সৈয়দ কওসর জামাল এর “বিস্ফোরণপর্ব”(২০১৯) কাব্যগ্রন্থটি দার্শনিকের পর্যবেক্ষণে, ভাবের দৃঢ়তায় এবং শিল্পীর শব্দটংকারে এমন এক রূপকার্থ বিন্যাস যা সময়েরই স্বর হয়ে উঠেছে। খুব কম লিখেও বেশি লেখা যায় তার-ই গভীর স্বাক্ষর এই কবিতাগুলি। “বিস্ফোরণপর্ব” একটা সময়েরই সরণি যা ব্যক্তিগত হয়েও রাষ্ট্রিক ও ঐতিহাসিক নিরিখে পর্যাপ্ত অবক্ষয় ও ধ্বংসের নানা পর্যায়। সংবেদী নিরীহ ছায়ায় কবির প্রতীতি অতলান্ত হয়েও বোধিকল্প ব্যাপ্তির মহানির্বাণে গতিশীল। কাব্যের ৪২ টি কবিতাতেই বিস্ফোরণের এই বারুদ ছিটকে পড়েছে।
সত্তর দশকের সেই বিদ্রোহ সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের চেতনায় রক্তাক্ত অভিযাপনের স্মৃতি কবির অনবদ্য প্রত্যয়ভূমি নির্মাণ করে দিয়েছে। কবি বলেছেন : “খোলা বিদ্যুতের তারে হাত রেখে শুরু এ জীবন”। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে শেখার মধ্যে দিয়েই নিজস্ব হৃদয়ের আলোটি জ্বেলে নিতে হয়েছে। কল্পিত বাস্তিল দুর্গ এবং বাস্তবিক সামাজিক বাস্তিল দুর্গ ভেঙে দিতে দিতে নতুন এক ইতিহাস ও সমাজ গঠনের যাত্রায় অগ্রসর হতে হয়েছে। কবি প্রশ্ন তুলেছেন :
“আমি কি একের পর এক কালো অক্ষর সাজিয়ে
দেওয়াল তুলিনি, বাঁচাতে চাইনি আলো?”
এই বাঁচানোর প্রয়াস তো সত্তরের পটভূমি থেকেই। রবার্ট ফ্রস্ট লিখেছেন : “We love the things we love for what they are.” কবি এই দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করলেন। তবু মনে হল : “এ পৃথিবী প্রেমহীন, পিশাচের উল্লাসনির্মিত”
কিন্তু যতই সংশয় ও দ্বান্দ্বিকবাদ পীড়িত করুক কবিকে, কবি তাঁর দার্শনিক প্রজ্ঞা থেকেই এর উত্তর পান :
“আমি জানি পৃথিবীই শেষপ্রান্ত ক্ষুদ্র জীবনের
আমি জানি মানুষের মৃত্যু হলে পৃথিবীও মৃত।”
সুতরাং মানুষের জন্যই এই পৃথিবী এবং মানবিক কল্যাণের পথই সভ্যতার পথ। জীবন প্রক্রিয়ায় এই মানবিক বিস্ফোরণই জেগে ওঠে । কবি কবিতা রচনার কারণটিও জানিয়ে দেন :
“বাতাস স্পন্দন ফিরে পায়
অন্ধকার পথে সহস্র মোমবাতি ঘুরছে পথে পথে
হারানো অক্ষর দিয়ে পুনরায় পৃথিবীর বর্ণবিভা লিখি ।”
এই বর্ণবিভা মানবিক প্রত্যয়ের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি যা আমেরিকান কবি ই ই কামিংসও লিখেছেন :
“To be nobody but
yourself in a world
which is doing its best day and night to make you like
everybody else means to fight the hardest battle
which any human being can fight and never stop fighting.”
