আজ বাসা খালি জানু, তুমি আসো! বাবা মা গ্রামের বাড়ি গেছে; শুধুই আমি আছি। আগামি তিন দিন একাই থাকবো।
-আপাতত আমার একটু সমস্যা, কিছু দিন পরে ঢাকা যাবো।
-কি সমস্যা টাকারতো? আমি তোমার বিকাশ একাউন্টে ৫ হাজার টাকা পাঠাচ্ছি, তুমি রাতের বাসে এসে পড়।
-৫ হাজার লাগবে না জান, ২ হাজার হলেই চলবে।
-বেশি কথা বলবে না রবিন। তুমি আমার জান, তোমাকেইতো আমি হেল্প করবো। বাস থেকে নেমে সোজা আমার বাসাই চলে আসবে। তোমার জন্য স্পেশিয়াল রান্না করবো আমি।

রবিন এলোরাকে “ওকে বাই জানু” বলে ম্যাসেজিং থেকে বের হলো। এলোরার সাথে রবিনের সম্পর্কের বয়স এক ঋতুর একটু বেশি। এলোরার সাথে রবিনের কখনো ফোনে কথা হয়নি। সব সময় ফেজবুকে চ্যাটিং আলাপচারী। ছবি আদান প্রদান আর চ্যাটিং। কখনো মোবাইলে কথা হয়নি। এলোরার এক কথা তোমার সাথে মিট না হওয়া পর্যন্তু মোবাইলে কোন কথা হবে না।

সম্পর্কের বয়স কম হলেও এলোরা রবিনকে অনেক বিশ্বাস করে। রবিনকে একটি লেপটপ কিনার জন্য ৪০ হাজার টাকা ছাড়াও মাঝে মাঝেই ২/৩ হাজার করে টাকা পাঠা। ছেলে হিসেবে প্রেমিকার কাছে টাকা নিতে রবিনের প্রথম প্রথম আপত্তি ও লজ্জা ছিলো। কিন্তু টাকা দিতে দিতে এ লজ্জা ধ্বংস করে দিছে এলোরা। টাকা পাঠানোর কাজে সহযোগিতা করে এলোরাদের কেয়ারটেকার স্বাধীন।

রবিন মোবারকপুর গ্রাম থেকে সেতাবগঞ্জ উপজেলা এসে এলোরার জন্য লিচু কিনলো। ভাবলো, দিনাজপুর থেকে প্রেমিকার বাসা ঢাকাতে যাচ্ছি, লিচু না নিলে কেমন দেখায়। ঢাকার উদেশ্যে সন্ধ্যা ৮ টায় বাসের চাকা ঘুরলো।

এলোরার জন্য মনে এলোমেলো ভাবনা শুরু হল। কত সুন্দর ভাবে দেহভোজের নিমন্ত্রণ দিলো। এত সুন্দর কিউট মেয়েটা আমার প্রেমে কেন পড়লো? প্রতিদিন যত ছবি সে পাঠায় সবগুলো কত উন্নত। আমি বা কম কিসের, টাকা ছাড়া আমার সবই আছে। বন্ধুরা যে আমাকে নায়ক বলে সে নায়কের নায়িকা সে মাত্র। সত্যি কেমন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি ব্যাপারটা। একটা মেয়ে, একটা বিছানা, একটা রুম, একটা রাত; জীবনের প্রথম কোন নারীকে স্পর্শ। ভাবতেই মন শিহরণে উৎসব মুখর হয়ে ওঠে।

-হ্যায় এলোরা!
-হুম জানু, কি খবর?
-আমি বাসে আসতেছি। তোমার মোবাইল নাম্বারটা দাও নেমে কল করবো।
-তোমাকে কতবার বলছি, আমাদের মিড না হওয়া পর্যন্ত কোন কথা হবে না। এর আগে শুধু চ্যাটিং ওকে?
-তাহলে তোমার বাসা পর্যন্ত পৌছবো কিভাবে?
-তোমার কাছে আমাদের কেয়ারটেকার স্বাধীন ভাই এর নাম্বার আছেন না? যার মাধ্যমে তোমার কাছে টাকা পাঠাই?
-হুম আছে।
-কাছাকাছি এসে তাকে কল করিও, সে তোমাকে বাসটেন থেকে রিসিভ করে নিয়ে আসবে।
-ওকে জানু।
-ঢাকা পৌছতে সকাল হয়ে যাবে। সো তুমি বাসে রিলাক্স মুডে ঘুমাও…

