মনে প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে শাহেদ এবার মিলির বাসা থেকে বের হয়ে আসলো।

মিলি বলেছে শাহেদ যদি কখনো বাসায় গিয়ে তার সাথে দেখা করতে চায় তবে সে ছয়তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করবে।

এর আগেও একদিন মিলি শাহেদের সামনে দেয়ালে কপাল ঠুকে নিজেকে রক্তাক্ত করেছে। শাহেদ হাত দিয়ে বাধা দিতে গেলে অপমান করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে।

মিলি শাহদকে একেবারেই সহ্য করতে পারছে না। এমনকি তার নাম শুনলেও গায়ে জ্বালা ধরে যাচ্ছে। অথচ একটা সময় দুজনের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দু’বছরের সম্পর্কে একটা দিনের জন্যও কেউ কাউকে দেখা ছাড়া থাকেনি। মিলির বাসায় শাহেদের অবাধ যাতায়াত ছিল। তাছাড়া মিলির পরিবারের সবাই শাহেদকে বেশ ভালোভাবেই নিয়েছিল। মেনে নেওয়ার কারণও বেশ জোরালো। শাহেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া মেধাবী ছাত্র এবং তুখোড় ছাত্রনেতা। দেখতে শুনতেও সবার থেকে আলাদা। বলা যায় এক দেখাতেই নজর কাড়ার মতো। মিলি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এর ওপরে অনার্সে ভর্তি হয়েছে।

তাদের সম্পর্কটা হয় মূলত শাহেদের এক বন্ধুর মাধ্যমে। মিলি তার বন্ধুর কাজিন। মিলি দেখতে খুব একটা সুন্দরী না হলেও শাহেদের কাছে ভালো লেগে যায়। শ্যামলা রঙের দোহারা গড়নের মিলির মাঝেই শাহেদ এক ধরণের ভালোলাগার আকর্ষণ খুঁজে পায়। পরবর্তীতে তা ভালোবাসার সম্পর্কে রূপ নেয়।

মিলি যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করছিল তখন থেকেই তাদের সম্পর্কের শুরু। শাহেদের ইচ্ছে ছিল মিলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করুক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত চান্স হয়নি। শাহেদের একটা দোষ ছিল। সে নিজেকে সবসময় সেরা ভাবতো। আর রাজনীতি করার কারণে তার মধ্যে এক ধরণের কর্তৃত্বপরায়ন মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এজন্য মনে মনে নিজেকে নিয়ে অহঙ্কার করতো। সে চাইতো চারপাশের সবাই তাকে মান্য করুক, তার কথামতো কাজ করুক। আর তার এই স্বভাব মিলির ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।

মিলি শাহেদকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো বলেই শাহেদের এই রকম আচরণকে সে সহজে মেনে নিয়েছিল। ফলে দুজনের সম্পর্কের বেশ উন্নতিও হয়েছিল। যখন তখন মিলির সাথে দেখা করতে চাইতো। নানা অসুবিধা থাকলেও কোনো অজুহাত না দেখিয়ে মিলি শাহেদের কাছে চলে আসতো। তাছাড়া মিলির পরিবারের সবাই ব্যাপারটা জানতেন এবং সানন্দে মেনে নেওয়াতে শাহেদের কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণ একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলো। শাহেদ মিলির পরিবার, বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে সবকিছুতে জোরালো হস্তক্ষেপ করতে লাগলো। মিলির এসব সয়ে গিয়েছিল এবং সে নিজেকে শাহেদ থেকে আলাদা কিছু ভাবতো না।