(e.e. cummings)
নিজের পৃথিবী এবং অন্যের পৃথিবীও যে একটি ভালো পৃথিবীর প্রতিষ্ঠা সেই লক্ষ্য নিয়েই সংগ্রাম কবির। যেখানে সেরাদিন ও সেরারাত্রি বিরাজ করবে। সবাইকে সবাই ভালোবাসতে পারবে। আজও এই সংগ্রামের কখনো ছেদ পড়েনি। মানবিকতাই এর একমাত্র পাথেয়।
আত্মপরিধির ভেতর এক দ্রোহ ও দর্শন নিয়েই কবি উচ্চারণ করেন : “প্রণয় জটিল কলা, /নক্ষত্রচারিণী”। বাস্তবকে স্বীকার করেও অতিবাস্তবের রূপলাবণ্য কবি আহরণ করেন। মর্মরিত শব্দের প্রয়োগ ঘটে চৈতন্যের স্বয়ংক্রিয় লীলায়। মুক্তির সোপানে সত্যসন্ধানী হয়ে ওঠেন :
“তোমাকে বাঁচাতে চাই বলো সে ধর্মের কথা, সতত স্বাধীন
যেখানে সময় সত্য, পাখির আকাশ সত্য, কবির আশ্রয়”
অন্ধগর্ভ প্রহরযাপন থেকে অসফল লিপিকার কবি ভাষাকেই আলোর প্লাবন দিতে চেয়েছেন। দেহবাদ থেকেই আত্মধ্বনির উচ্ছ্বাস ও হাহাকারে ক্রিয়ার সদর্থক অভিব্যক্তি নির্ণয় করেছেন। “আগুন ও পতঙ্গকথা”, “রূপকথা”, “ব্যালাড হেমন্তকাল”প্রভৃতি দীর্ঘ কবিতাগুলিতেও নিরবধি রহস্যকুয়াশার অদ্ভুত এক ক্ষরণ, স্তব্ধতা, নিঃসঙ্গ ও নিঃস্বতা প্রবহমান। প্রেম ও প্রকৃতির শূন্য অভীপ্সায় বিমর্ষ ব্যাকুল কবিকে পাই ।”অন্ধদের গ্রাম” কবিতায় ভ্রম আর চিতা, আলো আর অন্ধচোখ সময়ের অভ্যন্তরে অসময় ও মায়ার জগৎ তৈরি করেছে। তাই বৈরাগ্য ও বৈপরীত্যের বাতাবরণ সেখানে।
“বিস্ফোরণপর্ব” ভয়ার্ত মৃত্যুর অন্ধকার, যেখানে “আর্তনাদ আমার গোপন স্নায়ুপথে /আমারই বিনাশে হাত রাখে /দৃষ্টিহীন শ্বাসহীন এই তমসায়”
প্রেতিনীকণ্ঠের গান বাতাসে আলোড়ন তোলে। নাগরিক সমাজ বিমূঢ় নিদ্রায় মগ্ন। এভাবেই মৃত্যুর শাসনে বিপর্যস্ত দেশ। বিদ্রোহ করলেই মৃত্যু। কবি জানেন “এই কাল অপদেবতার”। অমানবিক সভ্যতার বর্বর উত্থান এবং নৈরাজ্যের সীমাহীন অবক্ষয় যে অন্ধকারে মানুষকে অন্ধ করে দিয়েছে, সেই নেতৃত্ব দানকারী শাসককে কবি “পাশুপাত” বলে উল্লেখ করেছেন। নাগরিক জীবনের বিমূঢ়তা বা গড্ডালিকাকে লিখলেন এভাবে :
“কুয়াশাচ্ছন্ন জনপদ /নাগরিক গভীর নিদ্রায় /নিম্নগামী আত্মার পারদ /মেধাবৃত্তি ছায়াচ্ছন্ন প্রায়।”
আর এর শাসককে লিখলেন এভাবে :
“তুমি অহঙ্কার কল্পতরু /আত্মবিনাশের জতুঘর /উপশমে মরীচিকা-মরু /নৈরাজ্যে তোমার সহোদর।”
তৎসম শব্দের সমাহারে সময়ের এই সংকট ও ধ্বংস স্পষ্ট হয়ে উঠল। অন্ধ, নিশীথিনী, সংবর্ত, সংহার, আহ্লাদিনী শব্দগুলি উজ্জীবিত বর্বরতার প্রচ্ছায়াকে প্রকট করে তুলল। কবিতা রূপকের ছান্দিক আড়ালেও স্পষ্টতায় ৠজু হয়ে উঠল। পুরাণ নিবিষ্ট প্রতীক থেকে ব্যাসজন্মের অনুক্ষণ ফিরে এল কাম-ক্রোধের প্রবৃত্তিগত তাড়নায়। মীনগন্ধভরা দেশ যোজনগন্ধা হতে পারল না। সত্যবতী সত্যিই কি ব্যাসের জন্ম দিল? কবি বলেছেন সবই “হল্লাসেনা” । ব্যঙ্গ ও বক্রোক্তির মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি ও ব্রহ্মকেই কবি বার বার উত্থাপন করেছেন ; তেমনি পার্থিবকে দেহবাদে এবং দেহকে বিদেহে নিয়ে যেতে পেরেছেন। মেধাবী ও পরিশীলিত আত্মশক্তির পরিচয় সমগ্র কাব্য জুড়েই ছড়িয়ে আছে।


বিস্ফোরণপর্ব : সৈয়দ কওসর জামাল, কলমচি, ২৩/৪ রাজকৃষ্ণ চ্যাটার্জি রোড, কলকাতা ৭০০০৪২, প্রচ্ছদ :শান্তনু মিত্র, মূল্য ১০০ টাকা।