টাইমফুল

বারান্দার ঝুলন্ত টবে ফুটেছে টাইমফুল। ঘাসের ডগায়
গোলাপ-আকার মেরুন ফুলগুলো
সকাল দশটায় ফোটে, চুপিসারে চুপসে দুপুরের প্রথম ভাগেই।
এই ফুল আমাদের উঠোনে, ভিটের পাশে
যেখানে টিনের চালের পানি ঝরে, সেখানে ফুটতো অনেক।

বাবা, তখন সাইকেল হাতে দাঁড়াতে আঙিনায়। ক্রিং ক্রিং
বেল বাজিয়ে বলতে- ‘দেরি হয়ে গেলো, কই-রে… আয় তাড়াতাড়ি’।
আমি বইপত্র গোছাতে ব্যস্ত, আর মা আমার চুলে
বাঁধছেন ঝুঁটি চিরুনি চালিয়ে- তারপর দুটো ক্লিপ।
বাবা তুমি প্রাইমারি মাস্টার, আমি তোমার স্কুলে
ছাত্রী চতুর্থ শ্রেণির। উঠোনের কোণ থেকে দুটো ফুল ছিঁড়ে
কানে গুঁজে ছুটলাম, সাইকেলে উঠলাম।
তখন মায়ের গলা- ‘গ্লাসভরা দুধ, খেয়ে তো গেলি না’। আমাদের
ছাইরঙা গাভীটা দিতো দুধ এক হাঁড়ি, আর তার বাছুরকে
রাখতো পারিপাটি
জিহ্বায় চেটে। আহা কী মাতৃত্ব! মায়েদের কতো মায়া!

যেদিন আমার বিয়ে ঠিক, সবাই খুশি, বিদেশে
চাকুরে ছেলে, অঢেল টাকা।
মা, তুমি চুপচাপ ছিলে কেনো বলো তো…? মেয়ে মানুষের জাত,
তাই বুঝি যথার্থ বুঝেছিলে মেয়েদের মনস্তত্ব।
টাইমফুল সময় ধরে ফোটে, সময় ধরেই
ঝরে । আমার যৌবন, মাতৃত্ব, সংসার! সময় গেলে তো আর
হবে না সাধন।

তোমাদের মেয়ের জামাই
বিয়ের প্রথম মাসে গেলো ভিনদেশে। তিনটি বছর পার, তবু
দেশে ফিরবার নাম নেই, সে দেশের গ্রীনকার্ড পেয়ে
তবেই ফিরবে, জানি না লাগবে কতো দিন।
তুমি তো জানো না মা, জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে
দূরের আকাশ দেখি। দেখি উড়ে যাওয়া মেঘ, পাখি আর বিমান।
বড়ো একা একা লাগে, মানুষের সান্নিধ্যের অভাব
কী যে যন্ত্রণার, কী করে বুঝাই!
আমি যেন পৃথিবীর বিলুপ্তপ্রায় সেই প্রাণি, বেঁচে আছি
একটি মাত্র- একাকি।
খুব জাগে সাধ, ফিরে যাই শৈশবে। বাবার সাইকেলে
ক্রিংক্রিং। তোমার স্নেহে ঝুটিবাঁধা চুল, কানেগুঁজা টাইমফুল।

সোনার চুড়ি, হিড়েকুচি নেকলেস, বিদেশি প্রসাধন
যেন আমার হাতের শিকল- যেন আমাকে লোহার খাঁচায়
ঝাপটে ধরে, অজগর হয়ে খেতে চায় গিলে।
এমন জীবন আমি চাইনি বাবা, এমন জীবন আমি
চাইনি তো মা, এমন জীবন আমি চাই না ঈশ্বর।
…………………………………………..

