কবি শামীমা আক্তার লেখালেখি করছেন বহুদিন ধরে। “আত্মজ” তাঁর প্রথম কবিতার বই। প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম এবং আধ্যাত্মিকতা তার কবিতার মূল বিষয়। সমাজ সংসারের জটিলতা, প্রকৃতির সাথে মানুষের কর্মের মিল-বন্ধন এবং নাগরিক জীবনের খুঁটিনাটি ফুটে উঠেছে তার লেখায়। একজন কবি যে কতো সহজ ভাবে তার চারপাশে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তার প্রমান মিলে শামীমা আক্তার এর আত্মজ বইটিতে। বইটির প্রথম কবিতা আত্মজ। যে কবিতায় তিনি একজন মায়ের উক্তিতে তার পেটে সন্তান ধারণ, মাতৃত্বকালীন কষ্ট, যন্ত্রণা ও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সকল দুঃখ ভুলে যাওয়া, কালক্রমে সন্তানটির বেড়ে ওঠা এবং একদিন সেই সন্তানের বিয়ে দিতে যাওয়া ইত্যাদি ফুটিয়ে তুলেছেন।
“একদিন একই শরীরে দুটি হৃদপিণ্ড / সেই হৃদপিন্ডের সাময়িক ছাড়াছাড়িতে / কেমন যেন আনমনা দিন, ভুলো মন / বুকের মধ্যে কলিজাটা এমন মোচড় দিচ্ছে কেন!” মাতৃত্বকালে মা তো এক শরীররে দুটি হূৎপিণ্ডই ধারণ করেন।
কবি খুব বাস্তববাদী। বাস্তবতার গ্যারাকলে আটকা পড়ে ভালোবাসার সময় পান না কবি। “যখন ভালবাসার সময় ছিলো / সুরুজ দেখার সময় ছিল না / প্রশান্তিদায়ক ভোরের হাওয়ায় / ছুঁতে পারেনি বাস্তবতার সকাল।”
পৃথিবী তো মানুষে ভরা, কিন্তু মানবিক মানুষ কই! কবি লিখেছেন – “মানুষ দেখতে গিয়ে চোখে পড়ে যায় / নাকে কচি নারীধর্ষণের ঘ্রান / সাপের মতো ঠাণ্ডা মাথার খুনির খুন / কথা বলায় কামনার ঘ্রাণ / বেশির ভাগ ভালোবাসে শরীরকে / ক-জন ভালোবাসে মনকে?” বিশুদ্ধ ভালোবাসা পাবার আশায় কবির মন ব্যাকুল।
কবি শামীমা আক্তার আশির দশকে রংপুর সাহিত্যাঙ্গনের একটি পরিচিত নাম। তিনি রংপুর অভিযাত্রিক সাহিত্য সংসদ ও ছড়া সাহিত্য পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তরুণ বয়স থেকে লিখছেন। তার কবিতায় যেমন তারুণ্যের প্রতিবাদী চেতনা রয়েছে, তেমনি পরিণত বয়সের অভিজ্ঞতা থেকে সমাজের অসঙ্গতিও কবিতায় ফুটে উঠেছে।
“সাপের খোলস পালটানো এরূপ কবে পাল্টাবে? / এক-একবার বিষধর সাপের দংশনে হৃদয় ক্ষত বিক্ষত / শুধুই ভুল মানুষের ভুল ভালোবাসায় জীবন এগিয়ে / ভালো মানুষ তো আছে, তারাও কেন নীল নীল কষ্টে দগ্ধ!”
জগৎ-সংসারকে তিনি দেখেছেন খুব তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। তাই তার চোখে সুখের চেয়ে দুঃখই বেশি ধরা পড়েছে। তাইতো লিখেছেন – “আসলে কজনা সুখী জগত সংসারে / সুখের ভান করে থাকা যেন মডেল।”
যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন যন্ত্রপাতির যন্ত্রণায় যন্ত্রণাদগ্ধ হয়ে ওঠে তখন প্রকৃতির কাছে শান্তির আশ্রয়ে চায়। শামীমা আক্তারের কবিতায় প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে মনোরম ভঙ্গিতে। “খোলা ছাদে আকাশকে খুব কাছে থেকে দেখা / সুনসান নিরবতা, মিষ্টি বাতাসে মুগ্ধতা / চারতলা এ ছাদ থেকে আকাশ দেখার শখ বহুদিনের / একদিন ওভারব্রিজে উঠে বারোমাসি কদম ফুলের ছবি তোলা।”
তার কবিতা শুধু নিছক প্রকৃতিপ্রেমের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। মাঝেমাঝে প্রকৃতির সাথে মানুষের সুখ-দুঃখ, মনোবেদনা ভাগাভাগির একটি ব্যাপারও লক্ষ করা যায়। “মেঘেরা আজও খুব রাগ করেছে /কেঁদে কেঁদে বিশ্বসংসার ভাসিয়ে দিচ্ছে; / কখনো চোখে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে / মরুভূমি মনকে ভিজিয়ে দেয়;/ বিরানভূমি আবার সজীব হয় / কষ্ট হয় বাগানের ফুলগুলো নষ্ট হয়ে যায় / আনন্দ হয় চারাগাছের সজীবতায় / এ অমৃতধারা সবার হৃদযয়কে করুক মেঘমুক্ত।”
প্রকৃতির সাথে মানব জীবনের বিস্ময়কর মিল রয়েছে। সে দর্শনই কবি লিখেছেন তার “সুরুজের উদয়াস্ত” কবিতায়। “সূরুজ ওঠার শুরু আর শেষটা ভীষণ বিমোহিতকর / জীবনের শুরু আর শেষটা যদি সূরুজের মতো হতো / যাক না সারাদিন তপ্ত রোদ – মেঘলা আকাশ!”
