বাস থেকে নেমেই সাকিব পাশের একটা চায়ের দোকানে বসলো চা-সিগারেট খেতে। সাথে ছিলো তার দুই সহচর নাঈম আর অমিত। গরমের মধ্যে জার্নি করে কিছুটা ক্লান্ত আর ঘেমেছে তারা তিনজনেই। কিন্তু গরম কি আর তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে ? মাস্তান টাইপ বড়ভাইদের তো একটাই অভ্যাস ! আর সেটা হলো চায়ের দোকানের আড্ডাবাজি আর সিগারেটের ফিল্টারে ফুক মারা ! দিনে একবার হয়তো ভাত খাওয়া ভুল হতে পারে, কিন্তু সিগারেট আর চা না খেয়ে ১০ মিনিটও থাকতে পারেনা।

সাবিক হলো এলাকার ক্ষুদে মাস্তান তবে সে এখন এলাকার বড় ভাই। সবাই তার কথা শুনে, তার কথাতেই ভাল-মন্দ কাজ করে এলাকার কিছু বখাটে। এলাকার মানুষ তাকে ডেঞ্জারাস সাকিব নামেই চিনে। এই উপাধিতে সাকিব মারাত্মক খুশি ! মাস্তান হতে হলে এমন একটা নামের উপাধি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করে সে !

চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর অমিত বলে উঠলো ঐ দোকানদার ৩ টা চা দে ! ভাই কতক্ষণ ধরে বসে আছে চোখে পড়ে না? নাকি তুই ভাইকে সম্মান করিস না? অমিতের কথায় আচমকা চমকে উঠে দোকানদার। কিছুটা ভয়ার্ত গলায় বলে ওঠে ভাই, চায়ের পানি এখনো গরম হয়নাই। আরো কিছুটা সময় লাগবো চা বানাইতে। কথাটা বলা শেষ হওয়া মাত্রই বেঞ্চ থেকে উঠেই দোকানদারকে কষে এক থাপ্পড় মারে নাঈম ! চুপ, একদম চুপ ! তুই ভাইরে চা দিতে যদি এত দেরি করস তাইলে এলাকায় ব্যবসা করবি কেমনে? ভাই তরে গতমাসের চান্দার টাকা কমায় দিছে। আর তুই ভাইরে সম্মান করস না ? ২ মিনিটের মধ্যে চা বানায়া দে!

মিনিট কয়েক ক্ষান্ত হবার পর দোকানি বেশ তাড়াহুড়ো করে চা বানিয়ে দিলো। চায়ের কাপে দুইবার চুমুক দেবার পর ডেঞ্জারাস সাবিক বলে উঠলো, তোরা আগামী মাস থেইকা প্রত্যেক চায়ের দোকানের চান্দা বাড়াইয়া দিবি। শালাগো চান্দা কম করলে অবহেলা বাড়াইয়া দেয় আমার পোলাপানগো ! আসলে মানুষের ভাল কইরা লাভ নাই ! সবাইরে চাপের ওপরে রাখলেই সবাই ভাল থাকে। নাঈম আর অমিত তাদের ভাইয়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নামিয়ে দেয় ! বলে, ভাই আপনার কথা মতই এই এলাকায় সব হবে, আপনি চিন্তা কইরেন না। চা খাওয়া শেষ হলে চায়ের দাম না দিয়ে উল্টো কাপগুলো ছুড়ে ফেলে দেয় তারা। এতে তিনটা কাপনই ভেঙ্গে যায়। বেচারা দোকানদার চায়ের দাম চাওয়ার সাহস না পেয়ে অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকে তার ভাঙ্গা কাপগুলোর দিকে। দুচোখে টলমল করে পানি বেয়ে পরলো তার !

