ফারাবি আজ মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে পারছিনা। তবে মিস করতেছি। এসো আমরা বাসায় নামাজ আদায় করি।”
নামাজ শেষে করে ফারাবি সোহরাব সাহেবকে ঔষধ খাওয়ালো।
সোহরাব উদ্দিন বললেন, “ফারাবি, কোন সংকোচ করবেনা। বাসায় একা থাকি। ছেলে এমবিবিএস পাশ করে ইংল্যান্ড সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেল। তারপর পিএইচডি শেষ করে এখন লন্ডন মেডিক্যাল ইউনিভার্সসিটির নিউরোলজি বিভাগের প্রফেসর। মেয়ে বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে এম এস সি করে কানাডায় সিটিজেনশীপ পেয়ে স্বামী, সংসার আর ব্যবসায় নিয়ে ব্যস্ত।”
ফারাবি মনোযোগ দিয়ে সোহরাব উদ্দিনের ছেলে মেযের সফলতার কথাগুলো শুনছিল। এক সময় মুখ ফসকে বলেই ফেলল “স্যার, আপনি একজন সফল মানুষ। সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এতে আপনার আনন্দ লাগে, গর্বে বুক ফুলে উঠে তাই না স্যার?
সোহরাব উদ্দিন মাথা নিচু থেকে উচু করে বলেন, ‘না। দুঃখ হয়। কষ্টে বুক ভেঙ্গে যায়। চৈত্র মাসে ফেটে যাওয়া জমির মতো এই হৃদয় পিতৃস্নেহে হে খাঁ খাঁ করে। মনটা আমার বিরান মরুভূমি হয়ে গেছে। তবুও যেন মরিচিকার পিছনে ছুটে চলছি।’
কিছুক্ষণ মৌন থেকে তিনি আবার বললেন, ‘জীবনের পড়ন্ত বেলাভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখি এক বুক শূন্যতা আমার সঙ্গী। পশ্চিম দিগন্তে ডুবন্ত লালাভ সূর্যের মতো শুধু স্বপ্ন দেখছি। আমি খুব অনুতপ্ত। আমি মেধা পাচার করেছি। আমি অপরাধ করছি। জানো ফারাবি, আগে ওরা বছরে দুই একবার আসতো। এখন আর আসেনা। সময় পায় না।’
সোহরাব উদ্দিনের চোখের কোনে চিক চিক করে উঠছে নোনা পানি। তিনি আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ছেন। কষ্ট পাচ্ছেন। কি ভাবে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করা যায়। ফারাবি তাই ভাবছে। ফারাবি বলল,
স্যার, আমি ভাল মুড়ি মাখা তৈরি করতে পারি। পিঁয়াজ, মরিচ, চানাচুর, সরিষার তেল দিযে মুড়ি মাখা মজা লাগবে। আয়োজন শুরু করব স্যার ?
সোহরাব উদ্দিন উৎসাহ নিয়ে বললেন, ‘অনেক দিন খওয়া হয় না। চল রান্না ঘরে, তোমাকে দেখে দেই কোথায় কি আছে।’
মুড়ি মাখা খেতে খেতে ফারাবি ভাবছে স্যারের স্ত্রী কোথায়। ছেলের সাথে থাকেন, না মেয়ের সাথে থাকেন। এই কথাই তার মাথায় ঘোর পাক করছে। অবশেষে সে বলেই ফেলল। তবে কৌশলে।
–স্যার, এই বিশাল ফ্ল্যাটে একা থেকে থেকে আপনার অভ্যেস হয়ে গেছে?
–এখনো অভ্যেস হয়নি। তবে অভ্যেস করে নিচ্ছি। সেই মাটির ঘরে একাই থাকতে হবে। তাই চেষ্টা করছি নিঃসঙ্গ থাকতে।
–ম্যাডাম কোথায় থাকেন?
–সেও দূরে থাকে। অনেক দূরে। স্বার্থপর। খুব স্বার্থপর। চল্লিশ বছর ধরে ভালোবাসা দিয়ে বুকে ধরে রাখলাম। কষ্ট-দুঃখের সংসার, বিরহ আর একাকিত্ব আমার কাঁধে তুলে দিয়ে নিরবে পরম মমতায় ঘুমে আছে সেই ঘরে,যেখানে যাওয়ার জন্যে আমি অপেক্ষা করছি।
–ও সরি স্যার ।
–নো সরি। জানো ফারাবি, চল্লিশ বছর বিয়ে জীবনে রাহেলাকে ছাড়া এক রাতও বাহিরে কোথাও থেকেছি বলে মনে হয় না। যখন আমি অক্সফোর্ডে পিএইচডি করি তখনো ও আমার সাথে ছিল। রাহেলা আমার ছায়া ছিল, আমার দেহ ছিল। আমার মস্তিষ্কের অর্ধেক ছিল। আজ সে না ফেরার দেশে।
এক বছরের ব্যবধানে ছেলে মেয়ে। বুঝতেই পারছ কেমন ঝামেলা। মাতৃ¯েœহ দিয়ে বড় করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অথচ মারা যাওয়ার সময় ছেলে মেয়ে একটাকেও দেখে যেতে পারেনি। কী নির্মম নিষ্ঠুর সত্য।
ফারাবি অবাক হয়ে সোহরাব উদ্দিনের আত্মকথন শুনছে। আর মাঝে মাঝে টুকটাক প্রশ্ন করে সোহরাব উদ্দিনকে সঙ্গ দেয়।
–স্যার, ছেলে মেয়ে আসেনি কেন?