ভেসে যাওয়া শেওলা কবিতায় তিনি লিখেছেন- “শীতের মৌসুমে যমুনা শান্ত একদম শুনশান রাতের মতো শান্ত / জীবনের জটিলতায় বুকে চর জাগে, বুকটা খা খা করে / যমুনার বুকে চর জেগেছে, তবে সেটা আবার ভরাট হবে, / প্লাবিত হবে, জীবন আর ভরাট হলেও প্লাবিত হবে না / ভেসে যাওয়া যাবে না, যমুনায় শেওলা যেমন ভেসে যায়…”
সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া কবিতায় পূর্ণ এই আত্মজ বইটি। পাঠককে কবিতার মাঝে ডুবিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখেন এই কবি।
সংসার জীবনে কত সুখ-দুখ, কত বিচ্ছেদ কত জ্বালা যন্ত্রণা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারই কিছু উঠে এসেছে এই পংক্তিগুলোতে – “শুনেছি তোমার স্ত্রীর প্রেমিকের কথা / তুমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছো / কিন্তু এক ছাদের তলায় বসবাসে নেই কোনো ভালোবাসা / পোষা বিড়ালের জন্য মায়া হয় / তোমাদের কোন মায়া নেই পরস্পরের প্রতি।”
অথচ জগত সংসারে মায়া আছে বলেই আজো টিকে আছে এই পৃথিবী। তাইতো তিনি আরেকটি কবিতায় লিখেছেন- “এখন বাসচালকেরা খানিকটা সচেতন, গাড়িটা একটু থামিয়ে / নারী যাত্রীকে সুন্দরভাবে নামিয়ে দেয়, তাতেও বিমোহিত / বেশকিছু কসাই ডাক্তার ও এখন সহযোগী মনোভাব নিয়ে গরিব রোগী দেখে / এই মানবিকতা আছে বলেই হয়তো এখনো শীতে শিউলি ফুটে।”
প্রকৃত কবি তো তিনি, যিনি তাঁর কবিতায় সমসাময়িক সময়কে ধারণ করতে পারেন। কবি শামীমা আক্তার এর “স্বজনের আইডি” কবিতাটার কিছু পুংক্তি- ” সজনের আইডির মধ্যে কয়েকটা ছেলের, দু-একটা মেয়ের/ রাজনীতির জন্য শুভ্র শরতের কাশফুলের মতো আইডির নাম শারদীয়া।/ কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থের জন্য শিউলি নামের আইডি ব্যবহার/ পরিচয় গোপন, সভ্যজগতে সভ্য মানুষের আইডি সভ্যতা / সাহিত্য জাহির করার জন্য অবন্তিকা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অবন্তিকা।/ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আইডি তোমার নিসংসতা/ মানুষের বিভিন্ন রূপ আছে, আইডির রূপ/ সেইরূপকে হার মানিয়ে দেয় /কখনো প্রতিবাদী মিছিলে স্বজনের মুখ, কখনো স্নেহময় পিতা।”
এছাড়াও তার কিছু কবিতার কিছু চরণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার মতো। যেমন – “বন্ধু হিসেবে পছন্দ নয় বলে ব্যশ্যা উপাধি” “মুখোশের মাঝে মাঝে প্রয়োজন হয়, তাই বলে কি বেশি ব্যবহার গ্রহণযোগ্য?” ” কত যুগ আর ভুল মানুষের ভালোবাসায় ভুলে যাবে?”
আত্মজ বইটি প্রকাশিত হয়েছে আবির প্রকাশণ প্রকাশনী থেকে। ৬৪ পৃষ্ঠার এ বইটিতে আছে ৫৪ টি কবিতা। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১০০ টাকা।
কবির এ কবিতাগুলো মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটবে আশাকরি। তবে কবিকে বলবো, লেখালেখির ব্যাপারে আরেকটু সচেতন হতে হবে। বাক্য গঠনে কখনো কখনো কিছু ভুল লক্ষনীয়। সেগুলো পরিমার্জন একান্ত জরুরী।
বই হোক সকলের বন্ধু, পৃথিবী হোক ভালো মানুষের আস্তানা।