এদিকে চায়ের দোকান থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় আসে ডেঞ্জারাস সাকিব ও তার সাংগুপাংগু। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক রিক্সাওয়ালাকে ডাক দেয় সাবিক। রিক্সা সামনে আসলেই তারা তিনজন রিক্সায় উঠেই বলে, চল, তাড়াতাড়ি চল…। প্রায় ১ ঘন্টা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রিক্সাওয়ালা কষ্ট করে তাদেরকে গন্তব্যে নিয়ে যায়। রিক্সা থেকে নেমে সাকিব রিক্সাওয়ালাকে মাত্র ২০ টাকা দিয়ে বলে, এই নে তোর ভাড়া !
রিক্সাওয়ালা গলার ঘাম মুছতে মুছতে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, স্যার ভারাতো ১৫০ টাকা। আর আপনে ২০ টাকা দিতাছেন ? সাকিব রাগান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে রিক্সাওয়ালাকে এক থাপ্পড় মেরে বলে চুপ বেয়াদব। ২০ টাকা দিছি সেটাই তো অনেক! বেশি কথা বলতে তরে ভাড়াই দিমুনা আর এই রোডে গাড়িও চালাইতে পারবিনা। বেচারা রিক্সাওয়ালা অশ্রুজল মোছা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না! (হয়তো সে মনে মনে তার সৃষ্টিকর্তার কাছে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে !)

রিক্সাওয়ালাকে পাশ কাটিয়ে সাকিব তার বাহিনী নিয়ে রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য সামনের দিকে অগ্রসর হলো। ব্যস্ত নগরীতে রাস্তাঘাট যেন সবসময় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে থাকে যানবাহনে ! তাতে সাকিব ভাইদের কি? তারা তো গ্যাংস্টার ! তারা কি আর কারো পরোয়া করে ? চায়ের দোকানদার চা দিতে দেরি হওয়ায় তারা চা-ওলাকে মারধর করে ! রিক্সার ভাড়া চাইতে গেলে রিক্সাওয়ালাকে মারধর করে ! তাঁদেরকে রুখবে কে? কারাই বা তাঁদেরকে শাসন করবে !

ব্যস্ত রাস্তায় পারাপার হবার জন্য সাবিক আর তার বাহিনী হাটা শুরু করে। প্রথমে একটা রিক্সা তাদের সামনে আসলে তারা হাত দিয়ে রিক্সাওয়ালাকে থামিয়ে আবার হাটা দেয়। ব্যস্ত রাস্তায় তারা প্রভাবশালীত্ব করতে ধীরে ধীরে রাস্তা পার হতে থাকে। কোন কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই হঠাৎ আচমকাই বিশাল একটা ট্রাক সাকিব ও তার দুই সহচরের ওপর দিয়ে উঠে যায়। পুরো শরীরের রক্ত দিয়ে রাস্তা লাল হয়ে যায়! চারিদিকের লোকজন দৌড়ে এসে ভিড় জমায় ঘটনাস্থলে। অনেকেই স্বল্প কণ্ঠে একে অন্যকে বলাবলি করছে যে, তিন জনই মারা গেছে ! কিন্তু কেউ সামনে গিয়ে তাঁদেরকে তুলে হাসপাতালে নেবার সাহস পাচ্ছেনা। এমন সময় মানুষের ভিড় ঠেলে এক রিক্সাওয়ালা লাশগুলোর সামনে যায়। যাকে কিছুক্ষণ পূর্বেই এই তিনজন গ্যাংস্টার মিলে মেরেছিলো, ভাড়া না দিয়ে ! তিনজনকে দেখে নিমিষেই চিনে ফেলে সে ! তাৎক্ষণিক সামনে এগিয়ে এসে উপস্থিত জনতাকে সাথে নিয়ে সে হাসপাতালে চলে যায় তাঁদেরকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করে !

রিক্সাওয়ালার এই মানবিকতা দেখে অনেকেই ভাবতে পারেন, যারা এই রিক্সাওয়ালার ভাড়া না দিয়ে উল্টো তাকে মারধর করলো, সে কেনো তাঁদেরকে বাঁচাতে গেলো? দুইনিয়ার প্রতিটা মানুষ যেমন এক না ! ঠিক তেমনি প্রতিটা মানুষের আচরণ, বিবেক, মানবিকতা এক নয় ! কেউ অর্থের লোভে খারাপ হয় আবার কেউ শুন্য হাতেও ভাল থাকে ! এটাইতো পৃথিবী ! দিনশেষে একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে বলা যায়, পাপ কখনো নিজের বাপেরেও ছাড়েনা ! আপনি যদি কারো সাথে খারাপ আচরণ করেন, কেউ না কেউ ঠিকই আপনার সাথেও একইভাবে খারাপ আচরণ করবে ! এটাই চিরন্তন সত্য !