মুয়াজ্জিনকে চিরকুট

শুনুন মুয়াজ্জিন সাহেব… সন্ধেবেলায় আমি
আজানের প্রতিক্ষায় থাকি।
আকাশ যখন হয় রক্তিম, নীড়ে ফিরে পাখি, আপনার সকরুণ সুর
ভিষণ মন্ত্রমুগ্ধ করে আমাকে। টিভির ভলিয়ম কমিয়ে
আজানের মায়াময় মূর্ছনায় কান পেতে রাখি।
মাথায় আঁচল তুলতে গিয়েই থামি। মুসলিম মেয়ে হলে
চলতো, আমি তো হিন্দু, লোকেরা ভাববে পাগলামী…!

কিশোরী বয়সে এক মুসলমান ছেলের প্রেমে পড়েছিলাম।
বলতো সে, তার ঘরে বউ হয়ে গেলে পড়তে হবে
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং খুব প্রভাতে তিলাওয়াতে-কুরআন।
প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ভালোবাসার মানুষটির উপদেশ
যতই কঠিন হোক, অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে কে না চায়?
কিন্তুু আমার হলো কই…! ধর্মাশ্রিত সমাজ
বাঁধার দেয়াল তুলে দাঁড়ালো।

এখন মাথায় সিঁদুর, শাখাপরা হাতে
করি অন্যের সংসার। কবুতরগুলো যখন বাকবাকুম ডেকে
খোঁপে ফিরে, বাঁদুরেরা ছুটে খাদ্যের খোঁজে, তুলসীতলায় সন্ধ্যা প্রদীপ
জ্বালাবার আগে; শুনুন মুয়াজ্জিন সাহেব, আমি
আজানের প্রতিক্ষায় থাকি।
…………………………………………..

প্রতীক্ষিতের ফরিয়াদ

করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এমন করে তুমি আসবে
ভাবিনি কখনো। তোমার কথা
খুব মনে পড়তো। পড়বে না…!
আমার পেটে যে তোমার সন্তান।
আমি তার মাঝে অনুভবে
তোমার স্পর্শ পাই। অনাগত, তবে অচিরেই
পৃথিবীর মুখ দেখবে।

তোমার খুব জানতে শখ ছিল, উদরগহীনে
শিশু কেমনে নড়েচড়ে ওঠে। সে কি হাত পা ছোড়ে
এদিক ওদিক, সে কি মাকে মা ডাকতে পারে, সে কি তোমাকে
বাবা বাবা ডাকে, কী কৌতূহল তোমার।
পেটের মাঝে কান পেতে রইলে আধাঘন্টা, কোন ফল
পেলে না। না মা ডাক, না বাবা ডাক, না কোন
কান্না-হাসি।
আমি শুধু হাসলাম তোমার পাগলামি দেখে
আর কুকড়ে গেলাম সুরসুরি পেয়ে। নাভীর উপর
চুলের ঘষা, সুরসুরি লাগবে না তো কী…!
তুমি কোনদিন
বাবা ডাক শুনতে পাবে না; কী দুর্ভাগা তুমি।
এমন করে তুমি আসবে ভাবিনি কখনো। সীমান্ত প্রহরীদের
ছুটি মেলে না সহজে, তাই
আমার মতো স্ত্রী-গণ
চিরপ্রতীক্ষার পাত্র। ছুটি নেই বলে
হানিমুনটাও করা হয়নি। তুমি বলতে পেনশন পেয়ে
তবে যাবে হানিমুনে, সাথে থাকবে নাতি নাতকর।

কখনো সখনো ফোনে কথা হলে বলতে তুমি
ফোনটা যেন একবার
ঠেকাই পেটে, অগ্রীম বাবা ডাক
শোনা চাই তোমার; কী পাগলটাই না ছিলে তুমি।

করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এমন করে
তুমি আসবে ভাবিনি কখনো।
গাড়ি এসে
থেমেছিল রাস্তার শেষ সীমানায়, একটা কফিন
নেমে এল ক’জনের কাধে
ভর করে। বাংলাদেশের পতাকা মোড়ানো তোমার লাশ।
গুলিটা তোমার কোথায় লেগেছিল-
ফুসফুসে, কলিজায়, নাকি হৃদপিণ্ডে?
নিশ্বাস যখন
বন্ধ হয়ে এল, অন্ধ হয়ে এল পৃথিবীর আলো
আমার কথা তোমার কি মনে পড়ছিল,
কিংবা আমার উদরপুষ্ট শিশুটির কথা? জলে ডোবা মানুষের
মুহূর্তে বিস্মৃতি স্মরণের মতো।

তোমার অনাগত সন্তান বাবা ডাকবে কাকে? কে শুনবে
তার বাবা বাবা ডাক? পিতৃছায়াহীন
বেঁচে থাকা কী যে বেদনার।
…………………………………………..

ভিনদেশে বিপর্যস্ত

মা আমাকে তার মাতৃসুলভ আচরণে
স্নেহের হাতে তুলে খাইয়ে দিতে চাইতো, আমি দেইনি সম্মতি কখনো
তার বুড়ো আঙুলের নখটা কেমন মড়া ঝিনুকের
ফ্যাকসা খোলসের মতো ছিল বলে।
শৈশবে স্কুলে পৌঁছবার রাজপথে
যেদিন প্রথম দেখেছিলাম শিয়ালের থেতলানো দেহ
টানা তিনরাত ঘুমোতে পারিনি দুঃস্বপ্ন দেখার ভয়ে, পারিনি করতে
আহার স্বাভাবিক। চোখের সামনে শুধু উঠতো ভেসে
বিচ্ছিন্ন মস্তক একটা মরা শিয়াল যার উসকোখুসকো চামড়ায়
জমে আছে রক্তের স্তূপ আর তকতকে নীল মাছি।

খুব বেশি খুতখুতে
স্বভাব ছিল আমার। বাবা একবার আমার গামছা দিয়ে
মুছে ছিলেন তার শস্যক্ষেত থেকে ফিরে আসা ঘর্মাক্ত পিঠ,
সেই অপরাধে তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার
করে দিয়েছিলাম মূর্খের অপবাদ দিয়ে। এক বিছানায় ঘুমোতে গিয়ে
আমার যে ছোটভাইটা গায়ের উপর তুলে দিতো পা
আমি এক চড়ে তার কান থেকে রক্ত ঝরিয়ে বুঝিয়েছিলাম
ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে যাওয়ার খেসারত।

এখন আমার ঘুম আসে না, ঘুম আসে না রাতে
ছাড়পোকা আর মশাদের উৎপাতে। উৎকট গন্ধে
বন্ধ দম, শৌচাগারের পাশে বিছানায় নেই গা ঢাকা দেবার মতো
টুকরো কাপড়। শীতে জুবুথুবু হয়ে যখন কুকড়ে যাই
তোকে বড়ো মনে পড়ে, তোকে বড়ো মনে পড়ে ভাইরে। ঘুমঘোরে একটি পা
গায়ের উপরে তুলে দিবি না আমায়
একটু আরাম উত্তাপ? বল, তুই করবি না
ক্ষমা আমায়…?

ওরা যখন আমাকে নিয়ে এসেছিল ভিনদেশে
বলেছিল কাজ দেবে পাঁচতারা হোটেলে, নিদেনপক্ষে মুদির দোকান তো
জুটবেই কপালে। সূর্য ওঠার আগে
শাবল ক্ষন্তা আঁকশি হাতে লেগে যাই কাজে, নগরের নর্দমা
শোধন এখন আমার কাজ।
যে হাতে ধরিনি গরুর দড়ি গোবর চনার গন্ধ লাগবে বলে
সে হাত ধরে পঁচা ইদুরের লেজ, পলিথিনে মোড়া
মাছি ভনভন করা মাছের পুরনো আঁশ। পরিত্যক্ত আবর্জনা
তুলে নিই পিঠের ঝুলিতে। বড়ো অসহায়, বড়ো অসহায় লাগে মা,
মনে হয় মরে যাই; না গেলে কাজে নিতান্ত বুভূক্ষু
কাটে দিন, পানিটাও এইদেশে কিনে খেতে হয়, টাকা ছাড়া জোটে না
কান চুলকানোর কাঠিটি পর্যন্ত।