সবকিছুই ঠিকমতো এগুচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু মনস্তাত্বিক দিক থেকে বিচার-বিবেচনা করতে গেলে অনেক সম্ভাবনাও এক সময় নিভে যেতে থাকে। যেমন কাউকে খুব বেশি গুরুত্ব দিলে সে নিজেকে মহামূল্যবান একজন ভাবতে থাকবে আর যার কাছ থেকে গুরুত্ব পাচ্ছে যে তার কাছে অনেকটা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মিলি আর শাহেদের ব্যাপারেও এমনটিই ঘটলো। শাহেদের প্রতি মিলির প্রচ- ভালোবাসা আস্তে আস্তে শাহেদের কাছে সহজ স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। শাহেদ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে লাগলো। ফলে মিলি আর আগের মতো শাহেদের কাছ থেকে পধৎব পাচ্ছিলো না। তাই মিলি শাহেদের পরিবারের সাথে যুক্ত হতে চাইলো। শাহেদের বড় ভাইয়ের বাসা ঢাকতে। মিলি একদিন বললো-“শাহেদ চলো, ভাইজানের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসি। ভাবির সাথেও পরিচিত হবো। আমাদের সম্পর্কটাও সবাই জানতে পারবে।”
শাহেদ বাধা দিয়ে বললো- “আমি তো এখন পর্যন্ত আমার ফ্যামেলির কাউকে তোমার ব্যাপারে বলিনি। হঠাৎ তোমাকে নিয়ে গেলে ব্যাপারটা বাজে দেখাবে। আর আমি এখনই এসব ফালতু বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না।”
মিলি স্তব্ধ হয়ে গেলো শাহেদের কথা শুনে। শুধু বললো-
“তোমার আমার সম্পর্কটা তোমার কাছে ফালতু বিষয়। আর তোমার পরিবারের কেউ এখনো আমার কথা জানে না। আমার তো খুবই আশ্চার্য লাগছে। অথচ আমার বাসার সবাই তোমাকে কত পধৎব করে।
শাহেদ তখন মিলিকে শান্ত করার জন্য বললো-
“মিলি শোন, তুমি এত রিয়্যাক্ট করছো কেন? আমি বাড়ির সবচেয়ে ছোট। আমার বড় দুই ভাই এখনো অববাহিত। এর মধ্যে আমি কীভাবে তোমার কথা বলি। যখন সময় হবে তখন তো বলবোই। আর এখন যদি বলি সবাই ভাববে আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি। এটা আমার জন্য খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।”
মিলি আর কিছু না বলে সেদিন চলে গেলো। কিন্তু তার কানে বার বার “ফালতু বিষয়” কথাটা বাজতে লাগলো। সে কিছুতেই কথাটা মেনে নিতে পারছে না।
মিলি শাহেদের ব্যাপারে হঠাৎ করেই পড়হভঁংবফ হয়ে গেলো। তার মনে হলো শাহেদ তাকে অন্য আট-দশটা মেয়ের মতো ভাবছে। শাহেদের কাছে তার কোনো গুরুত্বই নেই। তবে কি এতদিন সে মরীচিকার পেছনে ছুটেছে। এরপর থেকে মিলি নিজেকে আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। যেহেতু সে শাহেদকে খুব ভালোবাসে তাই সে সম্পর্ক ভাঙার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিল না। আগের মতোই দেখা-সাক্ষাত, যোগাযোগ চলতে লাগলো। মিলির মধ্যে যে কিছুটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে তা শাহেদ টেরই পেল না।

এর মধ্যে একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল। শাহেদের ইমিডিয়েট বড় ভাই শরীফ সিএনজি এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার বাম পায়ে প্রচ- আঘাত লেগেছে তাই পনেরো দিন ধরে সে special care এ আছে। এই দিনগুলোতে শাহেদ সারাক্ষণ তার পাশে থাকায় ব্যস্ততার কারণে মিলির সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। মিলি কয়েকবার ফোন দেওয়াতে শুধু বলেছে ব্যস্ত আছি কিন্তু ব্যস্ততার কারণ বলেনি। মিলি কোনো উপায় না দেখে শাহেদের হলে এসে শুনতে পেলো বড় ভাইয়ের এক্সিডেন্টের কথা। কথাটা শুনে মিলি ভীষণ রিয়্যাক্ট করলো। সে ভাবতেই পারছে না এরকম সিরিয়াস একটা ব্যাপার তাকে লুকোনোর কি আছে। হলের বন্ধুদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে মিলি সোজা হাসপাতালে গিয়ে শাহেদকে ফোন দিলো। ফোন পেয়েই শাহেদ দৌড়ে এসে মিলিকে বললো-