বাস থেকে নেমে আর স্বাধীনকে কল করতে হলো না। নামতেই স্বাধীন হাতটি ধরে বলঃ তোমার আসতে এতো সময় লাগে? সকাল ৯ পার হলো। চলো আগে নাস্তা করে নেয়।
রবিন বলো না, চলেন আগে বাসাই যায়, এলোরা নিশ্চই অপেক্ষা করছে।
-তুমি এলোরার আপুর মেসেস দেখনি?
-না।
-সকালে তার খালা আসছে বাসাই। সে আগামি কাল সকালে চলে যাবে। এ অবধি তোমাকে দেখা শুনার দায়িত্ব আমাকে দিছে। কাল সকালে বাসায় যাবো আমরা।

স্বাধীনের ঘনিষ্ট আচরন রবিনের ভালো লাগলো। খেয়াল করলো স্বাধীন তাকে তুমি বলে সম্বোধন করছে, মোবাইল সে আপনি বলতো। স্বাধীন নিচের ঠোঁট এগিয়ে কথা বলে, কিছুটা মেয়েদের মতো হাটে। ফরসা ত্বক। ঘন চুলে কপাল এবং কান পর্যন্ত ডাকা। চোখে মায়া থাকলে মেয়েই মনে হতো। রবিনের সাথে কথা বলছে আর একটার পর একটা লিচু খাচ্ছে। মনে হচ্ছে লিচু তার জন্য নিয়ে আসছে। রবিনের বলতে মন চাচ্ছে কিছু লিচু রাখেন এলোরার জন্য, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারছে না।

রাত ১২টা বাজে। হোটেল রেডিসনের সুইমিং পুলের পাশে বসে আছে রবিন। ফেজবুকে মেসেজ আসলো এলোরার। “আমি সত্যি অনেক দুঃখিতো রবিন। হটাৎ খালামনি বাসায় আসার জন্য তোমাকে বাসাই নিয়ে আসতে পারছি না। রাতটা স্বাধীনের সাথে হোটেলে থাকো, কাল সকালেই চলে আসবে।” স্বাধীন দেরি করছে কেন ভাবতেই, স্বাধীন এসে হাত ধরে বলল চলো, রুম বুকিন দিছি।

স্বাধীনেরর সাথে গল্প করতে করতে রবিন ঘুমিয়ে পড়ল। অনেক রাত, রবিন এলোরাকে নিয়ে রোমাঞ্চকর স্বপ্নে বিভোর। হটাৎ ঘুমের ঘোরে মনে হলো তার দেহখানা ভারী, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। চোখ জড়িয়ে আছে মাতাল ঘুম। সে সময় অনুভব করলো তার দেহের উপর অন্য কেউ! অস্থিরভাবে দেহে অধিকার রক্ষায় তৎপর। প্রতি মানুষটির সর্বগ্রাসী ক্ষুধার তান্ডবে রবিন অসহায়। রবিন কিছু বলতে যেতেই সে মানুষটি অমনি তার অধর কামড়ে ধরে অব্যাহত তান্ডব চালাতে লাগল। তার ক্ষুধার্থ দেহের নিম্পেষণে তান্ডবে রবিন বিরক্ত। কিন্তু সে নিষ্ঠুরভাবে তান্ডব চালাচ্ছে। কিন্তু কে এই মানুষ? এলোরা কি আমাকে সারপ্রাইজ দিচ্ছে? দেহের উপরে মানুষ কে আবিষ্কার করার প্রয়াসে, দাকা দিয়ে দেহ থেকে দেহ শরিয়ে দিয়ে রুমের লাইটের সুইচ অন করলো রবিন।