একবার, শুধু একবার, মা তোমার গোবর গুলে গৈঠা বানানো হাতে
একমুঠো ভাত খাইয়ে দিয়ে যাও।
বাবা, ও বাবা, আমার গায়ের সবচেয়ে সুন্দর যে জামাটি
তাতে মোছো তোমার ভাত খেয়ে না ধোয়া হাত। তোমার সফেদ দাড়ির ভাজে
তরকারির যে ঝোল লেগে থাকে
সেই ময়লাটি জিহ্বায় চেটে তুলে নিতে বড়ো ইচ্ছা জাগে আমার।
…………………………………………..

অহিংসোক

জাহাজডোবা নাবিকের মতো বিধ্বস্ত, কম্পিত পা
দাঁড়িয়েছি তোমার সামনে। বুভূক্ষু এক ভিখারীর সুরে বলেছি-
‘তোমার অনেক ডাঙা, আমায় একটু আশ্রয় দেবে?’
জবাব দিলে-
‘দুনিয়াতে লোক তো অনেক আছে, ওদের কাছে যাও।’

মরু সাহারার তৃষিত বেদুঈন, আঁজলা করে হাতের তালু
বসেছি তোমার সামনে। যেন সিদ্ধিলভিতে দেবীর পায়ে প্রণাম-
‘তোমার রঙিন ফোয়ারা, আমায় একঢোক জল দেবে?’
জবাব দিলে-
‘দুনিয়াতে লোক তো অনেক আছে, ওদের কাছে যাও।’

যুদ্ধাহত যোদ্ধার মতো ক্লান্ত এবং আধবুজা চোখ
হাটু গেড়েছি তোমার সামনে। কপাল ফাটা কয়েদির কণ্ঠে বলেছি-
‘তোমার সুতি আচল, আমার মাথায় পট্টি দেবে?’
জবাব দিলে-
‘দুনিয়াতে লোক তো অনেক আছে, ওদের কাছে যাও।’

বনপোড়া হরিণীর মতো নিরুপায়, শঙ্কিত মুখ
দাঁড়ালে আমার সামনে। নির্যাতিত অসহায় সুরে বললে-
‘আমার অনেক বিপদ, আমায় তুমি বাঁচাও।’
আমি তখন পারিনি বলতে-
‘দুনিয়াতে লোক তো অনেক আছে, ওদের কাছে যাও।’

চোখের বদলা চোখ যদি হয়-আমরা তবে অন্ধ হয়ে যাবো
পায়ের বদলা পা যদি হয়-আমরা তবে পঙ্গু হয়ে যাবো।
…………………………………………..

রিকশাতে একদিন

রিকশাতে একটা মেয়ে একটা ছেলের কাঁধে মাথা রেখে
ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল।
আর ছেলেটা মেয়েটার চুল-ওড়া কপালে চুমু খেতে খেতে
নরম শরীরে শরীর ঘষছিল।

রিকশাটা চলে গেল আমারই চোখের সম্মুখ মাড়িয়ে।
মুহূর্তে আমি যেন তলিয়ে গেলাম, পুরাতন স্মৃতির
আড়ালে গেলাম হারিয়ে।

মনে পড়ে তার মুখ তার চোখ, যাকে আমি প্রাণপণ বেসেছি ভালো-
আহা, সেই কবেকার কথা- এমন মধুর দিন আমারও তো ছিল।
রিকশাতে একটা মেয়ে একটা ছেলের কাঁধে মাথা রেখে
ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল।
…………………………………………..