“মিলি, তোমার এখনে আসা মোটেই উচিত হয়নি। এজন্যই আমি তোমাকে বলিনি। ভিতরে আমার বড় ভাই-ভাবীরা, বাবা-কাক সবাই আছে। আমি চাইনা তোমার সাথে এখনই সবার দেখা হোক। তাই বলছি, please তুমি চলে যাও।”

মিলি অবাক হয়ে স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ শাহেদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললোÑ “আমি ভাইয়াকে একবার দেখে চলে যাবো।”
“ঠিক আছে, তাহলে তুমি একা গিয়ে দেখে আসো। আমি যেতে পারবো না। আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার কথা বলো না।”

মিলি এ কথাগুলো শুনে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে হাসপাতাল থেকে চলে গেলো। শাহেদ পিছন থেকে আর ডাক দিল না, যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

মিলি বাসায় গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলো। শাহেদের এরকম দুর্ব্যবহার সে কিছুতেই মানতে পারছে না। প্রচ- আত্মসম্মানবোধ তার মনকে শক্ত করে দিলো। সিদ্ধান্ত নিলো যে তাকে গুরুত্ব দেয় না, তার সাথে আর নয়। যথেষ্ট হয়েছে। যেখানে ভালোবাসার পরিবর্তে অবহেলা আর অপমান মিলছে সেখানে পড়ে থেকে সুখী হওয়ার বৃথা চেষ্টা করে লাভ নেই। তার চেয়ে স্বাধীনভাবে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে বেঁচে থাকাটাই জীবনের পরম সত্য। নিজস্ব সম্মানটুকুই যদি না থাকে তবে এ জীবনের কি দাম আছে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো শাহেদের সাথে আর যোগাযোগ রাখবে না।

এদিকে প্রায় পঁচিশ দিন পর শরীফ হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে বাড়ি চলে গেলো। শাহেদ ঝামেলামুক্ত হয়ে মিলিকে ফোন দিলো। মিলি ফোন রিসিফ করে বললো- “হ্যালো, কে আপনি? কাকে চাচ্ছেন?”

শাহেদ একটু ধাক্কা খেয়ে বললো- “মিলি আমার সাথে এভাবে কথা বলছো কেন? এতদিন ফোন দিতে পারিনি বলে রাগ করেছ, তাই না? তুমি তো জানোই …

মিলি রং নাম্বার বলে ঠাস করে ফোন কেটে দিলো।

শাহেদ আবার চেষ্টা করে ফোন পেলো। সে বুঝতে পারলো মিলি ভীষণ রাগ করেছে, তাই সেদিন সন্ধ্যায় মিলির বাসায় গেলো। শাহেদকে মিলির মা খুব পছন্দ করে। তাই মিলির সাথে যোগাযোগ করতে না পারার কারণটা শাহেদ খুব গুছিয়ে মিলির মাকে বললো। আর মিলির হাসপাতালে যাওয়ার ঘটনাটা চেপে গেলো, মিলির মা সব শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করে মিলিকে ডাকতে গেলো। মিলি শাহেদের আসার শব্দ পেয়েই রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তার মা বার বার ডাকার পারও সে রুম থেকে বের হলো না। শাহেদ বিষণ্ন মনে চলে আসলো।