হ্যায় হ্যায় এ দেখি স্বাধীন ভাই। মেকাপ লিবিস্টিক কাজলে বিস্ময়কর ভাবে সেজেছে।

রবিন অসার বিরক্তি নিয়ে বলল ছিঃ স্বাধীন ভাই। এসব কি হচ্ছে? আপনি এরকম?
-প্লিজ জান আমাকে স্বাধীন ভাই বলো না। আমাকে স্বাধীন আপু বলো!
-কি বলছেন এসব? আমি এলোরাকে এসোব জানাচ্ছি।
-এলোরা বলতে কেউ নেই জান। আমি ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে; এলোরা হয়ে তোমার সাথে সম্পর্ক করেছি। ফেসবুকে তোমার কিউট স্মাট চেহেরা দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি। আর এমন মিথ্যার আশ্রয় না নিলে কখনোই সম্পর্ক করতে না।
-কিসের সম্পর্ক? আপনার প্রতি ঘৃণা ছাড়া আমার কিছুই নেই। আমি চলে যাচ্ছি। এ বলে রবিন রুমের দরজার কাছে যেতে।
স্বাধীন বলল দাঁড়াও প্লিজ।

রবিন স্বাধীনের দিকে তাকাতেই চোখে নজর গেলো। স্বাধীনের চোখে কাজল এলোমেলো, চোখে মেয়েদের মতো মায়া নেই। অশ্রুতে কাজল এলোমেলো হয়ে গেছে। সবুজ ফসলের মাঠ নদী ভেঙ্গে ফেলার মুহূর্তের মত মনে হচ্ছে। রবিনের কানে নদী ভাঙ্গার শব্দ আসছে। রবিন মনে করছে, আমি মনে হয় আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি। এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। আমার ২৪ বছরের যত্নের যৌবন কোন নারী ছাড়া ব্যবহার হতে পারে না। কিন্তু এ রাত ২ টার সময় কোথাই যাবো? বাস স্টেশনে বসে সময় কাটিয়ে দিবো। সকালে বাসে উঠে চলে যাবো দিনাজপুরে। এ ভেবে রুমের দরজা খুলতে গেলো।

হুট করে স্বাধীন হাত ধরে বলল, তোমরা সবাই কেন আমাদের ঘৃণা করো। আমরা তৃলিঙ্গরা কি মানুষ না? তোমাদের যে শ্রেষ্টা সৃষ্টি করছে, সে তো আমাকেও সৃষ্টি করেছে। তোমাকে পরিপূর্ণ ভাবে সৃষ্টি করেছে আর আমাকে তোমার প্রতি আকর্ষণ রেখে সৃষ্টি করেছে। তোমাদের প্রতি আমাদের মানসিকভাবে দুর্বলতা হয়, ফিজিকেল ভাবে আকর্ষণ হয় কিন্তু আমাদের সবাই ঘৃণা করে। কিন্তু কেন আকর্ষণ আর কেন ঘৃণা? আমি বিবিএ এমবিএ শেষ করেছি। এখন আমি অনলাইনে বিজনেস করে মাসে ৪০/৫০ হাজার টাকা ইনকাম করি, কিন্তু আমার কোন মূল্য নেই। আমাকে ভালোবাসার কেউ নেই। ভাবছিলাম অন্তত তুমি আমাকে একটু ভালোবাসবে। তোমাকে প্রেমিকের মতো বা স্বামীর মতো ভেবে এ বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবো। কিন্তু তুমিও সবার মতো… প্লিজ তুমি যেও না, এ বলে টান দিয়ে খাটে বসিয়ে দিলো রবিনকে।

অনেক গুলো মুহূর্ত নিস্পন্দ নিস্তব্ধ, ঝড় হওয়ার পর গাছের পাতার জমে থাকার শেষ পানি টুকু যে ভাবে ঝুলে ঝুলে পরে, ঠিক স্বাধীনের অশ্রুকণা সে ভাবে পড়ছে। রবিন ভাবছে, আজ প্রকৃতি কি স্বাধীনের অনুকূলে। এ রাতটুকু কি তাহলে স্বাধীনের স্বাধীনতায় কাটবে? রবিন আর ভাবতে পারছে না, মাথা ঝিম ঝিম করছে। মাথাটা খুব সাবধানে বালিশে রাখলো। স্বাধীনের আগুলের চাপে রুমের আলো নিবে গেলো।

অবহেলা আর ভালোবাসাহীন জীবনটা প্রাণহীন শুকনো কাঠের মতো। ভালোবাসাহীন সকাল দুপর তার। ভালোবাসা-আশা ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? স্বাধীনের এমন আশাহীন অন্ধকার জীবনে রবিনরা কি তাহলে আতশবাজি, জলে উঠেয় নিবে যায়।
কিন্তু এ জীবনের শেষ পৃষ্ঠা কি?