“ফুলটুসি ফুলটুসি কলমটা দিয়ে যা মা” অফ্ এমন সময় কলমটাও শেষ হলো। গল্পের একদম অন্তিম মহূর্ত। নায়লা সারা ঘর তন্ন তন্ন করে কলম খুঁজছে আর মেয়ে ফুলটুসিকে ডাকছে।
: মা, এই নাও কলম।
মায়ের সামনে কলমটা ধরে রেখে টেবিলের উপর উপুর হয়ে গল্পটা পড়ার চেষ্টা করে ফুলটুসি।
: এখন না পরে পাড়িস, তোর বাবা এখনই চলে আসবে, আর এসে যদি দেখে গল্পটা এখনো শেষ হয়নি তাহলে তো জানিস কী তুলকালাম হবে।
: হুম। ( একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুলটুসি)
কিছুক্ষণ একঝলক মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কী অপূর্ব সুন্দরী মা, যেমন সুন্দর তেমন মেধা। এক একটা লেখা যেন তার তলোয়ারের ঝংকার। আর যখন মা গল্প লেখে তখন আর নিজের মধ্যে থাকেনা। হারিয়ে যায় গল্পের চরিত্রে। সে সময় ফুলটুসির কাছে তার মাকে আরো সুন্দর আরো উদ্ভূত লাগে।
: আচ্ছা মা
: হুম
: কী লাভ এত নিখুঁত করে লিখে।
: মানে?
হঠাৎ লেখা থামিয়ে ভ্র কুচঁকে মেয়ের দিকে তাকায় নায়লা।
: না এমনিই।
এমনিই কী! কালকে তোর বাবার এই নতুন গল্পটা নিয়ে মিটিং আছে। অনেক লোক আসবে। বুঝতে পারছিস সময় কত কম, আর তুই ডির্স্ট্রাব করছিস।
: তাতে তোমার কী লাভ?
মায়ের চোখে চোখ রেখে সরাসরি প্রশ্ন করলো ফুলটুসি।
নাহ্ এই চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দেওয়ার ভাষা নায়লার জানা নাই। বিয়ের পর থেকে এমনই হয়ে আসছে। দেশখ্যাত স্বনাম ধন্য লেখক গাফ্ফার আহমেদ। অর্থাৎ ফুলটুসির বাবার সব লেখার সৃষ্টি করেছেন নায়লা। আর তার সমস্ত ক্রেডিট গিয়েছে স্বামীর খাতায়। সব সময নায়লা থেকে গেছেন স্টেজের পেছনে।
চোখ থেকে শুধু অশ্রু ফেলা ছাড়া কিছুই করার নেই নায়লার। কারণ স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস যে তার নেই।
: কেঁদনা মা।
মায়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে মাকে বুকে টেনে নেয় ফুলটুসি।
: একটা কথা বলবো মা ?
: হুম বল।
: এটা তোমার ভাষা, বাবার নয়। তোমার ভাষা তুমি লিখবে, কথা বলবে। সেই ভাষা কেন কাউকে কেড়ে নিতে দিবে না। এই ভাষাটা তোমার সম্পদ মা, প্লিজ এবার দয়া করে করুখে দাঁড়াও।
বিশাল হলরুম। আলোয় আলোকিত প্রচুর ভক্ত অনুরাগির মাঝে মধ্যমনি হয়ে বসে আছেন গাফ্ফার আহমেদ। তার নতুন গল্প “আওয়াজ” নিয়ে কথা বলছেন। হঠাৎ এক ভক্ত প্রশ্ন করল,
: স্যার গল্পটা অসাধারণ মনে হচ্ছে। এর শেষ অংশটা কী হবে স্যার?
: মানে?
চমকে উঠলেন গাফ্ফার আহমেদ। আরে, তাড়া হুড়া করার কারনে শেষ অংশের পাতাগুলো আনতেই ভুলে গেছি। এখন কি যে হবে ?
: শেষ অংশটা আমি বলছি।
হঠাৎ হলরুমের ভেতর একজন মধ্যবয়স্ক মহিলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে সবাই ঘুরে পেছনে তাকালো।
ফুলটুসি আর নায়লা সার দৃষ্টি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। ঠিক যেখানে গাফ্ফার আহমেদ দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো নায়লা। রাগে কটমট করে তাকিয়ে আছে তার স্বামী। কিন্তু আজ সেই জ্বলন্ত দৃষ্টি উপেক্ষা করে নায়লা কণ্ঠস্বর কউচু করে বলল,
গল্পগুলো আমি লিখি। তিনি নন। তিনি শুধু আমার গল্পে তার নাম ব্যবহার করেন। তবে আমি ঠিক করেছি আজ থেকে আমার ভাষার লেখাগুলো আমার নামেই হবে।