একাকী জীবন লৌকিকতার আড়ালের নানামুখী যাতনায় গুমরে উঠলেও একা থাকার আলাদা একটা অনির্বচনীয় সুখ আছে। যে সুখ সাধারণ জীবনকে অতিক্রম করে সর্ব্বোচ্চ সুন্দরের কাছাকাছি নিয়ে যায় মানুষকে। মানুষ যখন নিজ সত্তা থেকে বের হতে পারে তখন তার মতো সুখি আর কেউ হতে পারে না। তার সুখ সহ্য করতে পারে না আমজনগণ। এজন্য তাকে নানাভাবে পীড়ন করতে থাকে। তাকে ঐশ্বরিক জগৎ থেকে নিজের কর্দমাক্ত ও কলুষিত জীবনে নামিয়ে আনতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ সনদধারীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা প্রবল থেকে প্রবলতর। এরা অধিকাংশই সনদ অর্জন করে, শিক্ষিত হয় না। কেউ কেউ শিক্ষিত হলেও শিল্পিত হয় না। শিল্পিত না হতে পেরে শুধু শিক্ষিত হলে নিজ বা জাতির কোনো উপকার হয় না। উপকার যে হয় না তা অনুধাবন করার মতো এদের আবার মানস তৈরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠেছে সনদ বিক্রির কারখানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অর্জন করে গর্জনকারী লোকদের দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু একটা প্রেস হতো তাহলেই ভালো হতো। সারা বছর শুধু সনদ উৎপাদন করতো আর প্রিন্ট দিতো। যার যেমন খুশি তেমন করে টাকা দিয়ে সনদ নিয়ে যেতো।

যাইহোক, আমার প্রসঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আত্মতত্ত্ব। একাকী না হলে আত্মতত্ত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করা যায় না। আবু হুরাইরা, বোখারী, সাইয়েদ কুতুবরা এজন্যই একা থেকেছেন কীনা তা গবেষণার দাবি রাখে। একাকী জীবনের একাগ্রতা আছে যা সমগ্রতাকে ছাপিয়ে ওঠে। এজন্য মানুষ সৃষ্টির মুহুর্তে এবং গবেষণার সময় একা থাকতে পছন্দ করে। আল্লাহ বা ইশ্বর বা ভগবান হয়তো এইজন্যেই একা। পরমের সঙ্গ যখন জীবনের মিলন ঘটে তখন অন্যকে সহ্য করা যায় না। অসহ্য মনে হয়। চরম সুখের মুহুর্তে মানুষ একা থাকতেই পছন্দ করে। যাদের জীবনের চরম বা পরম সুখ আসে না তারা এটা উপলব্ধিতে আনতে পারে না। তাই নিজ থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ যখন ভাসমান হয়ে ওঠে তখনি নিজস্বতা আবিষ্কার করে। সাদা মেঘের মতো সে উড়তে থাকে। যেখানে যায় সেটাই তার আবাস মনে করে। সমগ্র প্রকৃতি তার নিজের হয়ে ওঠে। নিজে আবার সমগ্র প্রকৃতির হয়ে ওঠে। মানুষের যখন বাড়ি-গাড়ি-নারী হয়ে যায় তখন থেকে সে পার্থিব বিষয়ে মত্ত থাকে। আধ্যাত্মিকতা তার কাছে অকল্পনীয় ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। আর জীবন নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করেন তারা মনে করেন, অপ্রয়োজনের দাবিই মূল দাবি। অপ্রয়োজনের প্রয়োজনই আসল প্রয়োজন।

একাকী সামগ্রিক হয়ে ওঠার জন্য একক জীবনের ব্যতিক্রম খুব কম। মোহাম্মদ সা. ছাড়া আন্য কাউকে এমন দেখিনি। তাঁর এই ভারসাম্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সকল গবেষক ব্যর্থ হয়েছেন। কীভাবে সম্ভব এটা! মহাকালের মহাবিস্ময় তিনি! শুধু মহামানব নন তিনি অতিমানবও বটে। তাঁর হেরাগুহার ধ্যানকে যারা বুঝতে পারে না তারা তাঁকে পায় না। তাঁকে না পেয়ে আবার তাঁকে নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ায়। মনে রাখা দরকার, অধ্যাত্মিকতায় থাকাকালে কোরআন নাযিল শুরু হয়। এটাই মৌলিক। সুফিরা এই মৌলিকতাকে ধারণ করে। তারা আল্লার রংয়ে রঙিন হতে চায়। তারা জানে তার রংয়ের মত উত্তম রং আর কিছু হতে পারে না। আমরা মসনবির সুনাম করি কিন্তু সুফিবাদের বিপক্ষে বলি। আমরা আল্লামা ইকবালের সুনাম করি কিন্তু সুফিবাদের বিপক্ষে বলি। এমন করে শেখ সাদী, ইমাম গাজ্জালী, সুলতান শাহ বলখী, শাহ মখদুম, শাহজালাল, শাহপরাণ, খানজাহান আলীসহ অসংখ্য দরবেশের সুনামে আমরা পঞ্চমুখ কিন্তু সুফিবাদের বদনামে উন্মুখ। মনসুর হাল্লাজকে খুব মনে পড়ছে। যিনি নিজেকে আল্লাহর মধ্যে হারিয়ে ফেলে আনাল হক বলা শুরু করেছিলেন। কেন জানি মনে হয় তিনিই আল্লাহকে পেয়েছিলেন।

আমাদের আত্মার মুক্তি হোক।