–ছেলে এসেছিল। রাহেলাকে করস্থ করার চারদিন পর। ভিসা জটিলতায় মেয়ে আসতে পারেনি।
দূর দেশে থাকলে যা হয়।
তবে ছেলে বলেছিল, ‘বাবা আমার সঙ্গে ইংল্যান্ডে চলেন। এই দেশে একা একা আপনার কষ্ট হবে। তাছাড়া আপনার শাররীক অব¯থাও ভাল নেই। ওখানে সার্বক্ষণিক আপনাকে চেকআপ করতে পারব। আমাদের রিমনও আপনাকে পেয়ে খুশি হবে। বাবা, আপনি তো রিমনকে দেখেননি, খুব দুষ্টু হয়েছে। চলেন বাবা, তাহলে আমিও নিশ্চিন্তে থাকতে পারব।‘
ফারাবি বলল, ‘স্যার আপনি গেলেন না কেন? ওখানে আপানার ভাল ছিল। সবার সঙ্গে থাকতে পারতেন।’
–তোমরা মনে কর ভালো। আমি তা মনে করি না। অক্সফোর্ডে পিএইচডি শেষে ঐ ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর পদে অধ্যাপনার সুযোগ পেলাম। অনেক সেলারি ছিল। বুঝতেই পারছ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। আমি সেই সুযোগ নেইনি। রাহেলাও নিতে দেয়নি।
এদেশের আলো বাতাসে বড় হয়েছি। এই দেশ আমার জন্যে অনেক করছে। তাই আমার অর্জিত জ্ঞান মেধা শ্রম এবং জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করেছি।
ফারাবি বলল ‘স্যার, আপনি যোগ্য এবং সাহসী জীবন সঙ্গী পেয়েছিলেন।’
ফারাবি কথা শেষ না করতেই সোহরাব উদ্দিন বললেন,
–পেয়েছিলেন না, বল পেয়েছি। রাহেলা এখনো আমার সাথে আছে।
রাহেলা কোন দিন সংসার নিয়ে ভবতে দেয়নি। পটুয়া শিল্পী হয়ে সুখের চিত্র এঁকেছে সংসারে। ওর হাতের জাদুর ছোঁয়া সবখানে ছড়িয়ে রয়েছে। দেয়ালের চারদিকে তাকালেই রাহেলাকে দেখতে পাই। চোখ বন্ধ করলেই হৃদয় পর্দায় দেখতে পাই মিষ্টি, দুষ্টমীভরা পবিত্র শান্ত রাহেলাকে।
জানো ফারাবি, বেলকুনিতে ইজি চেয়ারে বসে চোখ বুজে এখনো রাহেলার সাথে কথাবলি। চলমান ঘটনাবলি নিয়ে কথাবলি। যা বাহিরে কারো সাথে আলোচনা করতে পারিনা। ভাল বললেও বিপদ, সত্য বললে আরো মুশকিল। তাই রাহেলার সাথে দেশ নিয়ে কথা বলি, দেশের মানুষ নিয়ে কথা বলি, হিং¯্র আর ঘুনে ধরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলি। রাহেলা আমাকে বলে, ‘তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করে যাও।’ মাঝে মাঝে রাহেলা স্মৃতি রোমন্থন করে বলে, ‘প্রফেসর মনে পরে তোমার,অতিতে ফেলে আসা সেই মধুময় দিনগুলো। গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠো পথ ধরে শাড়ি পড়ে তোমার হাত ধরে হেঁটে চলা। সন্ধ্যায় জোনাকির লুকোচুরি। আরো কত কী।’ এই কথাগুলো বলেই হাসিতে গলে পরে।
জানো ফারাবি, আমি যখন মৌন হয়ে থকি তখন আমার মনকে রাঙানোর জন্যে ও খুব মজা করে। দুষ্টমিতে মেতে উঠে। পূর্ণিমার জোছনার রূপালি আলোতে রাহেলা বেশি বেপরোওয়া হয়ে উঠে। এই জন্যে আজ পর্যন্ত পূর্ণিমার রাত মিস করিনি। পূর্ণিমার রাতে ছাদে বসে থাকি। আর রাহেলা চুপি চুপি পিছন থেকে এসে আমার চোখ চেপে ধরে। তার হাতে হাত রাখতেই সে নাই হয়ে যায়। অনেক দূরে চলে যায়। সে শুধু হাতছানি দিয়ে অহর্নিশ ডাকে আমায়। তার আবেদনময়ী আহবানে আমি মোহবিষ্ট হয়ে যাই। যখন আমি হাত উঠিয়ে ইশারা দেই তখন রাহেলাকে আর দেখতে পাইনা।