ব্যর্থ ডুবুরী

চেয়েছিলাম একটি বেগুনী ফুল, তুমি এনে দিলে ঝুলবারান্দায়
ঝুলিয়ে রাখার মতো দুটো অর্কিড-চারা নারকেলের খয়েরী মালায়।
সকাল বিকাল আমি জল ঢালি খুব যতনে- আর তুমি
অফিসে যাবার আগে একবার পাতায় পাতায়
বুলিয়ে যাও হাত, ফিরে এসে আরবার ধরো। যেন পিতা
তার চঞ্চল কন্যার ববকাট চুলে স্নেহের আঙুল চালায়।
যেদিন ফুটলো প্রথম ফুল তুমিই খুশি
হলে সবচেয়ে বেশি।
আমাকে একেবারে কোলবালিশের মতো আড়কোলে তোলে
কপালে খেলে খপাৎ খপাৎ চুমু, আর বার বার তাকালে
হালকা হাওয়ায় কাঁপা প্রজাপতির পাখার মতো
ছিটছিট অর্কিড পাপড়িগুলোর দিকে।

আমি তো জানি কতো যে ভালো তুমি বাসো আমায়। তাই আমার
একাকীত্ব কাটিয়ে দিতে দিলে উপহার
খরগোশ একজোড়া, একটি ধবধবে সাদা
অন্যটি সাদায় কালোয় মিশ্রিত
যাদের লালন করি আমি আপন শিশুর মতো
গালে গাল মিশিয়ে- যেন আমিই তাদের মা। মুখে তুলে দেই কতো
চাকচাক করে কাটা গাজরের ফালি, বাধাকপির কচি সবুজ পাতা।

আমার কোন আবদার রাখেনি অপূর্ণ তুমি। আমিই কেবল পারিনি…
মনে কি পড়ে… চেয়েছিলাম
পদ্মার ইলিশ-সর্ষে ভাজি? তুমি আমাকেই নিয়ে গেলে পদ্মায়
জোয়ারের বেলা জেলেদের নৌকায়
উঠে নিজের হাতে ধরলে ইলিশ। যে ইলিশ ভেজেছি
পহেলা বৈশাখে উত্তপ্ত উনুনের পাশে দাঁড়িয়ে আর আঁচলে মুছেছি
গলার ভাঁজে জমা রূপালি মালার মতো ঘাম। তখন তুমি
কোমর জড়িয়ে ধরে কামড়ে দিলে কান, আর হাতের আঙুলে
এক চিমটি সর্ষে ইলিশ মুখে নিয়ে বললে-
‘বড়ো মধুর হয়েছে আমার
রাধুনীর রান্না।’-মনে কি পড়ে? মনে কি পড়ে?
অথচ আমি বারোটি বছর ধরে
তোমাকে প্রতিদান কিছু দেবো বলে কতো যে চাই- যেমন একটি সন্তান,
তবু পারি না দিতে। হাজার হাজার মাইল সাঁতরে এসে আমি যেন
অতলান্তিক সমুদ্রপুরী থেকে শূন্য হাতে উঠে আসা ব্যর্থ ডুবুরী কোন।
তুমি যখন আমাকে খুব খুব খুব বেশি ভালোবাসো…
ব্যর্থতার গ্লানী আর অপারগ অপরাধের ভার
বুকে নিয়ে গলায় কলস বেধে ডুবে মরতে ইচ্ছে করে আমার।
…………………………………………..

কদম

ঋতুটি শরৎ এখন পঞ্জিকার পাতায়।
বর্ষার আমেজ কাটেনি বুঝি, সারাটি আকাশ
কালো করে নামে বৃষ্টি।
একটানা ভিজে শালবন, মহুয়ার কিশলয়। সতেজ হয়
লতানো পুঁইয়ের ডগা।

এ বর্ষণ দেখার সৌভাগ্য আমার নেই। দূর পরবাসে
বসে আমি ভাবি-আহ, কি সহজেই ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম
প্রিয় ফুল কদমের কথা…!
পড়ার টেবিলে দুটো কদম, আষাঢ় শ্রাবণে তরতাজা দুটো কদম
জিইয়ে রেখেছি কতো-
কাচের বোতলে। ভেজা বাতাসে কদমের হালকা সুবাস।
তিনটে বছর, মাত্র তিনটে বছর
ভুলিয়ে দিলো চব্বিশ বছরের বর্ষার স্মৃতি, যেন চব্বিশ বছর
পরাজিত তিন বছরের পাল্লায়।

