একটি জঙ্গলের ভেতর একটি ছোট পুকুর আছে। সেই পুকুরে ছোট ছোট অনেক গুলি মাছ বসবাস করে। মানুষেরা ওই পুকুরে মাছ আছে সেই কথা কোন দিন ভাবেনি। তাই কোন মানুষ কোন দিন সেখানে মাছ ধরতে যায়না। ফলে মাছ গুলি সব খুব সুখেই বসবাস করে। কারো কোন বিপদ হলে অন্যান্য মাছগুলি বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত। আর এই ভাবে সব মাছগুলি কখন যে একটি পরিবারে পরিণত হয় তা তারাও জানতে পারেনি।

কিছু দিন পর বিশাল বড় বন্যা হয়। অন্যান্য পুকুর ও জলাশয়ের মাছগুলি তাদের বসবাস স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ে উন্মুক্ত পরিবেশে। কিন্তু জঙ্গলের সেই পুকুরের মাছগুলি সে স্থান ছেড়ে অন্য কোন জায়গায় যায়নি। তবে কিছু নতুন মাছ ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যায় জঙ্গলের সেই পুকুরে। আসতে আসতে পরিবেশ আগের মত হলেও সেই পুকুরের পরিবেশ পালটে যায় একটি বোয়াল মাছের জন্য। বন্যায় একটি বোয়াল মাছ সেই পুকুর আসে। বোয়াল মাছটি বুঝতে পারে তার চেয়ে পুকুরে কোন বড় মাছ নেই। তাই সে অন্যান্য ছোট মাছগুলিকে সুযোগ বুঝে খেয়ে ফেলে। আসতে আসতে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় অন্যান্য মাছগুলির মনের ভেতর। তারা কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। আসতে আসতে তাদের সংখ্যা কমতে শুরু করে। অনেকে হারিয়ে ফেলে আপনজনকে। স্বজন হারানোর ব্যথায় সব নিথর হয়ে গেছে।

একটি নতুন তেচোখা মাছ সেই পুকুরে বন্যার সময় পথ ভুলে চলে আসে। পুরোনো মাছগুলি তাকে আপন মনে করে নেয়। তাদের ব্যবহারে সেও আসতে আসতে ভুলে যায় স্বজন হারানোর ব্যথা। তারাকেই স্বজন মনে করে।তবে সে বুঝতে পারে পুকুরের শান্ত পরিবেশ বেশ নষ্ট করেছে বোয়াল মাছটি। তাই সে মনে করে যে ভাবেই হোক এই অশান্ত পরিবেশ স্বাভাবিক করবে। কিন্তু কি ভাবে করা যায় তা নিয়ে সে সারাক্ষন ব্যস্ত থাকে।

পুকুরের মাছেদের রাজা কই মাছ হতাশ হয়ে পড়ে। যেহেতু সে ডাঙ্গায় চলতে পারে তাই ভাবছে পুকুর ছেড়ে পালাবে। কিন্তু আবার ভাবছে যারা তাকে মালিক হিসেবে মেনেছে তারাকে ছাড়া কি ভাবে কীভাবে পালাবে। পালালে কেউ তাকে ক্ষমা করবে না। তার থেকে লড়াই করে মরাই ভালো এমন কথা তার মনের ভেতর জেগে উঠল। তাই সে নির্বাচিত কয়েকটি মাছকে নিয়ে একটি গোপনে মিটিং শুরু করে বোয়াল মাছের কাছ থেকে কি ভাবে মুক্তি পাওয়া যায় তার জন্য।ঠিক তখন ওখান দিয়ে তেচোখা মাছ যাচ্ছিল। তাকে সব কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সে রাজাকে গিয়ে বলে- বুঝতে পারছি আপনারা বোয়াল মাছ থেকে বাঁচার জন্য মিটিং করছ।
কই মাছ রেগে বলল-তোমাকে কে বলল এ কথা?
-না আসলে আমি বুঝতে পারছি বোয়াল মাছের জন্য আপনারা অনেক কষ্টে আছেন।
-কি করে বুঝলে?
-আসলে আমি প্রথমে যখন আসি তখন দেখেছি পুকুরের সকল মাছগুলি মহা আনন্দে ছিল। আর আমাকেও তারা আপন করে নিয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেই পরিবেশ নেই। সব কেমন যেন আতঙ্কে থাকে।
-তো তোর কি হল?
-আমিও যেহেতু আপনাদের দলে। সুতরাং আমারও ভয় হয়।
-তো কি করবি?
-আত্মসমর্পন না করে জীবন দিয়ে লড়াই করে মরা ভালো।
-কেমন করে লড়বি।
-আমি সব সময় জলের উপর ভেসে বেড়ায়। তাই জানি মানুষেরা মাছ কি ভাবে ধরে।
-সত্যি বলছিস।
-হ্যাঁ।
-বল তাহলে কি ভাবে বোয়াল মাছকে আটকাতে পারি?
-আমি যেহেতু বেশির ভাগ সময় জলের উপর ভেসে চলি। তাই দেখেছি কি ভাবে মানুষেরা বড়শি দিয়ে বড় বড় মাছ ধরে ফেলে। রাজা মহাশয় আপনি তো মাটির উপর চলতে পারেন। আপনি একটি বড়শির ব্যবস্থা করেন তার পর আমি দেখেছি।
তেচোখা মাছের সাথে কথা বলতে বলতে আসতে আসতে কই মাছের রাগ শেষ হয়ে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। তাই সে কিছুক্ষন ভাবার পর দেখল তেচোখা মাছ সঠিক কথায় বলছে। তাই সে বলল-ঠিক আছে তা ব্যবস্থা করছি। এখন তুমি যা পরে তোর সাথে কথা হবে।