তারপর থেকে শাহেদ বুঝতে পারলো যে, সে মিলির উপর অনেক অবিচার করে ফেলেছে। এটাই হয়তো জগতের নিয়ম, যখন কেউ তার ভুল বুঝতে পারে তখন আর কিছুই করার থাকে না। তবুও শাহেদ আবার চেষ্টা করলো মিলির অভিমান ভাঙাতে। কিন্তু মিলি তার সিদ্ধান্তে অনড়। শাহেদের ফোন রিসিভ করে না। শাহেদ যদি অন্য নাম্বার থেকে ফোন দেয় তবে রিসিভ করার পর বুঝার সাথে সাথে কেটে দেয়। পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেছে। শাহেদ এখন মিলির জন্য পাগলপ্রায় হয়ে গেছে। আর মিলির শাহেদের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে। কোনো উপায় না দেখে শাহেদ আবার মিলির বাসায় গেল এবং মিলির মাকে মিলির দুর্ব্যবহারের কথা বললো। মিলির মা আশ্বাস দিলো যে মিলিকে বুঝাবে। তারপর মিলিকে অনেক অনুনয়-বিনয় করলো, ক্ষমা চাইলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। মিলির এক কথা সে শাহেদের মুখ দেখতে চায় না।

সম্পর্ক হওয়ার পর বছরের প্রতিটি বিশেষ দিনই তারা বিশেষভাবে উপভোগ করেছে। এবারের পহেলা বৈশাখে শাহেদ মনের সবটুকু বিশ্বাস নিয়ে মিলিকে ফোন করলো এবং দেখা করার কথা বললো। মিলি না করলেও শাহেদ ভেবেছিল সে আসবে। তাই সারাদিন হল থেকে বের হলো না। কিন্তু মিলি শেষ পর্যন্ত আসেনি। ফলে শাহেদের মনে ব্যাপক শূন্যতা সৃষ্টি হলো। হতাশা দিন দিন বাড়তেই থাকলো। কোনোভাবেই মিলিকে টলানো গেল না। এভাবেই চলতে থাকলো।

শাহেদের মাস্টার্স শেষ হবার আগেই ব্যাংকে চাকরি হয়ে গেল। শাহেদ ভাবলো এবার হয়তো মিলি এড়িয়ে যাবে না। কিন্তু আগের অবস্থাই বিরাজমান। শাহেদের চাকরীর কোনো মূল্য নেই মিলির কাছে। মিলির এক কথা, সে শাহেদকে সবকিছুর উর্ধ্বে ভালবেসেছিল, শাহেদ সেটার মূল্যায়ন করেনি তাই আর তার কোনো মূল্য নেই মিলির কাছে।

ইতোমধ্যে শাহেদের পাগলামি মিলি, মিলির পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ছাড়িয়ে তার পরিবারেও ছড়িয়ে গেল। তার বড় ভাইয়েরা সবাই মিলির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেল। মিলির পরিবার এক কথায় রাজি কিন্তু মিলি সবার উদ্দেশ্যে শুধু একটি কথাই বললো- শাহেদের মতো স্বার্থপর, একগুঁয়ে একটা ছেলেকে বিয়ে করে সে জীবনেও সুখী হতে পারবে না। আর যদি সবাই মিলে বিয়েতে বাধ্য করে তবে শাহেদের জীবনের সমস্ত সুখ-শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে। আর তাই সে যেন তাকে আশা না করে অন্য কোথাও চেষ্টা করে। তবেই সবার মঙ্গল হবে। এরপরও সে যদি বাসায় আসে তবে সে আত্মহত্যা করবে তবু তার মুখ দেখবে না।

এরপর শাহেদ আর মিলির বাসায় যায়নি। মিলির মায়ের কাছে ফোন দিয়ে ওর খোঁজ নিতো। আর এদিকে শাহেদের বড় ভাইয়েরা মিলির বাসা থেকে এসেই শাহেদের বিয়ে ঠিক করে ফেলে। শাহেদকে বাড়ি যাওয়ার জন্য খবর দেয়া হয়। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা অন্য একজনের সাথে শাহেদের বিয়ে দিয়ে দেয়।

আর মিলি তার আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রেখে নিজের মতো করে বাঁচতে থাকে।