পরিজন ফোন করে খবর নিতে-‘কি পাঠাবো বল…?
কাঠালের বিচি ভাজা, চিনে বাদাম, ঝুনা নারকেল
নাকি আমের আচার…?’-ওদের তালিকায়
আমার পছন্দ অনুপস্থিত।

সাহেবদের বিলেতী ফুলের ভীড়ে
ঠাঁই নেই কদমের-
যেমন আছে কাঁদা মাটির সুঁদাগন্ধ ভরা বাংলায়।
ক্যালেণ্ডারের পাতায় দেখি
ফুটফুটে কদমের শ্বেত রেণু বিনিময়, আর অন্তরে অনুভবে
রূপ-রস-গন্ধ।
…………………………………………..

গোপনে বিপন্ন

সোনার পিঞ্জিরা রেখে উড়ে যায় পোষা পাখি
সোনার কী দাম আহা রইল তবে
ঘরের বধূই যদি গেল চলে পৃথিবী ছেড়ে
রুপালি খাটটি না হয় পড়ে থাক নীরবে।

মেঘ কেন মিশে যায় গহিন নীলিমায়
হাসে না হাসনাহেনা বিপন্ন বাগানে
জাল ছেঁড়া মাছ দেখায় লেজের দাপট
চলে গেল যে তার লাগি মন কাঁদে গোপনে।

সে যদি গেলই চলে একাকী নিস্বর্গে
আমার থরোথরো বুকে কে ঘুমাবে খোঁপা খুলে
এতই যদি রবে অটুট তার অভিমান
আমার চুরুটের ধুঁয়া প্রজাপতি হবে কার চুলে!!
…………………………………………..

ফিরতে পারিস যখন তখন

তোর চোখের মাপের আকাশ আমার নেই
তাই পাখনা মেলে উড়তে বলি না তোকে
ইচ্ছে হলে যা খুশি তা করিস, পূর্ণ অধিকার দেই।

তোর মনের মাপের উঠোন নেই এ বুকে
তাই নীড় সাজিয়ে বসতে বলি না তোকে
স্বাধীনতা দিলাম, বাসা বাঁধিস যার খুশি তার ডালে।

কিন্তু বলি শোন, আমার আকাশে কোনো বন্ধন নেই
সোনার খাঁচার দ্বার রেখেছি খুলে
ফিরতে পারিস যখন তখন তোর আকাশে দুরন্ত ঝড় এলে।
…………………………………………..

তুমি কোনটা নেবে…?

আমার হাতে বন্দুক, আমার কপালে রক্ত
তুমি কোনটা নেবে…?
যদি বন্দুক নাও- তুমি হিংস্র ঘাতক।
যদি রক্ত নাওÑ তুমি অপরিণামদর্শী কাতিল।

আমার চোখে অশ্রু, আমার ঠোঁটে হাসি
তুমি কোনটা নেবে…?
যদি অশ্রু নাও, তবে তুমি
দুঃখ বিলাসী- মানে আমার প্রকৃত বন্ধু।
যদি হাসি নাও, তবে তুমি
দুধের মাছি- মানে সুসময়ের ধাপ্পাবাজ।

আমার কপালে ঘাম, আমার দু’চোখ লাল
তুমি কোনটা নেবে…?
যদি কপালের ঘাম মুছে দাও শুষ্ক আঁচলে-
তুমি আমার প্রকৃত ঘরণী, আমার অর্ধ-অঙ্গ।
যদি রক্তিম চোখে বোলাও হাতের শীতল আঙুল-
তুমি আমার স্নেহশীল প্রেমিকা, রমণযোগ্য ভালোবাসা।