পরের দিন কই মাছ অন্য জলাশয়ে গিয়ে তেচোখা মাছের পরমর্শ অনুযায়ী পাটকাটিতে সুতো দিয়ে আটকানো বড়শির সুতোর উপর থেকে কেটে নেয়।তারপর তা নিয়ে ফিরে আসে। কই মাছ আবার তেচোখা মাছসহ অন্যান্য তার সহযোগী মাছগুলিকে নিয়ে বৈঠকে বসে। তেচোখা মাছকে কই মাছ বলল- বল এবার আমরা কি ভাবে বোয়াল মাছকে মারব?
তেচোখা মাছ বলল- একটি বড় সুতো বড়শির সুতোর সাথে যুক্ত করতে হবে। তার ওই সুতো গাছের মুলে বেঁধে দিতে হবে যে গাছটি পুকুরের ঠিক পাশে আছে। আর একটি মাছ ঐ বড়শিতে আটকে দিতে হবে। আর যখন ওই মাছটিকে বোয়াল মাছ খাবে তখন তার গলায় বড়শি আটকে যাবে। আর ও যতই বের করার জন্য দৌড়াবে ততই ভালো ভাবে আরও আটকাবে।আসতে অসতে সে ছটপট করতে এক সময় মারা যাবে। কিন্তু ভয় করলে চলবে না।
কই মাছ বলল- ঠিক আছে তাই হবে।

তেচোখা মাছের পরমর্শ অনুযায়ী সব কাজ করা হল। কিন্তু কোন মাছ জীবন দিয়ে বড়শিতে আটকে থাকতে চায় না। এত কষ্টের মৃত্যু থেকে বোয়াল মাছের শিকার হওয়া অনেক ভালো। কই মাছ নিরুপায় হয়ে বলল-আমি তাহলে বড়শিতে আটকাতে চাই।
তেচোখা মাছ বলল-রাজা আপনাকে কিছু করতে হবে না। আমি আমার জীবন আপনাদের জন্য দিতে চাই। কারণ আপনারা আমাকে যে ভাবে আপন করে নিয়েছেন তা কোন দিন ভুলের নয়। তাছাড়া আমার অন্য কোন আত্মীয় তো এখানে নেই।
কই মাছ তেচোখা মাছের এমন কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যায়। আর কিছুক্ষন পর বলল- তা কোন মতেই হতে পারে না। তোমাকে কোন মতেই কষ্ট দিতে পারব না। তুমি কত কি না আমাদের জন্য ভাবছ। তার থেকে আমার জীবন দেওয়ায় ভালো।
তেচোখা মাছ বলল- না আপনি থাকলে কে দেখবে অন্যান্য মাছদের। আপনি না রাজা।

অনেক বুঝবার কই মাছ রাজি হল। তেচোখা মাছটি বড়শিতে আটকেছে। ব্যথায় ছটপট করছে। বেরিয়ে যাচ্ছে রক্ত। ঠিক তখন বোয়াল মাছটি ওখান দিয়ে যাচ্ছিল। আর তাকে দেখে তেচোখা মাছটি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল-কাপুরুষ বোয়াল মাছ। পারলে আমাকে খেয়ে দেখ।
বোয়াল মাছ রেগে তেচোখা মাছটিকে গিলে ফেলল। আর সাথে সাথে বড়শি আটকে গেল তার গলায়। তা দেখে অন্যান্য মাছগুলি আনন্দে মেতে উঠল। যেন ফিরে পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি। কিন্তু কই মাছ নীরবে কাঁদছে তেচোখা মাছের আত্মত্যাগের কথা ভেবে।